ফজলে রাব্বি

বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। কোরবানি ঈদকে ঘিরে বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যয়ের উল্লম্ফন এবং জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির প্রভাবে মে মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে, যা গত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সাম্প্রতিক বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির পূর্ণ প্রভাব এখনো বাজারে প্রতিফলিত হয়নি। ফলে আগামী মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতি আরও ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত সর্বশেষ মূল্যস্ফীতি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এপ্রিল মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ০৪ শতাংশ। এক মাসের ব্যবধানে তা বেড়ে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরুতে জুলাই মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ। অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে থাকলেও ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে ওঠে। মার্চে সামান্য কমলেও এপ্রিল ও মে মাসে আবারও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায়।
এই ঊর্ধ্বগতির পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি। জ্বালানির সঙ্গে উৎপাদন, পরিবহন, বিপণন এবং সরবরাহ ব্যবস্থার প্রায় প্রতিটি স্তর সরাসরি সম্পৃক্ত। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব কেবল পরিবহন খরচেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং কৃষি উৎপাদন থেকে শুরু করে শিল্পপণ্য, নির্মাণসামগ্রী, খাদ্যপণ্য এবং সেবাখাত-সব ক্ষেত্রেই ব্যয় বাড়ে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির সম্পর্ক
সরকার গত এপ্রিল মাসে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়। সে অনুযায়ী ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১০০ টাকা থেকে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে ১৩০ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা এবং পেট্রলের দাম ১১৬ টাকা থেকে ১৩৫ টাকায় উন্নীত করা হয়। একই সময়ে গ্যাসের মূল্যও সমন্বয় করা হয়। এরপর মে মাসের শেষ দিকে আবারও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি করা হয়, যদিও তা জুন মাস থেকে কার্যকর হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মূল্য সমন্বয় করা হলেও এর অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক প্রভাবকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে এমন সময়ে যখন মূল্যস্ফীতি আগে থেকেই উচ্চ অবস্থানে রয়েছে, তখন জ্বালানির দাম বৃদ্ধি বাজারে নতুন চাপ সৃষ্টি করে।
সামষ্টিক অর্থনীতির ভাষায় জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ‘কস্ট-পুশ ইনফ্লেশন’ বা ব্যয়জনিত মূল্যস্ফীতি তৈরি করে। উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার ফলে ব্যবসায়ীরা সেই অতিরিক্ত খরচ পণ্যের দামের মাধ্যমে ভোক্তার ওপর স্থানান্তর করেন। এর ফলেই বাজারে প্রায় সব ধরনের পণ্যের মূল্য বাড়তে থাকে।
বাজার তদারকির ব্যর্থতা বড় কারণ
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ মনে করেন, মে মাসে মূল্যস্ফীতি ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পেছনে শুধু জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নয়, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও বড় ভূমিকা রেখেছে।
চরচাকে তিনি বলেন, “মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না, যার প্রধান কারণ আমাদের বাজার ব্যবস্থাপনার চরম দুর্বলতা। বাজার তদারকিতে নিয়োজিত সরকারি সংস্থাগুলোর কোনো পদক্ষেপই (অদৌ যদি কোন পদক্ষেপ থেকে থাকে) মাঠে কাজে আসছে না।”
তার মতে, বাজারে প্রতিযোগিতার অভাব, সরবরাহ ব্যবস্থার অদক্ষতা এবং কার্যকর নজরদারির ঘাটতির কারণে জ্বালানি ব্যয়ের চেয়ে বেশি হারে অনেক ক্ষেত্রে পণ্যের দাম বাড়ানো হচ্ছে। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও গভীর হচ্ছে।
পরিবহন ব্যয় বেড়ে চাপে সরবরাহ ব্যবস্থা
বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশের প্রধান শহরগুলোতে পণ্য সরবরাহ পুরোপুরি পরিবহন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। কৃষিপণ্য, মাছ, মাংস, শাকসবজি কিংবা শিল্পপণ্য-সবকিছুর ক্ষেত্রেই পরিবহন ব্যয় একটি বড় উপাদান।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও অন্যান্য পণ্যবাহী যানবাহনের পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। এর ফলে জেলা থেকে রাজধানী কিংবা বিভাগীয় শহরগুলোতে পণ্য পরিবহনের খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে পরিবহন ব্যয় ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
