রাস্তায় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: ফেসবুক
গোটা ভারতের নজর তার দিকে, বিদেশেরও। টানা ১৫ বছর পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায়। তার বিরুদ্ধে প্রচারে ঝড় তুলছে বিজেপি, কংগ্রেস, সিপিআইএম থেকে শুরু করে ছোট-বড় বহু দল। এমনকি, একদা তার বিশ্বস্ত সৈনিকেরা অনেকেই আজ শত্রু শিবিরে নাম লিখিয়ে তার বিরুদ্ধে কুৎসায় মেতেছেন। তবু তিনি একা সামনে থেকে লড়ছেন দূর্গ রক্ষায়। জয়ের হ্যাট্রিক গতবারই হয়েছে, এবারের লড়াইতেও জয় নিশ্চিত–আত্মবিশ্বাসী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এবারের ভোটেও দল নয়, ব্যক্তি মমতাই তৃণমূলের জয়ের চাবিকাঠি। মমতা নিজেই বলছেন, ‘২৯৪ আসনে আমিই প্রার্থী’। চক্কর কাটছেন গোটা রাজ্য।
২৯৪ আসনের পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার ভোট দুই দফায়, ২৩ ও ২৯ এপ্রিল। দেশের আরও চার রাজ্যে ভোট হলেও গোটা ভারত তাকিয়ে আছে পশ্চিমবঙ্গের দিকে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিষয়ে লাগাতার লড়াই চলছে। আদালতে ও রাজপথে উভয় লড়াইতেই নেতৃত্ব দিচ্ছেন তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা। কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে একদিন যে দল তিনি নিজে হাতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেই দলে এখনো মমতাই এক ও অদ্বিতীয় ভরসার নাম। তাই পায়ে হাওয়াই চটি, আর গায়ে সাধারণ শাড়ি চাপিয়ে বিরোধীদের মোকাবিলায় সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে হচ্ছে সত্তরোর্ধ্ব এই নারীকে।
টানা ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ২০১১ সালে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসেন মমতা। তার উত্থানে সিপিআইএম এখন পশ্চিমবঙ্গের সংসদীয় রাজনীতিতে শূণ্যে বিরাজ করছে। কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করেও তাদের শূণ্য-মুক্তি ঘটেনি। বিধানসভা বা জাতীয় সংসদে পশ্চিমবঙ্গ থেকে সিপিআইএমের কোনো সদস্য নেই। এবারও তেমন একটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে না। অথচ, এক সময় তাদেরই ছিল অসীম আধিপত্য।
অন্যদিকে, বিজেপির উত্থান হয়েছে প্রবল বেগে। তারাই এখন পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তি। ২০১৮ সাল থেকেই বাড়তে শুরু করেছিল বিজেপির দাপট। কিন্তু সেখানেও লাগাম টানতে সক্ষম হয়েছেন মমতা। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সর্বশক্তি দিয়ে নেমেছিল বিজেপি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি থেকে শুরু করে বিজেপির সর্বভারতীয় নেতারা দিল্লি থেকে ‘ডেলিপ্যাসেঞ্জারি’ শুরু করেছিলেন। প্রচারে ঝড় তোলার পাশাপাশি বিজেপি নেতারা তৃণমূলে ব্যাপক ভাঙন ধরান। এমনকি, মমতার ডানহাত বলে পরিচিত, সদ্য প্রয়াত মুকুল রায়ও বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। বর্তমান বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীও তখনকার দলবদলু। কিন্তু মমতার নেতৃত্বে আসন ও প্রতিপত্তি দুটিই বাড়ে তৃণমূলের। মানুষ বুঝিয়ে দেয়, “বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়”। ২৯৪ আসনের মধ্যে ‘খেলা হবে’ স্লোগান তুলে ২১৫টি আসনে জয়লাভ করে তৃণমূল। প্রাপ্ত ভোটের হার ৪৮.৪৬। গতবারও মমতা বলেছিলেন, “২৯৪ আসনে আমিই প্রার্থী”। নন্দীগ্রামে তিনি নিজে হেরে গিয়েছিলেন, কিন্তু তাকে সামনে রেখে রাজ্যে জিতেছিল তার দল।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: ফেসবুক
