সম্প্রতি দুটি ঘটনা ব্যাপক আলোচিত হয়েছে। দুটিই ঘটেছে রাজধানী ঢাকার মধ্যে। যেহেতু আমাদের দেশটা দিনশেষে অত্যন্ত রাজধানীকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে দিনে দিনে, তাই এই দুই ঘটনা পুরো দেশের একটি ভয়ঙ্কর প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র হওয়ার পথে আছে। সংবাদমাধ্যম সূত্রে ঘটনাগুলো জেনে নেওয়া যাক।
ঘটনা ১: গত ২৪ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে ঢাকার মিরপুর-১ এ অবস্থিত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা করে ব্যাপক লুটপাট ও ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। মুখোশধারী দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে ঢুকেছিল বলে জানা গেছে। তারা কেন্দ্রের দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে মূল্যবান যন্ত্রপাতি, ওষুধ, টিকা, নগদ অর্থসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী লুট করে। পরে ভারী যন্ত্রপাতি (স্কেভেটর) ব্যবহার করে পুরো স্থাপনাটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে আনুমানিক এক কোটি টাকারও বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানানো হয়। ওই প্রতিষ্ঠানটিতে মূলত নিম্ন আয়ের ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষ স্বাস্থ্যসেবা নিত।
সেখানে শিশুদের টিকাদান, প্রজনন স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, প্রসূতি সেবাসহ নানা মৌলিক চিকিৎসা সুবিধা দেওয়া হতো। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে শাহ আলী থানায় মামলা করা হয়। মামলায় বিএনপির ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক সদস্য মোহাম্মদ হানিফ মিয়াসহ অজ্ঞাতনামা আরও ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
ঘটনা ২: গত শনিবার রাতে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট চালানো হয়। সালমান মুক্তাদির নিজেই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে লাইভে এসে এই হামলা, ভাঙচুরের বিষয়টি জানান। এ সময় আশপাশের কয়েকটি বাড়িসহ কয়েকটি স্থাপনাতেও ভাঙচুর করে হামলাকারীরা। রাজধানীর ইসিবি চত্বরের নিউ গিনি প্রপার্টিজে এই হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। জানা গেছে, পাঁচটি পিকআপে করে দুই-তিন শ লোক এসে জড়ো হয়েছিল সেখানে হামলার জন্য। ফটক ভেঙে গুলি করতে করতে ভেতরে ঢুকেছিল তারা। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী হামলা-ভাঙচুর, লুটপাট হয়। একপর্যায়ে পুলিশ এলে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনাও ঘটে।
এমন হামলা, ভাঙচুর বা লুটপাটের কারণ হিসেবে সালমান মুক্তাদির সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, তার কাছে কোনো চাঁদা দাবি করা হয়নি। তবে দাবি করলে তিনি তা দিয়ে দিতেন। অবশ্য সালমান মুক্তাদির চাঁদাবাজির দিকে ইঙ্গিত করলেও পুলিশ বলছে, জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে এ ঘটনা ঘটেছে। জমি নিয়ে নিউ গিনি প্রোপার্টিজ লিমিটেড এবং মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম মহিউদ্দিনের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। এই বিরোধের জেরেই হয় হামলা, ভাঙচুর। জানা গেছে, নিউ গিনি প্রোপার্টিজ লিমিটেডের কাছ থেকে জায়গা ভাড়া নিয়ে সালমান মুক্তাদির সেখানে তার স্টুডিও তৈরি করেছিলেন। এমন ঘটনায় করা মামলায় গ্রেপ্তার তিন আসামিকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত।
ওদিকে রাড্ডার ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামের সাইনবোর্ড ও ব্যানার টাঙিয়ে দেয় হামলাকারীরা। এই সমিতির কার্যক্রমের সঙ্গেও স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তারা বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদের (মিষ্টি) ঘনিষ্ঠ হিসেবে এলাকায় পরিচিত। ফেরদৌসী আহমেদ অবশ্য এই হামলায় জড়িত নন বলে দাবি করেছেন।
সুতরাং, বোঝাই যাচ্ছে যে, ওপরের দুটি ঘটনাই কোনো সরল হিসাবে ঘটেনি। এগুলো ‘এলাকার ক্যাচাল’ বলতে যেসব ছোটখাটো ঘটনা বোঝায়, সেসব নয়। বরং এসবের পেছনে নানা ঘটনার ইতিহাস আছে। এবং সেই সাথে আছে ক্ষমতা দেখানো এবং একই সাথে বিদ্যমান আইনের শাসনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা। এক কথায়, এগুলো ‘হ্যাডম’ প্রদর্শন এবং তার প্রতিষ্ঠা করার এক ধরনের কার্যক্রম। এতে তথাকথিত ‘দখল’ করার পক্ষকে চিহ্নিত করা এবং তাদের ‘দখল করার অধিকার’কে জনমনে প্রোথিত করে দেওয়ার কাজটিও হয়। অর্থাৎ, কাজ একটা হলেও, তার ফলাফল আসলে অনেক।
