চরচা ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রে মিড-টার্ম নির্বাচন আগামী নভেম্বরে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে ইরানে যুদ্ধ শুরু করার পাঁচ মাস হয়ে গেল। প্রায় তিন মাসের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির সমাপ্তি দেখারও সপ্তাহ তিনেক হয়ে গেল। অথচ আড়াই মাস ধরে পেন্টাগন কোনো আনুষ্ঠানিক প্রেস কনফারেন্স করে না।
তথ্যগুলো একসঙ্গে মেলালে একটা ইঙ্গিতই পাওয়ার কথা। কিছু একটা লুকাতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র। যে যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেচে পড়ে বাঁধিয়েছেন–ট্রাম্পের ‘ওয়ার অব চয়েস’ই বলা হচ্ছে যে যুদ্ধকে, যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের ক্ষয়িষ্ণু জনপ্রিয়তায় ধস নামিয়েছে যে যুদ্ধ, মিড-টার্ম নির্বাচনের আগে সে যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই ঢাকঢাক-গুড়গুড় দেখে তেমন মনে না হওয়ার কারণও নেই। পিটার হেগসেথের অধীন ‘ডিপার্টমেন্ট অব ওয়ারে’র কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ইরান যুদ্ধে সত্যিকারের মার্কিন ক্ষতি–সেটা অর্থের দিক থেকে যেমন, তেমনি জনবলের দিক থেকেও–লুকানোর চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে আগেই।
ইংলিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রতিরক্ষা সচিব ও সিআইএ-এর সাবেক পরিচালক লেওন পানেত্তা সরাসরি সেই অভিযোগই তুলেছেন। আফগানিস্তান ও ইরাকে যুদ্ধের সময়ে প্রতি সপ্তাহেই পেন্টাগনে প্রেস ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা পানেত্তার মনে হচ্ছে, পেন্টাগন ইরান যুদ্ধের সত্যিকারের আহত-নিহতের সংবাদ গোপন করার একটা ‘লজ্জাজনক মনোভাব’ দেখাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ইরানের হামলায় কতজন সেনা আহত বা নিহত হয়েছেন, সেটা পেন্টাগন ঠিকমতো তুলে ধরছে না বলে মনে হচ্ছে পানেত্তার।
‘কার্যত, আমেরিকান জনগণের কাছে তথ্য যেতে না দেওয়ার একটা ইচ্ছাকৃত প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে’–গার্ডিয়ানে বলেছেন পানেত্তা। এটাকেই ‘যুদ্ধকালীন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে একটা লজ্জাজনক মনোভাব’ মনে হচ্ছে পানেত্তার।
কী হয়েছে আসলে?
এই মাসের শুরুর দিকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির শেষ টেনে আবার যুদ্ধ শুরু করেছে। প্রতিদিনই এক পক্ষ অন্য পক্ষের ওপর আঘাত হানছে। এতে একটা শঙ্কা জেগেছে যে, এই যুদ্ধ লম্বা সময় ধরে চলতে পারে। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জেতার আগে ট্রাম্প ‘অনন্তকাল ধরে চলতে থাকা যুদ্ধের’ শেষ টানার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেটাকেও ধোঁকা বলে মনে হচ্ছে।
গত সপ্তাহ পর্যন্ত তথ্য, ইরানে যুদ্ধে এ পর্যন্ত ১৮ মার্কিন সেনা মারা গেছেন। ৪৩০ জনের মতো আহত হয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে। পেন্টাগন গত সোমবার বলেছে, ৭ জুলাই আবার যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ১০০ সেনা আহত হয়েছেন। তবে এর মধ্যে ৯৬ শতাংশই আবার কাজে ফিরে গেছেন। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদন জানায়, পেন্টাগন শুরুতে আহত-নিহতের এই সংখ্যা জানায়নি। সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা পোস্ট দিয়ে কাজ সেরেছে।
পেন্টাগন কর্মকর্তারা অবশ্য টাইমসের প্রতিবেদনটাকে ‘ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ জানিয়ে উল্টো দাবি করেছিলেন, যদি আহত সেনারা শিগগিরই কাজে ফেরার মতো অবস্থায় থাকেন, সে ক্ষেত্রে আহতের সংখ্যা জনসম্মুখে প্রচারের কোনো বাধ্যবাধকতা তাদের নেই। কিন্তু এসব ব্যাখ্যার পেছনে পেন্টাগনের আসল উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরাল হয়, যখন টাইমসেরই আরেক প্রতিবেদনে দেখানো হলো, পেন্টাগনের ওয়েবসাইটে যুদ্ধে নিহত সেনার সংখ্যা ১৮-র বদলে ১৪ দেখানো হচ্ছে। পেন্টাগন মুখপাত্র শন পারনেল ওই ভুলের পেছনে ‘সাময়িক তথ্যের বিচ্যুতি’র ওপর দোষ চাপিয়েছেন।
কিন্তু সমালোচকদের আওয়াজ এতে উল্টো আরও জোরাল হয়েছে। তারা বলছেন, ক্রমেই ব্যর্থ হতে থাকা এক সামরিক অভিযানের তথ্য লুকানোর উদ্দেশ্যে এসব আসলে পেন্টাগনের দিক থেকে হিসাব কষা রাজনৈতিক কৌশল। জাতিসংঘে মার্কিন প্রতিনিধির সাবেক ডেপুটি ও স্টেট ডিপার্টমেন্টের সাবেক মুখপাত্র নেড প্রাইস বলছেন, “এটাকে সংবাদমাধ্যমের প্রতি প্রশাসনের প্রথাগত আস্থার অভাব বা বিদ্বেষের মতো করে দেখলে হবে না। এটা আসলে যুদ্ধের আসল ও সম্মিলিত ক্ষতির তথ্য থেকে আমেরিকান জনগণকে দূরে রাখার চেষ্টা।”
পেন্টাগন বনাম প্রেস: ট্রাম্প-যুগের শুরু থেকেই
পাঁচ মাস আগে যুদ্ধটা শুরু হওয়ার পর থেকেই পেন্টাগনের সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের অলিখিত লড়াইয়ের শুরু। পেন্টাগনের দিক থেকে অপারেশনের তথ্য নিয়ে গোপনীয়তার চেষ্টা ছিল। উল্টোদিকে জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে সংবাদমাধ্যমের চাহিদা ছিল স্বচ্ছতা। পার্থক্যটা আরও বেশি করে ধরা পড়ে ভিয়েতনাম আর ইরাক যুদ্ধের সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে। ইরান যুদ্ধের মতো ওই দুই যুদ্ধও ছিল বিতর্কিত, অজনপ্রিয়। কিন্তু সে সময়ও পেন্টাগনের দিক থেকে তথ্য সরবরাহের প্রক্রিয়াটা আরও উন্মুক্ত ছিল। কিন্তু ২০২৫-এর জানুয়ারিতে ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এই রাস্তাটা সংকূচিত করে ফেলার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
ট্রাম্প চেয়ারে বসার পরপরই নিউইয়র্ক টাইমস, ন্যাশনাল পাবলিক রেডিও, পলিটিকোর মতো গুরুত্বপূর্ণ মিডিয়াকে বের করে দেওয়া হলো। যদিও পেন্টাগনে অনেক বছর ধরে এই মিডিয়াগুলোর জন্য ডেস্ক নির্ধারিত ছিল। এদের জায়গা দেওয়া হলো ব্রাইবার্ট, দ্য ওয়ান আমেরিকা নিউজ নেটওয়ার্ক ও নিউইয়র্ক পোস্টের মতো ট্রাম্পপন্থী মিডিয়াকে। সে বছরেরই মে মাসে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলো পেন্টাগনে সাংবাদিকদের মুক্ত চলাচলে। অক্টোবরে যখন নতুন নিয়ম জারি করা হলো–পিট হেগসেথের অনুমতি না নিয়ে কোনো তথ্য প্রতিবেদনে ব্যবহার করলে সেই সাংবাদিককে চাইলে পেন্টাগন বহিষ্কার করতে পারবে। এর প্রতিবাদে সাংবাদিকরা পেন্টাগনে ঢোকার জন্য সরবরাহ করা ‘ব্যাজ’ জমা দিয়ে একসঙ্গে বেরিয়ে গেলেন। ডিসেম্বরে পেন্টাগন তিন দিনের এক অনুষ্ঠান আয়োজন করল শুধু ট্রাম্পপন্থী নতুন মিডিয়া এবং পডকাস্টার ও ইনফ্লুয়েন্সারদের পেন্টাগনের সবকিছুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য।
এ বছরের মার্চে যখন ইরান যুদ্ধ চূড়ায় পৌঁছে গেছে, তখন পেন্টাগন নতুন নিয়ম করল–তাদের সীমানার মধ্যে সাংবাদিকরা ঘুরতে হলে তাদের সঙ্গে একজন পেন্টাগন কর্মকর্তা থাকতে হবে। জুনে জানাল, পেন্টাগনের প্রেস অফিসেই সাংবাদিকরা ঢুকতে পারবেন না! কারণ হিসেবে কী জানানো হলো? ওখানে নাকি এমন বক্তৃতালেখকরা ঘোরেন, যাদের নিয়মিতই ‘ক্লাসিফায়েড ডকুমেন্ট’ নিয়ে কাজ করতে হয়।
ট্রাম্প যুগের শুরু থেকেই সংবাদমাধ্যমের প্রতি বিমাতাসূলভ এই পেন্টাগনকে নিয়ে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স-এর ওয়াশিংটন পরিচালক ক্লেইটন ওয়াইমার্সের রায়, “যদি এভাবে বলা হয় যে, সাম্প্রতিক অতীতের সব (প্রেসিডেন্টের অধীন) পেন্টাগনের চেয়ে এই (ট্রাম্প জমানার) পেন্টাগন অনেক বেশি শত্রুভাবাপন্ন হয়ে গেছে, সেটা মোটেও বাড়িয়ে বলা হবে না।”
তবে এখন তথ্য গোপন করার যে মনোভাব দেখা যাচ্ছে পেন্টাগনে, ইরান যুদ্ধের শুরুতেও এটা তেমন ছিল না। হেগসেথ তখন নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে যেতেন, সঠিক-বেঠিকের ধার না ধেরেই দম্ভোক্তি করতেন। কিন্তু যুদ্ধ যত এগিয়েছে, ইরানকে যত বেশি করে অদম্য মনে হয়েছে, পেন্টাগনেও তথ্য সরবরাহের পথ সংকুচিত হয়েছে। দম্ভোক্তির জায়গায় এসেছে নীরবতা।

সাবেক ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অব স্টেট জোয়েল রুবিন বলছেন, “যুদ্ধের ময়দানে কী হচ্ছে, সেটা যখন আপনি পরিষ্কারভাবে জানাচ্ছেন না, তার মানে হচ্ছে যুদ্ধের ময়দানে যা হচ্ছে এবং সেটার প্রভাব এখানকার (যুক্তরাষ্ট্রের) রাজনীতিতে ও পলিসি তৈরির ক্ষেত্রে কীভাবে পড়বে, তা নিয়ে আপনি খুব একটা আত্মবিশ্বাসী বা স্বচ্ছন্দ নন।”
যুদ্ধে আসল ক্ষতি ও লুকোচুরি
ইরান যুদ্ধে এরই মধ্যে ৩৭৫০ কোটি ডলার খরচ হয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের। গ্যাস-তেলের দাম বেড়েই চলেছে। এর প্রভাবে প্রায় সবকিছুরই দাম বাড়ছে। মানুষের বাড়তি বিরক্তির কারণ–ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র আসলে কী চায় আর কীভাবে তা অর্জন করতে চায়, সে বিষয়ে পাঁচ মাসেও পরিষ্কার কিছু জানাতে পারেনি ট্রাম্প প্রশাসন।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সেনা নিহত-আহতের পরিসংখ্যান নিয়ে লুকোচুরি। নেড প্রাইস বলেন, যারা এ যুদ্ধের ব্যাপারে খোঁজখবর রেখেছেন, তারা ১৮ সেনার মৃত্যুর কথা জানেন। “কিন্তু খুব ভালোভাবে খোঁজখবর না রাখলে তারা যেটা জানতে পারবেন না, তা হলো–আমাদের ইউনিফর্ম পরা ছেলে-মেয়েরা আসলে কোন মাত্রার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন; তা-ও এমন একটা যুদ্ধে, যেখানে উদ্দেশ্য পরিষ্কার না, উত্তেজনা প্রশমনের পরিষ্কার কৌশল তো নিশ্চিতভাবেই নেই।”
সেনাদের ক্ষতির ব্যাপারটা কেন প্রশাসন চেপে রাখতে চাইছে, তা নিয়ে নেড প্রাইসের বিশ্লেষণ, “ব্যাপারটা এমন না যে, এক-দুই ডজন সেনা সদস্য মাথায় হালকা আঘাত পেয়েছেন। এখানে শত শত, একটা হিসাব বলছে পাঁচ শ, মার্কিন সেনা শারীরিক আঘাত পেয়েছেন। প্রশাসন সম্ভবত ঠিকঠাক হিসাবই করে নিয়েছে যে, আর্থিক ক্ষতির সঙ্গে যদি আমাদের সেনাদের ক্ষতির তথ্যও যোগ হয়, তাহলে এরই মধ্যে রাজনৈতিকভাবে পরাজয়ের মুখোমুখি করে দেওয়া এই যুদ্ধ প্রশাসনকে আরও নিচে টেনে নিয়ে যাবে।”

