Chaarcha Logo
Chaarcha logo
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
Chaarcha logo
সংক্ষেপেকানেক্টম্যাগাজিন

আমরা

আমাদের সম্পর্কেযোগাযোগবিধিনিষেধ ও শর্তাবলিগোপনীয়তার নীতি
Chaarcha logo
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
Chaarcha logo
সর্বশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
আমরা
  • আমাদের সম্পর্কে
  • যোগাযোগ
  • বিধিনিষেধ ও শর্তাবলি
  • গোপনীয়তার নীতি
এক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণ

সম্পাদক: সোহরাব হাসান, প্রিন্টার্স বিল্ডিং (লেভেল–১৪), ৫ রাজউক অ্যাভিনিউ, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা–১০০০, বাংলাদেশ

|

স্বত্ব © চরচা

Chaarcha Logo
Advertisement
Advertisement
> বিশ্লেষণ

ফ্যাসিবাদ কাজ করে যেভাবে

অর্ণব সান্যাল

অর্ণব সান্যাল

প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০২৫, ১৮: ৪৪
ফ্যাসিবাদ কাজ করে যেভাবে

বিংশ শতাব্দীর ইতিহাস যদি আমরা পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখা যাবে, পুরো শতকজুড়েই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সুনির্দিষ্ট সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ফ্যাসিবাদের উত্থানের পথ তৈরি করে দিয়েছে। প্রধানত, বিশ শতকজুড়ে বিভিন্ন দেশের জাতীয় সংকট চরম হয়ে ওঠার কারণে ফ্যাসিবাদী শাসন শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং জনপ্রিয়তা লাভ করে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement

বিশেষ করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইতালি ও জার্মানিতে জাতীয় সংকট (অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক) ঘনীভূত হওয়ায় সাধারণ জনতা বিকল্প খুঁজতে থাকে। আর সেই সুযোগেই আবির্ভূত হয় ফ্যাসিবাদী আদর্শ। জনগণকে স্বপ্ন দেখায় গৌরবের রাষ্ট্র নির্মাণের। আর তাতে আকৃষ্ট হয়ে দেশের ভবিষ্যৎ ফ্যাসিবাদীদের হাতে তুলে দেয় জনতা। আর ক্ষমতা কাঠামোতে খানিক স্থান পেয়েই তা সুসংহত করতে উঠেপড়ে লাগে ফ্যাসিবাদী। এমন এক নাগপাশ রচনা করা হয়, যা থেকে সবার মুক্তি পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

ফ্যাসিবাদ নিয়ে বিখ্যাত রুশ বিপ্লবী, রাজনীতিক ও রাজনৈতিক তাত্ত্বিক লিও ট্রটস্কি ১৯৩১ সালের ১৫ নভেম্বরে এক ব্রিটিশ কমরেডকে চিঠি লিখেছিলেন। ১৯৩২ সালের ১৬ জানুয়ারি দ্য মিলিটান্টে তা প্রকাশিত হয়। ওই চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘ইতালিতে ফ্যাসিবাদী আন্দোলন ছিল ব্যাপক জনগণের এক স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন, যেখানে নতুন নেতৃত্ব তৃণমূলের সাধারণ কর্মী থেকে উঠে আসছিল। এই আন্দোলন মূলগতভাবে ছিল বড় বড় পুঁজিপতি শক্তিদের দ্বারা পরিচালিত ও আর্থিক সাহায্যপ্রাপ্ত এক গণআন্দোলন, যার সামনের সারিতে ছিল পেটি-বুর্জোয়া জনতা, হতদরিদ্র শ্রমিক ও কিছু পরিমাণে শ্রমিকশ্রেণীর এক অংশ।’