রাড্ডার ঘটনায় সরাসরি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বিএনপির এমপি’র দিকে আঙুল উঠেছে। অভিযোগ আছে, বিএনপির স্থানীয় নেতামহলের দিকেও। ওদিকে ইসিবি চত্বরের কাছে দেশের আলোচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটরের স্টুডিও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে দেশের প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকায়। হ্যাঁ, এর কারণ নিয়ে নানা বিতর্ক চলছে। সালমান নিজে চাঁদাবাজির দিকে ইঙ্গিত করলেও আবার বলেছেন তার কাছে কেউ চাঁদা চায়নি। ওদিকে পুলিশ বলছে, জমি নিয়ে নানা বিরোধ আছে। সেই হিসাবে পুলিশের আলাপে ইঙ্গিত অনেকটা এমন যে, দুই পক্ষের রেষারেষিতে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুর হওয়াটা অনেকটা ‘ক্রসফায়ার’ হওয়ারমতো ঘটনা।
কিন্তু, প্রশ্ন হলো প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী আসনেই যদি এভাবে চর দখলের মতো মারামারি, হামলা, ভাঙচুর হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ আসলে কোথায় নিরাপদ বোধ করবে? প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী আসন বলেই এই হামলা, ভাঙচুরের আলাদা গুরুত্ব আছে। কারণ এতে প্রতীকীভাবে হলেও মানুষ অধিকতর নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করতে পারে। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, কারণ যাই থাকুক না কেন, কোনোভাবেই হামলা, ভাঙচুর বা লুটপাটের ঘটনা এভাবে একটি আইনের শাসনে থাকা দেশে ঘটতে পারে না। এসব ঘটনা এভাবে ঘটতে থাকলে, এটিই প্রতীয়মান হয় যে, দেশে আইনের শাসন অতিমাত্রায় দুর্বল হয়ে গেছে। বরং সেই আদিম সমাজের মতো ‘জোর যার, মুলুক তার’ নীতিই যেন প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।
তখন আর সরকার বা সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রয়োজনীয়তাও জনমনে ফিকে হয়ে আসে। আর যখন নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয়তাই জনমনে ঝাপসা হয়ে যায়, তখন নিয়ন্ত্রণ বলতে দেশে বা সমাজে কিছু থাকে না।
হ্যাঁ, সরকার দাবি করতেই পারে যে, এমন ধরনের সাম্প্রতিক সব ঘটনাতেই তো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কোথাও ওসি প্রত্যাহার হচ্ছে, মামলায় গ্রেপ্তার হচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে মনে রাখতে হবে, যেসব ‘ব্যবস্থা’ নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো সবই হচ্ছে ‘রোগী মরিবার পর’। অর্থাৎ, ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর। কিন্তু এ ধরনের ঘটনা প্রবলভাবে না ঘটার জন্য অন্তত যতটুকু উন্নত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রয়োজন হয়, সেটির অনুপস্থিতি প্রবল। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আশাবাদী হওয়ার মতো নাগরিক খুব একটা পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভাঙচুর ও লুটপাট। ছবি:সংগৃহীত
আমাদের দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবস্থাই অবশ্য গত বছর দুয়েক ধরে নড়বড়ে। সেই ভঙ্গুর অবস্থাটিই উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে বর্তমান সরকার। তবে সেই কথা বলে তো আর নড়বড়ে পরিস্থিতির দায় লম্বা সময় ধরে অন্যের ঘাড়ে চাপানো যায় না। কারণ, বর্তমান সরকার ‘ভালো দিন’ আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েই গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জনগণের ম্যান্ডেট পেয়েছে। এখন শুধু আগের সরকারকে দোষ দেওয়া আর কতদিন নেওয়া যায়?
মোদ্দা কথা হলো, সরকার সাধারণ জনগণকে নিরাপদ বোধ করাতে পারছে না। আর এই লেখায় উল্লেখ করা দুটি ঘটনা সেই বিষয়টিরই আরও সঙিন চিত্র উপস্থাপন করছে। সেই সাথে আছে আবার ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ। ফলে রাড্ডা বা ইসিবি চত্বরে ঘটনা দুটি আসলে সরকারের ‘সার্বিক নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব’ নিয়েই গুরুতর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এই প্রশ্নের ইতিবাচক উত্তর না পাওয়া গেলে কিন্তু দেশের মানুষের স্বস্তি আর মিলবে না। এখন সরকার তা বুঝলেই হয়!
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা