চরচা ডেস্ক

ভারতের সবচেয়ে প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরীক্ষাগুলোর একটির আবারও পরীক্ষা দিতে হবে—এই চিন্তাই ১৯ বছর বয়সী শেখ সানার জন্য এতটাই অসহনীয় হয়ে উঠেছিল যে পরীক্ষার আগের দিন তিনি আর মানসিক চাপ সামলাতে পারেননি।
আবার পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার পরিবর্তে তিনি একটি সাদা কাগজে শুধু লিখেছিলেন, “আমি দুঃখিত”। এরপর তিনি আত্মহত্যা করেন বলে জানিয়েছে তার পরিবার।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
চিকিৎসা কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া আরও কয়েকজন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনাও এখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের জবাবদিহির দাবিতে চলা ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর পরীক্ষা বাতিল করে পুনঃপরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
আন্দোলনের মুখে শনিবার পদত্যাগ করেন ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান।
প্রায় দুই মাস ধরে চলা এই আন্দোলন প্রথমে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে শুরু হলেও পরে তা শিক্ষা ব্যবস্থা, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং সরকারের জবাবদিহি নিয়ে তরুণদের বৃহত্তর অসন্তোষের প্রকাশে রূপ নেয়। ভারতে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৫ শতাংশের বয়স ৩৫ বছরের নিচে।
গত মে মাসে ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি-কাম-এন্ট্রান্স টেস্ট (এনইইটি বা নিট) নামের কাগজে-কলমে অনুষ্ঠিত চিকিৎসা ভর্তি পরীক্ষায় ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নেন। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা সামনে আসার পর সরকার তদন্ত শুরু করে, ফল প্রকাশ স্থগিত করে এবং জুনে পুনঃপরীক্ষার নির্দেশ দেয়। এতে পরীক্ষার্থীদের আবারও কঠোর প্রস্তুতিতে ফিরতে হয়।
শেখ সানার পরিবারসহ আত্মহত্যা করা আরও দুই শিক্ষার্থীর স্বজনেরা বলেন, প্রথম পরীক্ষা বাতিল হওয়া এবং পরবর্তী অনিশ্চয়তাই তাদের মৃত্যুর জন্য দায়ী।
দিল্লির যন্তর মন্তরে চলা আন্দোলনস্থলে সানার বাবা শেখ জাফর হুসাইন রয়টার্সকে বলেন, “ভয়ই তাকে মেরে ফেলেছে। পুনরায় নিট পরীক্ষা (রি-নিট) দেওয়ার ভয়।”
পরীক্ষার্থীদের মৃত্যুর বিষয়ে সরকার কোনো মন্তব্য করেনি। রাজস্থান, তেলেঙ্গানা ও গুজরাটের পুলিশ রয়টার্সকে জানিয়েছে, সানা ও আরও দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে এবং তদন্ত চলছে। তবে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে তারা কোনো মন্তব্য করেনি। রয়টার্সও স্বাধীনভাবে ওই দাবিগুলো যাচাই করতে পারেনি।
মে মাসের মাঝামাঝি ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো (সিবিআই) জানায়, বেসরকারি কোচিং সেন্টারের কিছু শিক্ষক ও দালাল অর্থের বিনিময়ে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করেছিল। এ ঘটনায় একজন চিকিৎসক ও কয়েকজন শিক্ষকসহ ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে সিবিআই।
গত বৃহস্পতিবার ভিডিও বার্তায় প্রধানমন্ত্রী মোদি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচারসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
তিনি বলেন, “আমি জানি প্রশ্নপত্র ফাঁস কোনো সাধারণ বিষয় নয়। লাখো শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকের জন্য এটি অত্যন্ত কষ্টের।”
আন্দোলনের বিস্তার
এ সপ্তাহে দিল্লির কেন্দ্রে কয়েক হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেয়। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরাও সংসদে বিক্ষোভ করে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি জানান।
প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী অভিযোগ করেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাগুলোর কোনো বিচার হয়নি এবং গত এক দশকে ১৫০টিরও বেশি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। অতীতের এসব ঘটনার বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে ধর্মেন্দ্র প্রধান বা তার মন্ত্রণালয় কোনো জবাব দেয়নি।
আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে জেন-জি প্রজন্মের সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। সংগঠনটির দাবি, পরীক্ষা কেলেঙ্কারির সঙ্গে সম্পর্কিত ঘটনায় ২১ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। তবে রয়টার্স স্বাধীনভাবে এই সংখ্যা যাচাই করতে পারেনি।
আন্দোলন ও শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, শিক্ষামন্ত্রী এবং সরকারের প্রধান মুখপাত্রও কোনো সাড়া দেননি।
গত মঙ্গলবার ধর্মেন্দ্র প্রধান বলেছিলেন, সরকার নিট পরীক্ষা নিয়ে আলোচনা এবং তরুণদের উদ্বেগ দূর করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
শনিবার পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে এক্সে (সাবেক টুইটার) তিনি লেখেন, “দেশের তরুণদের আকাঙ্ক্ষা, অনুভূতি এবং ন্যায্য প্রত্যাশার প্রতি আমি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া এই আন্দোলন এমন এক সরকারের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ, যারা বরাবরই দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে ভারতের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি বলে তুলে ধরেছে।
কলকাতার রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরী বলেন, “যখন তরুণেরা দিল্লির রাস্তায় নেমে শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, তখন বিষয়টি অনেক বড় রাজনৈতিক গুরুত্ব পায়।”
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এতে মোদির জনপ্রিয়তায় বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না। গত ১২ বছরে নাগরিকত্ব আইন ও কৃষি সংস্কারবিরোধী আন্দোলনসহ একাধিক বড় বিক্ষোভ তিনি রাজনৈতিকভাবে সামাল দিয়েছেন।
শিক্ষা নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা
ভারতের হাজারো পরিবারের কাছে চিকিৎসা কলেজে ভর্তি পরীক্ষা আর্থিক নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা ও উন্নত জীবনের প্রবেশদ্বার হিসেবে বিবেচিত হয়। কারণ দেশটিতে পেশাগত শিক্ষা অর্জনের প্রতিযোগিতা অত্যন্ত তীব্র এবং সুযোগ সীমিত।
দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও গত বছর ভারতে সরকারি হিসাবে যুব বেকারত্বের হার ছিল ৯ দশমিক ৯ শতাংশ, যেখানে সামগ্রিক বেকারত্বের হার ছিল ৩ দশমিক ১ শতাংশ।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নিট পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র প্রায় ৬ শতাংশ চিকিৎসা কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান।
সন্তানকে চিকিৎসক বানানোর আশায় বহু পরিবার বছরের পর বছর সঞ্চয় ব্যয় করে কিংবা ঋণ নিয়ে কোচিং, আবাসন ও পড়াশোনার খরচ বহন করে।
এমনই একজন রাজস্থানের ঝুনঝুনু জেলার কৃষক রাজেশ কুমার। তিনি জানান, ছেলে প্রদীপ কুমারের প্রস্তুতির জন্য ২৮ লাখ রুপি মূল্যের জমি বিক্রি করেছেন এবং ১১ লাখ রুপি ব্যাংকঋণ নিয়েছেন।
২২ বছর বয়সী প্রদীপ ছোটবেলা থেকেই চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। প্রস্তুতির জন্য তিনি সিকার শহরের কোচিং কেন্দ্রে চলে যান। পরীক্ষার ফল প্রকাশ স্থগিত হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই, ১৫ মে তিনি আত্মহত্যা করেন।
নিজের সাধারণ ইটের বাড়ির সামনে লাল প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে রয়টার্সকে রাজেশ কুমার বলেন, “আমরা কৃষক, খুব বেশি শিক্ষিত নই। কিন্তু আমার ছেলে সব সময় চিকিৎসক হতে চাইত।”
তিনি বলেন, ‘ব্যবস্থার ব্যর্থতাই’ তার ছেলের মৃত্যুর জন্য দায়ী। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তিনি হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী ছেলের অস্থি গঙ্গায় বিসর্জন দেবেন না বলেও জানান।