গত ৭ জুলাই যুদ্ধ আবার শুরুর পর আহত যোদ্ধাদের অনেকে আবার কাজে ফিরে গেছেন বলে যে তথ্য জানাচ্ছে পেন্টাগন, সেটাও বিশ্বাস করছেন না সাবেক যোদ্ধা বা ভেটেরানরা। সাবেক যোদ্ধাদের নিয়ে কাজ করা দাতব্য অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান ‘ভেট ভয়েস ফাউন্ডেশনে’র প্রধান নির্বাহী জেনেসা গোল্ডবেকের বিশ্লেষণ, আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের যুদ্ধে যোদ্ধাদের আঘাতের মাত্রা কয়েক মাস বা বছরেও ঠিকভাবে বোঝা যেতে না-ও পারে। তার চোখে, “আসলে কী হচ্ছে, সেটা জানা আমাদের অধিকার। ওরা কেন আহত-নিহতের খবর সময়মতো দিচ্ছে না, এ ব্যাপারেও প্রশ্ন উঠে যাচ্ছে। আমার ধারণা, এই পুরো ব্যাপারটাই আসলে বড় একটা জাতীয় নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক ন্যারেটিভ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা।”

যুক্তরাষ্ট্রে মিড-টার্ম নির্বাচন আগামী নভেম্বরে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে ইরানে যুদ্ধ শুরু করার পাঁচ মাস হয়ে গেল। প্রায় তিন মাসের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির সমাপ্তি দেখারও সপ্তাহ তিনেক হয়ে গেল। অথচ আড়াই মাস ধরে পেন্টাগন কোনো আনুষ্ঠানিক প্রেস কনফারেন্স করে না।
তথ্যগুলো একসঙ্গে মেলালে একটা ইঙ্গিতই পাওয়ার কথা। কিছু একটা লুকাতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র। যে যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেচে পড়ে বাঁধিয়েছেন–ট্রাম্পের ‘ওয়ার অব চয়েস’ই বলা হচ্ছে যে যুদ্ধকে, যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের ক্ষয়িষ্ণু জনপ্রিয়তায় ধস নামিয়েছে যে যুদ্ধ, মিড-টার্ম নির্বাচনের আগে সে যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই ঢাকঢাক-গুড়গুড় দেখে তেমন মনে না হওয়ার কারণও নেই। পিটার হেগসেথের অধীন ‘ডিপার্টমেন্ট অব ওয়ারে’র কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ইরান যুদ্ধে সত্যিকারের মার্কিন ক্ষতি–সেটা অর্থের দিক থেকে যেমন, তেমনি জনবলের দিক থেকেও–লুকানোর চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে আগেই।
ইংলিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রতিরক্ষা সচিব ও সিআইএ-এর সাবেক পরিচালক লেওন পানেত্তা সরাসরি সেই অভিযোগই তুলেছেন। আফগানিস্তান ও ইরাকে যুদ্ধের সময়ে প্রতি সপ্তাহেই পেন্টাগনে প্রেস ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা পানেত্তার মনে হচ্ছে, পেন্টাগন ইরান যুদ্ধের সত্যিকারের আহত-নিহতের সংবাদ গোপন করার একটা ‘লজ্জাজনক মনোভাব’ দেখাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ইরানের হামলায় কতজন সেনা আহত বা নিহত হয়েছেন, সেটা পেন্টাগন ঠিকমতো তুলে ধরছে না বলে মনে হচ্ছে পানেত্তার।
‘কার্যত, আমেরিকান জনগণের কাছে তথ্য যেতে না দেওয়ার একটা ইচ্ছাকৃত প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে’–গার্ডিয়ানে বলেছেন পানেত্তা। এটাকেই ‘যুদ্ধকালীন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে একটা লজ্জাজনক মনোভাব’ মনে হচ্ছে পানেত্তার।
কী হয়েছে আসলে?
এই মাসের শুরুর দিকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির শেষ টেনে আবার যুদ্ধ শুরু করেছে। প্রতিদিনই এক পক্ষ অন্য পক্ষের ওপর আঘাত হানছে। এতে একটা শঙ্কা জেগেছে যে, এই যুদ্ধ লম্বা সময় ধরে চলতে পারে। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জেতার আগে ট্রাম্প ‘অনন্তকাল ধরে চলতে থাকা যুদ্ধের’ শেষ টানার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেটাকেও ধোঁকা বলে মনে হচ্ছে।
গত সপ্তাহ পর্যন্ত তথ্য, ইরানে যুদ্ধে এ পর্যন্ত ১৮ মার্কিন সেনা মারা গেছেন। ৪৩০ জনের মতো আহত হয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে। পেন্টাগন গত সোমবার বলেছে, ৭ জুলাই আবার যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ১০০ সেনা আহত হয়েছেন। তবে এর মধ্যে ৯৬ শতাংশই আবার কাজে ফিরে গেছেন। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদন জানায়, পেন্টাগন শুরুতে আহত-নিহতের এই সংখ্যা জানায়নি। সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা পোস্ট দিয়ে কাজ সেরেছে।
পেন্টাগন কর্মকর্তারা অবশ্য টাইমসের প্রতিবেদনটাকে ‘ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ জানিয়ে উল্টো দাবি করেছিলেন, যদি আহত সেনারা শিগগিরই কাজে ফেরার মতো অবস্থায় থাকেন, সে ক্ষেত্রে আহতের সংখ্যা জনসম্মুখে প্রচারের কোনো বাধ্যবাধকতা তাদের নেই। কিন্তু এসব ব্যাখ্যার পেছনে পেন্টাগনের আসল উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরাল হয়, যখন টাইমসেরই আরেক প্রতিবেদনে দেখানো হলো, পেন্টাগনের ওয়েবসাইটে যুদ্ধে নিহত সেনার সংখ্যা ১৮-র বদলে ১৪ দেখানো হচ্ছে। পেন্টাগন মুখপাত্র শন পারনেল ওই ভুলের পেছনে ‘সাময়িক তথ্যের বিচ্যুতি’র ওপর দোষ চাপিয়েছেন।
কিন্তু সমালোচকদের আওয়াজ এতে উল্টো আরও জোরাল হয়েছে। তারা বলছেন, ক্রমেই ব্যর্থ হতে থাকা এক সামরিক অভিযানের তথ্য লুকানোর উদ্দেশ্যে এসব আসলে পেন্টাগনের দিক থেকে হিসাব কষা রাজনৈতিক কৌশল। জাতিসংঘে মার্কিন প্রতিনিধির সাবেক ডেপুটি ও স্টেট ডিপার্টমেন্টের সাবেক মুখপাত্র নেড প্রাইস বলছেন, “এটাকে সংবাদমাধ্যমের প্রতি প্রশাসনের প্রথাগত আস্থার অভাব বা বিদ্বেষের মতো করে দেখলে হবে না। এটা আসলে যুদ্ধের আসল ও সম্মিলিত ক্ষতির তথ্য থেকে আমেরিকান জনগণকে দূরে রাখার চেষ্টা।”
পেন্টাগন বনাম প্রেস: ট্রাম্প-যুগের শুরু থেকেই
পাঁচ মাস আগে যুদ্ধটা শুরু হওয়ার পর থেকেই পেন্টাগনের সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের অলিখিত লড়াইয়ের শুরু। পেন্টাগনের দিক থেকে অপারেশনের তথ্য নিয়ে গোপনীয়তার চেষ্টা ছিল। উল্টোদিকে জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে সংবাদমাধ্যমের চাহিদা ছিল স্বচ্ছতা। পার্থক্যটা আরও বেশি করে ধরা পড়ে ভিয়েতনাম আর ইরাক যুদ্ধের সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে। ইরান যুদ্ধের মতো ওই দুই যুদ্ধও ছিল বিতর্কিত, অজনপ্রিয়। কিন্তু সে সময়ও পেন্টাগনের দিক থেকে তথ্য সরবরাহের প্রক্রিয়াটা আরও উন্মুক্ত ছিল। কিন্তু ২০২৫-এর জানুয়ারিতে ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এই রাস্তাটা সংকূচিত করে ফেলার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
