প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন এবং সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে গণভোট একদিনে অনুষ্ঠানের ঘোষণার পর রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অনেক হিসেব-নিকেশের প্রশ্ন উঠেছে। তবে সব কিছু ছাপিয়ে যে প্রশ্নটি ঘুরছে তা হলো, সরকার কাকে খুশি করল?
দুটি ভোট একই দিনের ঘোষণার বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে ধন্যবাদ জানিয়েছে। এক দিনে দুই ভোট মূলত বিএনপিরই দাবি ছিল। তারা শুরু থেকেই এই অবস্থানে ছিল। কিন্তু সরকারের ঘোষণার দলটির নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ সরাসরি প্রধান উপদেষ্টার দিকে প্রশ্ন তুলেছেন। তার অভিযোগ, সরকারপ্রধান মুহাম্মদ ইউনূস জুলাই জাতীয় সনদকে ‘লঙ্ঘন’ করেছেন। কারণ সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে যে পরিষদ গঠনের কথা বলা হয়েছে তা সনদ নেই। বিএনপির এই নেতা জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় পুরোটাতেই বিএনপির প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
বিএনপি বরাবরই ঐকমত্য কমিশনে তার দেওয়া নোট অব ডিসেন্ট নিয়ে শক্ত অবস্থানে ছিল। সেগুলো সহ-ই যাতে সংবিধান আদেশ জারি হয় সে দাবি ছিল দলটির। সরকার সেদিকে হাঁটেনি। আনুষ্ঠানিক ধন্যবাদ জানিয়েও বিএনপি এ বিষয়ে এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
সংবিধান সংস্কার নিয়ে ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ প্রকাশের পর থেকেই বিএনপি এর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। দলটির অভিযোগ যেসব বিষয় নিয়ে তারা একমত হয়েছিল সেগুলোর বাইরে অনেক কিছু সুপারিশে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বিশেষ করে সংবিধান সংস্কার পরিষদ। গত বৃহস্পতিবার সংবিধান সংস্কারের যে আদেশ রাষ্ট্রপতি জারি করেছেন সেখানে কমিশনের সুপারিশই একটু এদিক-ওদিক আছে শুধু।
লন্ডনে তারেক রহমানের সঙ্গে মুহাম্মদ ইউনূসের বৈঠকের পর আগামী বছর ভোট আয়োজনের কথা জানানো হয়। তখন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং জামায়াতে ইসলামীর অসন্তোষ লুকানো ছিল না। স্পষ্টই তারা বলছিল, সরকার বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা করেছে। তবে ঘটনা যাই হোক না কেন বিএনপির সঙ্গে সরকারের সেই ‘সমঝোতা’র স্বস্তি বেশি দিন ছিল না। কারণ, ঐকমত্য কমিশনের আলোচনা। যার প্রকাশ কমিশনের সুপারিশ বের হওয়ার পরে বেশ বোঝা গেছে।
এদিকে, জামায়াতে ইসলামী যে খুশি হয়নি তা স্পষ্ট। কারণ দলটি নভেম্বরেই গণভোট চেয়েছিল। সেটা আপাতত হচ্ছে না। সংসদ নির্বাচনও সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি (পিআর) হচ্ছে না। জামায়াত-ইসলামী আন্দোলনসহ আটটি দলের প্রধান দাবি কার্যত নাকচ করে দিয়েছে সরকার।
দলগুলোর হুঁশিয়ারি ছিল, আগে গণভোট আর পিআর পদ্ধতি না হলে জাতীয় নির্বাচন হতেই দেওয়া হবে না।
তাদের দাবি, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি ও সেই আদেশের ওপর নভেম্বর মাসের মধ্যেই গণভোট; সংসদ নির্বাচনে সংসদের উভয় কক্ষে পিআর পদ্ধতি চালু; অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের লক্ষ্যে সবার জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা; ‘ফ্যাসিস্ট সরকারের’ জুলুম-নির্যাতন, গণহত্যা ও দুর্নীতির বিচার দৃশ্যমান করা; এবং ‘স্বৈরাচারের দোসর’ জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা।
