নীলফামারী-৪ আসনে জামায়াতের সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
বাঙালি যখন কথা বলে, তখন সে আবেগ, ইতিহাস, ভূগোল এবং সাধারণ জ্ঞানকে এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দিয়ে এক অলৌকিক ঘোরের মধ্যে চলে যায়। সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে এই ঘোর চায়ের দোকানে ঝড় তোলে, আর রাজনীতিবিদদের ক্ষেত্রে তা সরাসরি জাতীয় সংসদে ঝড় তোলে। এমনিতেই কথা আছে–সংসদ হলো আইনের পবিত্র গৃহ। তবে আমাদের দেশে এটি মাঝে মাঝে এমন এক উন্মুক্ত মঞ্চ, যেখানে দাঁড়ালে ব্যাকরণ, লজিক কিংবা জীববিজ্ঞানের মতো তুচ্ছ বিষয়গুলো স্পিকারের হাতুড়ির ঘায়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। অতি সম্প্রতি আমরা সেই চূর্ণবিচূর্ণ ইতিহাসের এক ঝলক দেখতে পেলাম।
যিনি এই অলৌকিক কাণ্ডটি ঘটিয়েছেন, তিনি আর কেউ নন–জামায়াতে ইসলামীর মাননীয় সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম সাহেব। বাজেট অধিবেশন চলছে, দেশ নিয়ে গুরুগম্ভীর আলোচনা হবে, ট্যাক্স-জিডিপি নিয়ে কথা হবে–এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এমপি সাহেব ভাবলেন, শুধু শুকনো বাজেট দিয়ে কী হবে? একটু রসে-বশে ইতিহাস আর আবেগের ফোড়ন দেওয়া যাক। যেই ভাবা সেই কাজ। মাইক হাতে পেয়েই তিনি ঘোষণা করে দিলেন, তিনি আসলে ‘মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সন্তান’!
শুধু এটুকুই যদি বলতেন, তাও হয়তো ইতিহাসের পাতা একটু ওলটপালট করে হজম করা যেত। কিন্তু এমপি সাহেব যখন ফর্মে থাকেন, তখন তিনি একাই একশো। তিনি এক নিঃশ্বাসে হিসাব দিলেন, “আমার বাবা, আমার দাদা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ। আমার আব্বারা সাত ভাই, চারজন মুক্তিযোদ্ধা। আমার দাদারা ১৯ জন, ১১ জন মুক্তিযোদ্ধা। আমার পরিবারে ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধা। আমার মা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। আমি জুলাই যোদ্ধা।”
বাহ! কী নিখুঁত পরিসংখ্যান! ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধা এক পরিবারে–এ তো কোনো পরিবার নয়, আস্ত একটা বধ্যভূমি! যেন তিনি একাই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চলমান জাদুঘর। এমপি সাহেবের বক্তব্য শুনে অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন। কেউ কেউ হয়তো ভাবছিলেন, এ পরিবারকে নিয়ে অন্তত তিনটা স্বাধীনতা জাদুঘর এবং দুটো স্মৃতিসৌধ বানানো সম্ভব।
কিন্তু গোল বাঁধল অন্য জায়গায়। সোশ্যাল মিডিয়ার এই ডিজিটাল যুগে পাবলিকের খেয়েদেয়ে কাজ নেই। তারা সঙ্গে সঙ্গে ক্যালকুলেটর আর এমপি সাহেবের হলফনামা নিয়ে বসে গেল। হিসাব কষে দেখা গেল, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। আর আমাদের মাননীয় এমপি আব্দুল মুনতাকিম সাহেবের জন্ম তারিখ ১০ জানুয়ারি ১৯৮১ সাল!
