ads

নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপি কাকে বেছে নেবে

অতীতেও পরিবেশ–পরিস্থিতির চাপে পূর্বসূরি রাষ্ট্রপতিরা যে সব সময় সত্য কথা বলেছেন, তা নয়।

নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপি কাকে বেছে নেবে
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির বাসভন ও কার্যালয় বঙ্গভবন। ছবি: বাসস

অনেক জল্পনার অবসান ঘটিয়ে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিন আজ শুক্রবার বিকেলে পদত্যাগ করেছেন। গত কয়েক দিন ধরেই আলোচনা চলে আসছিল যে তিনি যে কোনো সময়ে পদত্যাগ করতে পারেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি শারীরিক অসুস্থতাকে পদত্যাগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করলেও রাজনৈতিক পরিসরে নানা কথা আছে। এর মধ্যে একটি হলো কিছু দিন আগে চিকিৎসার জন্য লন্ডন সফরকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোন সংলাপ। মো. সাহাবুদ্দিন এই সংলাপের কথা অস্বীকার করেছেন।

রাষ্ট্রপতি পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের প্রথম দাবি ওঠে গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর। সেই সময়ে আন্দোলনকারীদের গরিষ্ঠ অংশ তার পদত্যাগের বিষয়ে রাস্তায় থাকলেও বিএনপি নেতৃত্ব সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি হয়, এ রকম কিছুর বিপক্ষে ছিলেন। এক পর্যায়ে ইনকিলাব মঞ্চ নামে একটি সংগঠন তার পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবন ঘেরাও করে। এ সময় বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে দেখা করে বলেছিলেন, ‘সাংবিধানিক সমস্যা তৈরি হয় এমন কিছু করা যাবে না’।

Advertisement

দ্বিতীয়বার পদত্যাগের বিষয়টি সামনে আসে ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করে থাকে জাতীয় সংসদ। কিন্তু বিএনপি এ বিষয়ে তাড়াহুড়া করতে চায়নি। এর পেছনে একটি রাজনৈতিক কৌশলও কাজ করেছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। আগামী নির্বাচন হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। সেক্ষেত্রে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর পরই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে দায়িত্বে নাও থাকতে পারেন। কেননা জাতীয় সংসদের মতো বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতিও ৫ বছরের জন্য নির্বাচিত হন। দ্বিতীয়ত রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির পক্ষ থেকে কাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে এ বিষয়ে বেশ কয়েকটি নাম শোনা গেলেও বিএনপি নেতৃত্ব তখনো কোনো নাম স্থির সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি।

ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদচ্যুতি ও দেশত্যাগের পর তার মনোনীত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন স্বপদে থাকতে পারেন কি না, বিতর্কটা উঠেছিল শুরুতেই। তবে সেই সময়ে উপদেষ্টা পরিষদ রাজনৈতিক বিতর্ক এড়িয়ে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার ওপর জোর দিয়েছিলেন। ৮ আগস্ট রাষ্ট্রপতির কাছেই মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে নতুন উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা শপথ নেন।

বিতর্কটা আরেকবার ওঠে মানবজমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীর সম্পাদিত জনতার চোখ–এ প্রকাশিত তৎকালীন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎকারমূলক একটি লেখা থেকে। রাষ্ট্রপতি বলেছিলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে পদত্যাগ করেছেন, তার দালিলিক প্রমাণ তার কাছে নেই। তিনি শুনেছেন শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে চলে গেছেন। একই কথা শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ও বলেছিলেন। সে সময় তেমন প্রতিক্রিয়া হয়নি।

অতীতেও পরিবেশ–পরিস্থিতির চাপে পূর্বসূরি রাষ্ট্রপতিরা যে সব সময় সত্য কথা বলেছেন, তা নয়।

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ জাতির উদ্দেশে দেওয়া রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারের ভাষণের কথা আমরা মনে করতে পারি। তিনি তার নেতৃত্বাধীন সরকারকে অথর্ব ও দুর্নীতিবাজ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। পরে বিচারপতি স্বীকার করেছেন, এটা তাকে দিয়ে এরশাদ জোর করে বলিয়েছেন। একইভাবে ২০০৭ সালে ১/১১–তেও রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ তার নেতৃত্বাধীন উপদেষ্টা পরিষদ ভেঙে দেওয়ার সময়ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর দোষ চাপিয়েছিলেন।

মো. সাহাবুদ্দিন বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি। এর আগে আরও ২১ জন রাষ্ট্রপতি ছিলেন। দু–একজন ব্যতিক্রম ছাড়া তাদের বিদায় হয়েছে বিষণ্ন ও করুণ। আমাদের দুজন সাবেক রাষ্ট্রপতি হত্যার শিকার হয়েছেন, একাধিক রাষ্ট্রপতি অপমানজনকভাবে বিদায় নিয়েছেন।

বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি প্রথম দফায় ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত এই পদে ছিলেন (স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অনুযায়ী)। যদিও তিনি পাকিস্তানি কারাগারে বন্দী থাকার কারণে এই সময়ে সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব দেশে ফিরে সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং ১২ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির পদ ছেড়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। একই সময়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। সরকারের সঙ্গে কাজ করতে বিভিন্ন বিষয়ে তার টক্কর লাগে।

১৯৭৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ালে তার স্থলাভিষিক্ত হন মোহাম্মদউল্লাহ। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু সংসদীয় পদ্ধতি বাতিল করে একদলীয় রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির শাসন জারি করেন এবং নিজেই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু তার এই দায়িত্বও স্থায়ী হয়নি।

একই বছরের ১৫ আগস্ট এক রক্তাক্ত সেনা অভ্যুত্থানে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু নিহত হন। এই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেন ফারুক–রশীদসহ একদল তরুণ সেনা কর্মকর্তা এবং তারা নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেছে নেন খন্দকার মোশতাক আহমদকে, যিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ও বাকশাল কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা।

খন্দকার মোশতাক আহমদের শাসনও ছিল অস্থায়ী। ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে পাল্টা অভ্যুত্থান হলে ৬ নভেম্বর মোশতাককে পদত্যাগ করতে হয়। নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেছে নেওয়া হয় সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে। এরপর ৭ নভেম্বর ‘সিপাহি–জনতার বিপ্লবে’ খালেদ মোশাররফ ও তার দুই সহযোগী নিহত হন। ক্ষমতার মঞ্চে আবির্ভূত হন জিয়াউর রহমান। সেসময় তিনি নিজে রাষ্ট্রপতি কিংবা প্রধান সামরিক শাসকের পদ না নিয়ে সেই পদে বিচারপতি সায়েমকেই রেখে দেন।

সেটা ছিল সামরিক শাসনকাল। ফলে সংবিধানের বাধ্যবাধকতা ছিল না।

এরপর জিয়াউর রহমান সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করে। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে নিহত হওয়ার আগপর্যন্ত তিনি এই পদে বহাল ছিলেন। একই দিন হাসপাতাল চিকিৎসাধীন উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। পরে ওই বছরের ১৫ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয় এবং আওয়ামী লীগ প্রার্থী কামাল হোসেনকে হারিয়ে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

কিন্তু নির্বাচনের আগেই সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ দেশ পরিচালনায় অংশীদারত্বের দাবি সামনে আনেন এবং ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ বিচারপতি সাত্তারকে সরিয়ে তিনি ক্ষমতা দখল করেন। তবে এরশাদ সেদিনই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব না নিয়ে আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে এই পদে বসান। ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর তাকে সরিয়ে নিজেই রাষ্ট্রপতি হয়ে বসেন।

এরপর ১৯৮৬ সালের ২৩ অক্টোবর প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচনের মাধ্যমে সেটাকে জায়েজ করেন। তত দিনে সামরিক আইন তুলে নেওয়া হয়েছে এবং সেই আইনে করা সব আদেশ–নির্দেশেরও বৈধতা দেওয়া হয়।

গণ–অভ্যুত্থানে নব্বইয়ের ৬ ডিসেম্বর পদত্যাগের আগ পর্যন্ত এরশাদ রাষ্ট্রপতি পদে বহাল ছিলেন। রাজনৈতিক দলগুলোর মতৈক্যের ভিত্তিতে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত হয় প্রথম অন্তর্বর্তী সরকার, যারা একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন করে প্রশংসিত হয়। এই নির্বাচনে বিএনপি ১৪৬টি আসন পেয়ে জামায়াতের সহায়তায় সরকার গঠন করে।

আওয়ামী লীগ জোট ১০০ আসন নিয়ে বিরোধী দলের আসনে বসে। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর পর্যন্ত। ওই দিন বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। তিনি ১৯৯৬ সালের ৯ অক্টোবর পর্যন্ত এই দায়িত্ব পালন করেন। নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনিই প্রথম ৫ বছরের মেয়াদ পূরণ করেছেন। তার সময়ে একটি সেনা অভ্যুত্থানের চেষ্টা হলেও সফল হয়নি।

আবদুর রহমান বিশ্বাসের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে রাষ্ট্রপতি হয়ে আসেন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। শেখ হাসিনা বলেছিলেন, “রাষ্ট্রপতি হতে রাজি না হলে তার বাড়ির সামনে অনশন করবেন।” প্রথম দিকে সরকারের সঙ্গে নানা বিষয়ে টানাপোড়েন চললেও কর্মসম্পর্ক মোটামুটি ভালো ছিল। কিন্তু ২০০১–এর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। আওয়ামী লীগের অভিযোগ, রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশন ও লতিফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গে মিলে আওয়ামী লীগকে হারিয়েছেন। তারা নির্বাচন বাতিল করতে তাকে চাপও দিয়েছিলেন। কিন্তু সাহাবুদ্দীন আহমদ রাজি হননি।

ওই বছরের ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতি পদে বহাল ছিলেন। একই দিন বিএনপির মনোনীত প্রার্থী বদরুদ্দোজা চৌধুরী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বিরোধের কারণে ২০০২ সালের ২১ জুন তাকে পদত্যাগ করতে হয়। এরপর তিন মাস স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।

