আজ ২৫ আগস্ট। ২০১৭ সালের এই দিনে রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নৃশংস অভিযান শুরু হওয়ার পর প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে কক্সবাজারে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। সেই ঘটনার নয় বছর পরও তাদের বড় একটি অংশ বাংলাদেশেই রয়ে গেছে। বরং সময়ের সঙ্গে বেড়েছে শরণার্থীর সংখ্যা, কমেছে আন্তর্জাতিক সহায়তা এবং আরও কঠিন হয়েছে প্রত্যাবাসনের পথ।
নয় বছরে কতটা বেড়েছে রোহিঙ্গার সংখ্যা
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত খবরে বলা হয়, ২০১৭ সালের পর থেকে বাংলাদেশে আনুমানিক ২ লাখ ৬০ হাজার রোহিঙ্গা শিশুর জন্ম হয়েছে। এর বাইরে ২০২৩ সাল থেকে আরও ১ লাখ ৫৪ হাজার ৬৯০ জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। ওই সময় রাখাইনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে নতুন করে সংঘাত তীব্র হয়ে ওঠে।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩১ জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল ১২ লাখ ২ হাজার। এর মধ্যে ১৯৯০ সালের দফায় আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা ৩৯ হাজার ৮৫৬ জন। আর ২০১৭ সালের ব্যাপক আগমনের পর বাংলাদেশে এসেছে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা।
কথা ছিল, অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হলে ধীরে ধীরে তারা নিজ দেশে ফিরে যাবে। কিন্তু নয় বছরেও সেই প্রত্যাবাসনে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি।
তালিকা যাচাই এগোলেও ফেরার পথ খুলছে না
সাম্প্রতিক সময়ে প্রত্যাবাসনের জন্য তালিকা যাচাইয়ের কাজ কিছুটা এগিয়েছে। বাংলাদেশ ধাপে ধাপে মিয়ানমারের কাছে ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ রোহিঙ্গার তালিকা দিয়েছে।
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, গত ৩১ জুলাই পর্যন্ত ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে স্বীকার করেছে দেশটি।
তবে যাচাই শেষ হলেও প্রত্যাবাসনের নির্দিষ্ট সময়সূচি এখনো নেই। মিয়ানমারের বক্তব্য, রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার পর যাচাই হওয়া ব্যক্তিদের ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।
ফলে তালিকা যাচাইয়ের এই অগ্রগতি শেষ পর্যন্ত কতটা বাস্তব প্রত্যাবাসনে রূপ নেবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
বাংলাদেশের ওপর বাড়ছে চাপ
রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সহায়তাও কমে আসছে। ফলে মিয়ানমার থেকে নিপীড়নের শিকার এই জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে রোহিঙ্গারা। ছবি: রয়টার্স
কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোর পরিস্থিতির অবনতির পাশাপাশি দ্রুত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনাও কমে যাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশকে সামনে আরও বড় আর্থিক, কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত চাপ সামলাতে হতে পারে।
জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূতের ব্রিফিংয়ে বক্তব্য দেওয়ার সময় জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর স্থায়ী সমাধানও সেখানেই খুঁজে বের করতে হবে। গত জুনে দেওয়া এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানায়। সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী ওই সময় আরও বলেন, প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে দীর্ঘদিন আশ্রয় দেওয়ার ফলে বাংলাদেশের ওপর উল্লেখযোগ্য সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
কমছে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন
রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক অর্থায়নও কমে যাচ্ছে। ২৫ আগস্ট প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে এনজিও প্ল্যাটফর্ম জানায়, ২০২৬ সালের জয়েন্ট রেসপন্স প্লানের অর্থায়ন ২৪ শতাংশ কমিয়ে ৭১ কোটি ৫ লাখ ডলার করা হয়েছে। এই অর্থ শুধু জীবন রক্ষার জন্য জরুরি সহায়তাগুলোতেই ব্যয় করার কথা।
অর্থায়ন কমে যাওয়ায় খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি, স্বাস্থ্য, আশ্রয়, সুরক্ষা ও শিক্ষাসহ গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলো আরও চাপের মুখে পড়েছে। নারী, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মতো বেশি ঝুঁকিতে থাকা মানুষ সহায়তা কমে গেলে তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।
শিক্ষা মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ সক্ষমতা তৈরির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও হাজারো রোহিঙ্গা শিশু ও কিশোর-কিশোরীর কাছে এখনও তা পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ভালো ভবিষ্যতের পথে তাদের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ছে।
সুরক্ষার ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। নিরাপত্তাঝুঁকি, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, শিশুর সুরক্ষা, মানবপাচার, শোষণ এবং মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোসামাজিক সহায়তা পাওয়ার সীমাবদ্ধতা এখনও রয়েছে।
২০২৪ সাল থেকে নতুন করে আসা ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গার বায়োমেট্রিক তথ্য নেওয়া হয়েছে। তবে তাদের বিদ্যমান শরণার্থী জনগোষ্ঠীর মতো ব্যক্তিগত নিবন্ধন ও সমমানের নথিপত্র দেওয়া হয়নি।
জলবায়ু ঝুঁকিও বাড়ছে
এনজিও প্ল্যাটফর্ম রোহিঙ্গাদের জলবায়ু ঝুঁকির কথাও তুলে ধরেছে। আগুন, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগ পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। তাই শক্তিশালী দুর্যোগ প্রস্তুতি ও টেকসই অবকাঠামোর প্রয়োজন বাড়ছে।
জুলাইয়ের মাঝামাঝিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে বসবাসকারী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জীবন ‘মারাত্মক ঝুঁকির’ মধ্যে রয়েছে।
সংস্থাটি বলেছে, ২০২৬ সালের জুলাইয়ের সাম্প্রতিক ভূমিধসের ঘটনাতেও সেই ঝুঁকি আবার স্পষ্ট হয়েছে। সময়ের সঙ্গে রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর পরিধি বাড়লেও তাদের গাছপালা কেটে ন্যাড়া করা খাড়া পাহাড়ের ঢালে বাঁশ ও ত্রিপলের তৈরি অস্থায়ী ছাউনিতে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে এসব বসতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
মিয়ানমার থেকে নতুন করে শরণার্থী আসার কারণে ঘিঞ্জি এসব ক্যাম্পে প্রাণঘাতী সাইক্লোন, বন্যা ও ভূমিধসে হতাহতের আশঙ্কা নিয়েও জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর বারবার সতর্ক করেছে।
সংকটের চাপ পড়ছে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও
আগস্টে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সংস্থা অক্সফামের ‘হোল্ডিং দ্য লাইন’ শীর্ষক প্রতিবেদনেও রোহিঙ্গা সংকটের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় প্রায় এক দশক ধরে চলা কার্যক্রমের কারণে শরণার্থী শিবিরের আশপাশের স্থানীয় জনগোষ্ঠীও ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত চাপের মুখে পড়েছে।
শিবির স্থাপনের আগে অনেক স্থানীয় মানুষ বন বিভাগের পাহাড়ি জমি ইজারা নিয়ে চাষাবাদ করতেন। কেউ বনভিত্তিক বিভিন্ন কাজে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন, আবার কেউ মাছ ধরা ও আশপাশের অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভর করতেন। রোহিঙ্গা বসতি ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো তৈরির জন্য বড় বড় এলাকা ব্যবহৃত হওয়ায় এসব জীবিকার সুযোগ অনেকের জন্য কমে গেছে।
অন্যদিকে, শরণার্থী শিবির ও আশপাশের এলাকায় কাজ করতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষের আসা বাড়তে থাকে। এতে বাসস্থান, পণ্য ও সেবার চাহিদাও বেড়ে যায়। ফলে জীবনযাত্রার খরচ বাড়ে, অথচ অনেক স্থানীয় পরিবারের আগের আয়ের সুযোগ কমে যায়। এতে পরিবারগুলোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বেড়েছে।
পানিও স্থানীয় মানুষের বড় উদ্বেগের বিষয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে অক্সফামের ওই প্রতিবেদনে। মানবিক সহায়তাকারী সংস্থাগুলো গভীর নলকূপ স্থাপনের আগে অনেক পরিবার অগভীর ভূগর্ভস্থ পানি ও আশপাশের বিভিন্ন উৎসের পানির ওপর নির্ভর করত। শুষ্ক মৌসুমে পানির স্তর নেমে গেলে এসব উৎসে পানির সংকট দেখা দিত। এতে আশপাশের এলাকাগুলোতে পানির ওপর চাপ আরও বাড়ত।
কমছে অর্থায়ন, বাড়ছে খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি
রোহিঙ্গাদের জন্য আসা অর্থনৈতিক সহায়তার পরিমাণও কমছে। জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় কার্যালয় (ওসিএইচএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের মানবিক সহায়তা পরিকল্পনায় রোহিঙ্গাদের জন্য ৩১ কোটি ৪৬ লাখ ডলার অর্থায়ন পাওয়া যায়। ২০১৮ ও ২০১৯ সালের পরিকল্পনায় এই অর্থের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৬৮ কোটি ৮১ লাখ ও ৬৯ কোটি ২০ লাখ ডলার।
২০২০ সালে অর্থায়ন কমে দাঁড়ায় ৬৩ কোটি ডলারে। পরের বছর, ২০২১ সালে তা বেড়ে হয় ৬৮ কোটি ৯৬ লাখ ডলার। এরপর আবার অর্থায়ন কমতে থাকে। ২০২২ সালে তা ছিল ৬১ কোটি ৯৭ লাখ ডলার, ২০২৩ সালে ৬১ কোটি ৯৯ লাখ ডলার এবং ২০২৪ সালে ৫৮ কোটি ১৩ লাখ ডলার।
২০২৫ সালে ডয়েচে ভেলেতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, খাদ্য সহায়তার পরিমাণ কমানো হলে ঝুঁকিতে থাকা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর এর মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে।
ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন কমে গেলে আঞ্চলিক নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হতে পারে। রোহিঙ্গারা থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। একই সঙ্গে ঝুঁকিতে থাকা শরণার্থীদের সুযোগ নিয়ে পরিচালিত মানবপাচারকারী নেটওয়ার্কগুলোর ব্যবহারও বাড়তে পারে।