ট্রটস্কি আরও বলেছিলেন, ‘জার্মানির আন্দোলন ইতালির সঙ্গে প্রায় সমগোত্রীয় ছিল। এটা ছিল এক গণআন্দোলন, যেখানে নেতৃত্ব বহুল পরিমাণে “সমাজতন্ত্রী” বুলির আশ্রয় নিয়েছিল। বস্তুত তা গণআন্দোলন তৈরির পক্ষে জরুরি ছিল। তবে ফ্যাসিবাদের প্রকৃত ভিত্তি ছিল পেটিবুর্জোয়া জনগণ। ইতালিতে ফ্যাসিবাদের বিরাট গণভিত্তি ছিল একদিকে শহর ও মফস্বলের পেটিবুর্জোয়া জনতা এবং অন্যদিকে কৃষক, এই ছিল ফ্যাসিবাদের গণভিত্তির মূল আধার। জার্মানিতে একই  ভাবে ফ্যাসিবাদের এক বিরাট গণভিত্তি ছিল... এটা বলা যেতে পারে, এবং বাস্তবত তা ঠিকই যে, নব্য মধ্যবিত্ত শ্রেণি, রাষ্ট্রের পরিচালকরা এবং বেসরকারি প্রশাসকরাও এই ধরনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।’

Advertisement
Advertisement
Advertisement

ফ্যাসিবাদী শাসনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সহিংসতা। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
ফ্যাসিবাদী শাসনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সহিংসতা। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ফ্যাসিবাদ একটি সাধারণ বিশ্বাস তৈরি করার চেষ্টা করে যে, প্রতিষ্ঠিত সরকার ব্যবস্থা, রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানসমূহ জাতীয় সংকট থেকে উত্তরণ ঘটাতে ব্যর্থ। এদের দ্বারা উন্নতি সম্ভব হবে না। কিন্তু একটি ফ্যাসিস্ট দল, তা যতই শক্তিশালী হয়ে উঠুক না কেন এবং শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী ভাবমূর্তির সাথে সাথে তা সরকারি ক্ষমতাকাঠামোতে যতখানিই প্রভাব বিস্তার করুক না কেন, সেই দলের তবুও জনগণকে পাশে রাখতে হয়। আর জনতার মধ্য থেকে সম্মতি উৎপাদনের উপায় হিসেবে ফ্যাসিবাদীদের একটি অংশ সাধারণত কিছু ক্ষুদ্র স্বার্থ উদ্ধারের জনপ্রিয় ও বিক্ষিপ্ত আন্দোলন সৃষ্টি করে থাকে।

যুক্তরাজ্যের কিইল ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের অধ্যাপক এরিস্টটল ক্যালিস মনে করেন, এ ধরনের আন্দোলন তৈরি এবং তাতে জনসাধারণের ব্যাপক সম্পৃক্ততার জন্য একটি প্রভাবক লাগে। ১৯২০ ও ৩০–এর দশকে এই প্রভাবকটি ছিল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মহামন্দা। ২০১৫ সালে নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে ফ্যাসিবাদের ওপর দেওয়া এক ভাষণে এরিস্টটল ক্যালিস আরও বলেন যে, এই মহামন্দার কারণেই মানুষের চিন্তাভাবনার গতিপ্রকৃতি একটি বিন্দুতে এসে মিলেছিল এবং তৎকালীন সংকট থেকে উদ্ধার পাওয়ার উপায় খুঁজছিল সবাই। তবে সেই উপায় হিসেবে ফ্যাসিবাদকে বেছে নেওয়া ছিল ফুটন্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনে ঝাঁপ দেওয়ার মতোই একটি বিষয়।

এ প্রসঙ্গে গবেষক রবার্ট প্যাক্সটন বলেছেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি ও ইতালির সাধারণ মানুষ এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছিল, যাতে তারা দিশেহারা ও মরিয়া হয়ে উঠেছিল। তাদের গ্রাস করেছিল জাতীয় লজ্জার বোধ। রবার্ট আরও মনে করেন, তখনই ফ্যাসিবাদের উত্থান বা আবির্ভাব হয়, যখন একটি সমাজ রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্য বহুল পরিচিত হয়ে ওঠে এবং যখন সেখানে গণতন্ত্র এতটাই প্রতিষ্ঠিত থাকে যে সাধারণ মানুষ বা নাগরিকেরা এতে বিভ্রান্তবোধও করে। যেমন: ইতালিতে ফ্যাসিস্টদের উত্থানের আগে ধারাবাহিকভাবে দুর্বল ও ক্রমপরিবর্তনশীল সরকার দেখা গিয়েছিল। জার্মানিতে হিটলার চ্যান্সেলর হওয়ার আগে প্রায় তিন বছর কোন রাজনৈতিক পক্ষই পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে পারেনি। ফলে দুই দেশেই অকার্যকর সরকার ব্যবস্থা সংক্রান্ত একটি সংকট প্রকট হয়ে ওঠে। এতে স্বাভাবিকভাবেই জনগণের ভোগান্তি বাড়ছিল। এসব থেকে মুক্তির উপায় দৃশ্যত ছিল দুটি—একটি হলো সমাজতন্ত্র, অন্যটি ফ্যাসিবাদ।

