পশ্চিমবঙ্গের মসনদে বিজেপি: বাংলাদেশের লাভ না ক্ষতি?
মেরিনা মিতু
প্রকাশ : ০৭ মে ২০২৬, ০৯: ০৩
ফল ঘোষণার পর বিজেপি সমর্থকদের উল্লাস। ছবি: সংগৃহীত
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জয় শুধু রাজ্য রাজনীতিতেই নয়, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের প্রেক্ষাপটেও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নিরঙ্কুশ বিজয়, এবং নরেন্দ্র মোদির ইতিবাচক বার্তা–সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক এক নতুন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে।
২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন, শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয়, কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অনেকটা শীতল হয়ে পড়েছিল।
এ ছাড়া বিএনপির সাথে ভারতের অতীত ইতিহাসও খুব একটা সুখকর ছিল না। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ‘অবনতি’ ঘটে।
এই প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান অনেকের কাছে সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে–এটি কি সম্পর্ককে আরও জটিল করবে, নাকি কেন্দ্র ও রাজ্যে রাজনৈতিক সামঞ্জস্যের ক্ষেত্রে নতুন স্থিতিশীলতা আনবে?
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২০৮টিতে জয় নিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বিজেপি। এই জয়ের মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ১৫ বছরের তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনের অবসান ঘটেছে।
পশ্চিমবঙ্গের বিজেপির জয়ের ফলে অর্থনৈতিক চাপ যতটুকু পড়বে, তার চেয়ে অনেক বেশি হবে রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ।
ভারতীয় সংবাধমাধ্যম এনডিটিভি সংবাদ সংস্থা এএনআই-এর বরাত দিয়ে লিখেছে, বাংলাদেশ সরকার বিজেপির জয়ে অভিনন্দন জানিয়েছে। একই সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন সরকার তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তির বিষয়টি বিবেচনা করবে–এমন আশা করছে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় তথ্য বিষয়ক সম্পাদক আজিজুল বারী হেলাল এএনআইকে বলেন, “আমি বিজয়ী শুভেন্দু অধিকারীর বিজেপি দলকে অভিনন্দন জানাই। আমি মনে করি, শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে বিজেপির এই বিজয় পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে সম্পর্ক আগের মতোই ভালোভাবে বজায় রাখতে সহায়তা করবে। এই সম্পর্ক আরও অগ্রসর হবে।”
মমতা ব্যানার্জি তিস্তা চুক্তির ক্ষেত্রে ‘প্রতিবন্ধকতা’ তৈরি করেছিল–এমন মন্তব্য করে পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার চুক্তি চূড়ান্ত করবে বলে আশা প্রকাশ করেন বিএনপির এই নেতা।
হেলাল বলেন, “আসলে, আগে আমরা দেখেছি যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তিস্তা ব্যারেজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাধা ছিলেন। এখন আমার মতে, শুভেন্দুর নেতৃত্বে বিজেপি নির্বাচন জেতায় তিস্তা ব্যারেজ চুক্তি, যা বাংলাদেশ সরকার ও মোদি সরকারের খুবই কাঙ্ক্ষিত ছিল, তা বাস্তবায়নে শুভেন্দু সহায়তা করবেন। আমি মনে করি, তৃণমূল কংগ্রেসের পরিবর্তে বিজেপি ক্ষমতায় আসায় এখন তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে।”
তবে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং থেকে এ বিষয়ে এখনো কিছু জানানো হয়নি।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরচাকে বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা জানানোর বিষয়ে আপাতত নো কমেন্ট।”
পশ্চিমবঙ্গ ভারতের একটি রাজ্য। রাজ্য সরকারের পলিসি নেওয়ার সক্ষমতা নেই। পলিসি তো কেন্দ্রীয় সরকারই করে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে অলরেডি নেতিবাচক প্রভাব আছে।
এদিকে বাণিজ্যসহ দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব পড়তে পারে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। চরচাকে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য সম্পর্ক, বিনিয়োগ প্রবাহ, ট্রানজিট সুবিধা এবং আঞ্চলিক সরবরাহ চেইনের ওপর যেকোনো নীতিগত পরিবর্তনের প্রভাব সরাসরি অর্থনীতিতে পড়তে পারে। বিশেষ করে আমদানি-রপ্তানি খরচ, শিল্পের কাঁচামালের সহজলভ্যতা এবং সীমান্ত বাণিজ্যের গতি–এসব বিষয় ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে। তাই রাজনৈতিক বক্তব্য বা অবস্থান যতই থাকুক, বাস্তব অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এবং স্থিতিশীল সহযোগিতাই সবচেয়ে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। আমরা মনে করি, ভারতের সাথে আমাদের সেই বোঝাপড়াটা আগের থেকে বেটার এবং আমরা আশাবাদী।”
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ চরচাকে বলেন, “আমরা পজেটিভ ওয়েতেই দেখছি। অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মন্তব্য করতে চাই না। তবে যা দেখা যাচ্ছে, তাতে বাংলাদেশের জন্য হোপফুল কিছুই দেখছি।”
বিএনপির একাধিক নেতা মনে করছেন, পশ্চিমবঙ্গের সরকারে পরিবর্তন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে বড় কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। বরং কেন্দ্রীয় রাজনীতির ধারাবাহিকতার কারণে সম্পর্ক অনেকটাই স্থিতিশীল থাকবে বলে তাদের অভিমত।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান চরচাকে বলেন, “ভারত আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র। দেশের স্বার্থ রক্ষা করেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা হবে।”
নির্বাচিতদের অভিনন্দন জানিয়ে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় চরচাকে বলেন, “ভারতের জনগণ তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে তাদের নেতা নির্বাচন করেছে। সেখানে কোন দল ক্ষমতায় এল-না এল তা মুখ্য না। তা নিয়ে আমাদের মাথাব্যথাও নেই। আমরা স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করি। তাই যে-ই ক্ষমতায় আসুক না কেন, সম্পর্ক একই থাকবে। দ্বিপক্ষীয় মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে আমরা আমাদের দেশের জনস্বার্থকেই গুরুত্ব দেব।”
আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও বাণিজ্য বিশ্লেষক মোবাশ্বের হোসেন টুটুল চরচাকে বলেন, “গত পাঁচ দশক ধরে ভারতের কেন্দ্রীয় শাসক দল কখনোই পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসতে পারেনি। এবার সেই ধারায় একটি বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। দীর্ঘদিন কেন্দ্র ও রাজ্যে ভিন্ন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকায় পশ্চিমবঙ্গ শিল্পায়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে ছিল। তরুণ প্রজন্ম লক্ষ্য করেছে, দেশের অন্যান্য রাজ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, দীর্ঘ বাম শাসনের অবসানের পরও মমতা ব্যানার্জি পশ্চিমবঙ্গের মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পুরোপুরি সফল হননি। এই প্রেক্ষাপটেই রাজ্যের একটি বড় অংশের মানুষ বিজেপির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। এই বদলে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কে কোনো প্রভাব পড়বে না।”
যা বলছে জামায়াত
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে কেমন প্রভাব পড়তে পারে জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ চরচাকে বলেন, “পশ্চিমবঙ্গ ভারতের একটি রাজ্য। রাজ্য সরকারের পলিসি নেওয়ার সক্ষমতা নেই। পলিসি তো কেন্দ্রীয় সরকারই করে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে অলরেডি নেতিবাচক প্রভাব আছে।”
‘পুশ ইন’ হওয়ার আশঙ্কা করছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আশঙ্কা তো সব সময় আছে। তারা কী করে আগে দেখি। প্রতিবেশী যদি ভালো আচরণ না করে, তাহলে আশঙ্কা সব সময় থাকে।”
আশঙ্কায় ইসলামী আন্দোলন
তবে বিজেপির জয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা ইউনূস আহমাদ। তিনি চরচাকে বলেন, “যে খবর পাচ্ছি, তাতে তো প্রভাব পড়ার আশঙ্কা আছে।”
কী ধরনের প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সেখানে মুসলিম বিদ্বেষী একটি বিষয় তো আগে থেকেই আছে। বিজেপির নেতা-কর্মীরা যারা আছেন, তাদের মধ্য থেকে মুসলিম বিদ্বেষ ছড়ানোর কিছু খবর কিন্তু এখনই আসতেছে। এটা আমাদের দেশের জন্য একটি আশঙ্কা থেকে যায়। ভারত সরকার যদি এ বিষয়ে নজর না দেয়, যারা উশৃঙ্খল তাদের নিয়ন্ত্রণ না করে, তাহলে আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।”
যা ভাবছে বামরা
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সহকারী সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন চরচাকে বলেন, “পশ্চিমবঙ্গের বিজেপির জয়ের ফলে অর্থনৈতিক চাপ যতটুকু পড়বে, তার চেয়ে অনেক বেশি হবে রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ। যেহেতু সাম্প্রদায়িক রাজনীতি সবসময় প্রতিপক্ষ খুঁজে বের করতে চায়, এবং সে প্রতিপক্ষটা হবে যে সত্যিকারের প্রতিপক্ষ নয়–জনগণকে কখনো বোকা বানানো, অথবা জনগণকে উত্তেজিত করা–মূল সমস্যা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়াটাই তো তাদের কাজ।”
রতন বলেন, “দেশের এত সমস্যা। ভারতের এত সমস্যা–ভারতের সেই সমস্যাগুলো কি বিজেপি নির্বাচনের সময় এক্সেস করেছিল? তারা করেনি। তারা বিভিন্ন কারণে সবকিছু ঢেকে দিতে চেয়েছিল। এবং তারা যেভাবেই হোক মানুষের ধর্মীয় আবেগ, কখনো কখনো সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা, কখনো কখনো বাংলাদেশের প্রতি কিছুটা বিদ্বেষ–এগুলো দিয়ে তারা ভোটের বৈঠা চালিয়েছে। ফলে তারা সবসময় চেষ্টা করবে রাজনীতিতে এই বিষয়টাকে সামনে নিয়ে আসার, এবং তার প্রভাবে বাংলাদেশেও সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা কিছুটা বাড়বে।”
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে হারের পরও পদত্যাগ করতে রাজি নন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
বাসদের এই নেতা বলেন, “একদিকে পশ্চিমবঙ্গ, এদিকে আসাম এবং ত্রিপুরা–তিন জায়গাতেই যেহেতু বিজেপি ক্ষমতায় আছে, ফলে বাংলাদেশকে তারা এক্ষেত্রে কখনো কখনো ভবিষ্যতের একটা পাঠ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করবে–যে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা হয়। এইভাবে তারা সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে সুবিধা পাবে। সাফার হবে আমাদের সাধারণ মানুষ, কিন্তু রাজনীতিতে একটা উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি থাকবে।”
ফল ঘোষণার পর বিজেপি সমর্থকদের উল্লাস। ছবি: সংগৃহীত
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জয় শুধু রাজ্য রাজনীতিতেই নয়, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের প্রেক্ষাপটেও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নিরঙ্কুশ বিজয়, এবং নরেন্দ্র মোদির ইতিবাচক বার্তা–সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক এক নতুন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে।
২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন, শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয়, কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অনেকটা শীতল হয়ে পড়েছিল।
এ ছাড়া বিএনপির সাথে ভারতের অতীত ইতিহাসও খুব একটা সুখকর ছিল না। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ‘অবনতি’ ঘটে।
এই প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান অনেকের কাছে সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে–এটি কি সম্পর্ককে আরও জটিল করবে, নাকি কেন্দ্র ও রাজ্যে রাজনৈতিক সামঞ্জস্যের ক্ষেত্রে নতুন স্থিতিশীলতা আনবে?
