সলিল ত্রিপাঠী

পুরস্কারপ্রাপ্ত ভারতীয় পরিবেশ ও শিক্ষা কর্মী সোনম ওয়াংচুককে গত ১৮ জুলাই তার অনশন ধর্মঘটের ২০তম দিনে পুলিশের মাধ্যমে দিল্লির একটি সরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। মে মাসে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার পর সরকারের কাছ থেকে জবাবদিহিতা চাওয়ার লক্ষ্যে শুরু হওয়া তার এই অনশন, মূলত ভারতের চরম প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষা ব্যবস্থা এবং ক্রমবর্ধমান বেকারত্বে অতিষ্ঠ তরুণ সমাজের শুরু করা নতুন আন্দোলনকে সমর্থন জোগাচ্ছে। হাসপাতালের দৃশ্যটি খুবই পরিচিত ছিল: ইউনিফর্ম পরা কয়েকজন ব্যক্তি পরিবৃত্ত করে রেখেছেন একজন শারীরিকভাবে দুর্বল মানুষকে; যেখানে সরকার দাবি করছে যে তারা চিকিৎসার উদ্বেগের কারণে এই পদক্ষেপ নিয়েছে। অন্যদিকে তার পরিবার জোর দিয়ে বলছে যে সরকারের এই ধরনের হস্তক্ষেপের কোনো অধিকার নেই। পরবর্তীতে দিল্লির হাইকোর্ট ওয়াংচুককে একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করার অনুমতি দিয়েছে এবং তার অবস্থা বর্তমানে স্থিতিশীল। ভারত অতীতেও বহুবার এই ধরনের পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করেছে, কারণ অনশন রাজনৈতিক প্রতিবাদ পদ্ধতির অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী একটি পথ।
৫৯ বছর বয়সী ওয়াংচুক মূলত একজন প্রকৌশলী ও শিক্ষাসংস্কারক, যিনি হিমালয়ে জল সংরক্ষণের কাজের জন্য পরিচিত। গত ২৮ জুন দিল্লির যন্তর মন্তরে তিনি অনশন শুরু করেন। কারণ প্রায় ২২ লাখ হবু ডাক্তারের বসা মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষাটি প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দুবার নিতে হয়েছিল। এই কেলেঙ্কারি সারা দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক হতাশা ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে, যার পর একের পর এক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর সামনে আসতে শুরু করে। এই অপূরণীয় শোক ও ক্ষোভ থেকেই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে এক আন্দোলনের জন্ম হয়। আন্দোলনটি মূলত অনলাইনে একটি ব্যঙ্গাত্মক রূপ নিয়ে শুরু হয়েছিল, যার নামকরণ করা হয়েছিল ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির একটি বিতর্কিত বক্তব্যের পর, যেখানে তিনি বেকার তরুণদের ‘পরজীবী’ ও ‘তেলাপোকা’ বা ককরোচ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তবে পরীক্ষার স্বচ্ছতার ওপর জোর দেওয়া এই প্রতিবাদ আন্দোলন দ্রুত তরুণদের মনে সাড়া ফেলে, যারা কর্মসংস্থানের অভাবের মুখে দাঁড়িয়ে একমাত্র শিক্ষার মাধ্যমেই সফলতার শীর্ষে ওঠার স্বপ্ন দেখে। যদি সেই শিক্ষাব্যবস্থাই জালিয়াতির শিকার হয়, তবে তরুণেরা কোথায় যাবে?