বিজেপি দাবি করেছিল, তারা দু শরও বেশি আসন পাবে। কিন্তু তারা থামে ৭৭-এ। প্রাপ্ত ভোটের হার ৩৭.৯৮। পরে অবশ্য দলবদলের হাত ধরে তৃণমূলের সদস্য সংখ্যা বেড়ে হয় ২১৯ এবং বিজেপির কমে ৬৪। আর সিপিআইএম-কংগ্রেসের সম্মিলিত জোট পায় মাত্র ১০ শতাংশ ভোট। আসন বলতে আইএসএফের একটি। কংগ্রেস ০, সিপিএম ০।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে আরও ভালো হয় তৃণমূলের জমি। রাজ্যের ৪২টি লোকসভা আসনের মধ্যে ২৯টিতেই জেতে তারা। আর বিজেপি ১৮ থেকে কমে হয় ১২। কংগ্রেস ১টি আসন পেলেও সিপিআইএম থেকে যায় শূণ্যে। প্রাপ্ত ভোটের হার তৃণমূলের ৪৬.২০, বিজেপির ৩৯.১০ আর বাম-কংগ্রেস জোট ১১ শতাংশ। এবারও তৃণমূলকে পরাস্ত করতে সবপক্ষই পুরোদমে মাঠে নেমেছে। চলছে প্রচারও। সঙ্গে নির্বাচন কমিশন এবং ভারতের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় সংস্থাকে ব্যবহার করে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলকে হারানোর চক্রান্ত করছে বলে মমতারা সমানে অভিযোগ করে চলেছেন। তবে সিপিআইএম ও কংগ্রেস নেতাদের অভিযোগ, ‘সবই নাটক। দিদি ও মোদির সেটিং (বোঝাপড়া) আছে।’
মোদি থেকে শুরু করে বিজেপি নেতাদের মমতার বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ, বাংলাদেশি অনুপ্রবেশের (পড়ুন মুসলিম অনুপ্রবেশ)। মুসলিমরা নাকি পশ্চিমবঙ্গে সনাতনীদের (বিজেপির ভাষায় হিন্দুদের নতুন নাম) হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গকে নাকি ‘মিনি পাকিস্তান’ বা ‘মিনি বাংলাদেশ’ করার ষড়যন্ত্র চলছে। সাম্প্রদায়িক বিভাজনই বিজেপির মূল অস্ত্র। এ ছাড়া ১৫ বছর শাসনামলের দুর্নীতি, বেকারত্ব থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিষয়কে তারা সামনে নিয়ে আসছেন।
অন্যদিকে, তৃণমূল প্রচারে আনছে, সাধারণ মানুষের কল্যাণে বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচি। যেমন ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এর নামে নারীদের প্রতি মাসে অন্তত দেড় হাজার রুপি ভাতা, বেকারদের ‘যুব সাথী’-র নামে দেড় হাজার রুপির ভাতা, স্কুল পড়ুয়াদের জন্য ‘কন্যাশ্রী’, প্রবীণদের জন্য ‘বার্ধক্য ভাতা’ প্রভৃতি। সেইসঙ্গে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি তৃণমূলের মূল স্লোগান।
পতাকা হাতে মমতার অপেক্ষায় নেতা-কর্মীরা। ছবি: ফেসবুক
