১.
গোগোলের দি ওভারকোট গল্পের আকাকির কথা মনে আছে? বেচারা! গরীব চাকুরে। আদতে খাঁটি নিম্নবর্গ!
পশ্চিমের অমন ক্ষুধার্ত রাক্ষসের মতন লাফিয়ে নামা শীতে আকাকির এক মাত্র সম্বল রোয়া উঠে যাওয়া ঘেয়ো কুকুরের গায়ের মতন ছাল-চামড়া ওঠা জীর্ণ এক ওভারকোট।
ফাটা-ফুটা সারাই করতে-করতে আরেকবার সেলাই করার মতন আর সুতোর জোরও অবশিষ্ট রইল না সেই শীতবস্ত্রের।
আকাকি এবং তার ওভারকোট—তারা যেন একে অপরের জীবনের প্রতিচ্ছবি।
আকাকির জীবনও ছাল ওঠা ঘেয়ো কুকুরের চেয়ে বেশি কিছু নয়। আদর-কদর-ভালোবাসা বলতে তার জীবনে নেই। বেঁচে আছে বলে শ্বাস নেয়। বেঁচে আছে বলেই বাঁচার ভার বইতে গিয়ে কলমপেশা কেরানির কাজ বিনা অভিযোগে করে যেতে হয়।
কিন্তু সে যে বেঁচে আছে, তার কোনো ছাপ সহকর্মীদের দেখে বোঝা যায় না। নিত্য উহ্য আর চির অদেখা থাকাই তার সামাজিক নিয়তি।
সেই আকাকিই একদিন খুব তাজ্জব বনে গেল তার প্রতি নিজের সহকর্মীদের বড় আদরনীয় আচরণ দেখে। অফিসের লোকেরা সেদিন তাকে কত ডাকল, খাতির যত্ন করল!
কী অভাবনীয় ব্যাপার!
ব্যাপার যতই অভাবনীয় লাগুক, আকাকি ঠিকই খাতির যত্নের কারণ খুঁজে বের করে ফেলল।
কী সেই কারণ?
আসন্ন শীতে যদি ভালো একটা ওভারকোট না থাকে, তাহলে আকাকি অফিসে যাতায়াত করবে কীভাবে? অফিসে যেতে না পারলে বাঁচতে হলে যে, ‘ফেল কড়ি মাখো তেল’ বন্দোবস্ত, সেই বন্দোবস্তে গরিব চাকুরে আকাকি খাবে কী? চলবে কী করে?
অত শত ভেবেই বহু কষ্টে নিজের সর্বোচ্চ কষ্ট সয়ে তিল-তিল করে একেবারে টাকা-আনা-পাই সব জমিয়ে সে কিছু অর্থ সঞ্চয় করলো ওভারকোট কিনবে বলে।
কেননা, তার পুরনো ওভারকোট আর সারাইয়ের কায়দা নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে দর্জিখানার লোক। তাই, বাধ্য হয়ে কিনতে হলো নতুন ওভারকোট।
তো অফিসে সেই যে এক দিনের খুব খাতির-যত্ন, এর পেছনে মূলত ছিল নয়া ওভারকোট।
বস্তিবাসী বা গ্রামবাসী সাধারণ নিম্নবর্গের মানুষেরা যেমন মেয়ের বিয়ে কি ছেলের মুসলমানির জন্য ঘরের বাঁশের পালায় ফুটো করে টাকা জমায়, তেমনই ছিল আকাকির দশা।
জমানো টাকায় সে যে ওভারকোটটা কেনে তা দেখতেও ছিল জম্পেশ! ফলে, আকাকি বুঝতে পারল, সহকর্মীদের এই হঠাৎ মনোযোগ আসলে ব্যক্তি-মানুষ হিসেবে আকাকির জন্য নয়। সকল প্রশংসা ও মনোযোগ আদতে তার সুন্দর শীতবস্ত্রের।
কথায় আছে, অভাগা যেদিকে যায়, সাগরও শুকিয়ে যায়।
আকাকির কপালেও সুখ সইল না। ওই পয়লা দিনই রাস্তায় তার ওভারকোটটাকে ছিনিয়ে নিল এক দুষ্কৃতি।
বেচারা আকাকি! কতই-না চেষ্টা করল সহকর্মীদের কাছ থেকে একটু সাহায্য পেতে। কিন্তু পাপোশতুল্য গরিব আকাকিকে কে আর পোছে! কে শোনে তার ফরিয়াদ! কে বাড়ায় সাহায্যের হাত!