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২০৮টিতে জয় নিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বিজেপি। এই জয়ের মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ১৫ বছরের তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনের অবসান ঘটেছে।
পশ্চিমবঙ্গের বিজেপির জয়ের ফলে অর্থনৈতিক চাপ যতটুকু পড়বে, তার চেয়ে অনেক বেশি হবে রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ।
ভারতীয় সংবাধমাধ্যম এনডিটিভি সংবাদ সংস্থা এএনআই-এর বরাত দিয়ে লিখেছে, বাংলাদেশ সরকার বিজেপির জয়ে অভিনন্দন জানিয়েছে। একই সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন সরকার তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তির বিষয়টি বিবেচনা করবে–এমন আশা করছে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় তথ্য বিষয়ক সম্পাদক আজিজুল বারী হেলাল এএনআইকে বলেন, “আমি বিজয়ী শুভেন্দু অধিকারীর বিজেপি দলকে অভিনন্দন জানাই। আমি মনে করি, শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে বিজেপির এই বিজয় পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে সম্পর্ক আগের মতোই ভালোভাবে বজায় রাখতে সহায়তা করবে। এই সম্পর্ক আরও অগ্রসর হবে।”
মমতা ব্যানার্জি তিস্তা চুক্তির ক্ষেত্রে ‘প্রতিবন্ধকতা’ তৈরি করেছিল–এমন মন্তব্য করে পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার চুক্তি চূড়ান্ত করবে বলে আশা প্রকাশ করেন বিএনপির এই নেতা।
হেলাল বলেন, “আসলে, আগে আমরা দেখেছি যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তিস্তা ব্যারেজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাধা ছিলেন। এখন আমার মতে, শুভেন্দুর নেতৃত্বে বিজেপি নির্বাচন জেতায় তিস্তা ব্যারেজ চুক্তি, যা বাংলাদেশ সরকার ও মোদি সরকারের খুবই কাঙ্ক্ষিত ছিল, তা বাস্তবায়নে শুভেন্দু সহায়তা করবেন। আমি মনে করি, তৃণমূল কংগ্রেসের পরিবর্তে বিজেপি ক্ষমতায় আসায় এখন তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে।”
তবে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং থেকে এ বিষয়ে এখনো কিছু জানানো হয়নি।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরচাকে বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা জানানোর বিষয়ে আপাতত নো কমেন্ট।”
পশ্চিমবঙ্গ ভারতের একটি রাজ্য। রাজ্য সরকারের পলিসি নেওয়ার সক্ষমতা নেই। পলিসি তো কেন্দ্রীয় সরকারই করে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে অলরেডি নেতিবাচক প্রভাব আছে।
এদিকে বাণিজ্যসহ দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব পড়তে পারে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। চরচাকে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য সম্পর্ক, বিনিয়োগ প্রবাহ, ট্রানজিট সুবিধা এবং আঞ্চলিক সরবরাহ চেইনের ওপর যেকোনো নীতিগত পরিবর্তনের প্রভাব সরাসরি অর্থনীতিতে পড়তে পারে। বিশেষ করে আমদানি-রপ্তানি খরচ, শিল্পের কাঁচামালের সহজলভ্যতা এবং সীমান্ত বাণিজ্যের গতি–এসব বিষয় ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে। তাই রাজনৈতিক বক্তব্য বা অবস্থান যতই থাকুক, বাস্তব অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এবং স্থিতিশীল সহযোগিতাই সবচেয়ে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। আমরা মনে করি, ভারতের সাথে আমাদের সেই বোঝাপড়াটা আগের থেকে বেটার এবং আমরা আশাবাদী।”
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ চরচাকে বলেন, “আমরা পজেটিভ ওয়েতেই দেখছি। অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মন্তব্য করতে চাই না। তবে যা দেখা যাচ্ছে, তাতে বাংলাদেশের জন্য হোপফুল কিছুই দেখছি।”
বিএনপির একাধিক নেতা মনে করছেন, পশ্চিমবঙ্গের সরকারে পরিবর্তন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে বড় কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। বরং কেন্দ্রীয় রাজনীতির ধারাবাহিকতার কারণে সম্পর্ক অনেকটাই স্থিতিশীল থাকবে বলে তাদের অভিমত।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান চরচাকে বলেন, “ভারত আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র। দেশের স্বার্থ রক্ষা করেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা হবে।”
নির্বাচিতদের অভিনন্দন জানিয়ে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় চরচাকে বলেন, “ভারতের জনগণ তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে তাদের নেতা নির্বাচন করেছে। সেখানে কোন দল ক্ষমতায় এল-না এল তা মুখ্য না। তা নিয়ে আমাদের মাথাব্যথাও নেই। আমরা স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করি। তাই যে-ই ক্ষমতায় আসুক না কেন, সম্পর্ক একই থাকবে। দ্বিপক্ষীয় মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে আমরা আমাদের দেশের জনস্বার্থকেই গুরুত্ব দেব।”
আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও বাণিজ্য বিশ্লেষক মোবাশ্বের হোসেন টুটুল চরচাকে বলেন, “গত পাঁচ দশক ধরে ভারতের কেন্দ্রীয় শাসক দল কখনোই পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসতে পারেনি। এবার সেই ধারায় একটি বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। দীর্ঘদিন কেন্দ্র ও রাজ্যে ভিন্ন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকায় পশ্চিমবঙ্গ শিল্পায়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে ছিল। তরুণ প্রজন্ম লক্ষ্য করেছে, দেশের অন্যান্য রাজ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, দীর্ঘ বাম শাসনের অবসানের পরও মমতা ব্যানার্জি পশ্চিমবঙ্গের মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পুরোপুরি সফল হননি। এই প্রেক্ষাপটেই রাজ্যের একটি বড় অংশের মানুষ বিজেপির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। এই বদলে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কে কোনো প্রভাব পড়বে না।”
যা বলছে জামায়াত
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে কেমন প্রভাব পড়তে পারে জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ চরচাকে বলেন, “পশ্চিমবঙ্গ ভারতের একটি রাজ্য। রাজ্য সরকারের পলিসি নেওয়ার সক্ষমতা নেই। পলিসি তো কেন্দ্রীয় সরকারই করে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে অলরেডি নেতিবাচক প্রভাব আছে।”
‘পুশ ইন’ হওয়ার আশঙ্কা করছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আশঙ্কা তো সব সময় আছে। তারা কী করে আগে দেখি। প্রতিবেশী যদি ভালো আচরণ না করে, তাহলে আশঙ্কা সব সময় থাকে।”
আশঙ্কায় ইসলামী আন্দোলন
তবে বিজেপির জয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা ইউনূস আহমাদ। তিনি চরচাকে বলেন, “যে খবর পাচ্ছি, তাতে তো প্রভাব পড়ার আশঙ্কা আছে।”
কী ধরনের প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সেখানে মুসলিম বিদ্বেষী একটি বিষয় তো আগে থেকেই আছে। বিজেপির নেতা-কর্মীরা যারা আছেন, তাদের মধ্য থেকে মুসলিম বিদ্বেষ ছড়ানোর কিছু খবর কিন্তু এখনই আসতেছে। এটা আমাদের দেশের জন্য একটি আশঙ্কা থেকে যায়। ভারত সরকার যদি এ বিষয়ে নজর না দেয়, যারা উশৃঙ্খল তাদের নিয়ন্ত্রণ না করে, তাহলে আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।”
যা ভাবছে বামরা
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সহকারী সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন চরচাকে বলেন, “পশ্চিমবঙ্গের বিজেপির জয়ের ফলে অর্থনৈতিক চাপ যতটুকু পড়বে, তার চেয়ে অনেক বেশি হবে রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ। যেহেতু সাম্প্রদায়িক রাজনীতি সবসময় প্রতিপক্ষ খুঁজে বের করতে চায়, এবং সে প্রতিপক্ষটা হবে যে সত্যিকারের প্রতিপক্ষ নয়–জনগণকে কখনো বোকা বানানো, অথবা জনগণকে উত্তেজিত করা–মূল সমস্যা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়াটাই তো তাদের কাজ।”
রতন বলেন, “দেশের এত সমস্যা। ভারতের এত সমস্যা–ভারতের সেই সমস্যাগুলো কি বিজেপি নির্বাচনের সময় এক্সেস করেছিল? তারা করেনি। তারা বিভিন্ন কারণে সবকিছু ঢেকে দিতে চেয়েছিল। এবং তারা যেভাবেই হোক মানুষের ধর্মীয় আবেগ, কখনো কখনো সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা, কখনো কখনো বাংলাদেশের প্রতি কিছুটা বিদ্বেষ–এগুলো দিয়ে তারা ভোটের বৈঠা চালিয়েছে। ফলে তারা সবসময় চেষ্টা করবে রাজনীতিতে এই বিষয়টাকে সামনে নিয়ে আসার, এবং তার প্রভাবে বাংলাদেশেও সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা কিছুটা বাড়বে।”
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে হারের পরও পদত্যাগ করতে রাজি নন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
বাসদের এই নেতা বলেন, “একদিকে পশ্চিমবঙ্গ, এদিকে আসাম এবং ত্রিপুরা–তিন জায়গাতেই যেহেতু বিজেপি ক্ষমতায় আছে, ফলে বাংলাদেশকে তারা এক্ষেত্রে কখনো কখনো ভবিষ্যতের একটা পাঠ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করবে–যে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা হয়। এইভাবে তারা সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে সুবিধা পাবে। সাফার হবে আমাদের সাধারণ মানুষ, কিন্তু রাজনীতিতে একটা উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি থাকবে।”