চরচা প্রতিবেদক

দেশের বর্তমান কর ব্যবস্থাকে ‘জুলুম ও হয়রানিমূলক’ হিসেবে আখ্যায়িত করে এর আমূল সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতা ও অর্থনীতিবিদরা। আজ শনিবার রাজধানীর সিরডাপ আন্তর্জাতিক কনফারেন্স সেন্টারে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘চরচা ডটকম’ আয়োজিত ‘সংকট মুহূর্তের বাজেট ২০২৬-২৭’ শীর্ষক আলোচনায় এ দাবি জানান তারা।
গো্লটেবিল আলোচনায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকাণ্ডকে ‘ট্যাক্স টেররিজম’ বা কর সন্ত্রাস হিসেবে অভিহিত করেছেন ব্যবসায়ী নেতারা। তারা বলেন, বর্তমান করনীতি ও আদায়ের পদ্ধতি দেশে বিনিয়োগের পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আলোচনায় এপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসিম মঞ্জুর বলেন, “বাংলাদেশে মোট যে কর আদায় হয়, তার ৭৮ শতাংশই উৎসে কর কর্তন (টিডিএস) থেকে আসে। এটা যদি ৭০ শতাংশও হয়, এটা খুবই আনহেলদি একটি সিচুয়েশন। আমরা মনে করি এটা অর্থনীতিকে খুব আনকপিটেনটিভ করে তুলছে। এতে প্রত্যেকটা জিনিসের দাম বেড়ে যাচ্ছে। আমরা এ রকমও জরিপ দেখেছি যে, ঢাকা শহরের কস্ট অব লিভিং অনেক ক্ষেত্রে ওয়েস্টার্ন সিটির কাছাকাছি। কিন্তু সে তুলনায় আমরা কী কোয়ালিটি অব লাইফ পাচ্ছি–সেটা আমরা জানি।”

কর হয়রানির কঠোর সমালোচনা করে ব্যবসায়ী নেতা ও রপ্তানিকারক মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “ব্যবসায়ীরা আজ ট্যাক্স টেররিজমের কবলে পড়েছে। আইন পাস করে আমাদের কাছ থেকে টাকাটা ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে।” তিনি অভিযোগ করেন, রপ্তানিকারকদের কাছ থেকে অগ্রিম আয়কর (AIT) কেটে নেওয়া হলেও তা ফেরত দেওয়া বা সমন্বয় করার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি, যা ব্যবসায়ীদের মূলধন সংকটে ফেলছে। এর বিকল্প হিসেবে তিনি প্রস্তাব দেন, “অতিরিক্ত করের বিপরীতে সরকারকে বন্ড ইস্যু করতে হবে, যা দিয়ে পরবর্তীতে কর বা অন্য সরকারি পাওনা সমন্বয় করা যাবে।”
একই প্রসঙ্গে নাসিম মঞ্জুর বলেন, “আমাদের আমদানিকৃত কাঁচামাল বা যেকোনো পণ্য এয়ারপোর্টে ফেলে রাখা এবং পরে এটাকে ছাড়ানোর জন্য বিভিন্ন রকমের খরচ করা–এটা আমাদের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিচ্ছে। অনেক সময় আমদানির সময় কর কেটে নেওয়া হয়। কিন্তু পরে সেটা আমরা অ্যাডজাস্ট করার জায়গা পাই না। এটার একটা ব্যবস্থা করতে হবে। এটাকে পুরোপুরি সক্রিয়, কার্যকর ও অনলাইনভিত্তিক করতে হবে। আমাদের কোথাও কোনো কর অফিসে যেন যেতে না হয়। গেলেই ফ্রিকশন হবে এবং ফ্রিকশন থেকে করাপশন হবে।”
বিনিয়োগ বাড়াতে করপোরেট কর কমানোর ওপর জোর দিয়ে নাসিম মঞ্জুর বলেন, ““প্রাইভেট সেক্টরের কাজ হচ্ছে বিনিয়োগ করা। আমরা প্রায় ৭২ শতাংশ বিনিয়োগ সঞ্চার করি। এখান থেকে কর্মসংস্থান হয়। সেখানে আমাদের করপোরেট ট্যাক্স এই মুহূর্তে সাড়ে ২৭ শতাংশ। এটাকে শিগগিরই শর্তবিহীনভাবে আড়াই শতাংশ কমানো দরকার। এবং আগামী তিন বছরের মধ্যে এটাকে কীভাবে ভিয়েতনামের সমতূল্য ২০ শতাংশে আনা যায়, বেজটাকে বাড়িয়ে, সেটা দেখতে হবে। ভ্যালুয়েশন, আমরা মনে করি সবচেয়ে বড় সমস্যা।”