কেউ না। কেউ না।
২.
রাজধানীর নানান ফুটপাথ সম্প্রতি খালি করা হয়েছে। ফুটপাথ ঘেঁষা দেয়ালগুলোও সাজানো হয়েছে রঙে। এই নিয়ে নগুরে মধ্যবিত্তের খুশির অন্ত নাই। বাহবার তুবড়ি ছুটছে বাতাসে।
বাহ হয়েছে। বেশ হয়েছে। হাঁটা যাচ্ছে আরামসে।
আহা! দেয়ালগুলো কী সুন্দর হলো! রাঙা দেয়ালেতে আঁকা মনীষীদের মুখ দেখে নয়নসুখ হলো কত! আহা! দেখনদারীর গরিবি দূর হলো!
বটে! কথা সত্য বটে।
রাঙা দেয়ালের ওইপারে জীর্ণ-শীর্ণ আকাকি অথবা ছাল ওঠা ঘেয়ো কুকুরের মতো জীবন কাটায় যত গরিব-ছোটোলোক-নিম্নবর্ণের দল— ওদের বিতাড়িত করা গেল বটে।
রাজধানী হবে ইন্দ্রপ্রস্থের মতন ঝকমকা। এখানে প্রকাশ্যে গরিবেরা বড় বেমানান।
অতএব, গরিব-নিম্নবর্গের ক্ষুধার চেয়েও রাজধানীতে মধ্যবিত্তের ফাঁকা ফুটপাথ অধিক জরুরি দরকার।
গরিবেরা বাঁচবে প্যারাসাইট সিনেমার গরিব পরিবারের সদস্যদের মতন। খালি কায়দা করবে এবং আরও কায়দা করার ফন্দি খুঁজবে। তাদের বাঁচা, তাদের মরা— সবই হবে ধনী আর মধ্যবিত্তকে সেবা দেওয়ার নিমিত্তে।
তারা বাঁচবে কিন্তু দৃশ্যমান হবে না।
তারা বাঁচবে কিন্তু তাদের বাঁচার কোনো দাবি থাকবে না।
তারা বাঁচবে কিন্তু নিজের জীবনের হিস্যা তারা পাবে না কোনো দিন।
কেননা, গণতন্ত্রের কেতাবি সংজ্ঞা আর কার্যকরী বাস্তবতা এক নয়। গণতন্ত্রে শুধু ভোটের সময়ই মাথা গুনে গণতন্ত্রের চর্চা হয়। কিন্তু রাষ্ট্রের সুবিধাদী দেওয়ার বা আদায়ের বেলায় সবার আগে বুক চেতিয়ে দাঁড়ায় ধনী ও মধ্যবিত্তের দল।
আর নিম্নবর্গেরা হলো কাজী নজরুলের মানুষ কবিতার পঙক্তির মতন:
জীর্ণ-বস্ত্র শীর্ণ-গাত্র, ক্ষুধায় কন্ঠ ক্ষীণ
ডাকিল পান্থ, ‘দ্বার খোলো বাবা, খাইনিকো সাত দিন!’
সহসা বন্ধ হলো মন্দির, ভুখারী ফিরিয়া চলে,
তিমির রাত্রি, পথ জুড়ে তার ক্ষুধার মানিক জ্বলে!
৩.
শহরের ফুটপাথগুলো থেকে দুইদিন পরপর উচ্ছেদ অভিযান হয়। কিন্তু উচ্ছেদ হওয়াদের রুটি-রুজির জায়গাটা কেড়ে নেওয়ার পর তাদের জন্য বিকল্প বন্দোবস্ত আর হয় না।
দেয়ালে রবীন্দ্রনাথ থাকবেন না কি ওই হিঁদুর ব্যাটা ব্রাহ্মকে ঝেঁটিয়ে বিদেয় করে প্রকৃত দেশপ্রেম প্রতিষ্ঠা করা হবে— সেই আলাপে দ্বিধাবিভক্ত সমাজ। আহা! সাধু! সাধু!
