ইংরেজির শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখা প্যারিসের দরিদ্র শহরতলির ১৭ বছর বয়সী মাইসা এ সপ্তাহে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী ও তাদের সমর্থকের সঙ্গে বিক্ষোভে যোগ দিয়েছে। জরাজীর্ণ স্কুল, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক সংকটের প্রতিবাদে শুরু হওয়া ওই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো ফ্রান্সে।
প্যারিসের উত্তরে সেন-সাঁ-দেনি বিভাগের শহরতলি অবারভিলিয়ার্স। সেখানকার লিসে ল্য করবুসিয়ে স্কুলের বিক্ষোভকারীরা বলছেন, তাদের মতো দরিদ্র এলাকার স্কুলগুলোতেই সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
মাইসা বলেন, “গত বছর কোনো ফরাসি ভাষার শিক্ষক ছাড়াই আমি উচ্চমাধ্যমিকের ফরাসি পরীক্ষা দিয়েছি। অথচ শিক্ষকদের ভূমিকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ।…এগুলো পড়াশোনার উপযুক্ত পরিবেশ নয়।”
বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
এ সপ্তাহে ফ্রান্সের ১ হাজার ২০০টিরও বেশি উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার সময় কয়েকটি স্থানে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট ব্যবহার করেছে। ৫ হাজারের বেশি জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের কেউ কেউ চোখে আঘাত, দাঁত ভেঙে যাওয়া এবং মাথায় আঘাতসহ গুরুতর আহত হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ একে “অগ্রহণযোগ্য সহিংসতার পরিবেশ” আখ্যা দিয়ে শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
১৫ বছর বয়সী আমেলিয়া মাইসার সঙ্গে স্কুলের ফটকের বাইরে বিক্ষোভে যোগ দেয়। তার হাতে ছিল একটি প্ল্যাকার্ড, যাতে লেখা ছিল, “আমাদের ঠিকানা যেন আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ না করে।” সে বলেছে, দেশের অন্য এলাকার শিক্ষার্থীদের মতো সমান অধিকার পাওয়ার দাবিতেই সে বিক্ষোভ করছে।
“শিক্ষা কর্তৃপক্ষ শহরতলির এলাকাগুলোতে যথেষ্ট বিনিয়োগ করছে না। এটি শ্রেণিবৈষম্যমূলক এবং বর্ণবাদী,” সে বলেছে।
প্যারিস ৮ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী উলিস রাবাতে বলেন, এই বিক্ষোভ দেখিয়ে দিচ্ছে যে ফ্রান্সের প্রান্তিক শহুরে এলাকাগুলো ক্রমেই জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব ফেলছে।
তিনি বলেন, “যখন সরকারি সেবা, বিশেষ করে সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, তখন যারা এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি এবং সবচেয়ে তীব্রভাবে অনুভব করে, তারা সমাজের নিচের সারির মানুষ।”
রাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু
গত সপ্তাহে শুরু হওয়া দেশব্যাপী বিক্ষোভ ও অবরোধ এখন সরকারের জন্য রাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এমন এক সময়ে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যখন সরকার গত বৃহস্পতিবার ২০২৭ সালের বাজেটে ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয় কয়েকটি ব্যয় সংকোচনমূলক পদক্ষেপ ঘোষণা করেছে।
শিক্ষকদের পেনশন বাদ দিলে শিক্ষা খাতে বাজেট ১ দশমিক ৭ শতাংশ বাড়িয়ে ৬৫ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ইউরো করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে কম।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার্দ জেফ্রে বলেছেন, শিক্ষা সরকারের অগ্রাধিকার হিসেবেই রয়েছে এবং মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম হারে বাজেট বাড়ানোর কারণ হলো জনসংখ্যা কমে যাওয়া।
প্যারিসের শহরতলি, যেখানে দারিদ্র্যের হার বেশি, সেখান থেকেই বিক্ষোভ শুরু হয়ে পরে প্যারিস এবং মার্সেই, স্ত্রাসবুর্গ, তুর ও লিলসহ ফ্রান্সের অন্য শহরে ছড়িয়ে পড়ে।
অভিভাবকদের নির্বাচিত প্রতিনিধি করিমা কারা আলির ভাষ্য অনুযায়ী, লিসে ল্য করবুসিয়ে স্কুলে শিক্ষকের সংকটের কারণে শিক্ষাবর্ষ শুরুর পর থেকে গণিত, মানবিক, ইংরেজি ও শরীরচর্চাসহ বিভিন্ন বিষয়ের ক্লাস বাতিল করা হয়েছে।
শ্রমিক ইউনিয়ন সিজিটি জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সেন-সাঁ-দেনি বিভাগের দুই-তৃতীয়াংশ উচ্চমাধ্যমিক স্কুল বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে। চারটি শহরের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকেরা অস্বাস্থ্যকর স্কুল পরিবেশ এবং নার্স ও সমাজকর্মীসহ দীর্ঘদিনের জনবল সংকটের অভিযোগ করেছেন।
সেন-সাঁ-দেনি শাখার সিজিটির শিক্ষা ইউনিয়নের প্রতিনিধি লুইজ পাতেরনস্তের বলেন, শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও তাদের শিক্ষাগত প্রয়োজনের তুলনায় এলাকাটি পর্যাপ্ত সম্পদ পাচ্ছে না।
ইউনিয়নের এক জরিপ অনুযায়ী, বিভাগের দুই-তৃতীয়াংশ স্কুলে শিক্ষক পদ খালি রয়েছে।
পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই
তিনি বলেন, “আমাদের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার সময় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কিছু স্কুলে পান করার পানিও নেই। অন্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আমাদের সমতা নেই।”
২০২৬ সালে দেশজুড়ে ৩ হাজার ২৫৬টি শিক্ষক পদ কমানোর সরকারি সিদ্ধান্তের কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
প্যারিসের উত্তর-পূর্ব প্রান্তের শহর পান্তাঁয় শিক্ষক দিলান রোশ এ সপ্তাহে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্কুলের বাইরে বিক্ষোভে যোগ দেন। তিনি তাদের দাবির প্রতি সমর্থন জানাতে এবং পুলিশের হাত থেকে তাদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য সেখানে ছিলেন।
তিনি বলেন, “ব্যানারে তারা যা লিখেছে, আমরা তা স্থানীয় শিক্ষা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো চিঠিতেও লিখেছি—অতিরিক্ত শিক্ষার্থীসংবলিত শ্রেণিকক্ষ, কোনো নার্স নেই, কোনো সমাজকর্মী নেই। যেসব শিক্ষার্থীর শেখার সমস্যা রয়েছে এবং যাদের অনেকেই অনিশ্চিত জীবনযাপন করছে, তাদের জন্য এটি বিশেষভাবে সমস্যাজনক।”
শিক্ষায় ব্যয়ের ক্ষেত্রে ফ্রান্স ওইসিডিভুক্ত দেশগুলোর মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে মাধ্যমিক পর্যায়ের একজন শিক্ষার্থীর পেছনে গড় ব্যয় প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। ২০২৪ সালে তা ছিল ১১ হাজার ৬৬০ ইউরো, যেখানে ২০১০ সালে ছিল ১১ হাজার ৯১০ ইউরো।
১৯৯০-এর দশকে এর আগে সর্বশেষ দেশব্যাপী এ ধরনের বড় উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থী আন্দোলন হয়েছিল, যার মূল দাবি ছিল শিক্ষা খাতে অর্থায়ন বাড়ানো। ওই সময় সরকার বেকালোরেয়া, অর্থাৎ উচ্চমাধ্যমিক সমাপনী পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছিল। এই পরীক্ষা যা সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করে। কিন্তু পর্যাপ্ত অতিরিক্ত সম্পদ না দিয়েই এই সম্প্রসারণ করা হয়েছিল বলে জানান পল ভালেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্লেমঁস কারদোঁ-কুইন্ট। তিনি শিক্ষা খাতে অর্থায়ন নিয়ে গবেষণা করেন।
ওই আন্দোলনের ফলে শিক্ষা খাতে অর্থায়ন বাড়ানো হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে স্কুলগুলোর ওপর বাড়তে থাকা দায়িত্ব ও চাহিদা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয় স্থবির হয়ে পড়ে।
কারদোঁ-কুইন্ট বলেন, বছরের পর বছর শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অতিরিক্ত দায়িত্ব নিতে হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৮ সালে চালু হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যবস্থা পারকুরসুপ পরিচালনাও রয়েছে, যেটিকে কিছু শিক্ষার্থী ও শিক্ষক অস্বচ্ছ এবং বৈষম্যমূলক বলে সমালোচনা করেন।
কারদোঁ-কুইন্ট বলেন, “বাজেট সংকোচনের সময়ে বৈষম্য কমানো আরও কঠিন হয়ে পড়ে।”