বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমেরাজ খালিদীর মৃত্যুর পর ফেসবুকে বহু মানুষ বহু কথা লিখছেন। স্মৃতিচারণের পাশাপাশি সাংবাদিকতায় তার অবদান নিয়েও অনেকে লিখছেন। সাংবাদিকতা কেমন হওয়া উচিত, বাংলাদেশে কী হচ্ছে, কোথায় বিডিনিউজ আলাদা-তা নিয়েও চলছে নানা কথা। ফেসবুকে ফটো কার্ড শেয়ারও হচ্ছে।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূসের প্রেস সচিব শফিকুল আলমের একটি ফেসবুক পোস্ট অনেকের নজর কেড়েছে। তিনি ইংরেজিতে লিখেছেন। একটা জায়গায় চোখ আটকালো। তার ইংরেজিতে লেখার পোস্টের বাংলা করলে বিষয়টা এমন হয়, “বাংলাদেশে তিনি নতুন সংবাদ প্রযুক্তির সূচনা করেছিলেন, যা পশ্চিমে আগেই প্রচলিত ছিল। অন্যান্য সংবাদমাধ্যম যখন ডিজিটাল সাংবাদিকতা মানিয়ে নেওয়া শুরু করল, তখন তার বিজনেস মডেল বা ব্যবসার ধরন নাটকীয়ভাবে ভেঙে পড়ল। তিনি ছিলেন এমন এক অহংকারী ও হামবড়া লোক, যিনি নিজেকে লিলিপুটদের দেশে গালিভার মনে করতেন। জুলাইয়ের অভ্যুত্থান বহু মানুষকে অপ্রাসঙ্গিক করে দিয়েছে। তিনি-ও ছিলেন তাদেরই একজন!!”
এরপরই ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম লিখেছেন, “তিনি তার সংবাদমাধ্যমে উদ্ধৃতি বা কোটেশন ব্যবহার করতেন দারুণভাবে। যে দেশে খবরের কাগজগুলোও নিয়মিত নিজের মনমতো উদ্ধৃতি বানিয়ে নেয় বা বদলে দেয়, সেখানে তার সংবাদমাধ্যমে ব্যবহৃত উদ্ধৃতিগুলোর ওপর চোখ বন্ধ করে ভরসা করা যেত। আমাদের সাংবাদিকতায় এটাই ছিল তার একমাত্র আসল অবদান!”
তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে নিয়ে আগের একটি লেখাতে বলেছিলাম, তিনি একটি প্রতিষ্ঠানকে সূত্রমুক্ত করেছিলেন। সে বিষয়টি বলছি। তার আগে এই যে জুলাই অভ্যুত্থান যাদের অপ্রাসঙ্গিক করে দিয়েছে এবং সেখানে তৌফিক ইমরোজ খালিদী ছিলেন–এই জায়গায় দুটো কথা বলা দরকার।
তৌফিক ইমরোজ খালিদী এবং বিডিনিউজের একটি ঘোষিত অবস্থান ছিল। তারা নিজেদের নিরপেক্ষ বলতেন না, বলতেন ‘বস্তুনিষ্ঠ’। এই বস্তুনিষ্ঠতা আর নিরপেক্ষতা যে এক জিনিস নয়, তা সাধারণ পড়াশোনা করা মানুষ মাত্রই বুঝবেন। বিডিনিউজ নিজেদের নিরপেক্ষ দাবি না করে পরে যে কথাটা বলে, বা তৌফিক ইমরোজ খালিদী বলতেন, তা হলো, “আমাদের প্রচণ্ড পক্ষপাতিত্ব আছে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি, একাত্তরের প্রতি।” এই জায়গাটাতেই আসছে প্রাসঙ্গিক আর অপ্রাসঙ্গিক হওয়ার বিষয়টা।
সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, হতাশা দানাবেঁধে জুলাই আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল–এ নিয়ে দ্বিমত নেই। মানুষের সেই ক্ষোভ কে, কীভাবে ‘মেটিকুলাসলি’ ব্যবহার করেছেন সেটা নিয়ে বিস্তর আলোচনা আছে। কিন্তু মানুষ সন্দেহ করা শুরু করল একটা সময়। যখন চব্বিশকে একাত্তরের সঙ্গে তুলনার জায়গায় খোদ সরকার এবং তার অনুগতরা চেষ্টা শুরু করলেন। আমরা এও দেখলাম, জাতীয় দিবসগুলো যেখানে রাষ্ট্রপ্রধান এবং সরকারপ্রধান একসঙ্গে একটু আগে-পরে স্মৃতিসৌধ, শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানান, সেখানে মুহাম্মদ ইউনূস দীর্ঘদিনের রীতি ভাঙলেন। তখনকার রাষ্ট্রপতিকে পাত্তা দিলেন না। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এমন একজনকে চিফ প্রসিকিউটর করা হলো যিনি যুদ্ধাপরাধের অভিযুক্তদের আইনজীবী ছিলেন। চব্বিশে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের বিচার হোক। ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক। গণতন্ত্রে সেটাই কাম্য।
তৌফিক ইমেরাজ খালিদী। ছবি: সংগৃহীত
চব্বিশের ফলাফল এনসিপি মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে বটে; কিন্তু সেখান থেকে কৌশলে বাদ দেয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। বঙ্গভবন থেকে বাঙালির এই নেতার ছবি সরিয়ে দিলেন মাহফুজ আলম। ক্ষমতার শক্তি দেখা গেল। চব্বিশের আন্দোলনে মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা প্রয়াত শরীফ ওসমান হাদির ইনকিলাব মঞ্চসহ অনেকেই সাতচল্লিশকে টেনে আনলেন। তাদের নেতা ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনীম জুমা ডাকসুতে ওঠালেন পাকিস্তানের জাতির জনক মোহমাম্মদ আলীর জিন্নাহ ছবি। নামালের শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এসব যখন চলছে, তখন তৌফিক ইমরোজ খালিদীর উদ্যোগে প্রকাশিত হলো তিন খণ্ডের দলিলভিত্তিক সংকলন ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’। বইয়ের তিনটি খণ্ডের পৃথক তিনটি প্রকাশনা অনুষ্ঠান হয়েছিল–২০২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে প্রথম, ২০২৬ সালের ৩০ জানুয়ারি মিরপুরের ‘শেষ রণক্ষেত্র’ স্মরণে রেখে দ্বিতীয় এবং ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে তৃতীয় খণ্ডের। পরের দুটি অবশ্য ‘মুক্তিযোদ্ধাদের দল’ বিএনপির আমলে।
শুধু এটুকুই যদি দেখি, তাহলে অন্তত সেই অপ্রাসঙ্গকিতার কথা আসে। জুলাই কি একাত্তরকে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ করেছে? নাকি যারা যারা নিজেদের জুলাইয়ের ‘সোল এজেন্ট’ ভাবেন, তারা করেছে? প্রশ্ন তো তারা তুলছেন, যারা একাত্তরের পরাজিত শক্তি। কিংবা তারা, যারা ওই শক্তির আশীর্বাদপুষ্ট। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বললেই যখন ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ বলে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে, তখন একাত্তর নিয়ে বই প্রকাশ আসলেই ‘অপ্রাসঙ্গিক’ তাদের কাছে, যারা মুক্তিযুদ্ধের প্রাসঙ্গিকতায় গাত্রদাহ অনুভব করেন। আর দিন শেষে বিষয়টা তাই হয়ে দাঁড়ায় ‘মুক্তিযুদ্ধ বনাম অ্যান্টি মুক্তিযুদ্ধ’।