আর বিভাজনের ফোঁকর দিয়ে পতনোন্মুখ পাথরখণ্ডের মতন গরিবেরা ক্রমশ আরো গরিবির দিকে সিস্টেম নির্ধারিত নিয়তির মতন গড়িয়ে নামছে। তিন বেলা তিন মুঠো খাওয়া থেকে দুই বেলা দুই মুঠো খাবার জোগাড়ে ঘণীভূত হচ্ছে তাদের অস্তিত্বে লড়াই।
গরিবদের কোনো করপোরেট মিডিয়া নেই। তাই, রাঙানো দেওয়ালের দৃষ্টিনন্দন ছবির পাশে শুকনো মুখের চিন্তাক্লিষ্ট পিতার ভাঁজ পড়া কপালের ছবি সমান গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয় না।
ধনীদের মিডিয়া জানে কী করে সংবাদের শিরোনামের আড়ালে এজেন্ডা সেট করতে হয়। কীভাবে বড় লাল ফন্টের ৫ বা ৮ কলামের বিরাট শিরোনাম দিয়ে যে কোনো ইস্যুকে বানিয়ে তুলতে হয় নাগরিকদের চায়ের কাপে ঝড় তোলার প্রসঙ্গ।
আবার মিডিয়া এটাও জানে যে পত্রিকার দ্বিতীয় পাতায় অষ্টম কলামে ছবিবিহীন ১ কলাম ৩ ইঞ্চির ক্ষুদ্র সংবাদ দিয়ে বড় প্রসঙ্গকেও লুকিয়ে ফেলতে হয় জনতার চোখের সামনে থেকে।
চোখের আড়াল তো মনের আড়াল— এতো বহু পুরনো কথা।
আকাকিদের জীবন-মরণের সংগ্রাম যেহেতু মিডিয়ায় নেই, ফলে দুশ্চিন্তাও নেই।
রাষ্ট্রের কর্তারাও ভাবেন, যাক, বাবা! এই সব মধ্যবিত্ত পকেটে আছে তো আর আপাতত জলঘোলা করার কেউ নেই। গরিবেরা পথে নামলে পুলিশ নামিয়ে পিটিয়ে আন্দোলন শিকেয় তুলে দেওয়া যাবে।
গরিবেরা পথ বন্ধ করে ‘বাঁচার মতন বাঁচতে চাই’ শ্লোগান দিলে সংবাদপত্রে শিরোনাম লিখবে: আবারও পথ আটকে বেতনের জন্যে আন্দোলনে নেমেছে পোশাক শ্রমিকেরা।
আর অমনি গরিবদেরকে পিটিয়ে স্বর্গ দেখানোর জন্য লাঠি হাতে পথে নেমে যাবে করিৎকর্মা শিল্প পুলিশ।
অতএব, আকাকিদের মরণই নিয়তি।
গোগোলের গল্পের আকাকিও মরে।
গরিবদের বাঁচা-মরা দুই-ই, সাধারণত, সমান। তাই, কোনোটাইতেই তারা শিরোনাম হয় না।
পিপলী লাইভ সিনেমায় মিডিয়ার এই সব বিড়াল তপস্বার কাহিনী আছে।
গরিবেরা শুধু তখনই শিরোনাম হয়, যখন তারা অস্বাভাবিক কিছু করে। যেমন—যখন রুখে দাঁড়ায়, যখন তারা প্রতিবাদ করে। যখন তারা পথ আটকায়।
গোগোলের আকাকিও মরার পরে ভূত হয়ে ধনী মানুষের পথ আটকাত। পথ আটকে কেড়ে নিত ধনীদের ওভারকোট।
কর্ম হারিয়ে, আয় হারিয়ে ঢাকা শহরের সব আকাকিই কি গ্রামের বাড়ি ফিরে যাবে? সবারই কি আর ফেরার মতন ‘দেশের বাড়ি’ই আছে নাকি?
বেওয়ারিশ কুকুরের মতন ঢাকা শহরের এই সব আকাকিরা তাহলে কোথায় যাবে?
তারাও কি ফুটপাথে বা রাস্তায় সিগারেট ফুঁকতে-ফুঁকতে বা মোবাইলে কথা বলতে-বলতে চলতে থাকা মধ্যবিত্তদের পথ রোধ করে পেটে বা গলায় ছুরি ধরে বলবে, ‘দে শালা! যা আছে, দিয়ে যা! নইলে ফুটা করে দেব’?
লেখক কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক। পেশায় সাংবাদিকতা, যোগাযোগ ও গণমাধ্যম বিষয়ক শিক্ষক।