গত বৃহস্পতিবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা প্রথম ও প্রধান দুটি দাবি কার্যত নাকচ করে দিয়েছেন। জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, “দুইটি ভোট (গণভোট ও সংসদ নির্বাচন) একই দিনে দিতে গিয়ে জাতিকে একটি সংকটে ফেলে দেওয়া হলো।”
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, দাবি আদায়ে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার সামনে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবস্থান কর্মসূচি তারা বহাল রেখেছেন। সেটি কবে থেকে হবে, তা আগামী রোববার জানানো হবে।
শুক্রবারও জামায়াতসহ আট দল সংবাদ সম্মেলনে নানা অভিযোগ তুলেছেন। তারা সরাসরি বলেছেন, তিনজন উপদেষ্টা প্রধান উপদেষ্টাকে ‘ফাঁদে’ ফেলেছেন। সরকার একটি দলের পক্ষে কাজ করছে বলেও অভিযোগ তাদের। বিএনপির নাম মুখে না আনলেও ইঙ্গিত যে দলটির দিকে সেটা বুঝতে কারও অসুবিধা হয়নি।
জামায়াত শুরু থেকে পিআর নিয়ে উচ্চকণ্ঠ। গণভোট, সংসদ নির্বাচন নিয়েও তাদের অবস্থান এখন পর্যন্ত স্পষ্ট। কিন্তু একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জামায়াতকে দরকার সরকারের। তাই হয়তো সংসদের উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতিতে ভোটের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। কিছু দিয়ে তাদেরকে সন্তুষ্ট করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখা যেতে পারে বিষয়টি। আবার মানবতাবিরোধী অপরাধে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে হওয়া মামলার রায় জানা যাবে ১৭ নভেম্বর। দৃশ্যমান বিচারের দাবি জামায়াত ও আট দলের সঙ্গে এনসিপিরও। গণভোট নিয়ে সিদ্ধান্ত জানানোর তিন দিনের মধ্যেই শেখ হাসিনার বিচারের রায় ঘোষণার বিষয়টিও একটু কৌশলী চিন্তার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা যেতেই পারে। যদিও বিষয়টি পুরোপুরি আদালতের এখতিয়ারে। আর বিচার বিভাগ বাংলাদেশে স্বাধীন।
এনসিপি শুরু থেকেই গণভোটের বদলে সংবিধান সংস্কার আদেশের দাবিতে সোচ্চার ছিল। দলটির দাবি ছিল, গণভোট সংসদ নির্বাচনের আগে বা ভোটের দিন যেকোনো সময় হতে পারে। তবে আদেশ আগে জারি করতে হবে এবং তা করতে হবে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকেই। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম কিছুদিন আগেই সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, তারা মনে করেন, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ‘সাংবিধানিক বৈধতা’ নেই। এজন্য গণঅভ্যুত্থানের ‘স্পিরিট’ ধরে রাখতে তারা মুহাম্মদ ইউনূসের মাধ্যমে আদেশ জারির দাবি করেন।
সরকার সংবিধান সংস্কার আদেশ জারি করেছে ঠিকই কিন্তু সেটি বিদ্যমান সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ীই করা হয়েছে। অর্থাৎ, রাষ্ট্রপতি সেই আদেশ জারি করেছেন। এই মুহূর্তে সংবিধানের বাইরে গিয়ে কিছু করার সুযোগ নেই। না হলে ভবিষ্যতে অন্তর্বর্তী সরকারের নানা পদক্ষেপ নিয়ে আদালতে প্রশ্ন উঠতে পারে। কারণ এই সরকার বিদ্যমান সংবিধানের অধীনেই শপথ নিয়েছে।
তবে প্রধান উপদেষ্টার ভাষণের পর এনসিপি আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। এনসিপি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ আগে চেয়েছিল। সেটা পেয়েছে তারা। চেয়েছিল মুহাম্মদ ইউনূস সেটা জারি করবেন। যেটা তারা পায়নি। এখানেও দেখা যাচ্ছে কিছু দিয়ে কিছু না দিয়ে খুশি রাখার একটা চেষ্টা।
সব দলের কিছু কিছু দাবি পূরণ করে সরকার আসলে সবাইকে খুশি করতে চাইছে না কি কোনো একটা দলকে ভরসা দিতে চাইছে তা হয়তো আর কিছু দিনের মধ্যে বোঝা যাবে। তবে, বাংলাদেশের রাজনীতির পরিস্থিতি যেভাবে হঠাৎ করে পরিবর্তনের নজির অতীতে আছে তাতে এখনই হয়তো বলা যাবে না, বল কার কোর্টে?