নিরাপত্তা পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক
আন্তর্জাতিক সংস্থা এসিপিএসের ২০২৩ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা শিবিরে অপরাধ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। সেখানে বলা হয়, ২০২২ সালের শুরু থেকে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে সহিংসতা ও নিরাপত্তাজনিত ঘটনা বেড়েছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাহাড় ধস। ছবি: রয়টার্স
এতে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। এর মধ্যে সাধারণ ও শারীরিক নিরাপত্তাহীনতা, শিশুদের সুরক্ষা-সংক্রান্ত ঝুঁকি এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার মতো বিষয় রয়েছে।
জীবিকা ও শিক্ষার সুযোগের অভাব এসব সুরক্ষা-সংক্রান্ত সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। একই সঙ্গে অর্থায়ন কমে যাওয়ায় খাদ্য নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন হয়ে উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে অনেক শরণার্থী মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ায় পৌঁছানোর আশায় ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রা করছেন। ২০২৫ সালকে সমুদ্রপথে রোহিঙ্গাদের যাত্রার ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এনজিও প্ল্যাটফর্মের বিবৃতিতে। ওই বছর প্রায় ৯০০ রোহিঙ্গা নিখোঁজ বা মারা গেছেন। বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রা অব্যাহত থাকায় ২০২৬ সালে সাগরে প্রাণহানি ২০২৫ সালের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এনজিও প্ল্যাটফর্ম বলছে, শুধু মানবিক সহায়তা দিয়ে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। ২৫ আগস্ট প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে সংস্থাটি রোহিঙ্গাদের সহনশীলতা, স্বনির্ভরতা, শিক্ষা, সুরক্ষা ও জীবিকার সুযোগ বাড়াতে আরও বেশি বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে।
একই সঙ্গে সংকটের সমাধান তৈরির প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গাদের অর্থবহভাবে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নিজ দেশে কি ফিরতে পারবে রোহিঙ্গারা?
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফিরে যাওয়া আদৌ সম্ভব কি না।
২৪ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ডয়েচে ভেলে উল্লেখ করে, বর্তমান পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। সিঙ্গাপুরের আইএসইএএস-ইউসুফ ইসহাক ইনস্টিটিউটের মিয়ানমার স্টাডিজ প্রোগ্রামের প্রধান মো থুজারের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৭ সালের পর যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন অনেক কম বাস্তবসম্মত।
থুজার বলেন, মিয়ানমারের সামরিক-সমর্থিত কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার উদ্যোগ নিতে চাইলেও যা তারা চাইবে বলে খুব কম বিশ্লেষকই মনে করেন রাখাইনের বেশিরভাগ এলাকার ওপর এখন তাদের আর নিয়ন্ত্রণ নেই।
রাখাইনভিত্তিক জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি বর্তমানে রাজ্যটির বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। এর মধ্যে উত্তরাঞ্চলের সেসব এলাকাও রয়েছে, যেখান থেকে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা পালিয়ে এসেছিলেন। আরাকান আর্মি রোহিঙ্গা বিদ্রোহী গোষ্ঠী এআরএসএ থেকে আলাদা একটি রাখাইন জাতিগোষ্ঠীর সশস্ত্র সংগঠন।
জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মি উভয়ের বিরুদ্ধেই রোহিঙ্গাদের ওপর গুরুতর নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে চলাচলে বিধিনিষেধ, নির্বিচারে আটক এবং জোরপূর্বক নিয়োগের মতো ঘটনা রয়েছে।
জার্মানির বিয়েলেফেল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল ও ট্রান্সন্যাশনাল মাইগ্রেশন অ্যান্ড মোবিলিটি বিভাগের অধ্যাপক আন্তিয়ে মিসবাখ ডয়েচে ভেলেকে বলেন, স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের কোনো নীতি নিয়ে সমঝোতা হলেও মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রস্তাব দেয়নি।
আন্তিয়ে মিসবাখ বলেন, রোহিঙ্গাদের অনেক গ্রাম ধ্বংস হয়ে গেছে। আবার কিছু গ্রামে এখন অন্য জনগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করছেন।
মিসবাখের ভাষায়, “রাখাইন নিরাপদ নয়।” তিনি উল্লেখ করেন, গত দুই বছরে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমার ছেড়ে বাংলাদেশের কক্সবাজারে এসে আশ্রয় নিয়েছেন।
রোহিঙ্গা সংকটের নয় বছর পর তাই প্রশ্নটি শুধু প্রত্যাবাসন কবে শুরু হবে, তা নয়। প্রশ্ন হলো—কবে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হবে, যেখানে নিরাপদে, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদার সঙ্গে রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরতে পারবেন। আর সেই সময় পর্যন্ত বাংলাদেশ ও রোহিঙ্গাদের ওপর চলতে থাকা এই দীর্ঘমেয়াদি চাপ কতটা বাড়বে, সেটিও এখন বড় উদ্বেগ।