ভূরাজনৈতিক ক্যানভাস-অনেক বিরাট, ব্যাপক ও বিস্তীর্ণ। খণ্ডিত আকারে ভূরাজনৈতিক ঘটনাবলিকে দেখার সুযোগ নেই। প্রায়শূন্য প্রত্যাবাসনের সম্ভবনায় বিশাল জনগোষ্ঠী নিয়ে মহাবিপাকে পড়েছে বাংলাদেশ। ভিনদেশী মানুষ হিসেবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী শরণার্থী বা বাস্তচ্যুত নয়; বরং তারা রাষ্ট্রহীন। শরণার্থী বা বাস্তচ্যুত মানুষের একদিন না একদিন তাদের বাস্তুভিটায় ফেরার স্বপ্ন থাকে। রাষ্ট্রহীনদের কোনো স্বপ্ন থাকে না। পৃথিবীর ইতিহাসে রাষ্ট্রহীন কোনো মানুষের, তার বাস্তুভিটায় ফেরার নজির নেই। বহুবিধ অর্থনৈতিক চাপে থেকেও বাংলাদেশকে প্রতিবছর গড়ে ১২৫ কোটি ডলার রোহিঙ্গাদের জন্য গুনতে হয়–যা বাংলাদেশের জন্য গোদের ওপর বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। উপরন্তু, বছরে প্রায় ২৫ হাজার শিশু জন্ম নেওয়ায়, বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা জনসংখ্যা প্রায় ১৩-১৪ লাখ।
জনতার দলের একটি বিশেষজ্ঞ দল দীর্ঘদিনের গবেষণার মাধ্যমে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের একটি উপায় খুঁজে বের করেছে। গবেষণালব্ধ প্রস্তাবের ক্ষেত্রে–ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে উত্থাপিত শান্তি প্রস্তাব (দ্য ক্লিনটন প্যারামিটার্স) এবং অতিসম্প্রতি সুদান-দক্ষিণ সুদান এবং আরএসএফ (রেপিড সাপোর্ট ফোর্স) এর মধ্যে সম্পাদিত ত্রিপক্ষীয় চুক্তির সারবস্তুকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের ২০০০ সালের ২ ডিসেম্বর ফিলিস্তিন রাষ্ট্রবিষয়ক প্রস্তাব–পি এল ও এবং ইসরায়েল, উভয়পক্ষই প্রায় মেনে নিয়েছিল। পূর্ব জেরুজালেম হবে ভবিষ্যত সার্বভৌম ফিলিস্তিনের রাজধানী এবং পশ্চিম জেরুজালেম হবে ইসরায়েলের রাজধানী। পূণ্যভূমি বিন্যাসের ক্ষেত্রে মুসলমানদের পবিত্রভুমি হারাম আল শরীফের ওপর ফিলিস্তিনিদের এবং পশ্চিম দেয়ালের ওপর ইসরায়েলিদের সার্বভৌম ক্ষমতা থাকবে। এছাড়া, অন্যান্য পুণ্যস্থানসমূহের ওপর উভয় ধর্মের অনুসারীগণের সমানাধিকার থাকবে। পুন্যস্থানসমূহের চূড়ান্ত সার্বভৌমত্বের অধিকার, ট্রানজিটের অনবরত সড়কব্যবস্থা এবং শরনার্থীদের অধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে জটিলতার কারণে, অভিনব ও ব্যতিক্রমধর্মী ক্লিনটন প্যারামিটার্স শান্তি প্রস্তাবটি তার অফিস ত্যাগের আগ মুহূর্তে ব্যর্থ হয়।
দ্বিতীয় উদাহরণটি সুদান-দক্ষিণ সুদান সীমান্তে হেগলিফ তৈলকূপকে কেন্দ্র করে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি–যা স্বাক্ষর হয় গত ০৮ ডিসেম্বর ২০২৫ সালে। সুদানে চলমান গৃহযুদ্ধে এসএএফ (সুদানের সশস্ত্রবাহিনী) এবং আরএসএফ বর্তমানে সংঘর্ষে লিপ্ত রয়েছে। এতে মহাবিপদে পড়ে বিশ্বের নবীনতম রাষ্ট্র দক্ষিণ সুদান। উল্লিখিত তিনটি পক্ষই হেগলিক তৈলকূপের ওপর অন্ধভাবে নির্ভরশীল। হেগলিক থেকে উত্তোলিত অপরিশোধিত তেল ‘দ্য গ্রেট নাইল পাইপলাইন’ সিস্টেমের মাধ্যমে পোর্ট সুদানে পরিবাহিত হয়। এ অপরিশোধিত তেল খার্তুমে পরিশোধিত হয় এবং লোহিত সাগর দিয়ে বর্হিবিশ্বে রপ্তানি হয়। দক্ষিণ সুদানের জিডিপির ৯০% এবং সুদানের জিডিপির একটি বিরাট অংশ উপার্জিত হয় ১৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইনে পরিবাহিত দক্ষিণ সুদানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির মাধ্যমে। দক্ষিণ সুদান জরুরীভিত্তিতে একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে এই অভিনব সমঝোতা করে।
উপরোক্ত মডেল দুটিতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য কিছু অসাধারণ অনুষঙ্গ লুক্কায়িত রয়েছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে প্রত্যেক্ষ-পরোক্ষভাবে পক্ষগুলো হলো: মিয়ানমার (জান্তা) সরকার, ইউএলএ/আরাকান আর্মি, বিচ্ছিন্নতাবাদী রোহিঙ্গা শসস্ত্রবাহিনীসমূহ (রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি ও আরএসও ইত্যাদি), বাংলাদেশে বসবাসরত রোহিঙ্গা সম্প্রদায় ও মায়ানমারের প্রবাসী সরকার। অপরদিকে, প্রতিবেশী প্রভাবশালী ও ভুক্তভোগী দেশ হিসেবে থাকছে–চীন, ভারত ও বালাদেশ।