এবার একটু ঠান্ডা মাথায়, গণিত এবং জীববিজ্ঞানের সূত্র দিয়ে চিন্তা করুন। ১৯৭১ সালে বাবা ‘শহীদ’ হয়ে গেছেন। অর্থাৎ, তিনি ইহলোক ত্যাগ করেছেন। আর তার সন্তান পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হচ্ছেন ১৯৮১ সালে–অর্থাৎ স্বাধীনতার পুরো ১০ বছর পর! এই যে অলৌকিক ঘটনা, একেই বোধহয় বলে ‘সংসদীয় ম্যাজিক রিয়ালিজম’। শহীদ বাবা মৃত্যুর ১০ বছর পর স্বর্গ থেকে এসে সন্তান জন্ম দিয়ে গেলেন–এমন ঐশ্বরিক থিওরি এর আগে কোনো জীববিজ্ঞানী বা ধর্মতাত্ত্বিক আবিষ্কার করতে পারেননি। সাবাশ বাংলাদেশ! আমাদের সংসদ সদস্যরা বিজ্ঞানকে কতটা পেছনে ফেলে দিতে পারেন, এ তার এক জাজ্বল্যমান প্রমাণ।
পাবলিক যখন এই ‘টাইম ট্রাভেল’ বা সময়ের ব্যবধান নিয়ে হাসাহাসি শুরু করল, তখন আসল সত্যটা যেন রূপকথার গল্পকেও হার মানাল। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, এমপি সাহেবের বাবা আব্দুল কাদের সৈয়দী এবং মা মোসলমান বেগম শুধু যে বেঁচে আছেন তাই নয়, তারা বহাল তবিয়তে সৈয়দপুর উপজেলার কামারপুকুর ইউনিয়নের ধলাগাছ গ্রামে ছেলের সঙ্গেই এক বাড়িতে বসবাস করছেন!
যে বাবা প্রতিদিন সকালে উঠে চা খাচ্ছেন, ছেলের সঙ্গে রাজনীতি নিয়ে আলাপ করছেন, সেই বাবাকে ছেলে দেশের সর্বোচ্চ আইনসভায় দাঁড়িয়ে এক ফুঁয়ে ‘শহীদ’ বানিয়ে দিলেন! বাবার আয়ু বাড়ানোর জন্য মানুষ কত কী করে, আর আমাদের এমপি সাহেব নিজের রাজনৈতিক প্রোফাইল ভারী করার জন্য জ্যান্ত বাবাকেই পরপারে পাঠিয়ে দিলেন। মাকেও বানালেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, অথচ মা হয়তো তখন ধলাগাছ গ্রামে বসে ছেলের এই ‘কীর্তি’ শুনে কপালে হাত দিয়ে ভাবছেন, “কাহারে জন্ম দিলাম রে!”
ভাবুন তো, একজন বাবা টেলিভিশনে সংসদের অধিবেশন দেখছেন। হঠাৎ শুনলেন তিনি শহীদ হয়ে গেছেন। এ এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। মানুষ সাধারণত মৃত্যুর পরে শহীদ হয়। কিন্তু আমাদের রাজনীতিতে এখন জীবিত অবস্থাতেই শহীদ হওয়ার সুযোগ এসেছে। এটি এক ধরনের আগাম সম্মাননা। যারা এতদিন বেঁচে আছেন, তারা হয়তো জানতেনই না যে তারা শহীদ। বাংলাদেশে প্রতিভার অভাব নেই।
সংসদ অধিবেশন কক্ষ
তবে ঘটনাটির সবচেয়ে চমকপ্রদ অংশ অন্য জায়গায়। যখন চারদিকে ট্রোল আর সমালোচনার বন্যা বয়ে যাচ্ছে, তখন এমপি সাহেব মুখ খুললেন। তিনি যা বললেন, তা রাজনীতি শাস্ত্রের ইতিহাসে সোনার অক্ষরে লেখা থাকা উচিত। তিনি বললেন, সংসদ অধিবেশন চলাকালে তিনি নাকি প্রচণ্ড অসুস্থ ছিলেন এবং তার ‘মাথাব্যথা’ করছিল! ফলে তিনি মুখে কী বলেছেন, তা নাকি নিজেই সঠিকভাবে বুঝতে পারেননি!
