আধুনিক আমেরিকান সমাজের এক চরম বৈপরীত্য ও সামাজিক বাস্তবতার মধ্যে বাস করছে। এই অত্যন্ত নির্মম পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন মার্কিন দ্য হিলের লেখক জন ম্যাক গ্লিয়ন। তার লেখায় নির্দেশ করা হয়েছে কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র আজ কেবল ঋণের ওপর ভিত্তি করে বেঁচে থাকা এক ভুয়া ধনীদের জাতিতে পরিণত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মোট ঋণ ইতিমধ্যে ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। বলা হচ্ছে এই ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা দেশটির নেই। কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র আরও ঋণ করছে এবং অন্যরা চুপচাপ বিষয়টি দেখছে।
লেখক ম্যাক গ্লিয়ন পর্যবেক্ষণ করেছেন যে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ভৌগোলিকভবে একই স্থানে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও দুটি সম্পূর্ণ আলাদা ও সুস্পষ্ট জাতির মতো আচরণ করছে। এর একটি জাতি বাস করে ইট-পাথরের বাস্তব জগতে, যেখানে সাধারণ নাগরিকেরা বিশ বছরের পুরনো গাড়ি চালায় এবং সুপারমার্কেট থেকে ব্র্যান্ডহীন সাধারণ ডিম কেনে।
অন্যদিকে, দ্বিতীয় জাতিটির বসবাস ছয় বর্গইঞ্চির ক্রমাগত কম্পনশীল এক আয়তক্ষেত্রাকার স্মার্টফোনের পর্দার ভেতরে, যেখানে প্রায় প্রতি তিনজন ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণের একজনই হলো ‘লাইফস্টাইল কিউরেটর’ বা জীবনযাত্রার প্রদর্শক, যার ঝলমলে জীবনটি গড়ে উঠেছে চরম বেপরোয়া আর্থিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিপ্রস্তরের ওপর।
এমপাওয়ার নামের কলোরাডোভিত্তিক একটি প্রধান আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক এক রিপোর্টের সূত্র ধরে জন ম্যাক গ্লিয়ন দেখিয়েছেন যে, জেন-জি প্রজন্মের প্রায় ২৪ শতাংশ তরুণ-তরুণী সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেদের বস্তুগত ধন-সম্পদ প্রদর্শনের এক তীব্র মানসিক চাপের মুখোমুখি হন। অথচ এর বিপরীতে বাস্তব চিত্র হলো, সার্বিকভাবে ৪১ শতাংশ আমেরিকান নিজেদের আর্থিক দিক থেকে মোটেই স্বচ্ছল মনে করেন না। গাণিতিক হিসাবটি একদম সহজ, নির্মম ও অনস্বীকার্য—লাখ লাখ নিঃস্ব বা আর্থিক সমস্যায় জর্জরিত মানুষ কেবল অন্য নিঃস্ব মানুষকে নিজেদের তেলের খনির মালিকের মতো বিত্তশালী হিসেবে প্রমান করার জন্যই ধার করা অর্থ ব্যয় করে চলেছে।
একটি আধুনিক সিটির ক্যাফেতে সকালের দৃশ্য বিশ্লেষণ করলে এই কৃত্রিম সভ্যতার কঙ্কালটি পরিষ্কার হয়ে ওঠে। গত মঙ্গলবার সকালে যেকোনো বড় শহরের ক্যাফেগুলোতে ওট মিল্ক ল্যাটের জন্য সাত ডলার খরচ করতে দরজার বাইরে পর্যন্ত মানুষের দীর্ঘ লাইন লেগে থাকে। কার্ড দিয়ে এই লেনদেনটি সম্পন্ন হতে সময় লাগে মাত্র তিন সেকেন্ড। আর ১০ মিনিটের মধ্যে কফিটি খাওয়া শেষ হয়ে যায়। কিন্তু এই সাত ডলারের সামান্য কফির জন্য তৈরি হওয়া ঋণটি ২৮ শতাংশ বার্ষিক সুদের হারে ৩০ দিনের জন্য ক্রেডিট কার্ডের ব্যালেন্স শিটে বা হিসাবে থেকে যায়।
যে ব্যক্তি কাপটি হাতে ধরে থাকেন, তিনি এক চুমুক কফি খাওয়ার আগেই ফোম আর্টের অন্তত চারটি ছবি তোলেন এবং তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার প্রায় ৭০০ পরিচিত দর্শকের সামনে আপলোড করেন, যারা ঠিক তিন ব্লক দূরে বসে একই কাজ করে যাচ্ছেন। লেখক এই চিত্রকে সম্পূর্ণ অদ্ভুত ও কিছুটা উন্মাদনাপূর্ণ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তবে এটিই আজকের আধুনিক আমেরিকার বাস্তব রূপ—যেখানে একটি সাধারণ স্যান্ডউইচ, যা কেনার সামর্থ্য অধিকাংশের নেই, তা এক অসুস্থ ও প্রদর্শনকামী সংস্কৃতির মর্যাদা বা স্ট্যাটাস সিম্বলে পরিণত হয়েছে।
বাস্তব বা ভৌত অর্থনীতি এখন এই অসীম সমৃদ্ধির বিভ্রমের ওপর ভর করে টিকে আছে। কেবল একটি ক্ষুদ্র কিন্তু সুস্পষ্ট লোগো থাকার কারণে চার শ ডলারের সাধারণ সুতির টি-শার্ট দোকান থেকে নিমেষেই বিক্রি হয়ে যায়। কোনো রেস্তোরাঁয় বসে খাবার খাওয়ার ক্ষেত্রে ১২০ ডলারের পাস্তার বিল পরিশোধ করতে ব্যবহার করা হয় ‘বাই-নাউ-পে-লেটার’ (এখনই কিনুন, পরে পরিশোধ করুন) অ্যাপ, যা প্রতি দুই সপ্তাহে দেয় এমন চারটি সহজ কিস্তিতে পুরো বিলটিকে ভাগ করে দেয়। এই মানসিকতা ও সংস্কৃতিগত পতন ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক মতাদর্শের সীমানাকেও পুরোপুরি অতিক্রম করে গেছে। বামপন্থী ধারণার কোনো শহরবাসী মাসে পাঁচ হাজার ডলার ভাড়ায় কৃত্রিম কাঠের মেঝে ও মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত কাঁচের জানালাযুক্ত বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ভাড়া নেন। অথচ তিনি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেন যে পুরো ভবনটি আসলে পাতলা ড্রাইভ্যাল এবং প্লাস্টিকের পাইপ দিয়ে তৈরি।
অন্যদিকে, ডানপন্থী ধারণার কোনো ব্যক্তি ৮০ হাজার ডলার দিয়ে চার চাকার ডিজেল চালিত একটি বিশাল পিকআপ ট্রাক কেনেন এবং তা চালিয়ে কেবল শহরতলীর ব্যবসায়িক এলাকায় যান, আর মনে মনে ভাবেন তিনি কেন এটি কিনেছিলেন। রাজনৈতিকভাবে বিপরীতমুখী উভয় পক্ষই একে অপরের দিকে চরম অবজ্ঞার সাথে তাকায়, কিন্তু তারা সম্পূর্ণ অন্ধ থেকে যায় এই বাস্তবতার কাছে যে—তারা উভয়েই আর্থিক আত্মহত্যার এই একই চরম নেশায় একে অপরের সাথে গভীরভাবে বাঁধা পড়ে আছেন।
অনলাইন ইকোসিস্টেম বা ইন্টারনেট জগতও অত্যন্ত দ্রুততার সাথে মানুষের এই অভ্যন্তরীণ বৈপরীত্যগুলোর সাথে মানিয়ে নেয় এবং তা থেকে মুনাফা লোটে। কৃত্রিম বা ভুয়া ধনীর এই মিথ্যা চাপ যখন সহ্য করা অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন ইন্টারনেট আবার এই ক্লান্তি ও বিষণ্নতাকেও মুদ্রায় রূপান্তর করতে নতুন এক নান্দনিক ট্রেন্ড বা ধারার জন্ম দেয়। এই নতুন ধারার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ডি-ইনফ্লুয়েন্সিং’।