ককরোচ জনতা পার্টি অনশন ও প্রতিবাদের জন্য দীর্ঘদিনের কেন্দ্রবিন্দু দিল্লির যন্তর মন্তরকেই বেছে নেয় এবং দেখায় যে এটি ভারতের বৈধ প্রতিবাদের ঐতিহ্যের অংশ। গত সোমবার, পার্লামেন্টের অধিবেশনের প্রথম দিনে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী যখন সংসদ ভবনের দিকে মিছিল করে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের ওপর টিয়ার গ্যাস ও লাঠিচার্জ করা হয়। জ্যেষ্ঠ এক মন্ত্রীর সাথে সরকারের একক আলোচনা কোনো কার্যকর সমাধান আনেনি। ফলে ওয়াংচুকের অনশনের প্রতি সংহতি জানিয়ে অনেক শিক্ষার্থীও এতে যোগ দিয়েছেন। পরবর্তীতে বিক্ষোভকারীরা জানিয়েছেন যে তারা যন্তর মন্তরে নিজেদের প্রতিবাদ চালিয়ে যাবেন, তবে পুনরায় মিছিলে অংশ নেবেন না; অন্যদিক বিরোধী দলীয় নেতারা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাসভবনের বাইরে ধর্না শুরু করেছেন।

ওয়াংচুক তরুণদের ক্ষোভ বুঝতে পেরে অনশন শুরু করেন এবং আন্দোলনের মূল অনুঘটকে পরিণত হন। তিনি শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সম্পূর্ণ আমূল সংস্কার দাবি করছেন। পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে ওয়াংচুক অনলাইনে লিখেছিলেন যে ভারতের ইতিহাসে ছোট ছোট আন্দোলনও বড় বড় সরকারকে পতন ঘটিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, কেন বিক্ষোভ বা ধর্মঘট না করে অনশনকে বেছে নেওয়া হলো? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ভারতীয় রাজনৈতিক ইতিহাসের গভীর নৈতিক দর্শনে, যেখানে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অহিংসার মূল নীতি হলো নিজের ওপর কষ্ট সহ্য করা। মহাত্মা গান্ধী রাজনৈতিক অনশনের উদ্ভাবক না হলেও একে একটি জাতীয় প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন এবং তিনি নিজে জীবনে অন্তত ১৭ বার অনশন করেছিলেন। তার লক্ষ্য কেবল ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ছিল না; বেশির ভাগ অনশন ছিল ভারতীয় সমাজকে সচেতন করার উদ্দেশ্যে– যেমন জাতপাত দূর করা, হিন্দু-মুসলিম সংঘাত বন্ধ করা এবং আত্মশুদ্ধি নিশ্চিত করা।
স্বাধীন ভারতে অনশনের ক্ষমতার সবচেয়ে নাটকীয় উদাহরণ তৈরি করেছিলেন পট্টি শ্রীরামুলু নামে এক কংগ্রেস কর্মী। ১৯৫২ সালে, তিনি তেলুগু ভাষীদের জন্য পৃথক অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের দাবিতে অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু প্রথমে একে গুরুত্ব দেননি, কিন্তু শ্রীরামুলু ৫৮ দিন অনশন করার পর ১৫ ডিসেম্বর মারা যান। তার মৃত্যুর পর মাদ্রাজ প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে এবং বাধ্য হয়ে দুই সপ্তাহের মধ্যে নেহরু অন্ধ্রপ্রদেশ গঠনের ঘোষণা দেন। এই ঘটনাই পরবর্তীতে ১৯৫৬ সালে ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠনের ভিত্তি তৈরি করে। এছাড়া ২০০০ সালে মণিপুরে সেনাসদস্যদের হাতে বেসামরিক লোক নিহত হওয়ার প্রতিবাদে ২৭ বছর বয়সী ইরোম শর্মিলাও দীর্ঘ ১৬ বছর অনশন করেছিলেন, যার মাধ্যমে তিনি সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা আইনের (AFSPA) বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। আন্তর্জাতিক স্তরেও ১৯০৯ সালে স্কটিশ সাফ্রাজেট মারিয়ন ওয়ালেস ডানলপ থেকে শুরু করে ১৯৮১ সালে আয়ারল্যান্ডের ববি স্যান্ডস এবং গুয়ানতানামো বে-র বন্দীরা অনশনকে প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
ভারতে অনশনের রাজনৈতিক প্রভাবের সাম্প্রতিকতম উদাহরণ ২০১১ সালের আন্না হাজারের আন্দোলন। সমন্বিত দুর্নীতিবিরোধী লোকপাল বিলের দাবিতে ৭৩ বছর বয়সী আন্না হাজারে যন্তর মন্তরে ৫ দিনের অনশন করেন, যা পরবর্তীতে তৎকালীন মনমোহন সিং সরকারকে নাগরিক সমাজের সাথে যৌথভাবে বিলের খসড়া তৈরি করতে বাধ্য করেছিল। পরে আন্না হাজারের রামলীলা ময়দানের ১২ দিনের অনশন এবং বিশাল জনসমর্থন ভারতের রাজনীতিতে পরিবর্তন এনেছিল। এটি একদিকে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টির জন্ম দিয়েছিল এবং অন্যদিকে ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার সুযোগ করে দেয়।
এই ঐতিহাসিক পটভূমিতে, ওয়াংচুকের অনশন কেবল একটি কৌশল নয়, বরং তরুণদের শেষ অবলম্বন হিসেবে দেখা দিচ্ছে। ছাত্র বিক্ষোভকারীরা বিগত দুই বছর ধরে ইউজিসি-নেট (UGC-NET) পরীক্ষা বাতিলের পর থেকেই মন্ত্রীর পদত্যাগ এবং পরীক্ষার সংস্কার দাবি করে আসছে। ককরোচ আন্দোলনের মধ্যে যার অভাব ছিল, তা হলো একজন নীতিবান নেতৃত্ব– যা ওয়াংচুক এনে দিয়েছেন। তিনি ইতিমধ্যে ত্যাগের জন্য পরিচিত এবং অনশন আন্দোলনের কৌশলে পারদর্শী। এই অর্থে, ওয়াংচুক ককরোচ আন্দোলনের জন্য সেটাই করছেন যা শ্রীরামুলু অন্ধ্রপ্রদেশের জন্য অথবা আন্না হাজারে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের জন্য করেছিলেন। তিনি এই বিশাল যুব ক্ষোভকে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে এনে দাঁড় করিয়েছেন এবং সরকারের সামনে এমন এক প্রশ্ন তুলে ধরেছেন যা এড়িয়ে যাওয়া কঠিন: সরকার কি তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেবে?
তবে এই পদক্ষেপ কতটা ফলপ্রসূ হবে তা বলা কঠিন। প্রধানমন্ত্রী মোদির সরকার হাসপাতালে স্থানান্তর ছাড়া ওয়াংচুকের অনশন নিয়ে মূলত নীরবতা বজায় রেখেছে। পূর্বে ২০১৮ সালে পরিবেশবিদ জি.ডি. আগরওয়াল (স্বামী সানন্দ) গঙ্গা নদী বাঁচানোর দাবিতে ১১১ দিন অনশন করেছিলেন এবং মোদীকে বারবার চিঠি লিখেও কোনো উত্তর পাননি; হাসপাতালে স্থানান্তরিত করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তিনি মারা যান। মোদী, যিনি ভারতীয় যুবসমাজের প্রশংসা করার সুযোগ মিস করেন না, এই আন্দোলনকেও আপাতত উপেক্ষা করছেন। প্রতিবাদের মুখে নতিস্বীকার করা বা নিজের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা মোদীর রাজনৈতিক দর্শনের বিপরীত। যদিও ভবিষ্যতে কোনো মুখরক্ষাকারী উপায়ে শিক্ষামন্ত্রীকে সরিয়ে অন্য কোনো পদ দেওয়া হতে পারে, তবে আপাতত সরকার নিজের অবস্থানে অনড়।
সরকারের এই নীরবতার পেছনে দুটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা রয়েছে। একটি হলো সাধারণ উদাসীনতা– যেখানে দিল্লি মনে করে অনশন এখন আর রাজনৈতিক বা নির্বাচনী ফলাফলে অত বড় প্রভাব ফেলে না। দ্বিতীয় ও আরো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যাটি হলো নরেন্দ্র মোদির নিজস্ব রাজনৈতিক ভাবমূর্তি। মোদীর ব্র্যান্ড মূলত এক আপসহীন ও শক্তিশালী নেতৃত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তরুণদের এই আন্দোলনের সামনে নতিস্বীকার করা কেবল নীতিগত পরিবর্তন হবে না, বরং এটি মোদির জন্য একটি বড় রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবে গণ্য হবে।
সলিল ত্রিপাঠী: নিউইয়র্ক ভিত্তিক একজন লেখক।
(এই লেখাটি ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনের সৌজন্যে প্রকাশিত হলো।)

পুরস্কারপ্রাপ্ত ভারতীয় পরিবেশ ও শিক্ষা কর্মী সোনম ওয়াংচুককে গত ১৮ জুলাই তার অনশন ধর্মঘটের ২০তম দিনে পুলিশের মাধ্যমে দিল্লির একটি সরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। মে মাসে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার পর সরকারের কাছ থেকে জবাবদিহিতা চাওয়ার লক্ষ্যে শুরু হওয়া তার এই অনশন, মূলত ভারতের চরম প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষা ব্যবস্থা এবং ক্রমবর্ধমান বেকারত্বে অতিষ্ঠ তরুণ সমাজের শুরু করা নতুন আন্দোলনকে সমর্থন জোগাচ্ছে। হাসপাতালের দৃশ্যটি খুবই পরিচিত ছিল: ইউনিফর্ম পরা কয়েকজন ব্যক্তি পরিবৃত্ত করে রেখেছেন একজন শারীরিকভাবে দুর্বল মানুষকে; যেখানে সরকার দাবি করছে যে তারা চিকিৎসার উদ্বেগের কারণে এই পদক্ষেপ নিয়েছে। অন্যদিকে তার পরিবার জোর দিয়ে বলছে যে সরকারের এই ধরনের হস্তক্ষেপের কোনো অধিকার নেই। পরবর্তীতে দিল্লির হাইকোর্ট ওয়াংচুককে একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করার অনুমতি দিয়েছে এবং তার অবস্থা বর্তমানে স্থিতিশীল। ভারত অতীতেও বহুবার এই ধরনের পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করেছে, কারণ অনশন রাজনৈতিক প্রতিবাদ পদ্ধতির অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী একটি পথ।
৫৯ বছর বয়সী ওয়াংচুক মূলত একজন প্রকৌশলী ও শিক্ষাসংস্কারক, যিনি হিমালয়ে জল সংরক্ষণের কাজের জন্য পরিচিত। গত ২৮ জুন দিল্লির যন্তর মন্তরে তিনি অনশন শুরু করেন। কারণ প্রায় ২২ লাখ হবু ডাক্তারের বসা মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষাটি প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দুবার নিতে হয়েছিল। এই কেলেঙ্কারি সারা দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক হতাশা ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে, যার পর একের পর এক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর সামনে আসতে শুরু করে। এই অপূরণীয় শোক ও ক্ষোভ থেকেই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে এক আন্দোলনের জন্ম হয়। আন্দোলনটি মূলত অনলাইনে একটি ব্যঙ্গাত্মক রূপ নিয়ে শুরু হয়েছিল, যার নামকরণ করা হয়েছিল ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির একটি বিতর্কিত বক্তব্যের পর, যেখানে তিনি বেকার তরুণদের ‘পরজীবী’ ও ‘তেলাপোকা’ বা ককরোচ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তবে পরীক্ষার স্বচ্ছতার ওপর জোর দেওয়া এই প্রতিবাদ আন্দোলন দ্রুত তরুণদের মনে সাড়া ফেলে, যারা কর্মসংস্থানের অভাবের মুখে দাঁড়িয়ে একমাত্র শিক্ষার মাধ্যমেই সফলতার শীর্ষে ওঠার স্বপ্ন দেখে। যদি সেই শিক্ষাব্যবস্থাই জালিয়াতির শিকার হয়, তবে তরুণেরা কোথায় যাবে?
ককরোচ জনতা পার্টি অনশন ও প্রতিবাদের জন্য দীর্ঘদিনের কেন্দ্রবিন্দু দিল্লির যন্তর মন্তরকেই বেছে নেয় এবং দেখায় যে এটি ভারতের বৈধ প্রতিবাদের ঐতিহ্যের অংশ। গত সোমবার, পার্লামেন্টের অধিবেশনের প্রথম দিনে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী যখন সংসদ ভবনের দিকে মিছিল করে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের ওপর টিয়ার গ্যাস ও লাঠিচার্জ করা হয়। জ্যেষ্ঠ এক মন্ত্রীর সাথে সরকারের একক আলোচনা কোনো কার্যকর সমাধান আনেনি। ফলে ওয়াংচুকের অনশনের প্রতি সংহতি জানিয়ে অনেক শিক্ষার্থীও এতে যোগ দিয়েছেন। পরবর্তীতে বিক্ষোভকারীরা জানিয়েছেন যে তারা যন্তর মন্তরে নিজেদের প্রতিবাদ চালিয়ে যাবেন, তবে পুনরায় মিছিলে অংশ নেবেন না; অন্যদিক বিরোধী দলীয় নেতারা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাসভবনের বাইরে ধর্না শুরু করেছেন।