সিজেপি ও কংগ্রেস আত্মহত্যাকারী শিক্ষার্থীদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। সরকার এখনো এ বিষয়ে কোনো ঘোষণা দেয়নি। তবে রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা স্বজনদের মতো রাজেশ কুমারও বলেন, তিনি অর্থ চান না।
তার ভাষায়, “আমি জবাবদিহি চাই।”
‘সে আর লড়াই চালিয়ে যেতে পারেনি’
আরেক শিক্ষার্থী, ১৭ বছর বয়সী কাহান প্যাটেল, জুনে পুনঃপরীক্ষার কয়েক দিন আগে গুজরাটে আত্মহত্যা করেন।
তার বাবা প্রশান্ত প্যাটেল বলেন, ছেলে চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়তে চেয়েছিল এবং পরে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার স্বপ্ন দেখত। পুনঃপরীক্ষার ঘোষণা আসার পর সে আবার প্রস্তুতি শুরু করলেও অনিশ্চয়তার চাপ আর সহ্য করতে পারেনি।
তিনি বলেন, “সে আর লড়াই চালিয়ে যেতে পারেনি। তাই সবকিছুর ইতি টেনে দেয়।”
শিক্ষা আন্দোলনের কর্মী ও দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি নন্দিতা নারায়ণ বলেন, এই আন্দোলন উচ্চশিক্ষায় ভর্তির প্রতিযোগিতা, ব্যয়বহুল বেসরকারি কোচিং এবং শিক্ষা খাতে বাণিজ্যিক স্বার্থ নিয়ে শিক্ষার্থীদের গভীর উদ্বেগের প্রতিফলন।
তিনি বলেন, “ভারতের তরুণেরা অবশেষে সমস্যাটির গভীরতা উপলব্ধি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভ এখন প্রকাশ্যে এসেছে।”
দিল্লির আন্দোলনস্থলে আত্মহত্যা করা দুই শিক্ষার্থীর ছবি মঞ্চে রাখা হয়েছিল। আর বিক্ষোভকারীরা সরকারের কাছে জবাবদিহির দাবিতে স্লোগান দিতে থাকে।

ভারতের সবচেয়ে প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরীক্ষাগুলোর একটির আবারও পরীক্ষা দিতে হবে—এই চিন্তাই ১৯ বছর বয়সী শেখ সানার জন্য এতটাই অসহনীয় হয়ে উঠেছিল যে পরীক্ষার আগের দিন তিনি আর মানসিক চাপ সামলাতে পারেননি।
আবার পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার পরিবর্তে তিনি একটি সাদা কাগজে শুধু লিখেছিলেন, “আমি দুঃখিত”। এরপর তিনি আত্মহত্যা করেন বলে জানিয়েছে তার পরিবার।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
চিকিৎসা কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া আরও কয়েকজন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনাও এখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের জবাবদিহির দাবিতে চলা ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর পরীক্ষা বাতিল করে পুনঃপরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
আন্দোলনের মুখে শনিবার পদত্যাগ করেন ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান।
প্রায় দুই মাস ধরে চলা এই আন্দোলন প্রথমে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে শুরু হলেও পরে তা শিক্ষা ব্যবস্থা, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং সরকারের জবাবদিহি নিয়ে তরুণদের বৃহত্তর অসন্তোষের প্রকাশে রূপ নেয়। ভারতে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৫ শতাংশের বয়স ৩৫ বছরের নিচে।
গত মে মাসে ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি-কাম-এন্ট্রান্স টেস্ট (এনইইটি বা নিট) নামের কাগজে-কলমে অনুষ্ঠিত চিকিৎসা ভর্তি পরীক্ষায় ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নেন। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা সামনে আসার পর সরকার তদন্ত শুরু করে, ফল প্রকাশ স্থগিত করে এবং জুনে পুনঃপরীক্ষার নির্দেশ দেয়। এতে পরীক্ষার্থীদের আবারও কঠোর প্রস্তুতিতে ফিরতে হয়।
শেখ সানার পরিবারসহ আত্মহত্যা করা আরও দুই শিক্ষার্থীর স্বজনেরা বলেন, প্রথম পরীক্ষা বাতিল হওয়া এবং পরবর্তী অনিশ্চয়তাই তাদের মৃত্যুর জন্য দায়ী।
দিল্লির যন্তর মন্তরে চলা আন্দোলনস্থলে সানার বাবা শেখ জাফর হুসাইন রয়টার্সকে বলেন, “ভয়ই তাকে মেরে ফেলেছে। পুনরায় নিট পরীক্ষা (রি-নিট) দেওয়ার ভয়।”