ওহ, কী চমৎকার অজুহাত! মাথাব্যথা হলে মানুষের কী কী হয়? বড়জোর চোখ বন্ধ হয়ে আসে, কপাল টিপতে ইচ্ছা করে, কেউ কেউ একটু মেজাজ হারায়। কিন্তু মাথাব্যথা হলে জ্যান্ত বাবা মারা যায়, নিজের জন্মসাল ১০ বছর পিছিয়ে যায়, আর পরিবারে হঠাৎ করে ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধা গজিয়ে ওঠে–এমন অদ্ভুত প্যাথলজিক্যাল লক্ষণ এর আগে কোনো ডাক্তার শুনেছেন বলে মনে হয় না। এই ‘মাথাব্যথা’ আসলে কোনো সাধারণ রোগ নয়, এটি হলো ‘সংসদীয় লাইমলাইট সিনড্রোম’। মাইক দেখলেই এই রোগ চাড়া দিয়ে ওঠে, তখন মুখ দিয়ে যা বের হয়, তার সঙ্গে মস্তিস্কের কোনো সংযোগ থাকে না।
এমপি সাহেব পরে অবশ্য ক্ষমা চেয়েছেন। বলেছেন, “আসলে আমার বাবা বেঁচে আছেন। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন আমার দাদা ও চাচা।” যাক বাবা, তবু রক্ষে যে বাবা অলৌকিক পুনরুত্থান ঘটিয়ে পৃথিবীতে ফিরে এলেন! কিন্তু কথা হলো, দেশের সার্বভৌম সংসদের ভেতরে দাঁড়িয়ে এমন একটা ডাহা মিথ্যা কথা যিনি বলতে পারেন, তিনি যখন সুস্থ মাথায় বাজেট বা আইন প্রণয়ন করবেন, তখন দেশের মানুষের মাথা যে কতটা ব্যথায় ছিঁড়ে যাবে, তা সহজেই অনুমেয়।
আসলে আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের একটা সাধারণ অসুখ আছে–বেশি কথা বলা। আর বেশি কথা বলতে গেলে যে একটু-আধটু ‘মিছা’ কথা মুখ দিয়ে বের হবেই, তা তো চিরন্তন সত্য। তফাত শুধু এই যে, সাধারণ মানুষের মিথ্যাগুলো হয় সস্তা, আর রাজনীতিবিদদের মিথ্যাগুলো হয় ঐতিহাসিক ও মহাকাব্যিক।
এই পুরো ঘটনার শেষ দৃশ্যে এসে আমাদের অবধারিতভাবেই বাংলার মহান দার্শনিক ও চিত্রনায়ক অনন্ত জলিলের সেই অমর এবং কালজয়ী আপ্তবাক্যটির কথা মনে পড়ে যায়। অনন্ত জলিল সাহেব তার সেই বিখ্যাত ভাঙা-ভাঙা বাংলায় বলেছিলেন, “একটা মিথ্যা করলে মিথ্যা কথা বললে অনেক মিথ্যা করলে মানে অনেক একটা মিথ্যা কথা বললে ওইটা অনেকগুলা মিথ্যা আরও কথা বললে ঢাকার চেষ্টা করলে মিথ্যা মিথ্যাই থেকে যাবে।”
অনন্ত জলিলের এই উক্তির ভেতরের গভীর দর্শনটা যদি আমাদের জামায়াত নেতা আব্দুল মুনতাকিম সাহেব একটু অনুধাবন করতেন, তাহলে আজ তাকে এই ‘শহীদে-মাথাব্যথা’ তত্ত্বে ভুগতে হতো না। তিনি একটা ‘শহীদ’ কার্ড খেলতে গিয়ে এমন এক মিথ্যার জাল বুনে ফেললেন, যা ঢাকতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজের জ্যান্ত বাবাকেই সাক্ষী মানতে হলো। মিথ্যাকে যতই ইতিহাসের আলো দিয়ে, ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধার তকমা দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করা হোক না কেন– দিনশেষে ‘মিথ্যা মিথ্যাই থেকে যাবে’।
সংসদে দাঁড়িয়ে মাননীয় এমপিরা যখন এমন বেপরোয়া, লাগামহীন বক্তব্য দেন, তখন মনে হয়–সংসদ কোনো আইনসভার অধিবেশন নয়, বরং এটি একটি ‘স্ট্যান্ড-আপ কমেডি’র মঞ্চ। যেখানে জনপ্রতিনিধিরা আসেন, মাইক্রোফোন নেন, মনগড়া রূপকথা শোনান, এবং শেষে ধরা খেলে বলেন, “সরি ভাই, মাথায় একটু ব্যথা ছিল!”
পরবর্তী বাজেট অধিবেশনে স্পিকার মহোদয়ের কাছে জনগণের একটাই আকুল আবেদন থাকবে-সংসদে ঢোকার আগে যেন সব এমপির ভালো করে থার্মোমিটার দিয়ে জ্বর এবং প্যারাসিটামল দিয়ে ‘মাথাব্যথা’ পরীক্ষা করে নেওয়া হয়। কারণ, দেশের মানুষের ট্যাক্সের টাকায় চলা সংসদে আমরা বাজেট শুনতে চাই, কোনো এমপির জ্যান্ত বাবাকে ‘ভুতুড়ে শহীদ’ বানানোর অলৌকিক গল্প শুনতে চাই না!
লেখক: কলাম লেখক।
নীলফামারী-৪ আসনে জামায়াতের সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
বাঙালি যখন কথা বলে, তখন সে আবেগ, ইতিহাস, ভূগোল এবং সাধারণ জ্ঞানকে এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দিয়ে এক অলৌকিক ঘোরের মধ্যে চলে যায়। সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে এই ঘোর চায়ের দোকানে ঝড় তোলে, আর রাজনীতিবিদদের ক্ষেত্রে তা সরাসরি জাতীয় সংসদে ঝড় তোলে। এমনিতেই কথা আছে–সংসদ হলো আইনের পবিত্র গৃহ। তবে আমাদের দেশে এটি মাঝে মাঝে এমন এক উন্মুক্ত মঞ্চ, যেখানে দাঁড়ালে ব্যাকরণ, লজিক কিংবা জীববিজ্ঞানের মতো তুচ্ছ বিষয়গুলো স্পিকারের হাতুড়ির ঘায়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। অতি সম্প্রতি আমরা সেই চূর্ণবিচূর্ণ ইতিহাসের এক ঝলক দেখতে পেলাম।
যিনি এই অলৌকিক কাণ্ডটি ঘটিয়েছেন, তিনি আর কেউ নন–জামায়াতে ইসলামীর মাননীয় সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম সাহেব। বাজেট অধিবেশন চলছে, দেশ নিয়ে গুরুগম্ভীর আলোচনা হবে, ট্যাক্স-জিডিপি নিয়ে কথা হবে–এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এমপি সাহেব ভাবলেন, শুধু শুকনো বাজেট দিয়ে কী হবে? একটু রসে-বশে ইতিহাস আর আবেগের ফোড়ন দেওয়া যাক। যেই ভাবা সেই কাজ। মাইক হাতে পেয়েই তিনি ঘোষণা করে দিলেন, তিনি আসলে ‘মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সন্তান’!
শুধু এটুকুই যদি বলতেন, তাও হয়তো ইতিহাসের পাতা একটু ওলটপালট করে হজম করা যেত। কিন্তু এমপি সাহেব যখন ফর্মে থাকেন, তখন তিনি একাই একশো। তিনি এক নিঃশ্বাসে হিসাব দিলেন, “আমার বাবা, আমার দাদা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ। আমার আব্বারা সাত ভাই, চারজন মুক্তিযোদ্ধা। আমার দাদারা ১৯ জন, ১১ জন মুক্তিযোদ্ধা। আমার পরিবারে ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধা। আমার মা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। আমি জুলাই যোদ্ধা।”
বাহ! কী নিখুঁত পরিসংখ্যান! ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধা এক পরিবারে–এ তো কোনো পরিবার নয়, আস্ত একটা বধ্যভূমি! যেন তিনি একাই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চলমান জাদুঘর। এমপি সাহেবের বক্তব্য শুনে অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন। কেউ কেউ হয়তো ভাবছিলেন, এ পরিবারকে নিয়ে অন্তত তিনটা স্বাধীনতা জাদুঘর এবং দুটো স্মৃতিসৌধ বানানো সম্ভব।
কিন্তু গোল বাঁধল অন্য জায়গায়। সোশ্যাল মিডিয়ার এই ডিজিটাল যুগে পাবলিকের খেয়েদেয়ে কাজ নেই। তারা সঙ্গে সঙ্গে ক্যালকুলেটর আর এমপি সাহেবের হলফনামা নিয়ে বসে গেল। হিসাব কষে দেখা গেল, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। আর আমাদের মাননীয় এমপি আব্দুল মুনতাকিম সাহেবের জন্ম তারিখ ১০ জানুয়ারি ১৯৮১ সাল!
