শিক্ষকসংকট ও জরাজীর্ণ স্কুল ভবন নিয়ে অভিযোগের সমাধানের আশ্বাস সরকার দিলেও নির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপের কথা না বলায় আজ বৃহস্পতিবারও ফ্রান্সের কিশোর শিক্ষার্থীরা কয়েকটি উচ্চবিদ্যালয় অবরোধ করে। পাশাপাশি আবারও বিক্ষোভের প্রস্তুতি নেয়।
তৃতীয় সপ্তাহে গড়ানো এই বিক্ষোভ আন্দোলন ফ্রান্সে জনসাধারণের অবনতিশীল সরকারি সেবায় বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবির সঙ্গে ঋণ ও ঘাটতি কমাতে বন্ডবাজারের চাপের মুখে থাকা অর্থসংকটে থাকা সরকারের গভীর টানাপোড়েনকে সামনে এনেছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
এ আন্দোলনে ইতিমধ্যে শত শত মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছে। আহত হয়েছে কয়েক ডজন। কিশোর শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ দমনে দাঙ্গা পুলিশের বলপ্রয়োগ নিয়েও তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। গতকাল বুধবার সরকার বিক্ষোভ মোকাবিলায় পুলিশের স্টান গ্রেনেড ব্যবহারের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দেয়।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আজ বৃহস্পতিবার সকালে ২২৪টি উচ্চবিদ্যালয় বন্ধ ছিল। আরও ১৫১টি বিদ্যালয় বন্ধ থাকার পর আংশিকভাবে খুলে দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয় বলেছে, বুধবার সকালের তুলনায় আজ বন্ধ বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৩০ শতাংশ কমেছে এবং দেশটির ৯৪ শতাংশ উচ্চবিদ্যালয় পুরোপুরি অথবা আংশিকভাবে খোলা রয়েছে।
প্যারিসের শ্রমজীবী অধ্যুষিত ২০তম অ্যারোঁদিসমঁ-এ হেলেন বুশে উচ্চবিদ্যালয়ের কাছে আবর্জনার বিন দিয়ে একটি ব্যারিকেড তৈরি করা হয়েছিল। সেখানে বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দিচ্ছিল এবং ব্যানার তুলে ধরেছিল। একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে তাদের ধস্তাধস্তি শুরু হয়।
শিক্ষক ও ট্রেড ইউনিয়নগুলোর সমর্থনে শিক্ষার্থীদের সমাবেশের কর্মসূচি ছিল। এর মধ্যে প্যারিসের প্লাস দ্য লা বাস্তিয়তেও সমাবেশের পরিকল্পনা ছিল। মাত্র দুই দিন আগে দেশজুড়ে লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছে।
নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ায় তীব্র বিভাজন
আজ বৃহস্পতিবারের সমাবেশগুলোতে আগের মতো বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেবে কি না, তা সরকারের সংকট প্রশমনের প্রচেষ্টার জন্য একটি পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে। তবে ইউনিয়নগুলো ইতিমধ্যে ১৭ অক্টোবর আরও বড় বিক্ষোভের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
বুধবার রাতে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, অক্টোবরের শেষ নাগাদ সরকার ‘সুনির্দিষ্ট, দ্রুত এবং সম্পূর্ণ অর্থায়ন করা পদক্ষেপ’ উপস্থাপন করবে। তবে তিনি কোনো বিস্তারিত পরিকল্পনা দেননি।
উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হতাশা ও দাবিগুলো জানার জন্য সরকার যে অনলাইন পরামর্শ প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে, তাতে প্রথম দুই দিনেই ৪৩ হাজারের বেশি মতামত জমা পড়েছে।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আর মাত্র ছয় মাস বাকি। এর মধ্যে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের ঢেউ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়ায় তীব্র বিভাজন দেখা দিয়েছে।
উগ্র ডানপন্থী শিবিরের সামনের সারির প্রার্থী মেরিন লা পেন বিক্ষোভকারীদের একটি অংশের কারণে স্কুলের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি তুলে ধরেছেন এবং বলেছেন, মেরামতের খরচ তাদের অথবা তাদের অভিভাবকদের বহন করা উচিত। গত মঙ্গলবার তিনি নির্বাচিত হওয়া সাপেক্ষে সরকারি ব্যয় কমানোর পরিকল্পনাও তুলে ধরেন।
তার কট্টর বামপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ, তারও দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, মঙ্গলবার প্যারিসের একটি বিক্ষোভে ব্যাপক উচ্ছ্বাসের সঙ্গে অভ্যর্থনা পান। সেখানে তিনি বিক্ষোভকারীদের ‘অবিশ্বাস্য’ বলে প্রশংসা করেন এবং পুলিশের নিষ্ঠুরতার নিন্দা জানান।
বিএফএম টিভির জন্য এলাবের করা এক জনমত জরিপ অনুযায়ী, ৭২ শতাংশ ফরাসি নাগরিক মনে করে শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো যৌক্তিক। তবে ৫৫ শতাংশ মনে করে, বিক্ষোভ বন্ধ হওয়া উচিত।
‘তাদের কথা শোনা আমাদের দায়িত্ব’
সরকার এমন একটি ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে, যেখানে স্কুলে আগুন দেওয়া ও কর্মীদের আহত করার মতো সহিংস ঘটনার নিন্দা জানানো হবে, একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের কিছু অভিযোগের প্রতিও সহানুভূতি দেখানো হবে।
অর্থমন্ত্রী রোলাঁ লেসক্যুর বিবিসিকে বলেন, ‘নেতা হিসেবে তাদের কথা শোনা আমাদের দায়িত্ব।’
তাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ‘তরুণদের বলা কঠিন যে তাদের জন্য অর্থ নেই, কারণ আমরা স্বাস্থ্যসেবা ও পেনশনে বিপুল অর্থ ব্যয় করছি।’ তিনি আরও বলেন, প্রজন্মগুলোর মধ্যে সরকারি ব্যয়ের ভারসাম্য পুনর্নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
এদিকে গতকাল বুধবার বেলজিয়াম, স্পেন ও পর্তুগালসহ ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশেও শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের বিক্ষোভ হয়েছে।
বেলজিয়ামের লিয়েজ শহরের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, চলতি মাসে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের ঘটনায় ১০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সেখানে কর্তৃপক্ষ ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত তিনজনের বেশি মানুষের জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করেছে।
বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বার্নার্ড কুইন্তাঁ বৃহস্পতিবার সকালে বলেন, কট্টর বামপন্থী কর্মীরা বিক্ষোভে ঢুকে পড়েছে এবং সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি ঘটাচ্ছে।