ওয়াংচুক তরুণদের ক্ষোভ বুঝতে পেরে অনশন শুরু করেন এবং আন্দোলনের মূল অনুঘটকে পরিণত হন। তিনি শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সম্পূর্ণ আমূল সংস্কার দাবি করছেন। পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে ওয়াংচুক অনলাইনে লিখেছিলেন যে ভারতের ইতিহাসে ছোট ছোট আন্দোলনও বড় বড় সরকারকে পতন ঘটিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, কেন বিক্ষোভ বা ধর্মঘট না করে অনশনকে বেছে নেওয়া হলো? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ভারতীয় রাজনৈতিক ইতিহাসের গভীর নৈতিক দর্শনে, যেখানে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অহিংসার মূল নীতি হলো নিজের ওপর কষ্ট সহ্য করা। মহাত্মা গান্ধী রাজনৈতিক অনশনের উদ্ভাবক না হলেও একে একটি জাতীয় প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন এবং তিনি নিজে জীবনে অন্তত ১৭ বার অনশন করেছিলেন। তার লক্ষ্য কেবল ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ছিল না; বেশির ভাগ অনশন ছিল ভারতীয় সমাজকে সচেতন করার উদ্দেশ্যে– যেমন জাতপাত দূর করা, হিন্দু-মুসলিম সংঘাত বন্ধ করা এবং আত্মশুদ্ধি নিশ্চিত করা।
স্বাধীন ভারতে অনশনের ক্ষমতার সবচেয়ে নাটকীয় উদাহরণ তৈরি করেছিলেন পট্টি শ্রীরামুলু নামে এক কংগ্রেস কর্মী। ১৯৫২ সালে, তিনি তেলুগু ভাষীদের জন্য পৃথক অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের দাবিতে অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু প্রথমে একে গুরুত্ব দেননি, কিন্তু শ্রীরামুলু ৫৮ দিন অনশন করার পর ১৫ ডিসেম্বর মারা যান। তার মৃত্যুর পর মাদ্রাজ প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে এবং বাধ্য হয়ে দুই সপ্তাহের মধ্যে নেহরু অন্ধ্রপ্রদেশ গঠনের ঘোষণা দেন। এই ঘটনাই পরবর্তীতে ১৯৫৬ সালে ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠনের ভিত্তি তৈরি করে। এছাড়া ২০০০ সালে মণিপুরে সেনাসদস্যদের হাতে বেসামরিক লোক নিহত হওয়ার প্রতিবাদে ২৭ বছর বয়সী ইরোম শর্মিলাও দীর্ঘ ১৬ বছর অনশন করেছিলেন, যার মাধ্যমে তিনি সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা আইনের (AFSPA) বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। আন্তর্জাতিক স্তরেও ১৯০৯ সালে স্কটিশ সাফ্রাজেট মারিয়ন ওয়ালেস ডানলপ থেকে শুরু করে ১৯৮১ সালে আয়ারল্যান্ডের ববি স্যান্ডস এবং গুয়ানতানামো বে-র বন্দীরা অনশনকে প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
ভারতে অনশনের রাজনৈতিক প্রভাবের সাম্প্রতিকতম উদাহরণ ২০১১ সালের আন্না হাজারের আন্দোলন। সমন্বিত দুর্নীতিবিরোধী লোকপাল বিলের দাবিতে ৭৩ বছর বয়সী আন্না হাজারে যন্তর মন্তরে ৫ দিনের অনশন করেন, যা পরবর্তীতে তৎকালীন মনমোহন সিং সরকারকে নাগরিক সমাজের সাথে যৌথভাবে বিলের খসড়া তৈরি করতে বাধ্য করেছিল। পরে আন্না হাজারের রামলীলা ময়দানের ১২ দিনের অনশন এবং বিশাল জনসমর্থন ভারতের রাজনীতিতে পরিবর্তন এনেছিল। এটি একদিকে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টির জন্ম দিয়েছিল এবং অন্যদিকে ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার সুযোগ করে দেয়।
এই ঐতিহাসিক পটভূমিতে, ওয়াংচুকের অনশন কেবল একটি কৌশল নয়, বরং তরুণদের শেষ অবলম্বন হিসেবে দেখা দিচ্ছে। ছাত্র বিক্ষোভকারীরা বিগত দুই বছর ধরে ইউজিসি-নেট (UGC-NET) পরীক্ষা বাতিলের পর থেকেই মন্ত্রীর পদত্যাগ এবং পরীক্ষার সংস্কার দাবি করে আসছে। ককরোচ আন্দোলনের মধ্যে যার অভাব ছিল, তা হলো একজন নীতিবান নেতৃত্ব– যা ওয়াংচুক এনে দিয়েছেন। তিনি ইতিমধ্যে ত্যাগের জন্য পরিচিত এবং অনশন আন্দোলনের কৌশলে পারদর্শী। এই অর্থে, ওয়াংচুক ককরোচ আন্দোলনের জন্য সেটাই করছেন যা শ্রীরামুলু অন্ধ্রপ্রদেশের জন্য অথবা আন্না হাজারে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের জন্য করেছিলেন। তিনি এই বিশাল যুব ক্ষোভকে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে এনে দাঁড় করিয়েছেন এবং সরকারের সামনে এমন এক প্রশ্ন তুলে ধরেছেন যা এড়িয়ে যাওয়া কঠিন: সরকার কি তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেবে?