ফলে ইতালি ও জার্মানিতে সমাজতন্ত্র বা কমিউনিজম ও ফ্যাসিবাদের প্রতি সাধারণের আগ্রহ বাড়ছিল ক্রমশ। ইতালিতে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটেই যাচ্ছিল প্রায়, সব ক্ষেত্র প্রস্তুত ছিল। ঠিক ওই সময়ই সমাজতান্ত্রিক জুজুর ভয়ে ভীত তৎকালীন শাসক সরকার ও রক্ষণশীল পুঁজিপতিরা ফ্যাসিবাদের দিকে উৎসুক দৃষ্টি ফেলে। অন্যদিকে ফ্যাসিবাদীরাও বুঝতে পেরেছিল যে, সরকার ব্যবস্থায় ঢুকতে হলে তাদের সবচেয়ে ভালো বিকল্প হলো রক্ষণশীলেরাই। জার্মানিতেও একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং দুই দেশেই টিকে থাকার স্বার্থে ফ্যাসিস্টদের সরকারে নেওয়ার বিষয়ে তৎকালীন সরকারি রাজনৈতিক দল একমত হয়। সেই সাথে সমাজতন্ত্রীদের ব্রাত্য করে দেওয়ার যুগপৎ নীতির বাস্তবায়ন শুরু হয়। এই নীতির বাস্তবায়নই এক পর্যায়ে ফ্যাসিবাদীদের সব বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকেই উৎখাত করার উৎসাহ জোগায় এবং উৎখাতের এই প্রক্রিয়াটি ছিল অনেকাংশেই সহিংস।

ফ্যাসিবাদের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়াকে ফ্যাসিবাদীরা রাষ্ট্রক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো বলে মনে করে। ছবি: পেক্সেলস
ফ্যাসিবাদের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়াকে ফ্যাসিবাদীরা রাষ্ট্রক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো বলে মনে করে। ছবি: পেক্সেলস

ফ্যাসিবাদী শাসনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সহিংসতা। যে কোনো ফ্যাসিবাদী শাসনই ধরনের দিক থেকে সহিংস। এই আদর্শ অনুযায়ী, কড়া শৃঙ্খলা ছাড়া রাষ্ট্রের পক্ষে ক্ষমতা অর্জন ও তা ধরে রাখা সম্ভব নয়। ঠিক যেমন ব্যক্তিকে পুরোপুরি কার্যকর হতে হলে তারা মন ও দেহের সম্পূর্ণ একতা প্রয়োজন বা মিশে যাওয়া প্রয়োজন, তেমনি রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করতে কড়া শৃঙ্খলার বিকল্প নেই। ফ্যাসিবাদ মনে করে, যারা এই নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর আদর্শের বাইরে অবস্থান নেয়, তাদের প্রতি শরীরী সহিংসতার মাধ্যমে দমন–পীড়ন চালানো অতি জরুরি। কারণ ফ্যাসিবাদের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়াকে ফ্যাসিবাদীরা রাষ্ট্রক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো বলে মনে করে। সেই হিসেবে প্রত্যেক মানুষের জীবনের একমাত্র অর্থ ও উদ্দেশ্যই হলো রাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতার পরিসর ও মাত্রা বাড়ানো।

