ads

প্রোপাগান্ডা দিয়ে কি ব্যর্থতা ঢাকতে পারবেন মোদি?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
প্রোপাগান্ডা দিয়ে কি ব্যর্থতা ঢাকতে পারবেন মোদি?
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

সাধারণত অনশনের কোনো ঘটনা ভাইরাল হয় না। কনটেন্ট ক্রিয়টরদের জন্য ইনস্টাগ্রাম বলছে– প্রথম তিন সেকেন্ডে দর্শককে আটকান, ট্রেন্ডিং গান ব্যবহার করুন, ভিডিও তিন মিনিটের কম রাখুন। আর যদি আকর্ষণীয় তরুণীর ছবি থাকে, মানুষ স্ক্রল থামায়। তাই দিনের পর দিন শুয়ে থাকা একজন মাঝবয়সী মানুষ সহজে ভাইরাল হন না। সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম চাকচিক্য চায়।

সম্ভবত এ জন্যই সোনম ওয়াংচুক ২৮ জুন থেকে নীরবে অনশন করে যাচ্ছিলেন। খুব একটা নজর কাড়তে পারেননি। যদিও তার সঙ্গে থাকা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র তরুণরা সোশ্যাল মিডিয়ায় চেষ্টা চালিয়েছিল।

Advertisement

ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, সোনম ওয়াংচুক ২০০৯ সালে প্রথম বেশি পরিচিত হন। তখন ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যা নিয়ে বানানো এক বলিউড সিনেমার চরিত্রের অনুপ্রেরণা হিসেবে তার নাম আসে। এবার তিনি সিদ্ধান্ত নেন–প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শিক্ষামন্ত্রীকে বরখাস্ত না করা পর্যন্ত আমরণ অনশন করবেন। কারণ বারবার পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছিল। সর্বশেষ ফাঁসের পর অন্তত ২০ জন পরীক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন। সোনমের মৃত্যুর সম্ভাবনাই বেশি ছিল। কারণ মোদি আগে কখনো অদক্ষতার জন্য কোনো মন্ত্রীকে বরখাস্ত করেননি।

তিন সপ্তাহ সরকার সোনম ওয়াংচুক বা তার দলের সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজন বোধ করেনি। বিজেপি মোদিকে এমন শক্তিশালী নেতা হিসেবে তুলে ধরে, যিনি কখনো আপস করেন না। অনেক টিভি চ্যানেল ও সংবাদপত্র সরকারের পক্ষে কথা বলে। ডিজিটাল কর্মীদের দল দলীয় বার্তা ছড়ায়।

সোনম ওয়াংচুক। ছবি: রয়টার্স
সোনম ওয়াংচুক। ছবি: রয়টার্স

কিন্তু হিসাব ভুল হয়। অনশনের ২১তম দিনে সাদা পোশাকের পুলিশ প্রতিবাদের জায়গায় হামলা চালায়। চিকিৎসার নামে সোনমকে চাদর দিয়ে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেই ভিডিও মুহূর্তেই ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক, রেডিট ও এক্সে ছড়িয়ে পড়ে। দুদিন পর পার্লামেন্ট অভিমুখে পদযাত্রায় অনেক সমর্থন জোটে।

সরকার এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়। কিন্তু তরুণরা থেমে থাকেনি। ডজন ডজন ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। তাতে দেখা যায় পুলিশ তরুণদের লাঠিপেটা করছে, একা থাকা আন্দোলনকারীদের ওপর চড়াও হচ্ছে এবং নারীদের লাঞ্ছিত করছে। দিল্লি পুলিশ অবশ্য বলে, পরিস্থিতি পেশাদারত্বের সঙ্গে সামলানো হয়েছে।

সাধারণত আন্দোলনকারীদের সহজেই ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’, ‘জঙ্গি’ বা ‘উসকানিদাতা’ বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। অনেক সাধারণ মানুষও মনে করে, ঝামেলা করলে কঠোর ব্যবস্থা দরকার। কিন্তু শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত হিন্দু তরুণ-তরুণীদের ওপর এমন দৃশ্য তারা দেখতে অভ্যস্ত নয়।

সরকার নানাভাবে বিষয়টি সামলানোর চেষ্টা করেছে। কেউ বলে এটি ষড়যন্ত্র। কেউ বলে তরুণদের ব্যবহার করা হচ্ছে। কোনো চ্যানেল আমেরিকার হাত খোঁজে, কোনো চ্যানেল পাকিস্তানি সংযোগের কথা বলে। অন্যদিকে মোদি টুইট করে জানান, ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট বানিয়ে প্রশ্ন ফাঁসকারীদের দ্রুত শাস্তি দেওয়া হবে।

ভারতের অর্ধেক মানুষ ৩০ বছরের কম বয়সী। তাদের শিক্ষাব্যবস্থা অনেক সময় ব্যয়বহুল বা নিম্নমানের। ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ কম, চাকরির অবস্থাও খারাপ।

সরকার যখন মন্ত্রীদের অদক্ষতা আর পুলিশের সহিংসতা লুকানোর গল্প বানায়, ঠিক তখনই অন্য ধরনের ভিডিও মাথাব্যথা হয়ে ওঠে। সেগুলো ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের সাক্ষাৎকার– যাদের ওপর কোনো উসকানি ছাড়াই হামলা হয়েছিল। চোখের জল ফেলে তারা প্রশ্ন করে, কেন নিজেদের প্রতিনিধিদের প্রশ্ন করতে পারব না? আর সবচেয়ে অবাক করা বিষয়– কিশোর-তরুণরা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর সেই অলঙ্ঘনীয় ভাবমূর্তি নিয়েও প্রশ্ন তোলে।

গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে রেখে ব্যর্থতা কিছুদিন ঢাকা যায়। কিন্তু প্রোপাগান্ডা তখনই কাজ করে, যখন তার পেছনে বাস্তবতার অন্তত কিছুটা ভিত্তি থাকে।

সম্পর্কিত