গত জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৩০টি টেক্সটাইল মিল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এ সময় আরও প্রায় ১৬৫টি মিল সক্ষমতার চেয়ে অনেক কম উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) বলছে, কোনো মিল ৫০ শতাংশ, কোনোটি ৭০ শতাংশ আবার কোনোটি মাত্র ৩০ শতাংশ সক্ষমতায় উৎপাদন করছে।
জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি অর্থায়নের সংকট, ব্যবসার পরিবেশের অবনতি, ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা এবং আমদানি প্রতিযোগিতাসহ নানা চাপ মিলগুলোর এই অবস্থা।
বিটিএমএর বর্তমান সদস্য মিলের সংখ্যা ১ হাজার ৮৮৩টি। এর মধ্যে ৫৩০টি সুতা উৎপাদনকারী, ১ হাজার ৮টি কাপড় উৎপাদনকারী এবং ৩৪৫টি ডাইং, প্রিন্টিং ও ফিনিশিং মিল। চলতি বছর জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৩০টি মিল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার তথ্য নিশ্চিত করে বিটিএমএর জয়েন্ট সেক্রেটারি মোহাম্মাদ জিয়াউর রহমান চরচাকে বলেন, “এসব সাম্প্রতিক বন্ধের চিত্র। অর্থাৎ চলতি বছর জানুয়ারি মাস থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০টি কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। আর ১৬৫টি কারখানা কম সক্ষমতা নিয়ে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে।”
বন্ধের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, “অধিকাংশ বন্ধ হয়েছে জ্বালানি সংকটে। আর বাকিগুলো অন্যান্য কারণে বন্ধ হয়েছে। যেমন, অর্থায়নের কারণে কিছু বন্ধ হয়েছে। ব্যবসার পরিবেশে অবনতি হওয়ার কারণে কিছু কারখানা বন্ধ হয়েছে। টেক্সটাইল মিলগুলোর সংকট এখন আর শুধু গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। উৎপাদন চালু রাখার মতো কার্যকর মূলধন না থাকা, ব্যাংকঋণের চাপ, ব্যবসায়িক পরিবেশের অবনতিও অনেক মিলকে চাপে ফেলেছে।”
গত জুলাইয়ে বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল জানিয়েছিলেন, শিল্প খাতের ব্যাংকিং সমস্যা ও উচ্চ সুদের হারও টেক্সটাইল মিলগুলোর আলোচনায় ছিল। তখন সংগঠনটি রপ্তানিমুখী প্রাইমারি টেক্সটাইল শিল্পের বিদ্যমান ঋণের জন্য সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ সুদে বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা এবং বন্ধ বা আংশিকভাবে চালু কারখানার জন্য সহজ শর্তে মূলধন সহায়তার দাবি জানিয়েছিল। একই সঙ্গে সরকার ঘোষিত ২০ হাজার কোটি টাকার ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সহায়তা দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানায় বিটিএমএ।অর্থাৎ অনেক মিলের ক্ষেত্রে উৎপাদন বন্ধ হওয়ার প্রক্রিয়াটি এক দিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে কম উৎপাদন, বিক্রি ও নগদ অর্থের সংকট, ঋণের কিস্তি এবং কাঁচামাল ও জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে নতুন করে গ্যাস সংকট যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে।
গ্যাস পরিস্থিতির উন্নতি হলেও সংকট কাটেনি
জুলাইয়ের শেষ দিক থেকে শিল্প খাতে গ্যাস সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এক পর্যায়ে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে টেক্সটাইল ও অন্যান্য কারখানার উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে যায়। গত আগস্টে বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল জানিয়েছিলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে এক মাসে প্রায় ৬০০ টেক্সটাইল কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তিনি তখন বলেছিলেন, “অনেক কারখানা এর আগেই আর্থিক ও অন্যান্য সমস্যার কারণে কম সক্ষমতায় চলছিল। জ্বালানি সংকটে কিছু কারখানার উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।”
তবে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা উন্নতি হয়েছে। বিটিএমএ ১৭ সেপ্টেম্বর জানায়, ১৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার পর শিল্প এলাকায় গ্যাসের চাপ বাড়তে শুরু করেছে এবং অনেক মিল উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে পারছে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে গার্মেন্টস রপ্তানিকারকদের প্রয়োজনীয় সুতা ও কাপড় সময়মতো সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল ২১ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে বিটিএমএ গ্যাস সরবরাহের এই উন্নতির জন্য সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে গ্যাসের চাপ ঠিক রেখে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ অব্যাহত রাখার দাবি জানায়।
তবে গ্যাসের সাম্প্রতিক উন্নতি হলেও আগের ক্ষতি দ্রুত পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। জানুয়ারি থেকে যেসব মিল বন্ধ হয়েছে কিংবা কম সক্ষমতায় চলছে, সেগুলোর অনেকের আর্থিক সংকট বেড়েছে। তাই গ্যাসের চাপ বাড়লেও ঋণ, মূলধন ও বাজারসংক্রান্ত সমস্যার সমাধান না হলে সব মিল দ্রুত পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে পারবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের সংকট ও নগদ অর্থের অভাব
টেক্সটাইল শিল্পের বড় একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা। মিল মালিকদের অভিযোগ, একদিকে উৎপাদন ও বিক্রির চাপ, অন্যদিকে ব্যাংকঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধের চাপ তাদের নগদ অর্থের সংকট বাড়িয়ে দিচ্ছে।
