বদরুল আলম খান

ট্রাম্প চীন সফর শেষ করে ওয়াশিংটন ফিরেছেন। বিশ্বব্যাপী এখন মূল আলোচনার বিষয়, তার সফর কেমন হল। আমার ধারনায় সফর ব্যর্থ হয়েছে। ব্যর্থ বলাটা হয়তো ঠিক হবে না। কারণ চীনে তিনি কোনো বিশেষ বিষয়কে সফল করার জন্য গিয়েছিলেন কিনা সে ব্যাপারে সন্দেহ থাকা স্বাভাবিক। যদি যেতেন, তাহলে অন্যভাবে এই সফরের পরিকল্পনা করা হতো।
এই ধরনের উচ্চ পর্যায়ের সফরের আগে বিশেষজ্ঞদের অগ্রবাহিনী সম্ভব্য চুক্তির খুঁটিনাটি আগে ভাগেই নির্দিষ্ট করেন। নানা বিষয়ে আলাপ হয়। সে সব আলাপ আলোচনা এক মাস বা তারও অধিক সময় ধরে চলতে পারে। তারপর রাষ্ট্রপ্রধানেরা সেটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে সই করেন। এর কিছুই এই সফরে লক্ষ্য করা গেল না। সে দিক থেকে ভাবলে সফর ব্যর্থ। অবশ্য সফরে প্রচুর ঢাক ঢোল পেটানো হয়েছে। উভয় পক্ষ একে অপরের প্রতি প্রশংসা বাক্যের ব্যবহারে কার্পণ্য করেনি। কিন্তু এর পেছনের সবই বায়বীয় মনে করার কারণ আছে।
চীন সফরের দুটি দিক লক্ষণীয়। ট্রাম্পের সফরসঙ্গী হয়ে বাণিজ্য প্রতিনিধির একটি বড় দল চীনে যায়। আশা করা হয়েছিল, বানিজ্য এবং আইটি নিয়ে বড় ধরনের চুক্তি হবে। একটি চুক্তি হতে পারতো মার্কিন বিমান কোম্পানি বোয়িং-এর সঙ্গে। ইতিমধ্যে ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন চীন ২০০টি যাত্রীবাহী বোয়িং বিমান কেনার অঙ্গীকার করেছে। আমেরিকার পক্ষ থেকে এই ঘোষণা এলেও চীনের পক্ষ থেকে কোনো ঘোষণা আসেনি। এক্ষেত্রে তারা নীরবতা পালন করছে। ফলে এ সংক্রান্ত কোনো চুক্তি আদৌও হয়েছে কিনা সে ব্যাপারে সন্দেহ আছে।
তবে যদি চুক্তি হয়েও থাকে, তাহলেও কিন্তু সেটি হতাশাব্যঞ্জক মনে হবে। ওয়াল স্ট্রিটের স্টক মার্কেট ৫০০টি বোয়িং বিমান কেনার চুক্তি হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল। সেটি হয়নি। সে কারণে বোয়িং কোম্পানির শেয়ারে ৪ শতাংশ পতন ঘটে। সয়াবিন আমদানি নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং কোনো চুক্তি সই হয়েছে কিনা সে ব্যাপারেও চীনা পক্ষ চুপ। চীন বর্তমানে ব্রাজিল থেকে তার সয়াবিন চাহিদা পুরণ করছে। হরমুজ প্রণালি এখনো পুরোপুরি খোলা হয়নি। আমেরিকায় সার সরবরাহ বন্ধ আছে। সারের ঘাটতি কৃষি উৎপাদনে কি প্রভাব ফেলবে, সেটা নিয়ে সেখানকার কৃষকেরা যথেষ্ট উদ্বিগ্ন। ফলে সয়াবিন উৎপাদন এবং চীনে তার রপ্তানি নিয়ে যদি চুক্তি হয়েও থাকে, তাহলেও কিন্তু আশঙ্কা থেকে যায়। মাংস বা অন্যান্য কৃষি পণ্য নিয়ে চুক্তি হলেও হতে পারে। কিন্তু সেগুলো সবই মামুলী ।
দৃশ্যত মনে হতে পারে যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চীনে গিয়েছিলেন একজন পর্যটক হিসেবে। বস্তুত চীনা প্রেসিডেন্ট তাকে সে ভাবেই আপ্যায়ন করেছেন। তিনি চীনে এসেছেন যতটুকু না গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলাপ করতে, তার চেয়ে নানা জায়গা পরিদর্শন যেন তার মূল উদ্দেশ্য ছিল। চীনের প্রেসিডেন্ট তাকে নানা ঐতিহ্যপূর্ণ স্থানে নিয়ে গেছেন। জোন নাং হাই ১৪ শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত চীনের রাজা বাদশাদের আবাসিক এলাকা। একে চীনের হোয়াইট হাউজ বলা যেতে পারে। এলাকাটি বেজিং শহরের কেন্দ্রবিন্দু তিয়ানেনমেন স্কোয়ার থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে। সেখানে অতি ঘনিষ্ঠ না হলে কোনো রাষ্ট্রীয় অতিথিকে নেওয়া চীনা ঐতিহ্যে বিরল। শি জিনপিং ট্রাম্পকে নিষিদ্ধ শহরে নিয়ে গেছেন, টেম্পল অব হেভেনে নিয়েছেন, পিপলস গ্রেট হলে ট্রাম্প গেছেন।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, চীনা প্রেসিডেন্ট এই ঘোরাঘুরির ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন কি সচেতনভাবে? আমার মনে হয়েছে, আমেরিকার সাথে যুক্তি সই করতে চীন খুব যে বেশি উৎসাহী, তা নয়। আমেরিকা চুক্তি সই করে কিন্তু সেটি পালনে কতটুকু নিবিষ্ট এবং আগ্রহী, সে ব্যাপারটি প্রশ্নবোধক। বিশেষ করে সম্প্রতি ইরানসংকট কেন্দ্রিক বিভিন্ন পর্যায়ে কূটনৈতিক আলোচনার ক্ষেত্রে আমেরিকার ভূমিকা বা আগ্রহ থেকে অন্তত এটুকু বোঝা যায়। চুক্তি সই বা আলোচনার ব্যাপারে আমেরিকা নির্ভরযোগ্য কোনো অংশীদার নয়। চীনের রাষ্ট্রপ্রধান নিশ্চয় জানেন, ইরানের সাথে আলাপ আলোচনার মধ্যবর্তী সময়ে আমেরিকা ইরানকে আক্রমন করে বসে। আন্তর্জাতিক আইনে যেটি যেকোনো বিচারে বড় মাপের অপরাধ।
এই সফরের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক ইস্যু ছিল তাইওয়ান ও ইরান। দুটি বিষয় নিয়ে আলাপ হলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যা চেয়েছেন, তা পাননি। হরমুজ প্রণালি যে আলাপের মুল বিষয় হবে, এটি সফরের আগে জানিয়ে দিয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু আলোচনাকালে জানা গেল, চীন মূল আলোচ্য বিষয় হিসেবে তাইওয়ানকে নির্দিষ্ট করেছে। ইরানের ওপর চীনের যে প্রভাব এবং যে ঘনিষ্ট সম্পর্ক তাদের মধ্যে গড়ে উঠেছে, তাকে কাজে লাগিয়ে হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করা ট্রাম্প সহজ হবে ভেবেছিলেন। কিন্তু চীনের প্রেসিডেন্ট যে কথা দুই মাস আগে বলেছেন, সেই কথাই পুনব্যক্ত করলেন মাত্র। অর্থাৎ চীন চায় হরমুজ প্রণালি জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হোক। এটি একটি সাধারণ বিবৃতি। এখানে কোন অঙ্গীকার নেই, ইরানের সমালোচনা নেই।

আসলে হরমুজ প্রণালি বন্ধ নেই, কিন্তু কোনো দেশের জাহাজ ওই প্রণালি অতিক্রম করার অনুমতি পাবে, সেটি নির্ভর করে ইরানের ওপর। ট্রাম্প চীনের সেনাবাহিনী পাঠানোর প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। কিন্তু শি জিনপিং
সেটি নাকচ করে দেন। তিনি জানান ইরান সার্বভৌম দেশ। সেখানে কোন ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপের প্রশ্ন আসে না।
ট্রাম্প বলেছেন, চীন হরমুজ প্রণালির সামরিকীকরণ আশা করে না। ইরান জাহাজের ওপর টোল আরোপের যে ব্যবস্থা চালু করেছে, সেটিও চীন নাকি বিরোধিতা করে। কিন্তু চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেনি। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি উক্তি এ প্রসঙ্গে প্রনিধানযোগ্য। তিনি ইরান আক্রমনকে পরোক্ষভাবে সমালোচনা করেছেন এবং কীভাবে তার নিস্পত্তি হবে, সে বিষয়ে ভাবাটাই মুল চ্যালেঞ্জ বলে উল্লেখ করেছেন।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং অবশ্য রাষ্ট্রীয় এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্পকে স্পষ্ট করেই জানিয়ে দেন যে, চীন মার্কিন সম্পর্কের প্রধান ইস্যুই হলো তাইওয়ান। তাইওয়ান চীনের মুল ভূখণ্ডের অংশ। সে কারণে এই ইস্যুকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে দেখতে হবে। এখানে কোন হটকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া চলবে না। সেক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যেকার সম্পর্ক জটিল হয়ে উঠবে। এমনকি দুই দেশ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে পারে।
ট্রাম্প এরপর থেকে তাইওয়ান বিষয় নিয়ে কোন মন্তব্য করেননি। তাইওয়ান সম্পর্কে ট্রাম্প পরবর্তীতে বলেছেন, আমেরিকা বর্তমানে যে নীতি অনুসরন করছে, সেই নীতি বহাল থাকবে। আমেরিকার নীতি হচ্ছে ‘কৌশলগত অস্পষ্টতা’ বজায় রাখা । তার অর্থ, আমেরিকা তাইওয়ানকে চীনের অংশ হিসেবে দেখে। কিন্তু তার সাথে নানা পর্যায়ে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে চায় । দেশে ফেরার পথে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমরা ৯ হাজার কিলোমিটার দূর থেকে এসে যুদ্ধ বাধাতে চাই না। তাইওয়ান যেন স্বাধীনতা ঘোষণা না করে, সে ব্যাপারে তিনি তাইওয়ানের নেতৃবৃন্দকে জানিয়ে দিয়েছেন।
তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই সিংটে এ ব্যাপারে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, স্বাধীনতা ঘোষণার প্রয়োজন নেই। কারণ ঘোষণা ছাড়াই তাইওয়ান স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বর্তমানে টিকে আছে। তার অর্থ হচ্ছে, তাইওয়ান সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। কিন্তু চীন আমেরিকাকে সতর্ক করে দিয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে নিয়ে একটা সমস্যা দেখা দিয়েছিল। ২০২০ সালে চীন মার্কো রুবিওর ওপর দুইবার নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ওই বছর তিনি হংকং-এর গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সময় চীনা পুলিশের নির্যাতনের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখেন। প্রত্যুত্তরে চীন রুবিওর ওপর কয়েক দফা নিষেধাজ্ঞা জারি করে। কিন্তু তা সত্ত্বেও রুবিও চীন সফরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গী হতে পেরেছিলেন। নিষেধাজ্ঞা তুলে না নিয়ে চীন রুবিওর নাম পরিবর্তন করে তাকে চীনে ঢোকার অনুমতি দেয়। চীনে দুই দিন থাকাকালে তার নাম ছিল মার্কো লু। যাই হোক, ট্রাম্পের সফর শেষ হয়েছে। দুই পরাশক্তির মধ্যে যে সংলাপ হলো, সেটি যেকোনো বিচারে ইতিবাচক। কতটুকু সফল হলো, সেটি অবশ্য ভিন্ন প্রশ্ন।
লেখক: ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক

ট্রাম্প চীন সফর শেষ করে ওয়াশিংটন ফিরেছেন। বিশ্বব্যাপী এখন মূল আলোচনার বিষয়, তার সফর কেমন হল। আমার ধারনায় সফর ব্যর্থ হয়েছে। ব্যর্থ বলাটা হয়তো ঠিক হবে না। কারণ চীনে তিনি কোনো বিশেষ বিষয়কে সফল করার জন্য গিয়েছিলেন কিনা সে ব্যাপারে সন্দেহ থাকা স্বাভাবিক। যদি যেতেন, তাহলে অন্যভাবে এই সফরের পরিকল্পনা করা হতো।
এই ধরনের উচ্চ পর্যায়ের সফরের আগে বিশেষজ্ঞদের অগ্রবাহিনী সম্ভব্য চুক্তির খুঁটিনাটি আগে ভাগেই নির্দিষ্ট করেন। নানা বিষয়ে আলাপ হয়। সে সব আলাপ আলোচনা এক মাস বা তারও অধিক সময় ধরে চলতে পারে। তারপর রাষ্ট্রপ্রধানেরা সেটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে সই করেন। এর কিছুই এই সফরে লক্ষ্য করা গেল না। সে দিক থেকে ভাবলে সফর ব্যর্থ। অবশ্য সফরে প্রচুর ঢাক ঢোল পেটানো হয়েছে। উভয় পক্ষ একে অপরের প্রতি প্রশংসা বাক্যের ব্যবহারে কার্পণ্য করেনি। কিন্তু এর পেছনের সবই বায়বীয় মনে করার কারণ আছে।
চীন সফরের দুটি দিক লক্ষণীয়। ট্রাম্পের সফরসঙ্গী হয়ে বাণিজ্য প্রতিনিধির একটি বড় দল চীনে যায়। আশা করা হয়েছিল, বানিজ্য এবং আইটি নিয়ে বড় ধরনের চুক্তি হবে। একটি চুক্তি হতে পারতো মার্কিন বিমান কোম্পানি বোয়িং-এর সঙ্গে। ইতিমধ্যে ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন চীন ২০০টি যাত্রীবাহী বোয়িং বিমান কেনার অঙ্গীকার করেছে। আমেরিকার পক্ষ থেকে এই ঘোষণা এলেও চীনের পক্ষ থেকে কোনো ঘোষণা আসেনি। এক্ষেত্রে তারা নীরবতা পালন করছে। ফলে এ সংক্রান্ত কোনো চুক্তি আদৌও হয়েছে কিনা সে ব্যাপারে সন্দেহ আছে।
তবে যদি চুক্তি হয়েও থাকে, তাহলেও কিন্তু সেটি হতাশাব্যঞ্জক মনে হবে। ওয়াল স্ট্রিটের স্টক মার্কেট ৫০০টি বোয়িং বিমান কেনার চুক্তি হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল। সেটি হয়নি। সে কারণে বোয়িং কোম্পানির শেয়ারে ৪ শতাংশ পতন ঘটে। সয়াবিন আমদানি নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং কোনো চুক্তি সই হয়েছে কিনা সে ব্যাপারেও চীনা পক্ষ চুপ। চীন বর্তমানে ব্রাজিল থেকে তার সয়াবিন চাহিদা পুরণ করছে। হরমুজ প্রণালি এখনো পুরোপুরি খোলা হয়নি। আমেরিকায় সার সরবরাহ বন্ধ আছে। সারের ঘাটতি কৃষি উৎপাদনে কি প্রভাব ফেলবে, সেটা নিয়ে সেখানকার কৃষকেরা যথেষ্ট উদ্বিগ্ন। ফলে সয়াবিন উৎপাদন এবং চীনে তার রপ্তানি নিয়ে যদি চুক্তি হয়েও থাকে, তাহলেও কিন্তু আশঙ্কা থেকে যায়। মাংস বা অন্যান্য কৃষি পণ্য নিয়ে চুক্তি হলেও হতে পারে। কিন্তু সেগুলো সবই মামুলী ।
দৃশ্যত মনে হতে পারে যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চীনে গিয়েছিলেন একজন পর্যটক হিসেবে। বস্তুত চীনা প্রেসিডেন্ট তাকে সে ভাবেই আপ্যায়ন করেছেন। তিনি চীনে এসেছেন যতটুকু না গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলাপ করতে, তার চেয়ে নানা জায়গা পরিদর্শন যেন তার মূল উদ্দেশ্য ছিল। চীনের প্রেসিডেন্ট তাকে নানা ঐতিহ্যপূর্ণ স্থানে নিয়ে গেছেন। জোন নাং হাই ১৪ শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত চীনের রাজা বাদশাদের আবাসিক এলাকা। একে চীনের হোয়াইট হাউজ বলা যেতে পারে। এলাকাটি বেজিং শহরের কেন্দ্রবিন্দু তিয়ানেনমেন স্কোয়ার থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে। সেখানে অতি ঘনিষ্ঠ না হলে কোনো রাষ্ট্রীয় অতিথিকে নেওয়া চীনা ঐতিহ্যে বিরল। শি জিনপিং ট্রাম্পকে নিষিদ্ধ শহরে নিয়ে গেছেন, টেম্পল অব হেভেনে নিয়েছেন, পিপলস গ্রেট হলে ট্রাম্প গেছেন।