এর প্রভাব কোরবানির পশুর বাজারেও দেখা গেছে। উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে রাজধানীতে পশু পরিবহনের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। জামালপুর ও সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকায় একটি গরুবাহী ট্রাক আনতে এ বছর প্রায় ২৮ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া গুনতে হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা বেশি। ফলে পশুর বিক্রয়মূল্যও বৃদ্ধি পেয়েছে।
মাসরুর রিয়াজ বলেন, “মে মাসে কোরবানি ঈদকে ঘিরে পশু ও খাদ্যপণ্যের বাজারে যে মূল্যচাপ তৈরি হয়েছিল, তার সঙ্গে এপ্রিল মাসে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব যুক্ত হয়ে মূল্যস্ফীতিকে আরও উঁচুতে নিয়ে গেছে।”
খাদ্য ও খাদ্য-বহির্ভূত উভয় খাতে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি
বিবিএসের তথ্য বলছে, মে মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ০৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এপ্রিল মাসে এই হার ছিল ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে খাদ্য মূল্যস্ফীতি প্রায় শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে।
অন্যদিকে খাদ্য-বহির্ভূত মূল্যস্ফীতিও ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। মে মাসে এ খাতে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৭১ শতাংশে, যা এপ্রিল মাসে ছিল ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ। বাসাভাড়া, পোশাক, পরিবহন, জ্বালানি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় বৃদ্ধির কারণে খাদ্য-বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, খাদ্য ও খাদ্য-বহির্ভূত উভয় খাতে একযোগে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাওয়া উদ্বেগজনক। সাধারণত কোনো একটি খাতে চাপ থাকলে অন্য খাত কিছুটা স্থিতিশীল থাকে। কিন্তু বর্তমানে দুই খাতেই মূল্যবৃদ্ধি ঘটছে, যা সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয়কে দ্রুত বাড়িয়ে দিচ্ছে।
মে মাসে গ্রামীণ এলাকায় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪৮ শতাংশে, যা শহরের ৯ দশমিক ২৫ শতাংশের চেয়ে বেশি। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আয়ের বড় অংশ খাদ্যপণ্য ক্রয়ে ব্যয় হয়। ফলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির প্রভাব তাদের ওপর তুলনামূলক বেশি পড়ে।
অন্যদিকে শহরে বাসাভাড়া, পরিবহন ও সেবাখাতের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে জীবনযাত্রার খরচ বাড়ছে। ফলে গ্রাম ও শহর-উভয় ক্ষেত্রেই জনগণ ক্রমবর্ধমান মূল্যচাপের মুখে পড়েছে।
মজুরি বাড়ছে, তবে মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম
মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় সামাজিক প্রভাব পড়ছে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২১ শতাংশ, যা এপ্রিল মাসে ছিল ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ।
অর্থাৎ মজুরি বাড়লেও তা মূল্যস্ফীতির তুলনায় অনেক কম। ফলে প্রকৃত অর্থে শ্রমজীবী ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের আয় কমে যাচ্ছে। একই পরিমাণ আয় দিয়ে আগের তুলনায় কম পণ্য ও সেবা ক্রয় করা সম্ভব হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে যদি মূল্যস্ফীতি মজুরি বৃদ্ধির চেয়ে বেশি থাকে, তাহলে মানুষের জীবনমানের অবনতি ঘটে এবং দারিদ্র্যের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
নতুন করে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রভাব
সম্প্রতি বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিদ্যুৎ শিল্প ও সেবা খাতের একটি মৌলিক উপকরণ। বিদ্যুতের দাম বাড়লে কারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, কৃষি সেচ ব্যবস্থা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে।
মাসরুর রিয়াজ সতর্ক করে বলেন, মে মাসে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে প্রতিফলিত হয়েছে। কিন্তু জুন মাসে নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ফলে আগামী মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও তীব্র হতে পারে।
তার ভাষায়, “জুন মাসে নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো মূল্যস্ফীতিকে আরও মারাত্মকভাবে উসকে দেবে।”
একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান। তার মতে, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি শিল্প উৎপাদন ব্যয় বাড়াবে এবং এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে গিয়ে পড়বে।
উত্তরণের পথ কী?
ড. মাসরুর রিয়াজের মতে, শুধু প্রশাসনিক নজরদারি দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।
তিনি সরকারকে দ্রুত বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা সম্প্রসারণের পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষকে সুরক্ষা দিতে না পারলে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব আরও গভীর হবে।
সিপিডির ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমানও মনে করেন, বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, সরবরাহ শৃঙ্খলে স্বচ্ছতা আনা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ বর্তমান পরিস্থিতিতে অত্যন্ত জরুরি।
সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ
বিগত অন্তর্বর্তী সরকার জুনের মধ্যে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার লক্ষ্য ঘোষণা করেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, সে লক্ষ্য অর্জনের ধারের কাছেও পৌঁছানো যায়নি। বরং মূল্যস্ফীতি আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের সামনে এখন কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাজার তদারকি জোরদার করা, সরবরাহ শৃঙ্খলে কৃত্রিম সংকট ও কারসাজি রোধ করা, জ্বালানি মূল্য সমন্বয়ের প্রভাব মোকাবিলা করা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির পূর্ণ প্রভাব এখনো বাজারে প্রতিফলিত হয়নি। ফলে আগামী কয়েক মাসে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। আর সেই চাপের প্রধান ভার বহন করতে হবে সীমিত আয়ের সাধারণ মানুষকেই।

বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। কোরবানি ঈদকে ঘিরে বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যয়ের উল্লম্ফন এবং জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির প্রভাবে মে মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে, যা গত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সাম্প্রতিক বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির পূর্ণ প্রভাব এখনো বাজারে প্রতিফলিত হয়নি। ফলে আগামী মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতি আরও ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত সর্বশেষ মূল্যস্ফীতি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এপ্রিল মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ০৪ শতাংশ। এক মাসের ব্যবধানে তা বেড়ে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরুতে জুলাই মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ। অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে থাকলেও ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে ওঠে। মার্চে সামান্য কমলেও এপ্রিল ও মে মাসে আবারও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায়।
এই ঊর্ধ্বগতির পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি। জ্বালানির সঙ্গে উৎপাদন, পরিবহন, বিপণন এবং সরবরাহ ব্যবস্থার প্রায় প্রতিটি স্তর সরাসরি সম্পৃক্ত। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব কেবল পরিবহন খরচেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং কৃষি উৎপাদন থেকে শুরু করে শিল্পপণ্য, নির্মাণসামগ্রী, খাদ্যপণ্য এবং সেবাখাত-সব ক্ষেত্রেই ব্যয় বাড়ে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির সম্পর্ক
সরকার গত এপ্রিল মাসে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়। সে অনুযায়ী ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১০০ টাকা থেকে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে ১৩০ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা এবং পেট্রলের দাম ১১৬ টাকা থেকে ১৩৫ টাকায় উন্নীত করা হয়। একই সময়ে গ্যাসের মূল্যও সমন্বয় করা হয়। এরপর মে মাসের শেষ দিকে আবারও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি করা হয়, যদিও তা জুন মাস থেকে কার্যকর হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মূল্য সমন্বয় করা হলেও এর অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক প্রভাবকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে এমন সময়ে যখন মূল্যস্ফীতি আগে থেকেই উচ্চ অবস্থানে রয়েছে, তখন জ্বালানির দাম বৃদ্ধি বাজারে নতুন চাপ সৃষ্টি করে।
সামষ্টিক অর্থনীতির ভাষায় জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ‘কস্ট-পুশ ইনফ্লেশন’ বা ব্যয়জনিত মূল্যস্ফীতি তৈরি করে। উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার ফলে ব্যবসায়ীরা সেই অতিরিক্ত খরচ পণ্যের দামের মাধ্যমে ভোক্তার ওপর স্থানান্তর করেন। এর ফলেই বাজারে প্রায় সব ধরনের পণ্যের মূল্য বাড়তে থাকে।
বাজার তদারকির ব্যর্থতা বড় কারণ
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ মনে করেন, মে মাসে মূল্যস্ফীতি ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পেছনে শুধু জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নয়, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও বড় ভূমিকা রেখেছে।
চরচাকে তিনি বলেন, “মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না, যার প্রধান কারণ আমাদের বাজার ব্যবস্থাপনার চরম দুর্বলতা। বাজার তদারকিতে নিয়োজিত সরকারি সংস্থাগুলোর কোনো পদক্ষেপই (অদৌ যদি কোন পদক্ষেপ থেকে থাকে) মাঠে কাজে আসছে না।”
তার মতে, বাজারে প্রতিযোগিতার অভাব, সরবরাহ ব্যবস্থার অদক্ষতা এবং কার্যকর নজরদারির ঘাটতির কারণে জ্বালানি ব্যয়ের চেয়ে বেশি হারে অনেক ক্ষেত্রে পণ্যের দাম বাড়ানো হচ্ছে। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও গভীর হচ্ছে।
পরিবহন ব্যয় বেড়ে চাপে সরবরাহ ব্যবস্থা
বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশের প্রধান শহরগুলোতে পণ্য সরবরাহ পুরোপুরি পরিবহন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। কৃষিপণ্য, মাছ, মাংস, শাকসবজি কিংবা শিল্পপণ্য-সবকিছুর ক্ষেত্রেই পরিবহন ব্যয় একটি বড় উপাদান।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও অন্যান্য পণ্যবাহী যানবাহনের পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। এর ফলে জেলা থেকে রাজধানী কিংবা বিভাগীয় শহরগুলোতে পণ্য পরিবহনের খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে পরিবহন ব্যয় ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
এর প্রভাব কোরবানির পশুর বাজারেও দেখা গেছে। উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে রাজধানীতে পশু পরিবহনের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। জামালপুর ও সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকায় একটি গরুবাহী ট্রাক আনতে এ বছর প্রায় ২৮ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া গুনতে হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা বেশি। ফলে পশুর বিক্রয়মূল্যও বৃদ্ধি পেয়েছে।
মাসরুর রিয়াজ বলেন, “মে মাসে কোরবানি ঈদকে ঘিরে পশু ও খাদ্যপণ্যের বাজারে যে মূল্যচাপ তৈরি হয়েছিল, তার সঙ্গে এপ্রিল মাসে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব যুক্ত হয়ে মূল্যস্ফীতিকে আরও উঁচুতে নিয়ে গেছে।”
খাদ্য ও খাদ্য-বহির্ভূত উভয় খাতে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি
বিবিএসের তথ্য বলছে, মে মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ০৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এপ্রিল মাসে এই হার ছিল ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে খাদ্য মূল্যস্ফীতি প্রায় শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে।
অন্যদিকে খাদ্য-বহির্ভূত মূল্যস্ফীতিও ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। মে মাসে এ খাতে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৭১ শতাংশে, যা এপ্রিল মাসে ছিল ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ। বাসাভাড়া, পোশাক, পরিবহন, জ্বালানি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় বৃদ্ধির কারণে খাদ্য-বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, খাদ্য ও খাদ্য-বহির্ভূত উভয় খাতে একযোগে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাওয়া উদ্বেগজনক। সাধারণত কোনো একটি খাতে চাপ থাকলে অন্য খাত কিছুটা স্থিতিশীল থাকে। কিন্তু বর্তমানে দুই খাতেই মূল্যবৃদ্ধি ঘটছে, যা সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয়কে দ্রুত বাড়িয়ে দিচ্ছে।
মে মাসে গ্রামীণ এলাকায় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪৮ শতাংশে, যা শহরের ৯ দশমিক ২৫ শতাংশের চেয়ে বেশি। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আয়ের বড় অংশ খাদ্যপণ্য ক্রয়ে ব্যয় হয়। ফলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির প্রভাব তাদের ওপর তুলনামূলক বেশি পড়ে।
অন্যদিকে শহরে বাসাভাড়া, পরিবহন ও সেবাখাতের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে জীবনযাত্রার খরচ বাড়ছে। ফলে গ্রাম ও শহর-উভয় ক্ষেত্রেই জনগণ ক্রমবর্ধমান মূল্যচাপের মুখে পড়েছে।
মজুরি বাড়ছে, তবে মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম
মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় সামাজিক প্রভাব পড়ছে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২১ শতাংশ, যা এপ্রিল মাসে ছিল ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ।
অর্থাৎ মজুরি বাড়লেও তা মূল্যস্ফীতির তুলনায় অনেক কম। ফলে প্রকৃত অর্থে শ্রমজীবী ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের আয় কমে যাচ্ছে। একই পরিমাণ আয় দিয়ে আগের তুলনায় কম পণ্য ও সেবা ক্রয় করা সম্ভব হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে যদি মূল্যস্ফীতি মজুরি বৃদ্ধির চেয়ে বেশি থাকে, তাহলে মানুষের জীবনমানের অবনতি ঘটে এবং দারিদ্র্যের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
নতুন করে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রভাব
সম্প্রতি বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিদ্যুৎ শিল্প ও সেবা খাতের একটি মৌলিক উপকরণ। বিদ্যুতের দাম বাড়লে কারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, কৃষি সেচ ব্যবস্থা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে।
মাসরুর রিয়াজ সতর্ক করে বলেন, মে মাসে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে প্রতিফলিত হয়েছে। কিন্তু জুন মাসে নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ফলে আগামী মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও তীব্র হতে পারে।
তার ভাষায়, “জুন মাসে নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো মূল্যস্ফীতিকে আরও মারাত্মকভাবে উসকে দেবে।”
একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান। তার মতে, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি শিল্প উৎপাদন ব্যয় বাড়াবে এবং এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে গিয়ে পড়বে।
উত্তরণের পথ কী?
ড. মাসরুর রিয়াজের মতে, শুধু প্রশাসনিক নজরদারি দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।
তিনি সরকারকে দ্রুত বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা সম্প্রসারণের পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষকে সুরক্ষা দিতে না পারলে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব আরও গভীর হবে।
সিপিডির ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমানও মনে করেন, বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, সরবরাহ শৃঙ্খলে স্বচ্ছতা আনা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ বর্তমান পরিস্থিতিতে অত্যন্ত জরুরি।
সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ
বিগত অন্তর্বর্তী সরকার জুনের মধ্যে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার লক্ষ্য ঘোষণা করেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, সে লক্ষ্য অর্জনের ধারের কাছেও পৌঁছানো যায়নি। বরং মূল্যস্ফীতি আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের সামনে এখন কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাজার তদারকি জোরদার করা, সরবরাহ শৃঙ্খলে কৃত্রিম সংকট ও কারসাজি রোধ করা, জ্বালানি মূল্য সমন্বয়ের প্রভাব মোকাবিলা করা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির পূর্ণ প্রভাব এখনো বাজারে প্রতিফলিত হয়নি। ফলে আগামী কয়েক মাসে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। আর সেই চাপের প্রধান ভার বহন করতে হবে সীমিত আয়ের সাধারণ মানুষকেই।