অর্থাৎ, ফ্যাসিবাদী মতবাদে ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রই সব মনযোগ ও কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। এ কারণে ফ্যাসিবাদের প্রাথমিক লক্ষ্য দাঁড়ায় সামাজিক পুনরুজ্জীবন ঘটানো। সামাজিক পুনরুজ্জীবন বলতে সাধারণত এমন একটি প্রক্রিয়াকে বোঝায়, যা সাধারণ মানুষের জীবনকে উন্নত করার জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ সৃষ্টি করে এবং বৈষম্য কমায়। ফ্যাসিবাদে এটিই করতে চাওয়া হয় জাতীয় ঐক্য অর্জনের চেষ্টা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদকে অস্বীকারের মাধ্যমে। এর জন্য শুরুতেই প্রয়োজন হয় জনসাধারণের প্রাথমিক সমর্থন। ফ্যাসিবাদী শাসকগোষ্ঠী এই সমর্থন লাভের জন্য নানা আদর্শিক বাণী ছড়ানোর চেষ্টা করে এবং এ জন্য গণমাধ্যমগুলোকে ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়াও আয়োজন করা হয় গণর‍্যালি এবং অন্যান্য ঘরানার প্রপাগান্ডা কৌশল অবলম্বন করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় বড় বড় সামাজিক পরিবর্তনের ধুয়া তোলা হয় এবং একটি নতুন সামাজিক কাঠামো গড়ে তোলার ভাবনাকে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলে।

কোনো অঞ্চল বা দেশের আর্থ–সামাজিক পরিস্থিতি যদি খারাপ থাকে, তবে তা ফ্যাসিবাদের উদ্ভবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এমন পরিস্থিতিতেই ফ্যাসিবাদীরা সাধারণত সোনালি অতীতের কথা মনে করিয়ে একটি উজ্জ্বল ও সংকটমুক্ত ভবিষ্যত নির্মাণের স্বপ্ন দেখায়। অর্থাৎ, গোষ্ঠীভুক্ত ব্যক্তিকে উন্নতির সোপানে তোলার ছদ্মবেশী আশ্বাস দেওয়া হয়।

কিন্তু ফ্যাসিবাদে আসলে ব্যক্তির অস্তিত্ব ততটুকুই টিকে থাকে, যতটুকু মেলে কেবলই রাষ্ট্রের সঙ্গে তার সম্পর্কের ভিত্তিতে। এর বাইরে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে খুব বেশি পাত্তা দেওয়া হয় না। এমনকি তার গুরুত্ব কমিয়ে আনারই চেষ্টা করা হয়। অথচ এই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদই প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের সর্বময় হয়ে ওঠার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফ্যাসিবাদ এর ঠিক বিপরীত। ফ্যাসিবাদ বলে, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, ইতিবাচক ব্যক্তিস্বার্থ ও সাম্য–এই তিনটিই ঐক্যের পথকে সীমিত করে দেয় এবং সামাজিক পুনরুজ্জীবনকে বাধাগ্রস্ত করে। ফ্যাসিবাদী সমাজ তার সদস্যদের বৃহত্তর স্বার্থের গল্প শোনায় এবং তা নিশ্চিতে নিজেদের শর্তহীনভাবে সমর্পন করতে বলে। এমন সমাজে মানুষ কখনো ফ্যাসিস্ট কাঠামোর অনুমতি ছাড়া কোনো সমাবেশে জড়ো হতে পারে না এবং তারা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো নেতিবাচক শব্দও উচ্চারণ করতে পারে না। কোনোরকম বিরোধিতার বদলে ফ্যাসিস্ট সমাজের মানুষ উগ্র জাতীয়তাবাদ ও নৃতাত্ত্বিক ঐক্যের সাগরে ডুবে যায়।

ফ্যাসিবাদে তারুণ্যকে ব্যাপকভাবে গৌরবান্বিত করা হয়। ছবি: সংগৃহীত
ফ্যাসিবাদে তারুণ্যকে ব্যাপকভাবে গৌরবান্বিত করা হয়। ছবি: সংগৃহীত