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, চীনা প্রেসিডেন্ট এই ঘোরাঘুরির ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন কি সচেতনভাবে? আমার মনে হয়েছে, আমেরিকার সাথে যুক্তি সই করতে চীন খুব যে বেশি উৎসাহী, তা নয়। আমেরিকা চুক্তি সই করে কিন্তু সেটি পালনে কতটুকু নিবিষ্ট এবং আগ্রহী, সে ব্যাপারটি প্রশ্নবোধক। বিশেষ করে সম্প্রতি ইরানসংকট কেন্দ্রিক বিভিন্ন পর্যায়ে কূটনৈতিক আলোচনার ক্ষেত্রে আমেরিকার ভূমিকা বা আগ্রহ থেকে অন্তত এটুকু বোঝা যায়। চুক্তি সই বা আলোচনার ব্যাপারে আমেরিকা নির্ভরযোগ্য কোনো অংশীদার নয়। চীনের রাষ্ট্রপ্রধান নিশ্চয় জানেন, ইরানের সাথে আলাপ আলোচনার মধ্যবর্তী সময়ে আমেরিকা ইরানকে আক্রমন করে বসে। আন্তর্জাতিক আইনে যেটি যেকোনো বিচারে বড় মাপের অপরাধ।
এই সফরের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক ইস্যু ছিল তাইওয়ান ও ইরান। দুটি বিষয় নিয়ে আলাপ হলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যা চেয়েছেন, তা পাননি। হরমুজ প্রণালি যে আলাপের মুল বিষয় হবে, এটি সফরের আগে জানিয়ে দিয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু আলোচনাকালে জানা গেল, চীন মূল আলোচ্য বিষয় হিসেবে তাইওয়ানকে নির্দিষ্ট করেছে। ইরানের ওপর চীনের যে প্রভাব এবং যে ঘনিষ্ট সম্পর্ক তাদের মধ্যে গড়ে উঠেছে, তাকে কাজে লাগিয়ে হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করা ট্রাম্প সহজ হবে ভেবেছিলেন। কিন্তু চীনের প্রেসিডেন্ট যে কথা দুই মাস আগে বলেছেন, সেই কথাই পুনব্যক্ত করলেন মাত্র। অর্থাৎ চীন চায় হরমুজ প্রণালি জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হোক। এটি একটি সাধারণ বিবৃতি। এখানে কোন অঙ্গীকার নেই, ইরানের সমালোচনা নেই।

আসলে হরমুজ প্রণালি বন্ধ নেই, কিন্তু কোনো দেশের জাহাজ ওই প্রণালি অতিক্রম করার অনুমতি পাবে, সেটি নির্ভর করে ইরানের ওপর। ট্রাম্প চীনের সেনাবাহিনী পাঠানোর প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। কিন্তু শি জিনপিং
সেটি নাকচ করে দেন। তিনি জানান ইরান সার্বভৌম দেশ। সেখানে কোন ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপের প্রশ্ন আসে না।
ট্রাম্প বলেছেন, চীন হরমুজ প্রণালির সামরিকীকরণ আশা করে না। ইরান জাহাজের ওপর টোল আরোপের যে ব্যবস্থা চালু করেছে, সেটিও চীন নাকি বিরোধিতা করে। কিন্তু চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেনি। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি উক্তি এ প্রসঙ্গে প্রনিধানযোগ্য। তিনি ইরান আক্রমনকে পরোক্ষভাবে সমালোচনা করেছেন এবং কীভাবে তার নিস্পত্তি হবে, সে বিষয়ে ভাবাটাই মুল চ্যালেঞ্জ বলে উল্লেখ করেছেন।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং অবশ্য রাষ্ট্রীয় এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্পকে স্পষ্ট করেই জানিয়ে দেন যে, চীন মার্কিন সম্পর্কের প্রধান ইস্যুই হলো তাইওয়ান। তাইওয়ান চীনের মুল ভূখণ্ডের অংশ। সে কারণে এই ইস্যুকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে দেখতে হবে। এখানে কোন হটকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া চলবে না। সেক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যেকার সম্পর্ক জটিল হয়ে উঠবে। এমনকি দুই দেশ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে পারে।
ট্রাম্প এরপর থেকে তাইওয়ান বিষয় নিয়ে কোন মন্তব্য করেননি। তাইওয়ান সম্পর্কে ট্রাম্প পরবর্তীতে বলেছেন, আমেরিকা বর্তমানে যে নীতি অনুসরন করছে, সেই নীতি বহাল থাকবে। আমেরিকার নীতি হচ্ছে ‘কৌশলগত অস্পষ্টতা’ বজায় রাখা । তার অর্থ, আমেরিকা তাইওয়ানকে চীনের অংশ হিসেবে দেখে। কিন্তু তার সাথে নানা পর্যায়ে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে চায় । দেশে ফেরার পথে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমরা ৯ হাজার কিলোমিটার দূর থেকে এসে যুদ্ধ বাধাতে চাই না। তাইওয়ান যেন স্বাধীনতা ঘোষণা না করে, সে ব্যাপারে তিনি তাইওয়ানের নেতৃবৃন্দকে জানিয়ে দিয়েছেন।
তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই সিংটে এ ব্যাপারে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, স্বাধীনতা ঘোষণার প্রয়োজন নেই। কারণ ঘোষণা ছাড়াই তাইওয়ান স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বর্তমানে টিকে আছে। তার অর্থ হচ্ছে, তাইওয়ান সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। কিন্তু চীন আমেরিকাকে সতর্ক করে দিয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে নিয়ে একটা সমস্যা দেখা দিয়েছিল। ২০২০ সালে চীন মার্কো রুবিওর ওপর দুইবার নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ওই বছর তিনি হংকং-এর গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সময় চীনা পুলিশের নির্যাতনের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখেন। প্রত্যুত্তরে চীন রুবিওর ওপর কয়েক দফা নিষেধাজ্ঞা জারি করে। কিন্তু তা সত্ত্বেও রুবিও চীন সফরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গী হতে পেরেছিলেন। নিষেধাজ্ঞা তুলে না নিয়ে চীন রুবিওর নাম পরিবর্তন করে তাকে চীনে ঢোকার অনুমতি দেয়। চীনে দুই দিন থাকাকালে তার নাম ছিল মার্কো লু। যাই হোক, ট্রাম্পের সফর শেষ হয়েছে। দুই পরাশক্তির মধ্যে যে সংলাপ হলো, সেটি যেকোনো বিচারে ইতিবাচক। কতটুকু সফল হলো, সেটি অবশ্য ভিন্ন প্রশ্ন।
লেখক: ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক

বাংলাদেশের মাটি উর্বর। এ কারণেই এই দেশকে ঐতিহাসিকভাবেই সুজলা, সুফলা, শস্য–শ্যামলা বলে থাকেন কবি, সাহিত্যিকেরা। তবে উর্বর এই দেশে গত কয়েক বছর ধরেই ধানের চেয়ে বেশি চাষ হচ্ছে ঘৃণার। ফলনও অনেক। এতটাই যে, আমাদের বাংলাদেশ এখন পরিণত হয়েছে মানুষ মরলে উল্লাসে হা হা দেওয়া দেশে!