আলাদা লড়লেও কংগ্রেস ও সিপিআইএমের প্রচারে মূল সুর, তৃণমূল ও বিজেপির বিরোধিতা। তাদের অভিযোগ, ‘যাহাই বিজেপি, তাহাই তৃণমূল। একই বৃন্তে দুই ফুল’! কটাক্ষ করে ‘বিজেমূল’-ও বলছেন কেউ কেউ। ঘটনাচক্রে বিজেপির প্রতীক পদ্ম আর তৃণমূলের ঘাস ফুল। গোটা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে চলছে ভোটের প্রচার। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীন থেকে শুরু করে গোটা দেশ থেকে উড়ে আসছেন বিজেপির তারকা প্রচারকেরা। সিপিআইএম ও কংগ্রেস অবশ্য এখনও রাজ্যনেতাদের ওপরই ভরসা রেখেছে। আর তৃণমূল মমতায়। অবশ্য মমতা ছাড়াও তার ভাইপো, দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও প্রচারে ঝড় তুলছেন। রয়েছেন অন্যরাও।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে মুসলিম ভোট চিরকালই নির্ণায়ক শক্তি। প্রায় ৩৫ শতাংশ মুসলিম ভোট রয়েছে রাজ্যে। তৃণমূল গত ১৫ বছর ধরে এই ভোটের সিংহভাগ একাই পেয়ে আসছে। এবার তাই সেই ভোট ভাঙার চেষ্টাও শুরু হয়েছে। কংগ্রেস, সিপিআইএম ছাড়াও আগে থেকেই ময়দানে রয়েছে বিধায়ক নওশদ সিদ্দিকির আইএসএফ, সংসদ সদস্য আসাউদ্দিন ওয়াইসির মিম। ভোটের আগে দলছুট তৃণমূল বিধায়ক হুমায়ুন কবির আম জনতা উন্নয়ন পার্টি গঠন করে নির্বাচনে প্রার্থী দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, মুসলিমদের আকৃষ্ট করতে মুর্শিদাবাদে বাবরি মসজিদের আদলে বিশাল মসজিদও বানাচ্ছেন তিনি। তাই মুসলিম ভোট ভাগ নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে। অভিযোগ, বিজেপিই নাকি মুসলিম ভোট ভাগাভাগির জন্য ছোট ছোট দলকে মদদ জোগাচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের ভোটে বাংলাদেশ থেকে শরণার্থী হয়ে আসা হিন্দু মতুয়াদের ভোটও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তাদের অনেকেই এখনো নাগরিকত্ব পাননি। বিজেপি নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএর মাধ্যমে তাদের নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি পালিত হয়নি। তাই বিজেপি বিরোধী ক্ষোভও রয়েছে মতুয়া সমাজে। মতুয়া ভোটে বিজেপির আধিপত্য এবার কমতে পারে।
যাইহোক, পশ্চিমবঙ্গে নিশ্চিত তৃণমূল। আত্মবিশ্বাসীও। তাদের ভরসার নাম মমতা। অতীতেও তিনিই হাল ধরেছেন বহু কঠিন পরীক্ষায়। তৃণমূলীদের বিশ্বাস, এবারও তিনিই পার করবে ভোট বৈতরণী।
২০২৪ সালের আগস্টে কলকাতার আকাশেও অভ্যুত্থানে মেঘ দেখা দিয়েছিল। সে বছর ৯ আগস্ট কলকাতার আরজি কর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভেতরেই এক নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ করে খুন করা হয়। অভিযোগ ওঠে শাসক দলের বিরুদ্ধে। গোটা পশ্চিমবঙ্গে ক্ষোভে ফেটে পড়েন। ১৪ আগস্ট, রাত দখলে রাস্তায় নামেন লাখো নারী। মানুষের ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে, মমতাকেও ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু সর্বক্ষণের রাজনৈতিক নেত্রী এবং জনগণের পাশে থাকা মমতা সেদিনও বিরোধীদের সমস্ত কৌশলকে হেলায় পরাস্ত করেছিলেন। গুলি না চালিয়েই দাবিয়ে রেখেছিলেন জনরোষ। সেই জনরোষই এখন তার দিকে জনসমর্থন হয়ে ফিরে এসেছে। এমনকি, সেদিন নিহতের মা এবার বিজেপির হয়ে প্রার্থী হলেও তার জয় মোটেই নিশ্চিত নয় বলে বিভিন্ন জরিপে বলা হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ৪ মে ভোট গণনার দিন শেষ হাসি হাসবেন মমতাই। তৃণমূলের স্লোগান ‘যতই করো হামলা, জিতবে আবার বাংলা’।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলকাতা (ভারত)