৬ সেপ্টেম্বর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। তিনি ২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই পদে বহাল ছিলেন। এরপর রাষ্ট্রপতি হন জিল্লুর রহমান। তার মেয়াদকাল ছিল ২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৩ সালের ২০ মার্চ।

এরপর সংসদের স্পিকার হিসেবে মো. আবদুল হামিদ মাত্র কয়েকদিনের জন্য অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং ২৪ এপ্রিল ২০১৩ থেকে ২৩ এপ্রিল ২০২৩ পর্যন্ত দুই মেয়াদে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। বঙ্গভবনে একমাত্র তার বিদায়ই ছিল বর্নাঢ্য ও জাঁকজমনপূর্ণ। যদিও স্বাভাবিকভাবেই সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী দলগুলোর কোনো নেতা সেই বিদায় অনুষ্ঠানে যাননি।

২০২৩ সালের ২৩ এপ্রিল নতুন রাষ্ট্রপতি হন মো. সাহাবুদ্দিন। এর আগে সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে যাদের নাম শোনা গিয়েছিল, তাদের মধ্যে সাহাবুদ্দিন ছিলেন না। কেন শেখ হাসিনা তাকে বেছে নিয়েছিলেন, সেটা রহস্য বটে। সেই সময়ে মন্ত্রিসভায় যাদের নেওয়া হয়েছে, তাদের বেশির ভাগকে নিয়ে প্রশ্ন ছিল।

আমাদের সরকারগুলো রাষ্ট্রপতিকে কী ধরনের মর্যাদা দেয়, তার একটি উদাহরণ তুলে ধরেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান। বিএনপি সরকারের আমলে অর্থ মন্ত্রণালয় দুর্নীতির অভিযোগে একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে সরিয়ে দেওয়া এবং সেই পদে অপর একজন কর্মকর্তাকে নিয়োগ সম্বলিত প্রস্তাব রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠালে তিনি সেটি আটকে দেন। রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস ও অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের সম্পর্ক ভালো ছিল না। এই পটভূমিতে অর্থমন্ত্রী মন্তব্য করেন, “তুমি কি মনে কর বঙ্গভবনের বাটঁকু লোকটি দেশ চালাচ্ছেন?”

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি কেবল প্রধানমন্ত্রী ও সুপ্রিম কোর্টের প্রধানবিচারপতির নিয়োগ ব্যতীত অন্য সব কাজ করবেন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ একবার বলেছিলেন, মিলাদ পড়া ও মাজার জেয়ারত করা ছাড়া তাদের কোনো কাজ নেই। বিএনপি সরকারের আমলে নির্বাচিত একজন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে বঙ্গভবন থেকে রওনা হয়েছিলেন, পরে তাকে রাষ্ট্রাচারের কথা বলে ঠেকানো হয়।

তবে সংবিধানে ত্রয়োদশ সংশোধনী অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা চালুর পর রাষ্ট্রপতি কিছুটা ক্ষমতাবান হন। ওই সময়ে রাষ্ট্রপতির হাতে প্রতিরক্ষা বিভাগ ন্যস্ত ছিল। ১৯৯৬ সালে প্রথম সাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সশস্ত্র বাহিনিতে বিদ্রোহ দেখা দিলে রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস শক্ত হাতেই সেটি মোকাবিলা করেন। সেই সময়ের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বলেছিলেন, “রাষ্ট্রপতি স্বেচ্ছায় ও স্বতঃপ্রণোদিতভাবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।”

কিন্তু ২০০৭ সালে ইয়াজউদ্দিন আহম্মদ সে রকম শক্ত পদক্ষেপ নিতে পারেননি। তিনি সেনা নেতৃত্বের চাপের কাছে নতিস্বীকার করে নিজের নেতৃত্বে গঠিত উপদেষ্টা পরিষদ ভেঙে দেন এবং নতুন উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেন।

মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে বঙ্গভবনে একটি অধ্যায়ের অবসান হলো। আগামী সংসদ অধিবেশন না ডাকা এবং নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদই ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। কে নতুন রাষ্ট্রপতি হবেন, সেটাই এখন রাজনৈতিক পরিসরে মুখ্য আলোচনা। সংসদে বিএনপির যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে, তাতে রাষ্ট্রপতি পদে তাদের পছন্দসই প্রার্থীকে জিতিয়ে আনতে বিরোধী দলের কাছে ধরনা দিতে হবে না। কিন্তু তাদের পছন্দসই প্রার্থীটা কে হবেন? বিএনপি নেতৃত্ব কাকে আগামী পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেছে নেবেন? দলের বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার নাম শোনা যাচ্ছে। তাদের মধ্য থেকে একজনকে, না বাইরের কাউকে বিএনপি নেতৃত্ব বাছাই করবেন, এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হয়তো আমাদের আরও কিছু দিন অপেক্ষা করতে হবে।

লেখক: সম্পাদক, চরচা।

সম্পর্কিত