ট্রাম্প চেয়ারে বসার পরপরই নিউইয়র্ক টাইমস, ন্যাশনাল পাবলিক রেডিও, পলিটিকোর মতো গুরুত্বপূর্ণ মিডিয়াকে বের করে দেওয়া হলো। যদিও পেন্টাগনে অনেক বছর ধরে এই মিডিয়াগুলোর জন্য ডেস্ক নির্ধারিত ছিল। এদের জায়গা দেওয়া হলো ব্রাইবার্ট, দ্য ওয়ান আমেরিকা নিউজ নেটওয়ার্ক ও নিউইয়র্ক পোস্টের মতো ট্রাম্পপন্থী মিডিয়াকে। সে বছরেরই মে মাসে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলো পেন্টাগনে সাংবাদিকদের মুক্ত চলাচলে। অক্টোবরে যখন নতুন নিয়ম জারি করা হলো–পিট হেগসেথের অনুমতি না নিয়ে কোনো তথ্য প্রতিবেদনে ব্যবহার করলে সেই সাংবাদিককে চাইলে পেন্টাগন বহিষ্কার করতে পারবে। এর প্রতিবাদে সাংবাদিকরা পেন্টাগনে ঢোকার জন্য সরবরাহ করা ‘ব্যাজ’ জমা দিয়ে একসঙ্গে বেরিয়ে গেলেন। ডিসেম্বরে পেন্টাগন তিন দিনের এক অনুষ্ঠান আয়োজন করল শুধু ট্রাম্পপন্থী নতুন মিডিয়া এবং পডকাস্টার ও ইনফ্লুয়েন্সারদের পেন্টাগনের সবকিছুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য।
এ বছরের মার্চে যখন ইরান যুদ্ধ চূড়ায় পৌঁছে গেছে, তখন পেন্টাগন নতুন নিয়ম করল–তাদের সীমানার মধ্যে সাংবাদিকরা ঘুরতে হলে তাদের সঙ্গে একজন পেন্টাগন কর্মকর্তা থাকতে হবে। জুনে জানাল, পেন্টাগনের প্রেস অফিসেই সাংবাদিকরা ঢুকতে পারবেন না! কারণ হিসেবে কী জানানো হলো? ওখানে নাকি এমন বক্তৃতালেখকরা ঘোরেন, যাদের নিয়মিতই ‘ক্লাসিফায়েড ডকুমেন্ট’ নিয়ে কাজ করতে হয়।
ট্রাম্প যুগের শুরু থেকেই সংবাদমাধ্যমের প্রতি বিমাতাসূলভ এই পেন্টাগনকে নিয়ে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স-এর ওয়াশিংটন পরিচালক ক্লেইটন ওয়াইমার্সের রায়, “যদি এভাবে বলা হয় যে, সাম্প্রতিক অতীতের সব (প্রেসিডেন্টের অধীন) পেন্টাগনের চেয়ে এই (ট্রাম্প জমানার) পেন্টাগন অনেক বেশি শত্রুভাবাপন্ন হয়ে গেছে, সেটা মোটেও বাড়িয়ে বলা হবে না।”
তবে এখন তথ্য গোপন করার যে মনোভাব দেখা যাচ্ছে পেন্টাগনে, ইরান যুদ্ধের শুরুতেও এটা তেমন ছিল না। হেগসেথ তখন নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে যেতেন, সঠিক-বেঠিকের ধার না ধেরেই দম্ভোক্তি করতেন। কিন্তু যুদ্ধ যত এগিয়েছে, ইরানকে যত বেশি করে অদম্য মনে হয়েছে, পেন্টাগনেও তথ্য সরবরাহের পথ সংকুচিত হয়েছে। দম্ভোক্তির জায়গায় এসেছে নীরবতা।

সাবেক ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অব স্টেট জোয়েল রুবিন বলছেন, “যুদ্ধের ময়দানে কী হচ্ছে, সেটা যখন আপনি পরিষ্কারভাবে জানাচ্ছেন না, তার মানে হচ্ছে যুদ্ধের ময়দানে যা হচ্ছে এবং সেটার প্রভাব এখানকার (যুক্তরাষ্ট্রের) রাজনীতিতে ও পলিসি তৈরির ক্ষেত্রে কীভাবে পড়বে, তা নিয়ে আপনি খুব একটা আত্মবিশ্বাসী বা স্বচ্ছন্দ নন।”
যুদ্ধে আসল ক্ষতি ও লুকোচুরি
ইরান যুদ্ধে এরই মধ্যে ৩৭৫০ কোটি ডলার খরচ হয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের। গ্যাস-তেলের দাম বেড়েই চলেছে। এর প্রভাবে প্রায় সবকিছুরই দাম বাড়ছে। মানুষের বাড়তি বিরক্তির কারণ–ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র আসলে কী চায় আর কীভাবে তা অর্জন করতে চায়, সে বিষয়ে পাঁচ মাসেও পরিষ্কার কিছু জানাতে পারেনি ট্রাম্প প্রশাসন।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সেনা নিহত-আহতের পরিসংখ্যান নিয়ে লুকোচুরি। নেড প্রাইস বলেন, যারা এ যুদ্ধের ব্যাপারে খোঁজখবর রেখেছেন, তারা ১৮ সেনার মৃত্যুর কথা জানেন। “কিন্তু খুব ভালোভাবে খোঁজখবর না রাখলে তারা যেটা জানতে পারবেন না, তা হলো–আমাদের ইউনিফর্ম পরা ছেলে-মেয়েরা আসলে কোন মাত্রার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন; তা-ও এমন একটা যুদ্ধে, যেখানে উদ্দেশ্য পরিষ্কার না, উত্তেজনা প্রশমনের পরিষ্কার কৌশল তো নিশ্চিতভাবেই নেই।”
সেনাদের ক্ষতির ব্যাপারটা কেন প্রশাসন চেপে রাখতে চাইছে, তা নিয়ে নেড প্রাইসের বিশ্লেষণ, “ব্যাপারটা এমন না যে, এক-দুই ডজন সেনা সদস্য মাথায় হালকা আঘাত পেয়েছেন। এখানে শত শত, একটা হিসাব বলছে পাঁচ শ, মার্কিন সেনা শারীরিক আঘাত পেয়েছেন। প্রশাসন সম্ভবত ঠিকঠাক হিসাবই করে নিয়েছে যে, আর্থিক ক্ষতির সঙ্গে যদি আমাদের সেনাদের ক্ষতির তথ্যও যোগ হয়, তাহলে এরই মধ্যে রাজনৈতিকভাবে পরাজয়ের মুখোমুখি করে দেওয়া এই যুদ্ধ প্রশাসনকে আরও নিচে টেনে নিয়ে যাবে।”

গত ৭ জুলাই যুদ্ধ আবার শুরুর পর আহত যোদ্ধাদের অনেকে আবার কাজে ফিরে গেছেন বলে যে তথ্য জানাচ্ছে পেন্টাগন, সেটাও বিশ্বাস করছেন না সাবেক যোদ্ধা বা ভেটেরানরা। সাবেক যোদ্ধাদের নিয়ে কাজ করা দাতব্য অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান ‘ভেট ভয়েস ফাউন্ডেশনে’র প্রধান নির্বাহী জেনেসা গোল্ডবেকের বিশ্লেষণ, আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের যুদ্ধে যোদ্ধাদের আঘাতের মাত্রা কয়েক মাস বা বছরেও ঠিকভাবে বোঝা যেতে না-ও পারে। তার চোখে, “আসলে কী হচ্ছে, সেটা জানা আমাদের অধিকার। ওরা কেন আহত-নিহতের খবর সময়মতো দিচ্ছে না, এ ব্যাপারেও প্রশ্ন উঠে যাচ্ছে। আমার ধারণা, এই পুরো ব্যাপারটাই আসলে বড় একটা জাতীয় নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক ন্যারেটিভ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা।”

ভারতে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশটির রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে অবস্থানরত আন্দোলনকারীরা। এর সূচনা হয়েছিল মূলত একটি ইন্টারনেট স্যাটায়ার বা ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ হিসেবে। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বে আন্দোলনটি পরবর্তীতে অন্যতম বৃহৎ আন্দোলন

সদ্য রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়া মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের গুঞ্জন ওঠার সাথে সাথেই তাকে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছিল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। পরে শুক্রবার সাহবুদ্দিন পদত্যাগ করার পর এনসিপি সংবাদ সম্মেলন করে একই দাবি তোলে।