মজার বিষয় হলো, ফ্যাসিবাদে তারুণ্যকে ব্যাপকভাবে গৌরবান্বিত করা হয়। এমনভাবে তরুণ সমাজকে মানুষের সামনে হাজির করা হয় যেন তারাই ওই অঞ্চল বা দেশের একমাত্র রক্ষাকর্তা! হুট করেই সমাজের ত্রাণকর্তা হিসেবে হাজির হওয়া এই তরুণেরা, যাদের রাষ্ট্রের কান্ডারি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার আরোপিত চেষ্টা চলে, এরা আবার তাদের দলে অন্যান্য গোষ্ঠীমুক্ত তরুণদের ফ্যাসিস্ট গোষ্ঠীভুক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যায়। এই চেষ্টাটি সর্বগ্রাসী হয়। এর মধ্য দিয়ে এক অর্থে ফ্যাসিবাদের সমর্থক দলকেই ভারী করার চেষ্টা চলে। কিন্তু তরুণদেরই কেন গুরুত্ব দেওয়া হয় এত? এর জবাবে বিশ্লেষকেরা বলেন, ফ্যাসিবাদীরা অনেক ক্ষেত্রেই চার্লস রবার্ট ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচনের মতবাদে বিশ্বাসী থাকে। তারা মনে করে, একমাত্র উপযুক্ত ও শক্তিমানেরাই টিকে থাকে পৃথিবীতে। আর তাই বেছে নেওয়া হয় প্রাকৃতিকভাবে জীবনীশক্তি বেশি থাকা তরুণ সম্প্রদায়কেই।

এক কথায়, ফ্যাসিবাদে সাধারণ মানুষের জীবনে থাকে রাষ্ট্রপ্রণোদিত মিছিল–মিটিং, জাতীয় পতাকার রঙ ছাড়া অন্য রঙ ফিকে হয়ে যায়, আকাশ ঢেকে যায় বিশালকায় জাতীয়তাবাদী মনুমেন্টে। সরকারি ছুটির দিনগুলো হয়ে যায় ফ্যাসিবাদীদের ঠিক করে দেওয়া বাধ্যতামূলক স্মরণযোগ্য প্রতীকময়। রাষ্ট্র তখন বিশ্বাসের বস্তু হয়ে ওঠে, নেয় পবিত্র ভাবমূর্তি। অন্য অর্থে, ধর্ম বা সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাসস্থাপনের বিষয়টি বদলে গিয়ে সেখানে রাষ্ট্র স্থাপিত হয়। সেদিক থেকে ধরলে ফ্যাসিবাদ প্রচলিত ধর্মবিশ্বাসের বিরোধীও বটে।

এতক্ষণ ফ্যাসিবাদের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হলো। এই আদর্শটি কীভাবে কাজ করে, তার অনেকটাই আশা করা যায় মূর্ত হয়েছে। তবে একটি বড় ক্ষেত্র বাদ আছে, সেটি হলো শ্রমিক শ্রেণি। উদারবাদী গণতন্ত্র সাধারণত ফ্যাসিবাদকে রাজনৈতিক সাম্য ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের পুরোপুরি বিপরীত প্রতিক্রিয়া হিসেবেই হাজির করে। তাতে শ্রমিক শ্রেণি আলাদা কোনো গুরুত্ব পায় না, অন্যান্য বিরোধী সংগঠন বা পক্ষের মতো করেই তাকে বিবেচনা করা হয়। পুঁজিবাদ এখানে অনেকাংশেই ফ্যাসিস্টদের পক্ষে থাকে, কিন্তু তার অবয়ব এমনভাবে আঁকা হয়, যাতে বোধ হয় যে, পুঁজিপতিরা অনেকটা অনন্যোপায় হয়ে ফ্যাসিবাদের সমর্থনে দাঁড়ায়! তবে এই দৃষ্টিভঙ্গির কঠোর সমালোচনা করেন মার্ক্সিস্ট বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, শ্রমিক শ্রেণির প্রতিরোধের মুখে পড়ে নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার সর্বশেষ মরিয়া চেষ্টা পুঁজিবাদ করে ফ্যাসিবাদের মাধ্যমে।

মার্ক্সিস্ট ওয়েবসাইট লেফটভয়েস ডট ওআরজি’তে ২০২১ সালের মার্চে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল। লিখেছিলেন মার্কিন লেখিকা মেডেলিন ফ্রিম্যান। তিনি ওই নিবন্ধে লিখেছিলেন, শ্রেণি চরিত্রের বাইরের কোনো বিষয় নয় ফ্যাসিবাদ। কেবলই একজন একনায়ক চূড়ান্ত ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ লাভের নেশায় ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠে—এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই। বরং ফ্যাসিবাদ হলো শ্রমিক শ্রেণির বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের ওপর একটি সর্বগ্রাসী হামলা। বিংশ শতাব্দীতে এই ফ্যাসিবাদ মূলত বর্ণবাদী, রাজনৈতিক গণহত্যা, নৃতাত্ত্বিক বিভেদকারী প্রভৃতি রূপ ধারণ করেছিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল এসব প্রক্রিয়ায় শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে নানাবিধ বিভক্তি সৃষ্টি করে পুঁজিবাদকে সুস্থির হয়ে ওঠার জন্য আরও অবসর তৈরি করে দেওয়া। এমনকি শ্রমিক শ্রেণির ন্যায্য আন্দোলনের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ বা সরাসরি এর বিরুদ্ধাচরণ করতেও বাধে না ফ্যাসিবাদের। আক্রমণ করা হয় শ্রমিক শ্রেণির সংগঠনগুলোকে, ফ্যাসিস্টরা ছাড় দেয় না ট্রেড ইউনিয়নগুলোকেও। আর এই কাজগুলো করা হয় একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ের পুঁজিপতিদের স্বার্থরক্ষার জন্যই।

মেডেলিন ফ্রিম্যানের মতে, ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক আদর্শ অনুযায়ী শ্রমিক ইউনিয়নগুলোকে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া উচিত। এই ঐক্য ভেঙে গেলে শ্রমিকেরা ব্যক্তিসত্তায় টুকরো টুকরো হয়ে পড়বে এবং তখন তাদের বৈশ্বিক পুঁজিবাদের সাগরে ডুবিয়ে দেওয়া যাবে। আবার এভাবে ফ্যাসিবাদী দলের নতুন অনুসারী তৈরির পথও খুলবে। উদারবাদী গণতান্ত্রিক চিন্তা বলে, শ্রমিক সংগঠনের ওপর ফ্যাসিবাদের এই আক্রমণ শুধুই শ্রমিকদের একজন ফ্যাসিবাদী নেতার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার জন্যই হয়। কিন্তু আসলে ফ্যাসিবাদী রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য থাকে শ্রমিক শ্রেণির যে স্বায়ত্ত্বশাসনের ভাবনা, সেটি ভেঙেচুরে দেওয়া। এটি করা হয় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদের স্বার্থেই। এবং এজন্য চরম সহিংসতা ও দমন–পীড়ন চালানো হয়।

ফ্যাসিবাদ তাই মানুষে মানুষে সহমর্মীতা কমিয়ে আনার একটি আদর্শই কেবল নয়। মার্ক্সিস্ট বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এটি পুঁজিবাদেরই একটি ভিন্ন রূপ যা সমাজের অর্থনৈতিক সম্পর্কগুলোকে ওলটপালট করে দিতে চায় ব্যাপকভাবে। অন্য কথায়, ফ্যাসিবাদ হলো সমাজে থাকা বুর্জোয়া শ্রেণির একটি প্রতিক্রিয়া, যা শ্রমিক শ্রেণির সংঘবদ্ধতা ও ক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে চালিত হয়। সাধারণত পুঁজিবাদ যখন অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর দিক থেকে প্রবল সংকটের মুখোমুখি হয়, তখনই ফ্যাসিবাদকে ডেকে আনা হয়। আর এই ফ্যাসিবাদ সৃষ্টি হয় উদারবাদী গণতন্ত্রের নিদারুণ ব্যর্থতায়। এক্ষেত্রে মূলত শ্রমিক শ্রেণিকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার অক্ষমতাটিই পাত্তা পায়। তাই ফ্যাসিবাদ আসলে পুঁজিবাদই, যা ভিন্ন ব্যক্তিত্বের একজন নেতার অধীনে থাকে। এই নেতার অন্যতম প্রধান কাজ থাকে, বিভিন্ন করপোরেশন ও ব্যবসায়িক স্বার্থের জায়গা থেকে রাষ্ট্রের সব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা।

তবে ফ্যাসিবাদ আদতে খুবই অস্থির প্রকৃতির একটি শাসনব্যবস্থা। ঐতিহাসিকভাবে পুঁজিবাদীরা এর পদতলে আশ্রয় নিলেও, প্রকৃতপক্ষে তারা এই ঘরানার শাসনব্যবস্থাকে খুব একটা পছন্দ করে না। এ বিষয়ে রাজনৈতিক তাত্ত্বিক লিও ট্রটস্কির একটি বিখ্যাত উক্তি আছে। সেটি দিয়েই এই লেখা শেষ করা যাক। ট্রটস্কি বলেছিলেন, ‘বড় বড় বুর্জোয়ারা ফ্যাসিবাদকে ততটাই পছন্দ করে, যতটা দাঁতের ব্যথায় কুপোকাত একজন মানুষ তার ওই দাঁত খোঁচাতে নাচতে নাচতে মত দেয়!’