তবে এই পদক্ষেপ কতটা ফলপ্রসূ হবে তা বলা কঠিন। প্রধানমন্ত্রী মোদির সরকার হাসপাতালে স্থানান্তর ছাড়া ওয়াংচুকের অনশন নিয়ে মূলত নীরবতা বজায় রেখেছে। পূর্বে ২০১৮ সালে পরিবেশবিদ জি.ডি. আগরওয়াল (স্বামী সানন্দ) গঙ্গা নদী বাঁচানোর দাবিতে ১১১ দিন অনশন করেছিলেন এবং মোদীকে বারবার চিঠি লিখেও কোনো উত্তর পাননি; হাসপাতালে স্থানান্তরিত করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তিনি মারা যান। মোদী, যিনি ভারতীয় যুবসমাজের প্রশংসা করার সুযোগ মিস করেন না, এই আন্দোলনকেও আপাতত উপেক্ষা করছেন। প্রতিবাদের মুখে নতিস্বীকার করা বা নিজের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা মোদীর রাজনৈতিক দর্শনের বিপরীত। যদিও ভবিষ্যতে কোনো মুখরক্ষাকারী উপায়ে শিক্ষামন্ত্রীকে সরিয়ে অন্য কোনো পদ দেওয়া হতে পারে, তবে আপাতত সরকার নিজের অবস্থানে অনড়।
সরকারের এই নীরবতার পেছনে দুটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা রয়েছে। একটি হলো সাধারণ উদাসীনতা– যেখানে দিল্লি মনে করে অনশন এখন আর রাজনৈতিক বা নির্বাচনী ফলাফলে অত বড় প্রভাব ফেলে না। দ্বিতীয় ও আরো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যাটি হলো নরেন্দ্র মোদির নিজস্ব রাজনৈতিক ভাবমূর্তি। মোদীর ব্র্যান্ড মূলত এক আপসহীন ও শক্তিশালী নেতৃত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তরুণদের এই আন্দোলনের সামনে নতিস্বীকার করা কেবল নীতিগত পরিবর্তন হবে না, বরং এটি মোদির জন্য একটি বড় রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবে গণ্য হবে।
সলিল ত্রিপাঠী: নিউইয়র্ক ভিত্তিক একজন লেখক।
(এই লেখাটি ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনের সৌজন্যে প্রকাশিত হলো।)

আজ যখন সেই রাতের কথা মনে পড়ে, তখন ক্লান্তি, ভয়, রক্ত, মানুষের আর্তনাদ—সবকিছুর মাঝে নিজের দায়িত্ববোধের তৃপ্তিও অনুভব করি। কারণ চিকিৎসকের জীবনে কিছু রাত থাকে, যেগুলোর কোনো ডিউটি রোস্টার থাকে না, কোনো অতিরিক্ত ভাতা থাকে না, কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিও থাকে না।

প্রতিবাদের বিশাল জনসমাগম। আন্দোলনকারীর সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ণয় করা কারো পক্ষেই হয়তো সম্ভব নয়। তবে আয়োজকেরা যে ১৫-২০ হাজার মানুষ আসার আশা করেছিলেন, উপস্থিতি যে তার চেয়ে বহুগুণ বেশি ছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ড্রোন থেকে তোলা ছবি ও দৃশ্যপট নির্দেশ করে যে লক্ষাধিক মানুষ এই প্রতিবাদে যোগ দিয়েছিলেন।