জুলাইয়ে বিটিএমএ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠকে বন্ধ ও আংশিকভাবে বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রণোদনা স্কিমের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছিল। পাশাপাশি বকেয়া ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির অর্থ পরিশোধ, গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ডের সুবিধা, টেক্সটাইল খাতে সুদের হার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা এবং সমস্যাগ্রস্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য কার্যকর এক্সিট পলিসির দাবিও জানায় সংগঠনটি।
জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকেও বিটিএমএ ৫ শতাংশ সুদে বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের দাবি জানায়। একই সঙ্গে বন্ধ ও আংশিকভাবে চালু কারখানাগুলোর জন্য সহজ শর্তে ঋণ পেতে সিআইবি মূল্যায়নের নিয়ম শিথিল করার দাবি জানানো হয়।
আমদানি ও দেশীয় শিল্পের টিকে থাকার লড়াই
টেক্সটাইল মিল মালিকদের আরেকটি বড় অভিযোগ, আমদানি করা সুতা ও কাপড়ের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতা। বিশেষ করে কম কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আপত্তি জানিয়ে আসছে বিটিএমএ।
সেপ্টেম্বরের শুরুতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের কটন সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার করে প্রকৃত রপ্তানিকারকদের ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে আমদানির সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে গার্মেন্টস খাতের আপত্তির পর সিদ্ধান্তটি পর্যালোচনার জন্য স্থগিত রাখা হয়। এ সিদ্ধান্ত বহাল রাখার জন্য ২১ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতির কাছে সমর্থন চেয়েছে বিটিএমএ।
বিটিএমএর দাবি, দেশে উৎপাদন করা সম্ভব এমন সুতা আমদানির সুযোগ বাড়লে স্থানীয় স্পিনিং ও টেক্সটাইল মিলগুলোর বাজার সংকুচিত হবে। সংগঠনটি জানিয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যে পরিমাণ ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানি হয়েছে, তার আর্থিক মূল্য প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা।
বিটিএমএর সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন চরচাকে বলেন, “টেক্সটাইল খাতের অবস্থা দিন দিন নাজুক হয়ে যাচ্ছে। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড়ের কারণে সৃষ্ট নিম্নচাপ ও প্রভাবে অনেক এলাকায় লোডশেডিংয়ের সমস্যা ছিল। সর্বোপরি ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা মেটাতে না পারায় বাংলাদেশের টেক্সটাইল খাত এখন চরম হুমকির মুখে। এর ওপর চোরাপথে প্রচুর বিদেশি কাপড় দেশে চলে আসছে, যা আমাদের দেশীয় শিল্পকে পঙ্গু করে দিচ্ছে।”খোকনের মতে, শুধু তৈরি পোশাকের রপ্তানি বাড়ালেই হবে না, দেশীয় ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শক্তিশালী করাও জরুরি। তিনি বলেন, “ভারতে পোশাক খাতের চেয়ে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজে বেশি জোর দেওয়া হয়, কারণ সেখানে ভ্যালু এডিশন বেশি। তৈরি পোশাক খাতে শুধু সিএম (মেকিং চার্জ) পাওয়া যায়, বাকি সব ক্রেতারা নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজে সুতা থেকে কাপড় এবং ডাইং—এই তিন ধাপে ভ্যালু এডিশন অনেক বেশি বাড়ে। ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শক্তিশালী হলে আমাদের দেশীয় শিল্প আরও মজবুত হতো।”
জ্বালানি ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা
টেক্সটাইল মিলগুলোর জন্য জ্বালানি সংকটের সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে জ্বালানির দাম বাড়ার চাপও। ২১ সেপ্টেম্বর ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা এবং পেট্রোলের দাম ১৪০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৬০ টাকা করা হয়। চলতি বছরে এটি ছিল তৃতীয় দফা দামবৃদ্ধি।
গ্যাসের চাপ কমে গেলে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিকল্প হিসেবে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করে। ফলে একদিকে গ্যাস না থাকায় উৎপাদন কমে, অন্যদিকে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ের এই চাপ টেক্সটাইলসহ রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে আরও চাপে ফেলছে।
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে গ্যাস সরবরাহের উন্নতি হলেও শিল্প সংগঠনগুলো এখনো নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের দাবি জানাচ্ছে। ১৬ সেপ্টেম্বর বিটিএমএ, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বাংলাদেশ টেরি টাওয়েল অ্যান্ড লিনেন ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন শিল্প এলাকায় গ্যাস সংকট মোকাবিলায় এলাকাভিত্তিক রেশনিংয়ের প্রস্তাবও দেয়।
দেশের প্রাইমারি টেক্সটাইল খাতে বিটিএমএর সদস্য মিলের সংখ্যা ১ হাজার ৮৮৩টি। সেই হিসাবে পুরোপুরি বন্ধ ও আংশিক সক্ষমতায় চলা প্রায় ১৯৫টি মিলকে মোট সদস্য মিলের সঙ্গে তুলনা করলে সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১০ শতাংশের বেশি। তবে এর মধ্যে কিছু মিল নতুন করে বন্ধ হয়েছে। আবার কিছু মিল চালু হয়েছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস সরবরাহের সাম্প্রতিক উন্নতি টেক্সটাইল খাতে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়েছে। কিন্তু বন্ধ মিলগুলো পুনরায় চালু করা এবং ১৬৫টি কম সক্ষমতায় চলা মিলকে পূর্ণ সক্ষমতায় ফেরাতে শুধু গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো যথেষ্ট নয়। অর্থায়ন, ব্যাংকঋণ, সুদের হার, আমদানি নীতি, স্থানীয় শিল্প সুরক্ষা এবং ব্যবসার সামগ্রিক পরিবেশের সমস্যাগুলোও একসঙ্গে সমাধান করতে হবে।