বিষয়: রাজনীতিবিদগণতন্ত্ররাজনৈতিক ব্যক্তিত্বসরকাররাজনৈতিক দলপুঁজিবাদকমিউনিস্ট পার্টি
সর্বশেষ
  • ১

    বিকল্প জ্বালানি হিসেবে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা সরকারের: মন্ত্রী

  • ২

    বিসিবির জিডি ট্রফি: বয়সভিত্তিক ক্রিকেটারদের প্রাপ্তি অনেক

  • ৩

    মৃত্যুর আগে ডায়েরিতে ‘দায়ীর’ নাম, শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ

  • ৪

    কমেডিও কাঠগড়ায়! চীনে বাকস্বাধীনতা কি ডিপ ফ্রিজে?

  • ৫

    সরকারও মনে হয় ৮০-এর দশকে ফিরে যাবে: নাহিদ ইসলাম

সম্পর্কিত
  • কমেডিও কাঠগড়ায়! চীনে বাকস্বাধীনতা কি ডিপ ফ্রিজে?

    কমেডিও কাঠগড়ায়! চীনে বাকস্বাধীনতা কি ডিপ ফ্রিজে?

    চীনের সরকার আসলে কী কী বন্ধ করে দেয় – শুধুই কি বিদেশি ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেয়, নাকি দেশের ভেতরে থাকা সমালোচকদের ওপরও এই নিষেধাজ্ঞা আছে, এমন চিন্তাটা আসা খুবই স্বাভাবিক। তবে এখানে সরকারের লক্ষ্য এর চেয়েও বড়।

  • ইরান যুদ্ধ কি বদলে দিল বিশ্ব তেলের বাজার?

    ইরান যুদ্ধ কি বদলে দিল বিশ্ব তেলের বাজার?

    ইরান যুদ্ধের ছয় মাস পেরিয়েছে। এই যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বিভিন্ন খাতে বিশেষ করে তেলের বাজার তীব্রভাবে প্রভাবিত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে আমেরিকানদের ওপর। গ্যাসের দাম কয়েক সপ্তাহ ধরে ৪ ডলারের বেশি। বন্ধকী ঋণের সুদের হারও বেড়ে প্রায় ৭ শতাংশের দিকে যাচ্ছে। আবার ডিজেলের রেকর্ড

  • বিশ্বজুড়ে ফিরেছে মূল্যস্ফীতি?

    বিশ্বজুড়ে ফিরেছে মূল্যস্ফীতি?

    ‘সফট ল্যান্ডিং’-এর কথা মনে আছে? আগে বলে নেওয়া দরকার সফট ল্যান্ডিং কী? ‘সফট ল্যান্ডিং’ বলতে বোঝায়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি নিয়ন্ত্রিত ও ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা, যাতে মূল্যস্ফীতি কমে আসে, কিন্তু অর্থনীতিতে মন্দা দেখা না দেয় বা বিপুলসংখ্যক মানুষ চাকরি না হারান।

  • সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক: টাকা ফেরত পেলেও কাটছে না আস্থার সংকট

    সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক: টাকা ফেরত পেলেও কাটছে না আস্থার সংকট

    আমানতের টাকা ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হলেও সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক ঘিরে আস্থা ও অনাস্থার দোলাচলে রয়েছে গ্রাহকরা। টাকা ফেরত পেয়ে কেউ আবারও ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেন চালিয়ে যেতে চান। আবার টাকা হাতে পাওয়ার পর আপাতত আর এই ব্যাংকে আমানত রাখতে চাইছেন না অনেকে। ব্যাংকটি শেষ পর্যন্ত কতটা ঘুরে দাঁড়াতে পার