রাস্তায় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: ফেসবুক
গোটা ভারতের নজর তার দিকে, বিদেশেরও। টানা ১৫ বছর পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায়। তার বিরুদ্ধে প্রচারে ঝড় তুলছে বিজেপি, কংগ্রেস, সিপিআইএম থেকে শুরু করে ছোট-বড় বহু দল। এমনকি, একদা তার বিশ্বস্ত সৈনিকেরা অনেকেই আজ শত্রু শিবিরে নাম লিখিয়ে তার বিরুদ্ধে কুৎসায় মেতেছেন। তবু তিনি একা সামনে থেকে লড়ছেন দূর্গ রক্ষায়। জয়ের হ্যাট্রিক গতবারই হয়েছে, এবারের লড়াইতেও জয় নিশ্চিত–আত্মবিশ্বাসী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এবারের ভোটেও দল নয়, ব্যক্তি মমতাই তৃণমূলের জয়ের চাবিকাঠি। মমতা নিজেই বলছেন, ‘২৯৪ আসনে আমিই প্রার্থী’। চক্কর কাটছেন গোটা রাজ্য।
২৯৪ আসনের পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার ভোট দুই দফায়, ২৩ ও ২৯ এপ্রিল। দেশের আরও চার রাজ্যে ভোট হলেও গোটা ভারত তাকিয়ে আছে পশ্চিমবঙ্গের দিকে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিষয়ে লাগাতার লড়াই চলছে। আদালতে ও রাজপথে উভয় লড়াইতেই নেতৃত্ব দিচ্ছেন তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা। কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে একদিন যে দল তিনি নিজে হাতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেই দলে এখনো মমতাই এক ও অদ্বিতীয় ভরসার নাম। তাই পায়ে হাওয়াই চটি, আর গায়ে সাধারণ শাড়ি চাপিয়ে বিরোধীদের মোকাবিলায় সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে হচ্ছে সত্তরোর্ধ্ব এই নারীকে।
টানা ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ২০১১ সালে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসেন মমতা। তার উত্থানে সিপিআইএম এখন পশ্চিমবঙ্গের সংসদীয় রাজনীতিতে শূণ্যে বিরাজ করছে। কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করেও তাদের শূণ্য-মুক্তি ঘটেনি। বিধানসভা বা জাতীয় সংসদে পশ্চিমবঙ্গ থেকে সিপিআইএমের কোনো সদস্য নেই। এবারও তেমন একটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে না। অথচ, এক সময় তাদেরই ছিল অসীম আধিপত্য।
অন্যদিকে, বিজেপির উত্থান হয়েছে প্রবল বেগে। তারাই এখন পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তি। ২০১৮ সাল থেকেই বাড়তে শুরু করেছিল বিজেপির দাপট। কিন্তু সেখানেও লাগাম টানতে সক্ষম হয়েছেন মমতা। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সর্বশক্তি দিয়ে নেমেছিল বিজেপি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি থেকে শুরু করে বিজেপির সর্বভারতীয় নেতারা দিল্লি থেকে ‘ডেলিপ্যাসেঞ্জারি’ শুরু করেছিলেন। প্রচারে ঝড় তোলার পাশাপাশি বিজেপি নেতারা তৃণমূলে ব্যাপক ভাঙন ধরান। এমনকি, মমতার ডানহাত বলে পরিচিত, সদ্য প্রয়াত মুকুল রায়ও বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। বর্তমান বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীও তখনকার দলবদলু। কিন্তু মমতার নেতৃত্বে আসন ও প্রতিপত্তি দুটিই বাড়ে তৃণমূলের। মানুষ বুঝিয়ে দেয়, “বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়”। ২৯৪ আসনের মধ্যে ‘খেলা হবে’ স্লোগান তুলে ২১৫টি আসনে জয়লাভ করে তৃণমূল। প্রাপ্ত ভোটের হার ৪৮.৪৬। গতবারও মমতা বলেছিলেন, “২৯৪ আসনে আমিই প্রার্থী”। নন্দীগ্রামে তিনি নিজে হেরে গিয়েছিলেন, কিন্তু তাকে সামনে রেখে রাজ্যে জিতেছিল তার দল।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: ফেসবুক
বিজেপি দাবি করেছিল, তারা দু শরও বেশি আসন পাবে। কিন্তু তারা থামে ৭৭-এ। প্রাপ্ত ভোটের হার ৩৭.৯৮। পরে অবশ্য দলবদলের হাত ধরে তৃণমূলের সদস্য সংখ্যা বেড়ে হয় ২১৯ এবং বিজেপির কমে ৬৪। আর সিপিআইএম-কংগ্রেসের সম্মিলিত জোট পায় মাত্র ১০ শতাংশ ভোট। আসন বলতে আইএসএফের একটি। কংগ্রেস ০, সিপিএম ০।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে আরও ভালো হয় তৃণমূলের জমি। রাজ্যের ৪২টি লোকসভা আসনের মধ্যে ২৯টিতেই জেতে তারা। আর বিজেপি ১৮ থেকে কমে হয় ১২। কংগ্রেস ১টি আসন পেলেও সিপিআইএম থেকে যায় শূণ্যে। প্রাপ্ত ভোটের হার তৃণমূলের ৪৬.২০, বিজেপির ৩৯.১০ আর বাম-কংগ্রেস জোট ১১ শতাংশ। এবারও তৃণমূলকে পরাস্ত করতে সবপক্ষই পুরোদমে মাঠে নেমেছে। চলছে প্রচারও। সঙ্গে নির্বাচন কমিশন এবং ভারতের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় সংস্থাকে ব্যবহার করে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলকে হারানোর চক্রান্ত করছে বলে মমতারা সমানে অভিযোগ করে চলেছেন। তবে সিপিআইএম ও কংগ্রেস নেতাদের অভিযোগ, ‘সবই নাটক। দিদি ও মোদির সেটিং (বোঝাপড়া) আছে।’
মোদি থেকে শুরু করে বিজেপি নেতাদের মমতার বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ, বাংলাদেশি অনুপ্রবেশের (পড়ুন মুসলিম অনুপ্রবেশ)। মুসলিমরা নাকি পশ্চিমবঙ্গে সনাতনীদের (বিজেপির ভাষায় হিন্দুদের নতুন নাম) হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গকে নাকি ‘মিনি পাকিস্তান’ বা ‘মিনি বাংলাদেশ’ করার ষড়যন্ত্র চলছে। সাম্প্রদায়িক বিভাজনই বিজেপির মূল অস্ত্র। এ ছাড়া ১৫ বছর শাসনামলের দুর্নীতি, বেকারত্ব থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিষয়কে তারা সামনে নিয়ে আসছেন।
অন্যদিকে, তৃণমূল প্রচারে আনছে, সাধারণ মানুষের কল্যাণে বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচি। যেমন ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এর নামে নারীদের প্রতি মাসে অন্তত দেড় হাজার রুপি ভাতা, বেকারদের ‘যুব সাথী’-র নামে দেড় হাজার রুপির ভাতা, স্কুল পড়ুয়াদের জন্য ‘কন্যাশ্রী’, প্রবীণদের জন্য ‘বার্ধক্য ভাতা’ প্রভৃতি। সেইসঙ্গে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি তৃণমূলের মূল স্লোগান।
পতাকা হাতে মমতার অপেক্ষায় নেতা-কর্মীরা। ছবি: ফেসবুক