সাংবাদিক শফিকুল আলম তার লেখায় তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’, হুবহু উদ্ধৃতি দিলে ‘A top fascist enabler’ বলেছেন। তৌফিক ইমরোজ খালিদীর যে অবদানের কথা ফেসবুকে সম্পাদক শফিকুল আলম লিখেছেন, সেটাই ব্যবহার করা হলো–উদ্ধৃতি চিহ্ন। বার্তা কক্ষে যেটাকে বলা হয়, ‘কোট-আনকোট’।
এবার সাংবাদিকতা নিয়ে দুটো কথা
বাংলাদেশে এখন যে তরুণরা ডিজিটাল মাধ্যমে সাংবাদিকতা করছেন, তাদের যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তারা জানেন বাংলাদেশে এই ধারাটির সূচনা কোন প্রতিষ্ঠানের হাতে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। ইন্টারনেটে সংবাদ প্রকাশই শুধু নয়; আজকে যে ভিডিও নিয়ে এত রমরমা–নিউজে ভিডিও দেওয়ার কাজটাও কিন্তু শুরু তাদের হাতে। এরপর এই জায়গায় অন্য অনেক চর্চা হয়েছে, হচ্ছে। নতুন নতুন অনেক কিছুর নিরীক্ষা হচ্ছে। ব্যবসাসফল হচ্ছে। হয়তো বিডিনিউজ এখন এই জায়গায় ব্যবসাসফল নয়; কিন্তু ভাইরাল মহামারীর মধ্যে এখনো গা ভাসায়নি তারা। চায়ও না সেটা। এই শুরুর ক্রেডিটটা বিডিনিউজকে দিতে হবে। ঠিক যেমন দিতে হবে সংবাদ সংস্থা হিসেবে বিডিনিউজ-এর যাত্রা শুরুকে। তেমনি এর খোলনলচে বদলে নতুন ধারায় শুরু হওয়াটাকেও। একটা সময় ছিল, যখন ইত্তেফাক, সংবাদের মতো ব্রডশিট নিউজ পাবলিশাররা সাংবাদিক তৈরি করত। সেখান থেকে কাজ করেই পরে তারা নতুন নতুন সংবাদপত্র তৈরি করেছে।
যে কাজটা পরে করেছে প্রথম আলো, ডেইলি স্টার। করেছে বললে হয়তো ভুল হবে, করছে। পরে একুশে টেলিভিশন নতুন একটা যুগের শুরু করল, একঝাঁক সাংবাদিককে সারা দেশে পরিচিত করাল। তারাই পরে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের নেতৃত্বে বসল।
ডিটিজাল সাংবাদিকতায় এই কাজটি করেছে বিডিনিউজ। বিডিনিউজের বার্তাকক্ষে যারা প্রথম দিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তারা বহু রিপোর্টার আর সহ-সম্পাদককে কাজ শিখিয়েছেন। পরে তারাই নতুন নতুন সংবাদ প্রকাশক প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিয়েছে, দিচ্ছে। সাংবাদিকতার যে মান; অর্থাৎ, খবর প্রকাশের যে ধরন এই প্রতিষ্ঠানগুলো শিখিয়ে বাজারে দক্ষ কর্মী তৈরি করে চলেছে, সেই অবদানকে শুধু উদ্ধৃতি চিহ্নের ব্যবহার দিয়ে বুঝলে হবে না।