পরীক্ষার্থীদের মৃত্যুর বিষয়ে সরকার কোনো মন্তব্য করেনি। রাজস্থান, তেলেঙ্গানা ও গুজরাটের পুলিশ রয়টার্সকে জানিয়েছে, সানা ও আরও দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে এবং তদন্ত চলছে। তবে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে তারা কোনো মন্তব্য করেনি। রয়টার্সও স্বাধীনভাবে ওই দাবিগুলো যাচাই করতে পারেনি।
মে মাসের মাঝামাঝি ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো (সিবিআই) জানায়, বেসরকারি কোচিং সেন্টারের কিছু শিক্ষক ও দালাল অর্থের বিনিময়ে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করেছিল। এ ঘটনায় একজন চিকিৎসক ও কয়েকজন শিক্ষকসহ ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে সিবিআই।
গত বৃহস্পতিবার ভিডিও বার্তায় প্রধানমন্ত্রী মোদি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচারসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
তিনি বলেন, “আমি জানি প্রশ্নপত্র ফাঁস কোনো সাধারণ বিষয় নয়। লাখো শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকের জন্য এটি অত্যন্ত কষ্টের।”
আন্দোলনের বিস্তার
এ সপ্তাহে দিল্লির কেন্দ্রে কয়েক হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেয়। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরাও সংসদে বিক্ষোভ করে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি জানান।
প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী অভিযোগ করেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাগুলোর কোনো বিচার হয়নি এবং গত এক দশকে ১৫০টিরও বেশি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। অতীতের এসব ঘটনার বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে ধর্মেন্দ্র প্রধান বা তার মন্ত্রণালয় কোনো জবাব দেয়নি।
আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে জেন-জি প্রজন্মের সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। সংগঠনটির দাবি, পরীক্ষা কেলেঙ্কারির সঙ্গে সম্পর্কিত ঘটনায় ২১ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। তবে রয়টার্স স্বাধীনভাবে এই সংখ্যা যাচাই করতে পারেনি।
আন্দোলন ও শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, শিক্ষামন্ত্রী এবং সরকারের প্রধান মুখপাত্রও কোনো সাড়া দেননি।
গত মঙ্গলবার ধর্মেন্দ্র প্রধান বলেছিলেন, সরকার নিট পরীক্ষা নিয়ে আলোচনা এবং তরুণদের উদ্বেগ দূর করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
শনিবার পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে এক্সে (সাবেক টুইটার) তিনি লেখেন, “দেশের তরুণদের আকাঙ্ক্ষা, অনুভূতি এবং ন্যায্য প্রত্যাশার প্রতি আমি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া এই আন্দোলন এমন এক সরকারের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ, যারা বরাবরই দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে ভারতের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি বলে তুলে ধরেছে।
কলকাতার রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরী বলেন, “যখন তরুণেরা দিল্লির রাস্তায় নেমে শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, তখন বিষয়টি অনেক বড় রাজনৈতিক গুরুত্ব পায়।”
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এতে মোদির জনপ্রিয়তায় বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না। গত ১২ বছরে নাগরিকত্ব আইন ও কৃষি সংস্কারবিরোধী আন্দোলনসহ একাধিক বড় বিক্ষোভ তিনি রাজনৈতিকভাবে সামাল দিয়েছেন।
শিক্ষা নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা
ভারতের হাজারো পরিবারের কাছে চিকিৎসা কলেজে ভর্তি পরীক্ষা আর্থিক নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা ও উন্নত জীবনের প্রবেশদ্বার হিসেবে বিবেচিত হয়। কারণ দেশটিতে পেশাগত শিক্ষা অর্জনের প্রতিযোগিতা অত্যন্ত তীব্র এবং সুযোগ সীমিত।
দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও গত বছর ভারতে সরকারি হিসাবে যুব বেকারত্বের হার ছিল ৯ দশমিক ৯ শতাংশ, যেখানে সামগ্রিক বেকারত্বের হার ছিল ৩ দশমিক ১ শতাংশ।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নিট পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র প্রায় ৬ শতাংশ চিকিৎসা কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান।
সন্তানকে চিকিৎসক বানানোর আশায় বহু পরিবার বছরের পর বছর সঞ্চয় ব্যয় করে কিংবা ঋণ নিয়ে কোচিং, আবাসন ও পড়াশোনার খরচ বহন করে।
এমনই একজন রাজস্থানের ঝুনঝুনু জেলার কৃষক রাজেশ কুমার। তিনি জানান, ছেলে প্রদীপ কুমারের প্রস্তুতির জন্য ২৮ লাখ রুপি মূল্যের জমি বিক্রি করেছেন এবং ১১ লাখ রুপি ব্যাংকঋণ নিয়েছেন।
২২ বছর বয়সী প্রদীপ ছোটবেলা থেকেই চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। প্রস্তুতির জন্য তিনি সিকার শহরের কোচিং কেন্দ্রে চলে যান। পরীক্ষার ফল প্রকাশ স্থগিত হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই, ১৫ মে তিনি আত্মহত্যা করেন।
নিজের সাধারণ ইটের বাড়ির সামনে লাল প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে রয়টার্সকে রাজেশ কুমার বলেন, “আমরা কৃষক, খুব বেশি শিক্ষিত নই। কিন্তু আমার ছেলে সব সময় চিকিৎসক হতে চাইত।”
তিনি বলেন, ‘ব্যবস্থার ব্যর্থতাই’ তার ছেলের মৃত্যুর জন্য দায়ী। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তিনি হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী ছেলের অস্থি গঙ্গায় বিসর্জন দেবেন না বলেও জানান।
সিজেপি ও কংগ্রেস আত্মহত্যাকারী শিক্ষার্থীদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। সরকার এখনো এ বিষয়ে কোনো ঘোষণা দেয়নি। তবে রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা স্বজনদের মতো রাজেশ কুমারও বলেন, তিনি অর্থ চান না।
তার ভাষায়, “আমি জবাবদিহি চাই।”
‘সে আর লড়াই চালিয়ে যেতে পারেনি’
আরেক শিক্ষার্থী, ১৭ বছর বয়সী কাহান প্যাটেল, জুনে পুনঃপরীক্ষার কয়েক দিন আগে গুজরাটে আত্মহত্যা করেন।
তার বাবা প্রশান্ত প্যাটেল বলেন, ছেলে চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়তে চেয়েছিল এবং পরে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার স্বপ্ন দেখত। পুনঃপরীক্ষার ঘোষণা আসার পর সে আবার প্রস্তুতি শুরু করলেও অনিশ্চয়তার চাপ আর সহ্য করতে পারেনি।
তিনি বলেন, “সে আর লড়াই চালিয়ে যেতে পারেনি। তাই সবকিছুর ইতি টেনে দেয়।”
শিক্ষা আন্দোলনের কর্মী ও দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি নন্দিতা নারায়ণ বলেন, এই আন্দোলন উচ্চশিক্ষায় ভর্তির প্রতিযোগিতা, ব্যয়বহুল বেসরকারি কোচিং এবং শিক্ষা খাতে বাণিজ্যিক স্বার্থ নিয়ে শিক্ষার্থীদের গভীর উদ্বেগের প্রতিফলন।
তিনি বলেন, “ভারতের তরুণেরা অবশেষে সমস্যাটির গভীরতা উপলব্ধি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভ এখন প্রকাশ্যে এসেছে।”
দিল্লির আন্দোলনস্থলে আত্মহত্যা করা দুই শিক্ষার্থীর ছবি মঞ্চে রাখা হয়েছিল। আর বিক্ষোভকারীরা সরকারের কাছে জবাবদিহির দাবিতে স্লোগান দিতে থাকে।

সাধারণত অনশনের কোনো ঘটনা ভাইরাল হয় না। কনটেন্ট ক্রিয়টরদের জন্য ইনস্টাগ্রাম বলছে– প্রথম তিন সেকেন্ডে দর্শককে আটকান, ট্রেন্ডিং গান ব্যবহার করুন, ভিডিও তিন মিনিটের কম রাখুন। আর যদি আকর্ষণীয় তরুণীর ছবি থাকে, মানুষ স্ক্রল থামায়। তাই দিনের পর দিন শুয়ে থাকা একজন মাঝবয়সী মানুষ সহজে ভাইরাল হন না।

ভারতে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশটির রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে অবস্থানরত আন্দোলনকারীরা। এর সূচনা হয়েছিল মূলত একটি ইন্টারনেট স্যাটায়ার বা ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ হিসেবে। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বে আন্দোলনটি পরবর্তীতে অন্যতম বৃহৎ আন্দোলন