আলাদা লড়লেও কংগ্রেস ও সিপিআইএমের প্রচারে মূল সুর, তৃণমূল ও বিজেপির বিরোধিতা। তাদের অভিযোগ, ‘যাহাই বিজেপি, তাহাই তৃণমূল। একই বৃন্তে দুই ফুল’! কটাক্ষ করে ‘বিজেমূল’-ও বলছেন কেউ কেউ। ঘটনাচক্রে বিজেপির প্রতীক পদ্ম আর তৃণমূলের ঘাস ফুল। গোটা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে চলছে ভোটের প্রচার। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীন থেকে শুরু করে গোটা দেশ থেকে উড়ে আসছেন বিজেপির তারকা প্রচারকেরা। সিপিআইএম ও কংগ্রেস অবশ্য এখনও রাজ্যনেতাদের ওপরই ভরসা রেখেছে। আর তৃণমূল মমতায়। অবশ্য মমতা ছাড়াও তার ভাইপো, দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও প্রচারে ঝড় তুলছেন। রয়েছেন অন্যরাও।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে মুসলিম ভোট চিরকালই নির্ণায়ক শক্তি। প্রায় ৩৫ শতাংশ মুসলিম ভোট রয়েছে রাজ্যে। তৃণমূল গত ১৫ বছর ধরে এই ভোটের সিংহভাগ একাই পেয়ে আসছে। এবার তাই সেই ভোট ভাঙার চেষ্টাও শুরু হয়েছে। কংগ্রেস, সিপিআইএম ছাড়াও আগে থেকেই ময়দানে রয়েছে বিধায়ক নওশদ সিদ্দিকির আইএসএফ, সংসদ সদস্য আসাউদ্দিন ওয়াইসির মিম। ভোটের আগে দলছুট তৃণমূল বিধায়ক হুমায়ুন কবির আম জনতা উন্নয়ন পার্টি গঠন করে নির্বাচনে প্রার্থী দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, মুসলিমদের আকৃষ্ট করতে মুর্শিদাবাদে বাবরি মসজিদের আদলে বিশাল মসজিদও বানাচ্ছেন তিনি। তাই মুসলিম ভোট ভাগ নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে। অভিযোগ, বিজেপিই নাকি মুসলিম ভোট ভাগাভাগির জন্য ছোট ছোট দলকে মদদ জোগাচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের ভোটে বাংলাদেশ থেকে শরণার্থী হয়ে আসা হিন্দু মতুয়াদের ভোটও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তাদের অনেকেই এখনো নাগরিকত্ব পাননি। বিজেপি নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএর মাধ্যমে তাদের নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি পালিত হয়নি। তাই বিজেপি বিরোধী ক্ষোভও রয়েছে মতুয়া সমাজে। মতুয়া ভোটে বিজেপির আধিপত্য এবার কমতে পারে।
যাইহোক, পশ্চিমবঙ্গে নিশ্চিত তৃণমূল। আত্মবিশ্বাসীও। তাদের ভরসার নাম মমতা। অতীতেও তিনিই হাল ধরেছেন বহু কঠিন পরীক্ষায়। তৃণমূলীদের বিশ্বাস, এবারও তিনিই পার করবে ভোট বৈতরণী।
২০২৪ সালের আগস্টে কলকাতার আকাশেও অভ্যুত্থানে মেঘ দেখা দিয়েছিল। সে বছর ৯ আগস্ট কলকাতার আরজি কর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভেতরেই এক নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ করে খুন করা হয়। অভিযোগ ওঠে শাসক দলের বিরুদ্ধে। গোটা পশ্চিমবঙ্গে ক্ষোভে ফেটে পড়েন। ১৪ আগস্ট, রাত দখলে রাস্তায় নামেন লাখো নারী। মানুষের ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে, মমতাকেও ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু সর্বক্ষণের রাজনৈতিক নেত্রী এবং জনগণের পাশে থাকা মমতা সেদিনও বিরোধীদের সমস্ত কৌশলকে হেলায় পরাস্ত করেছিলেন। গুলি না চালিয়েই দাবিয়ে রেখেছিলেন জনরোষ। সেই জনরোষই এখন তার দিকে জনসমর্থন হয়ে ফিরে এসেছে। এমনকি, সেদিন নিহতের মা এবার বিজেপির হয়ে প্রার্থী হলেও তার জয় মোটেই নিশ্চিত নয় বলে বিভিন্ন জরিপে বলা হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ৪ মে ভোট গণনার দিন শেষ হাসি হাসবেন মমতাই। তৃণমূলের স্লোগান ‘যতই করো হামলা, জিতবে আবার বাংলা’।