ফাইল ছবি। ছবি: রয়টার্স থেকে নেওয়া
শিলিগুড়ি চিকেন নেক নিয়ে আগাগোড়া চিন্তিত ভারত, সেভেন সিস্টার্সের সাথে বিকল্প যোগাযোগের ভাবনা থেকে কলকাতার হুগলী থেকে ৫৩৯ কি.মি. সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে মিয়ানমারের সিতওয়ে সমুদ্রবন্দরকে সংযোগ করেছে। অতঃপর কালাদান মাল্টিমোডাল প্রজেক্ট ধরে পালেতোয়া-কালেতোয়া-জরিনপুই-লংওয়াটালাই হয়ে আইজল পর্যন্ত কৌশলগত যোগাযোগ স্থাপন করেছে ভারত। কালাদান মাল্টিমোডাল প্রজেক্টের অপরিসীম কৌশলগত শুরুত্ব মাথায় রেখে, ভারত সিতওয়ে সমুদ্রবন্দর পরিচালনার দায়িত্ব নেয় ২০২৩ সালে।
সিতওয়ের দ্বিতীয় শহর কিয়াকপু একটি উপকুলীয় পর্যটন শহর ও গভীর সমুদ্রবন্দর। এ শহরটিকে মিয়ানমারের অর্থনীতির পানির কল বলা হয়। চীন এ শহরে ১৬০০ বর্গ কি.মি. জায়গা নিয়ে বিশেষায়িত অর্থনৈতিক জোন গড়ে তুলেছে। কিয়াকপু থেকে দুটি পাইপলাইনের মাধ্যমে চীন কুনমিং পর্যন্ত গ্যাস ও অপরিশোধিত তেল পরিবহণ করে। মিয়ানমারের জিডিপির প্রায় ৮৫ বিলিয়ন ডলারের সিংহভাগ আসে সিতওয়ের প্রাকৃতিক সম্পদ এবং জ্বালানি পরিবহন ও রপ্তানির (পাইপলাইনে) মাধ্যমে।
ইউএলএ–এর সামরিক সংগঠন আরাকান আর্মি, ২০২৪ সালের ১০ জানুয়ারি অপারেশন-১০২৭ শুরু করে ২০২৫ এর ১০ এপ্রিলের মধ্যে পুরো রাখাইনের দখলের শপথ গ্রহন করে সে লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। যদিও আরাকান পিপলস রেভল্যুশনারি গর্ভমেন্ট (এপিআরজি)–এর মাধ্যমে রাখাইনে প্রশাসনিক কাঠামো গঠন করে প্রশাসনিক, বিচারব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যসেবা ইত্যাদি গড়ে তোলার চেষ্টা করছে ইউএলএ।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে ক্লিনটন প্যারামিটার্স ২০০০ এবং হেগলিক ত্রিপক্ষীয় চুক্তির আলোকে নিম্নলিখিত শর্তগুলো আশার আলো জ্বালাতে পারে। (১) রাখাইনকে সকল পক্ষের স্বার্থ রক্ষার নিমিত্তে উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক নগরী হিসেবে ঘোষণা করা। রাখাইনের রাজধানী সিতওয়ের উত্তরাংশ অর্থাৎ সিতওয়ের সমুদ্রবন্দর এলাকাকে রাখাইনের রাজধানী এবং দক্ষিনাংশে মানায়াংকে মিয়ানমার সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রদান করা। এ দুটি স্থান ব্যতীত অন্যান্য অঞ্চলসমূহ উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক নগরী হিসেবে সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য উন্মুক্ত রাখা। (২) গোটা সিতওয়ে নগরী থেকে উপার্জিত আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ (৩০–৪০%) ইউএলএ এবং অবশিষ্ট ৬০–৭০% মিয়ানমার সরকার লাভ করবে। (৩) সিতওয়ে নগরীকে অসামরিক জোন ঘোষণা করা এবং নিরপেক্ষ জাতিসংঘ বাহিনীর তদারকির বন্দোবস্ত করা।
(৪) সিতওয়ে সমুদ্রবন্দর পরিচালনার বর্তমান দায়িত্বপালনকারী দেশ ভারতকে তা পরিচালনার সুযোগসহ কালাদান মাল্টিমোডাল প্রজেক্ট দিয়ে ভারতের সেভেন সিস্টার্সের সাথে বাণিজ্যিক যোগাযোগের সকল সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা। (৫) কিয়াকপুতে চীনের বিশেষ অর্থনৈতিক জোনসহ পাইপলাইনের মাধ্যমে অপরিশোধিত তেল ও গ্যাস কুনমিং পর্যন্ত পরিবহনের যাবতীয় সুযোগ সুবিধা চীনকে প্রদান করা। (৬) ভবিষ্যতে চীন–মিয়ানমার–বাংলাদেশের মধ্যে প্রস্তাবিত করিডোর স্থাপিত হলে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সহায়তার আশ্বাস প্রদান করা।
উপরোক্ত শর্তগুলোর ওপর সমঝোতা হলে, বাংলাদেশে বসবাসরত সব রোহিঙ্গা জনগণকে রাখাইনে তাদের বাস্তুভিটায় ফিরে যাওয়ার অধিকার প্রদান করার দাবী আদৌ অযৌক্তিক হবে না! এখানে, বাংলাদেশকে ১.৫ কূটনীতির পথ ধরে কার্যকরী এবং বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে হবে।
লেখক: চেয়ারম্যান, জনতার দল ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক