জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও সহনশীল করে তুলতে জলবায়ু, দুর্যোগ ও শিক্ষাসংক্রান্ত তথ্যের সমন্বয় এবং জাতীয় শিক্ষাপরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে এসব তথ্যের কার্যকর ব্যবহার জোরদার করছে বাংলাদেশ।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও তীব্র তাপপ্রবাহ বিদ্যালয়ের অবকাঠামোর ক্ষতি এবং শিক্ষার্থীদের পাঠদান ব্যাহত করছে। বাংলাদেশে শিক্ষা ও জলবায়ুসংক্রান্ত বিপুল তথ্য থাকলেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এসব তথ্যের পর্যাপ্ত সমন্বয় না থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয় চিহ্নিত করা, দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি মূল্যায়ন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তার অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ইউনেসকোর সহযোগিতায় বিদ্যমান তথ্যব্যবস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার এবং শিক্ষা পরিকল্পনায় জলবায়ুসংক্রান্ত তথ্যের ব্যবহার বাড়াতে কাজ করছে।
এরই ধারাবাহিকতায় ক্লাইমেট স্মার্ট এডুকেশন সিস্টেমস ইনিশিয়েটিভের (সিএসইএসআই) আওতায় আয়োজিত তিন দিনব্যাপী একটি জাতীয় কর্মশালা বৃহস্পতিবার ঢাকার হোটেল হলিডে ইনে শেষ হয়েছে।
কর্মশালায় সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষা পরিকল্পনাবিদ ও কারিগরি বিশেষজ্ঞরা বিদ্যমান তথ্যব্যবস্থার ঘাটতি পর্যালোচনা করেন। বিশেষভাবে বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিসংখ্যানের (এপিএসএস) ওপর গুরুত্ব দিয়ে তথ্য আদান-প্রদান, বিভিন্ন তথ্যব্যবস্থার মধ্যে আন্তঃসংযোগ ও সমন্বয় এবং জলবায়ুসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া উন্নত করার উপায় নিয়ে আলোচনা করা হয়।
ইউনেসকোর ঢাকা কার্যালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানিয়েছে।
কর্মশালায় শিক্ষা, জলবায়ু ও দুর্যোগসংক্রান্ত বিদ্যমান তথ্যের উৎস ও সংগ্রহপদ্ধতি পর্যালোচনা ও যাচাই, তথ্যের ঘাটতি মূল্যায়ন এবং উন্নয়নের অগ্রাধিকার নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। আলোচনায় এপিএসএসের বিদ্যমান তথ্য সংগ্রহপদ্ধতিতে সম্ভাব্য সংযোজন বা সংশোধন, বিভিন্ন তথ্যব্যবস্থার মধ্যে আন্তঃসংযোগ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান জোরদারের উপায় উঠে আসে।
পাশাপাশি ভবিষ্যতে এপিএসএসে অন্তর্ভুক্তির জন্য জলবায়ুসংক্রান্ত প্রাথমিক প্রশ্ন ও তথ্যসূচক তৈরির বিষয়েও আলোচনা হয়।
কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (নিরীক্ষা ও আইন অনুবিভাগ) দেলোয়ারা বেগম।
তিনি জলবায়ু ঝুঁকি থেকে শিক্ষাখাতের বিনিয়োগ সুরক্ষিত রাখার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “দুর্যোগ কিংবা তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে কোনো বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেলে শিক্ষাখাতের অন্য বিনিয়োগের সুফলও কিছুটা কমে যায়। তাই শিক্ষা পরিকল্পনায় জলবায়ুর বিষয়টি বিবেচনা করা কোনো বাড়তি কাজ নয়; বরং এটি আমাদের সামগ্রিক বিনিয়োগকে সুরক্ষিত রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।”
ছবি: ইউনেসকোর ঢাকা কার্যালয়
ইউনেসকো ঢাকা কার্যালয়ের শিক্ষা বিভাগের প্রধান নোরিহিদে ফুরুকাওয়া বিদ্যমান তথ্যব্যবস্থাগুলোকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, “জলবায়ু-সহনশীল শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে শুধু তথ্য সংগ্রহ করাই যথেষ্ট নয়। বিদ্যমান তথ্যের মধ্যে সমন্বয় এবং গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতিগুলো পূরণের মাধ্যমে আমরা শিক্ষা কর্তৃপক্ষকে আরও কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করতে পারি, যা বিদ্যালয়ের সুরক্ষা এবং শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
এই উদ্যোগ সিএসইএসআই-প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত পূর্ববর্তী কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা। ২০২৫ সালের অক্টোবর এবং ২০২৬ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত কর্মশালাগুলোতে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় জলবায়ু ঝুঁকি, ঝুঁকি প্রবণতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা পর্যালোচনা করা হয়। এ ছাড়া, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত আরেকটি কর্মশালায় পাঠ্যক্রমে জলবায়ু শিক্ষা অন্তর্ভুক্তি এবং এ বিষয়ে শিক্ষকদের প্রস্তুতি মূল্যায়ন করা হয়। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষানীতি, পরিকল্পনা ও পাঠদান প্রক্রিয়ায় জলবায়ু সহনশীলতা অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যভিত্তিক ভিত্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদার করা হচ্ছে।
নির্ভরযোগ্য ও সমন্বিত তথ্যের সহজলভ্যতা শিক্ষা কর্তৃপক্ষকে জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা বিদ্যালয় চিহ্নিত করা, নিরাপদ অবকাঠামোতে বিনিয়োগের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে। বিশেষ করে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকার শিশুদের শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে, ইউনেসকো এবং ইউনেসকোর ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর এডুকেশনাল প্ল্যানিংয়ের (ইউনেসকো-আইআইইপি) কারিগরি সহায়তায় এবং গ্লোবাল পার্টনারশিপ ফর এডুকেশনের (জিপিই) অর্থায়নে সিএসইএসআই বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য শিক্ষাখাতের নীতি, পরিকল্পনা, বাজেট ও কৌশলে জলবায়ু সহনশীলতা এবং পরিবেশগত টেকসই উন্নয়নের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জলবায়ু-সহনশীল করে তোলা।