বাংলাদেশের প্রথাগত সংবাদ পরিবেশনে ‘সূত্র জানায়’ শব্দ দুটির ব্যবহার যথেচ্ছ। কোন সোর্স থেকে কী খবর পাওয়া যাচ্ছে, সেটা বলার বালাই নেই। ‘সূত্র জানায়’ বলে নিউজ লিখে খালাস। এখনো চলছে সেটা। প্রতিবেদক হিসেবে কাজের সুবাদে অনেক উদাহরণ এখানে তুলে ধরা যায়, তাতে অবশ্য লেখার কলেবর বাড়বে। একটা কথা বলা যায়, একই সোর্স থেকে খবর পেয়ে বিডিনিউজ যেখানে লিখেছে, ‘সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সেখানে বড় একটি পত্রিকায় লেখা হয়েছিল, ‘সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়’। হিসাবটা সহজ। এহেন যখন অবস্থা, বিডিনিউজ প্রায় শুরুর দিকে, অর্থাৎ তৌফিক ইমরোজ খালিদী দায়িত্ব নেওয়ার ঠিক করলেন, ‘সূত্র জানায়’ চলবে না। দরকার হলে খবর প্রকাশ করা হবে না। কিন্তু সূত্রের যথাযথ উল্লেখ এবং সংশ্লিষ্ট বক্তব্য থাকতে হবে। খবরে নিজেদের রিপোর্টারের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রকাশের ধারাটিও সম্ভবত তারাই শুরু করে। পাঠকের কাছে নিজেদের প্রতিমুহূর্তে বিশ্বাসযোগ্য রাখার এই যে কঠিন কাজ, সেটা দুই দশক ধরে বিডিনিউজ করছে। আর বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় এই জায়গায় তৌফিক ইমরোজ খালিদীর অবদান স্বীকার না করে শুধু ‘উদ্ধৃতি’তে সীমাবদ্ধ থাকা যথাযথ মূল্যায়ন নয়।
তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মৃত্যুর পর তারই একসময়ের সহকর্মী সাবির মুস্তাফা বিডিনিউজে বলেছেন, “নিজের কাজে সবসময় ‘উচ্চমান রক্ষা’ করতে চাওয়া এবং ‘আমি অধিকাংশের চেয়ে ভালো’, এমন স্বভাবজাত আত্মবিশ্বাস প্রকাশের কারণে সহকর্মীদের অনেকে তাকে ‘অহঙ্কারী’ হিসেবে দেখতেন।
সাবির মুস্তাফার ভাষ্য, “এই আত্মবিশ্বাসটাকে অনেকে অহঙ্কার হিসেবে দেখত। যারা আসলেই জানে যে, তারা ওনার চেয়ে ভালো না, তারা আসলে তাকে ঈর্ষা করত। তো এই একটা কথা আমি ফেসবুকে দেখছি আজকাল যে, ‘উনি নিজেকে একটু বেশি মনে করতেন’। বেশি মনে করতেন কারণ, তার অ্যাবিলিটি সম্পর্কে তার আত্মবিশ্বাস ছিল। এবং তার একটা স্ট্যান্ডার্ড ছিল।”
বিবিসিতে তার আরেক সাবেক সহকর্মী শাকিল আনোয়ার বলেছেন, “হি ওয়াজ আ ভেরি কম্পিটেন্ট জার্নালিস্ট, অ্যাজ ওয়েল অ্যাজ ভেরি কম্পিটেন্ট। খুবই কনফিডেন্ট। সে যা করত বা যা বুঝত, সে সম্পর্কে তার পুরো কনফিডেন্স আমি দেখেছি। ...যেহেতু হি ওয়াজ ভেরি কনফিডেন্ট, কনফিডেন্ট অ্যাবাউট হোয়াট হি ইজ ডুইং। এবং এক ধরনের ওই যে যেটা বলে আরকি, যে ‘অন্য কেউ কিছু জানে না, আমি জানি ভালো। এবং আমি যেটা জানি, সেটা সবচেয়ে ভালো।’ সেই কারণে অনেকের সাথে মাঝেমধ্যে ফ্রিকশন হতো।”
এই জায়গায় একটা কথা বলতে হয়, সাংবাদিকতায় এই কনফিডেন্ট আসে যদি কারও লাইফস্টাইল হয় সাংবাদিকতা। মানে চাকরি হিসেবে নয়, নিজের জীবনটাকে সাংবাদিকতায় সঁপে দিলে এমনটা হয়। দেশের হাতেগোনা কিছু সাংবাদিক এমন আছেন বা ছিলেন, যাদের একজন তৌফিক ইমরোজ খালিদী।
লেখক: জ্যেষ্ঠ যুগ্ম বার্তা সম্পাদক, চরচা