৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ফ্লাইদুবাই ফ্লাইট এফজেড-১০৭৩। দুবাই থেকে ইসরায়েলের রাজধানী তেল আবিবের পথে ওমানি কো-পাইলট হামাম আল-হামামি ককপিটে রাখা ছোট কুঠার দিয়ে ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারের মাথায় আঘাত করেন, ইঞ্জিন বন্ধ করে বিমানটিকে ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে আছড়ে ফেলতে চেয়েছিলেন। বিমানটি ৩৪ হাজার ফুট থেকে হঠাৎ ১৭ হাজার ফুট নিচে নেমে যায়, ক্যাপ্টেন রক্তাক্ত অবস্থায় দরজা খুলে দিলে যাত্রীরা হামামিকে আটক করেন।
তদন্তে বেরিয়েছে, ওমান এয়ার আগেই উগ্র মতাদর্শের সন্দেহে তাকে বিমান ওড়ানো থেকে সরিয়েছিল। তিনি নিজেই বলেছেন, কোন এয়ারলাইন ইসরায়েলে যায় তা দেখে তিনি ফ্লাইদুবাইতে চাকরি নিয়েছিলেন। একজন ব্যক্তির এই পরিকল্পিত উগ্রতা শুধু ১৭৪ জন যাত্রীর প্রাণ নয়, বিশ্বের কোটি মুসলিম ভ্রমণকারীর জন্যও নতুন করে সন্দেহের দেয়াল তুলে দিল। সংযুক্ত আরব আমিরাত একে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সন্ত্রাসী হামলার চেষ্টা’ ঘোষণা করেছে।
এই কড়াকড়ি আজকের নয়, শুরু হয়েছিল ষাটের দশকের শেষে। ১৯৬৮ সালে ইসরায়েলি বিমান সংস্থার একটি বিমান ভূমধ্যসাগরের ওপর থেকে ছিনতাই করে আলজেরিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। এর পরই ইসরায়েল প্রথম কড়া বিমানবন্দর নিরাপত্তা চালু করে। ১৯৬৯ সালে ফিলিস্তিনি নেত্রী লায়লা খালেদ যুক্তরাষ্ট্রের একটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে সিরিয়ার দামেস্কে নিয়ে যান। ১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বরে জর্ডানের মরুভূমির একটি পরিত্যক্ত বিমানঘাঁটিতে একই দিনে চারটি আন্তর্জাতিক বিমান ছিনতাই করে নামানো হয়। এই ঘটনাগুলোর পরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আকাশে সশস্ত্র প্রহরী দেন এবং দেশটির বেসামরিক বিমান কর্তৃপক্ষ প্রথমবারের মতো সব যাত্রীর জন্য ধাতব বস্তু শনাক্তকারী আর্চওয়েতে তল্লাশি বাধ্যতামূলক করে। আজ আপনি জুতা, বেল্ট, ঘড়ি খুলে যে আর্চওয়েতে দাঁড়ান, তার প্রথম ইটটি গাঁথা হয়েছিল ওই ছিনতাইয়ের যুগেই।
সেই ধারা চূড়ান্ত রূপ নেয় ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। আল-কায়েদার ১৯ জন ছিনতাইকারী চারটি বেসামরিক বিমানকে ক্ষেপণাস্ত্র বানিয়ে নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার ও পেন্টাগনে আঘাত করে প্রায় তিন হাজার মানুষ হত্যা করে। এই ঘটনার পরই বিশ্বের বিমান চলাচলের চিত্র পুরো বদলে যায়। ককপিটের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ও গুলিরোধী করা বাধ্যতামূলক হলো, তরল, লাইটার, এমনকি পানির বোতলও হাতব্যাগে নিষিদ্ধ হলো।
আরেকটি নিয়ম হলো, যাত্রী বিমানে না উঠলে তার বুক করা ব্যাগও বিমান থেকে নামিয়ে ফেলা হবে, যাতে কেউ ব্যাগে বোমা রেখে নিজে নেমে না যায়। এই বাড়তি নিরাপত্তার জন্য যে শত শত বিলিয়ন ডলার খরচ হয়, তা শেষ পর্যন্ত প্রতিটি টিকিটের দামে, প্রতিটি পণ্যের দামে যোগ হচ্ছে।