এই আন্দোলনে কনটেন্ট ক্রিয়েটররা ভিডিও পোস্ট করে তাদের অনুসারীদের বলে যে, কোন ৮০ ডলারের ময়েশ্চারাইজার বা ৫০ ডলারের ওয়াটার টাম্বলার বা পানির বোতল তাদের কেনা উচিত নয়। এরপর সেই ক্রিয়েটররাই তাদের প্রোফাইল বায়োতে কমদামী বিকল্প পণ্যের লিঙ্ক যুক্ত করে দেন এবং বিক্রি হওয়া প্রতিটি সাশ্রয়ী বিকল্প পণ্য থেকে ৫ শতাংশ কমিশন উপার্জন করেন। ফলে ভোক্তা সেই দামী জিনিসটি না কিনে অর্থ সাশ্রয় করার আনন্দ উদযাপন করতে গিয়ে একসাথে তিনটি তুলনামূলক কমদামী জিনিস কিনে ফেলে।
ছুটি কাটানো বা ভ্রমণের পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও একই লজিক্যাল ট্র্যাজেডি দেখা যায়। জুন ও জুলাই মাসে সোশ্যাল মিডিয়ার ফিডগুলোতে মেডিটেরেনিয়ান বা ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলরেখা, ইনফিনিটি পুল এবং এয়ারপোর্টের লাউঞ্জ অ্যাক্সেস পাসের অবিরাম ভিডিও বা ছবি ভাসতে থাকে। অথচ বাস্তব চিত্র হলো, এইসব ভ্রমণের বড় একটি অংশ আসলে ক্রেডিট কার্ডের স্টেটমেন্টে উচ্চ সুদের দায় হিসেবে জমা হয়।
ইউরোপে মাত্র সাত দিনের একটি ট্যুর পরবর্তীতে তিন বছরের জন্য এক দীর্ঘ আর্থিক দায়বদ্ধতায় পরিণত হয়। পর্যটকেরা পাথুরে সৈকতে দাঁড়িয়ে অপটিমাল লাইটিং বা সঠিক আলোতে তিনটি নিখুঁত ছবি তোলার জন্য টানা ছয় ঘণ্টা পোজ দিয়ে কাটান, আর বাকি বিকেলটা হোটেল রুমে বসে তাদের সঙ্গীর সাথে রুম সার্ভিস বা খাবারের অত্যধিক খরচ নিয়ে ঝগড়া করে নষ্ট করেন।
ফলে মানসিকভাবে ডিজিটাল সত্তাটি বাস করে ফাইন ডাইনিং, উচ্চমানের ডিজাইন, অসীম অবসর এবং অন্তহীন মোহ বা বিভ্রান্তির এক চিরন্তন সোনালী যুগে। অন্যদিকে, একই মানুষের ভৌত বা আসল সত্তাটি স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টের বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে সোডিয়াম-সমৃদ্ধ প্যাকেটজাত নুডলস বা রামেন খায় আর নিজের চোখের জল মোছে, ঠিক তখনই তার ফোনে ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স কমে যাওয়ার অ্যালার্ট বা টেক্সট মেসেজ আসে।
আমেরিকান সমাজ এভাবে মানুষের চেতনাকে দুটি পৃথক সত্তায় বিভক্ত করতে সক্ষম হয়েছে: যার একটি হলো ব্র্যান্ড ম্যানেজার যে সৈকত থেকে ছবি পোস্ট করে, আর অন্যটি হলো দিনমজুর যে বিমানের টিকিটের টাকা শোধ করতে এবং সামান্য নুডলস কেনার জন্য দিনরাত অতিরিক্ত কাজ করে যায়।
এই পুরো সামাজিক ও আর্থিক ব্যবস্থাটি কেবল এই কারণে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে, কারণ প্রত্যেকেই এই খেলার নিয়মগুলো বোঝে কিন্তু কেউই প্রথম ব্যক্তি হিসেবে খেলা থামানোর সাহস পায় না। যে সমাজে কোনো মানুষের মূল্য কেবল তার বাহ্যিক বস্তুগত ভোগের দ্বারা পরিমাপ করা হয়, সে সমাজে নিজের সামর্থ্য নেই বলে স্বীকার করা বা সাধারণ ৭-ইলেভেন থেকে কেনাকাটা করতে না পারা কিংবা প্রতিদিনের ৭ ডলারের কফি ও উইকএন্ড ট্রিপ বর্জন করাকে ব্যক্তি মানুষের চরম ব্যর্থতা হিসেবে গণ্য করা হয়।
তাই পুরো দেশটি একটির পর একটি কিস্তির স্কিম বা ইনস্টলমেন্ট প্ল্যান সাথে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে। তারা সবাই সুদের ঋণের সূত্রে একসাথে যুক্ত, অ্যালগরিদম দ্বারা বিভক্ত, এবং ক্যামেরার জন্য নিখুঁতভাবে সাজানো এক কৃত্রিম জাতি।