এবার একটু ঠান্ডা মাথায়, গণিত এবং জীববিজ্ঞানের সূত্র দিয়ে চিন্তা করুন। ১৯৭১ সালে বাবা ‘শহীদ’ হয়ে গেছেন। অর্থাৎ, তিনি ইহলোক ত্যাগ করেছেন। আর তার সন্তান পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হচ্ছেন ১৯৮১ সালে–অর্থাৎ স্বাধীনতার পুরো ১০ বছর পর! এই যে অলৌকিক ঘটনা, একেই বোধহয় বলে ‘সংসদীয় ম্যাজিক রিয়ালিজম’। শহীদ বাবা মৃত্যুর ১০ বছর পর স্বর্গ থেকে এসে সন্তান জন্ম দিয়ে গেলেন–এমন ঐশ্বরিক থিওরি এর আগে কোনো জীববিজ্ঞানী বা ধর্মতাত্ত্বিক আবিষ্কার করতে পারেননি। সাবাশ বাংলাদেশ! আমাদের সংসদ সদস্যরা বিজ্ঞানকে কতটা পেছনে ফেলে দিতে পারেন, এ তার এক জাজ্বল্যমান প্রমাণ।
পাবলিক যখন এই ‘টাইম ট্রাভেল’ বা সময়ের ব্যবধান নিয়ে হাসাহাসি শুরু করল, তখন আসল সত্যটা যেন রূপকথার গল্পকেও হার মানাল। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, এমপি সাহেবের বাবা আব্দুল কাদের সৈয়দী এবং মা মোসলমান বেগম শুধু যে বেঁচে আছেন তাই নয়, তারা বহাল তবিয়তে সৈয়দপুর উপজেলার কামারপুকুর ইউনিয়নের ধলাগাছ গ্রামে ছেলের সঙ্গেই এক বাড়িতে বসবাস করছেন!
যে বাবা প্রতিদিন সকালে উঠে চা খাচ্ছেন, ছেলের সঙ্গে রাজনীতি নিয়ে আলাপ করছেন, সেই বাবাকে ছেলে দেশের সর্বোচ্চ আইনসভায় দাঁড়িয়ে এক ফুঁয়ে ‘শহীদ’ বানিয়ে দিলেন! বাবার আয়ু বাড়ানোর জন্য মানুষ কত কী করে, আর আমাদের এমপি সাহেব নিজের রাজনৈতিক প্রোফাইল ভারী করার জন্য জ্যান্ত বাবাকেই পরপারে পাঠিয়ে দিলেন। মাকেও বানালেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, অথচ মা হয়তো তখন ধলাগাছ গ্রামে বসে ছেলের এই ‘কীর্তি’ শুনে কপালে হাত দিয়ে ভাবছেন, “কাহারে জন্ম দিলাম রে!”
ভাবুন তো, একজন বাবা টেলিভিশনে সংসদের অধিবেশন দেখছেন। হঠাৎ শুনলেন তিনি শহীদ হয়ে গেছেন। এ এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। মানুষ সাধারণত মৃত্যুর পরে শহীদ হয়। কিন্তু আমাদের রাজনীতিতে এখন জীবিত অবস্থাতেই শহীদ হওয়ার সুযোগ এসেছে। এটি এক ধরনের আগাম সম্মাননা। যারা এতদিন বেঁচে আছেন, তারা হয়তো জানতেনই না যে তারা শহীদ। বাংলাদেশে প্রতিভার অভাব নেই।
সংসদ অধিবেশন কক্ষ
তবে ঘটনাটির সবচেয়ে চমকপ্রদ অংশ অন্য জায়গায়। যখন চারদিকে ট্রোল আর সমালোচনার বন্যা বয়ে যাচ্ছে, তখন এমপি সাহেব মুখ খুললেন। তিনি যা বললেন, তা রাজনীতি শাস্ত্রের ইতিহাসে সোনার অক্ষরে লেখা থাকা উচিত। তিনি বললেন, সংসদ অধিবেশন চলাকালে তিনি নাকি প্রচণ্ড অসুস্থ ছিলেন এবং তার ‘মাথাব্যথা’ করছিল! ফলে তিনি মুখে কী বলেছেন, তা নাকি নিজেই সঠিকভাবে বুঝতে পারেননি!
ওহ, কী চমৎকার অজুহাত! মাথাব্যথা হলে মানুষের কী কী হয়? বড়জোর চোখ বন্ধ হয়ে আসে, কপাল টিপতে ইচ্ছা করে, কেউ কেউ একটু মেজাজ হারায়। কিন্তু মাথাব্যথা হলে জ্যান্ত বাবা মারা যায়, নিজের জন্মসাল ১০ বছর পিছিয়ে যায়, আর পরিবারে হঠাৎ করে ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধা গজিয়ে ওঠে–এমন অদ্ভুত প্যাথলজিক্যাল লক্ষণ এর আগে কোনো ডাক্তার শুনেছেন বলে মনে হয় না। এই ‘মাথাব্যথা’ আসলে কোনো সাধারণ রোগ নয়, এটি হলো ‘সংসদীয় লাইমলাইট সিনড্রোম’। মাইক দেখলেই এই রোগ চাড়া দিয়ে ওঠে, তখন মুখ দিয়ে যা বের হয়, তার সঙ্গে মস্তিস্কের কোনো সংযোগ থাকে না।
এমপি সাহেব পরে অবশ্য ক্ষমা চেয়েছেন। বলেছেন, “আসলে আমার বাবা বেঁচে আছেন। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন আমার দাদা ও চাচা।” যাক বাবা, তবু রক্ষে যে বাবা অলৌকিক পুনরুত্থান ঘটিয়ে পৃথিবীতে ফিরে এলেন! কিন্তু কথা হলো, দেশের সার্বভৌম সংসদের ভেতরে দাঁড়িয়ে এমন একটা ডাহা মিথ্যা কথা যিনি বলতে পারেন, তিনি যখন সুস্থ মাথায় বাজেট বা আইন প্রণয়ন করবেন, তখন দেশের মানুষের মাথা যে কতটা ব্যথায় ছিঁড়ে যাবে, তা সহজেই অনুমেয়।
আসলে আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের একটা সাধারণ অসুখ আছে–বেশি কথা বলা। আর বেশি কথা বলতে গেলে যে একটু-আধটু ‘মিছা’ কথা মুখ দিয়ে বের হবেই, তা তো চিরন্তন সত্য। তফাত শুধু এই যে, সাধারণ মানুষের মিথ্যাগুলো হয় সস্তা, আর রাজনীতিবিদদের মিথ্যাগুলো হয় ঐতিহাসিক ও মহাকাব্যিক।
এই পুরো ঘটনার শেষ দৃশ্যে এসে আমাদের অবধারিতভাবেই বাংলার মহান দার্শনিক ও চিত্রনায়ক অনন্ত জলিলের সেই অমর এবং কালজয়ী আপ্তবাক্যটির কথা মনে পড়ে যায়। অনন্ত জলিল সাহেব তার সেই বিখ্যাত ভাঙা-ভাঙা বাংলায় বলেছিলেন, “একটা মিথ্যা করলে মিথ্যা কথা বললে অনেক মিথ্যা করলে মানে অনেক একটা মিথ্যা কথা বললে ওইটা অনেকগুলা মিথ্যা আরও কথা বললে ঢাকার চেষ্টা করলে মিথ্যা মিথ্যাই থেকে যাবে।”
অনন্ত জলিলের এই উক্তির ভেতরের গভীর দর্শনটা যদি আমাদের জামায়াত নেতা আব্দুল মুনতাকিম সাহেব একটু অনুধাবন করতেন, তাহলে আজ তাকে এই ‘শহীদে-মাথাব্যথা’ তত্ত্বে ভুগতে হতো না। তিনি একটা ‘শহীদ’ কার্ড খেলতে গিয়ে এমন এক মিথ্যার জাল বুনে ফেললেন, যা ঢাকতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজের জ্যান্ত বাবাকেই সাক্ষী মানতে হলো। মিথ্যাকে যতই ইতিহাসের আলো দিয়ে, ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধার তকমা দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করা হোক না কেন– দিনশেষে ‘মিথ্যা মিথ্যাই থেকে যাবে’।
সংসদে দাঁড়িয়ে মাননীয় এমপিরা যখন এমন বেপরোয়া, লাগামহীন বক্তব্য দেন, তখন মনে হয়–সংসদ কোনো আইনসভার অধিবেশন নয়, বরং এটি একটি ‘স্ট্যান্ড-আপ কমেডি’র মঞ্চ। যেখানে জনপ্রতিনিধিরা আসেন, মাইক্রোফোন নেন, মনগড়া রূপকথা শোনান, এবং শেষে ধরা খেলে বলেন, “সরি ভাই, মাথায় একটু ব্যথা ছিল!”
পরবর্তী বাজেট অধিবেশনে স্পিকার মহোদয়ের কাছে জনগণের একটাই আকুল আবেদন থাকবে-সংসদে ঢোকার আগে যেন সব এমপির ভালো করে থার্মোমিটার দিয়ে জ্বর এবং প্যারাসিটামল দিয়ে ‘মাথাব্যথা’ পরীক্ষা করে নেওয়া হয়। কারণ, দেশের মানুষের ট্যাক্সের টাকায় চলা সংসদে আমরা বাজেট শুনতে চাই, কোনো এমপির জ্যান্ত বাবাকে ‘ভুতুড়ে শহীদ’ বানানোর অলৌকিক গল্প শুনতে চাই না!