এই নিরাপত্তার মূল্য সবচেয়ে বেশি দিচ্ছে সাধারণ মুসলমান। নামে মোহাম্মদ, আহমেদ, ইসলাম থাকলেই ইউরোপ-আমেরিকার ভিসা প্রক্রিয়ায় বাড়তি জেরা, পাসপোর্টে পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের সিল থাকলে ভিসা দিতে অনীহা-এখন প্রকাশ্য সত্য। বলিউড তারকা শাহরুখ খানকে লস অ্যাঞ্জেলেসে তিন ঘণ্টা আটকে রাখা, ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি বিজ্ঞানী এ পি জে আবদুল কালামকে নিউইয়র্কে তল্লাশি করা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি নাম ও চেহারা দেখে আলাদা করে সন্দেহ করার সংস্কৃতির ফল।
ফ্লাইদুবাই ঘটনার পর ইসরায়েল ঘোষণা দিয়েছে, ইসরায়েলে যাতায়াতকারী সব এয়ারলাইনের কর্মীদের নতুন করে যাচাই করা হবে এবং যে দেশ ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়নি, সেই দেশের নাগরিককে পাইলট হিসেবে রাখা যাবে কি না তা পুনর্বিবেচনা করা হবে।
এই সন্দেহ শুধু বিমানবন্দরে নয়, ইউরোপের রাস্তায়ও নামছে। ফ্রান্সে হিজাব, বোরকা নিয়ে আইনি নিষেধাজ্ঞা, ডেনমার্ক ও বেলজিয়ামে স্কুলে ধর্মীয় পোশাক নিয়ে বিরোধ। অন্য কোনো ধর্মের পোশাক নিয়ে এত তীব্র বিতর্ক নেই। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কিছু উগ্র ব্যক্তির প্রতিশোধমূলক হামলা-ফ্রান্সে ক্লাসে মতপ্রকাশের কারণে শিক্ষক হত্যা, অস্ট্রিয়া ও লন্ডনে ছুরিকাঘাত, জনতার ওপর গাড়ি তুলে দেওয়া। সংখ্যায় এরা মুষ্টিমেয়, কিন্তু একটি ঘটনাই পুরো সম্প্রদায়ের ভাবমূর্তি কয়েক বছরের জন্য পিছিয়ে দেয়। ফলে যে শহরে একসময় বহুসংস্কৃতি উদযাপিত হতো, সেখানে এখন হিজাব পরা মেয়েরা গণপরিবহনে হেনস্তার শিকার হচ্ছেন।
এই দ্বিমুখী চিত্রটাই এখন বাস্তবতা। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর ইউরোপে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক অপরাধ তিনগুণ বেড়েছে বলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানবাধিকার সংস্থা জানিয়েছে। ব্রিটেনে হিজাব পরা নারীদের ওপর হামলার ৬০ শতাংশ ঘটেছে বাস ও ট্রেনে। অন্যদিকে একই ইউরোপে হালাল খাবার, শালীন পোশাক, ইসলামী ব্যাংকিং-তিনটিই সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল বাজার। অর্থাৎ বাজার মুসলমানকে ক্রেতা হিসেবে চায়, কিন্তু সমাজ তাকে প্রতিবেশী হিসেবে সন্দেহ করে। এই ফাঁকটি ততদিন থাকবে, যতদিন না মূলধারার মুসলিম সমাজ নিজের ভেতরের উগ্রতাকে, “আমাদের ছেলে ভুল করেছে” বলে আড়াল না করে, প্রকাশ্যে, “এটি অপরাধ, এটি ইসলামের শিক্ষা নয়” বলে। ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে বড় মুসলিম সংগঠন যেমন খিলাফতবাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অবস্থান নিয়েছিল, তেমন স্পষ্ট অবস্থান দরকার।
শেষ বিচারে কোনো সম্প্রদায় দেয়াল তুলে টিকে থাকতে পারে না। লায়লা খালেদ একসময় আরব বিশ্বে নায়িকা ছিলেন, আজ বিশ্বের কোনো বিমানবন্দর তার নাম শুনলে সতর্ক হয়ে যায়। হামাম আল-হামামির স্বপ্ন ছিল বেন গুরিয়নে আছড়ে পড়ে শহীদ হওয়া, বাস্তবে সে আছড়ে পড়েছে আবুধাবির জেলে, আর তার ধাক্কা লেগেছে ঢাকার হজযাত্রী থেকে শুরু করে লন্ডনে শিক্ষার্থীর বোর্ডিং পাসে। আকাশে আগুন লাগিয়ে কোনো জাতি মুক্তি পায়নি, মুক্তি পেয়েছে আকাশকে সবার জন্য নিরাপদ রেখে। সেই সহজ সত্যটি না বুঝলে, মুসলমানরা অন্যের ষড়যন্ত্রে নয়, নিজেদের কিছু সন্তানের অন্ধ আবেগের কারণেই একদিন সত্যিই বাকি পৃথিবী থেকে আলাদা হয়ে যাবে। আর সেদিন আফসোস করার জন্য কোনো বিমানবন্দর খোলা থাকবে না।
লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।