বিদেশি বিনিয়োগ প্রশ্নে এপেক্স এমডি বলেন, “বিদেশ থেকে বিনিয়োগকারীরা যখন আসছে, তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে ভয় পায়–একটা প্রধান কারণ হচ্ছে ট্যাক্সের কোনো নিশ্চয়তা নাই–আজকে ২০, কালকে ২২, পরশু ২৫ পারসেন্ট। তাদের কথা হলো–২০ পারসেন্ট নাও, সমস্যা নেই। বলো যে তিন বছর ধরে আছে। আমরা একটা প্রতিশ্রুতি চাই, এই সরকার যে ট্যাক্স রেগুলেট করবে–এটা আগামী তিন বছরের মধ্যে আন্তর্জাতিক কমপিটেটিভ করবে।”
এ ক্ষেত্রে প্রথমেই উৎসে কর কর্তনের মতো প্রবণতা কমাতে হবে উল্লেখ করে নাসিম মঞ্জুর বলেন, “আমরা মনে করি ১৫ শতাংশ ভ্যাট–এটা অনেক বেশি। এখানে দুটো রেট হতে পারে, বা তিনটা রেট হতে পারে। কিন্তু এটাকে অতিসত্বর কমানো দরকার। আমরা পার্শ্ববর্তী দেশে দেখেছি, তারা যখন ইনডিপেনডেন্স ট্যারিফের মোকাবিলা করেছেন, সঙ্গে সঙ্গে তারা জিএসটি কমিয়ে দিয়ে কমপিটেটিভনেস বাড়িয়েছে।”
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের ক্ষেত্রে করহার কমানোর প্রস্তাব তুলে নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘আমরা এসএমই খাতের দিকে তাকালে দেখব, সেখানে একটা ন্যূনতম করের একটা ব্যবস্থা আছে। এটাকে ইমিডিয়েটলি শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ করা উচিত, যাতে ছোট ব্যবসায়ীরা টিকে থাকতে পারে।”
নিরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এই ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, ‘আমরা যাকে খুশি তাকে অডিট করব, মোটা অঙ্কের টাকা চাইব, না দিলে অডিট করব–এখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।’ রিস্ক বেইজড অডিট সিস্টেমের প্রস্তাব তুলে নাসিম মঞ্জুর বলেন, “ঝুঁকি মূল্যায়ন করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আগে কোনো ট্র্যাক রেকর্ড আছে কি না–দেখে সে অনুযায়ী তা অটোমেটেড করে ফেলেন।
পাশাপাশি লার্জ ট্যাক্স পেয়ারস ইউনিট (এলটিইউ): “এলটিইউ থেকে একটা বড় অঙ্কের কর পাই। আগেও বলেছি, আবার বলছি–বাংলাদেশে দুর্ভাগ্যবশত আমরা যারা কর দিই, আমরা নিজেদেরটাও দিই, যারা দেয় না, তাদেরটাও দিই। আর কতকাল এভাবে চলবে? সেটা যদি হতেই হয়–লার্জ টেক্সপেয়ারে যদি আপনারা আমাদের ফেলতেই চান, তাহলে সেই সেবাটা আমাদের দিন।”
করনীতি ও আদায়কারী সংস্থা পৃথকীকরণের দাবি
ব্যবসায়ী নেতা এবং সাবেক আমলারা কর কাঠামো সংস্কারে একটি মৌলিক পরিবর্তনের দাবি তুলেছেন। মোহাম্মদ হাতেম এবং সাবেক অর্থসচিব মুসলিম চৌধুরী উভয়েই একমত হয়ে বলেন, একই সংস্থার হাতে করনীতি প্রণয়ন এবং কর আদায়ের ক্ষমতা থাকা অনৈতিক।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “ট্যাক্স কালেক্টর আর পলিসি মেকার একই লোক হওয়া উচিত না; এই দুই বিভাগকে অবিলম্বে আলাদা করতে হবে। এ ছাড়া বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার সুবিধার জন্য কর নীতি অন্তত ৫ বছরের জন্য স্থিতিশীল রাখতে হবে।”
অটোমেশনের নামে হয়রানি ও আস্থার সংকট
কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে আলোচনা হলেও বক্তারা বর্তমান প্রক্রিয়ার সমালোচনা করেন। আইসিএমএবি-র সভাপতি কাওসার আলম বলেন, “যিনি ট্যাক্সপেয়ার তার আস্থার অভাব আছে। তিনি চিন্তা করেন তার টাকার বিনিময়ে সরকার কী সার্ভিস দিচ্ছে।”
কাওসার আলম মনে করেন, শুধু রাজস্ব বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা না দিয়ে আদায়ের পদ্ধতিতে গুণগত পরিবর্তন আনতে হবে।
এ বিষয়ে নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের ডিন ড. ওয়ারসুল করিম বলেন, “অটোমেশন মানে শুধু ওয়েবসাইটে গিয়ে রিটার্ন জমা দেওয়া নয়, বরং দেশের প্রতিটি বিক্রয়কেন্দ্রকে (POS) এনবিআর সার্ভারের সাথে যুক্ত করতে হবে।”
অন্যদিকে নাসিম মঞ্জুর পরামর্শ দেন, অডিটের নামে হয়রানি বন্ধ করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ভিত্তিক ‘রিস্ক-বেজড’ অডিট ব্যবস্থা চালু করার, যাতে সৎ ব্যবসায়ীরা অহেতুক হেনস্তার শিকার না হন।

ফেসলেস সার্ভিস ও স্বচ্ছতা
সাবেক অর্থসচিব মুসলিম চৌধুরী কর ব্যবস্থাকে হয়রানিমুক্ত করতে ‘ফেসলেস’ ও অনলাইন সার্ভিস চালুর ওপর জোর দেন। তিনি মনে করেন, করদাতার সাথে কর কর্মকর্তার সরাসরি যোগাযোগ যত কমবে, দুর্নীতি ও ‘ট্যাক্স টেররিজম’ ততটাই হ্রাস পাবে।
চরচা সম্পাদক সোহরাব হাসানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এ গোলটেবিল আলোচনায় ব্যবসায়ী নেতা ও অর্থনীতিবিদদের এসব প্রস্তাব ও দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, “বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমরা লক্ষ্য করেছি যে, পাঁচটি বিষয়ের কথা তারা (বিনিয়োগকারীরা) উল্লেখ করেন। প্রথমেই আছে নীতির ধারাবাহিকতা। একজন বিনিয়োগকারী বিনিয়োগ করতে পারেন, যদি তিনি ন্যূনতম পাঁচ বছরের ক্ষেত্রে পরিকর্পনা করতে পারেন। আপনারা ১১ জুন দেখতে পারবেন যে, কর কাঠামোর ক্ষেত্রে এর প্রতিফলন ঘটবে। দ্বিতীয় হচ্ছে–বিভিন্ন টেবিলে তাকে ঘুরে বেড়াতে হয়, সাংবাদিকতার ভাষায় যাকে বলে লাল ফিতার দৌরাত্ম, সে ক্ষেত্রেও আমরা বিনিয়ন্ত্রীকরণের বাস্তবায়নযোগ্য পদ্ধতিগুলো উল্লেখ করব।”

দেশের বর্তমান কর ব্যবস্থাকে ‘জুলুম ও হয়রানিমূলক’ হিসেবে আখ্যায়িত করে এর আমূল সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতা ও অর্থনীতিবিদরা। আজ শনিবার রাজধানীর সিরডাপ আন্তর্জাতিক কনফারেন্স সেন্টারে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘চরচা ডটকম’ আয়োজিত ‘সংকট মুহূর্তের বাজেট ২০২৬-২৭’ শীর্ষক আলোচনায় এ দাবি জানান তারা।
গো্লটেবিল আলোচনায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকাণ্ডকে ‘ট্যাক্স টেররিজম’ বা কর সন্ত্রাস হিসেবে অভিহিত করেছেন ব্যবসায়ী নেতারা। তারা বলেন, বর্তমান করনীতি ও আদায়ের পদ্ধতি দেশে বিনিয়োগের পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আলোচনায় এপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসিম মঞ্জুর বলেন, “বাংলাদেশে মোট যে কর আদায় হয়, তার ৭৮ শতাংশই উৎসে কর কর্তন (টিডিএস) থেকে আসে। এটা যদি ৭০ শতাংশও হয়, এটা খুবই আনহেলদি একটি সিচুয়েশন। আমরা মনে করি এটা অর্থনীতিকে খুব আনকপিটেনটিভ করে তুলছে। এতে প্রত্যেকটা জিনিসের দাম বেড়ে যাচ্ছে। আমরা এ রকমও জরিপ দেখেছি যে, ঢাকা শহরের কস্ট অব লিভিং অনেক ক্ষেত্রে ওয়েস্টার্ন সিটির কাছাকাছি। কিন্তু সে তুলনায় আমরা কী কোয়ালিটি অব লাইফ পাচ্ছি–সেটা আমরা জানি।”

কর হয়রানির কঠোর সমালোচনা করে ব্যবসায়ী নেতা ও রপ্তানিকারক মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “ব্যবসায়ীরা আজ ট্যাক্স টেররিজমের কবলে পড়েছে। আইন পাস করে আমাদের কাছ থেকে টাকাটা ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে।” তিনি অভিযোগ করেন, রপ্তানিকারকদের কাছ থেকে অগ্রিম আয়কর (AIT) কেটে নেওয়া হলেও তা ফেরত দেওয়া বা সমন্বয় করার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি, যা ব্যবসায়ীদের মূলধন সংকটে ফেলছে। এর বিকল্প হিসেবে তিনি প্রস্তাব দেন, “অতিরিক্ত করের বিপরীতে সরকারকে বন্ড ইস্যু করতে হবে, যা দিয়ে পরবর্তীতে কর বা অন্য সরকারি পাওনা সমন্বয় করা যাবে।”
একই প্রসঙ্গে নাসিম মঞ্জুর বলেন, “আমাদের আমদানিকৃত কাঁচামাল বা যেকোনো পণ্য এয়ারপোর্টে ফেলে রাখা এবং পরে এটাকে ছাড়ানোর জন্য বিভিন্ন রকমের খরচ করা–এটা আমাদের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিচ্ছে। অনেক সময় আমদানির সময় কর কেটে নেওয়া হয়। কিন্তু পরে সেটা আমরা অ্যাডজাস্ট করার জায়গা পাই না। এটার একটা ব্যবস্থা করতে হবে। এটাকে পুরোপুরি সক্রিয়, কার্যকর ও অনলাইনভিত্তিক করতে হবে। আমাদের কোথাও কোনো কর অফিসে যেন যেতে না হয়। গেলেই ফ্রিকশন হবে এবং ফ্রিকশন থেকে করাপশন হবে।”
বিনিয়োগ বাড়াতে করপোরেট কর কমানোর ওপর জোর দিয়ে নাসিম মঞ্জুর বলেন, ““প্রাইভেট সেক্টরের কাজ হচ্ছে বিনিয়োগ করা। আমরা প্রায় ৭২ শতাংশ বিনিয়োগ সঞ্চার করি। এখান থেকে কর্মসংস্থান হয়। সেখানে আমাদের করপোরেট ট্যাক্স এই মুহূর্তে সাড়ে ২৭ শতাংশ। এটাকে শিগগিরই শর্তবিহীনভাবে আড়াই শতাংশ কমানো দরকার। এবং আগামী তিন বছরের মধ্যে এটাকে কীভাবে ভিয়েতনামের সমতূল্য ২০ শতাংশে আনা যায়, বেজটাকে বাড়িয়ে, সেটা দেখতে হবে। ভ্যালুয়েশন, আমরা মনে করি সবচেয়ে বড় সমস্যা।”
বিদেশি বিনিয়োগ প্রশ্নে এপেক্স এমডি বলেন, “বিদেশ থেকে বিনিয়োগকারীরা যখন আসছে, তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে ভয় পায়–একটা প্রধান কারণ হচ্ছে ট্যাক্সের কোনো নিশ্চয়তা নাই–আজকে ২০, কালকে ২২, পরশু ২৫ পারসেন্ট। তাদের কথা হলো–২০ পারসেন্ট নাও, সমস্যা নেই। বলো যে তিন বছর ধরে আছে। আমরা একটা প্রতিশ্রুতি চাই, এই সরকার যে ট্যাক্স রেগুলেট করবে–এটা আগামী তিন বছরের মধ্যে আন্তর্জাতিক কমপিটেটিভ করবে।”
এ ক্ষেত্রে প্রথমেই উৎসে কর কর্তনের মতো প্রবণতা কমাতে হবে উল্লেখ করে নাসিম মঞ্জুর বলেন, “আমরা মনে করি ১৫ শতাংশ ভ্যাট–এটা অনেক বেশি। এখানে দুটো রেট হতে পারে, বা তিনটা রেট হতে পারে। কিন্তু এটাকে অতিসত্বর কমানো দরকার। আমরা পার্শ্ববর্তী দেশে দেখেছি, তারা যখন ইনডিপেনডেন্স ট্যারিফের মোকাবিলা করেছেন, সঙ্গে সঙ্গে তারা জিএসটি কমিয়ে দিয়ে কমপিটেটিভনেস বাড়িয়েছে।”
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের ক্ষেত্রে করহার কমানোর প্রস্তাব তুলে নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘আমরা এসএমই খাতের দিকে তাকালে দেখব, সেখানে একটা ন্যূনতম করের একটা ব্যবস্থা আছে। এটাকে ইমিডিয়েটলি শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ করা উচিত, যাতে ছোট ব্যবসায়ীরা টিকে থাকতে পারে।”
নিরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এই ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, ‘আমরা যাকে খুশি তাকে অডিট করব, মোটা অঙ্কের টাকা চাইব, না দিলে অডিট করব–এখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।’ রিস্ক বেইজড অডিট সিস্টেমের প্রস্তাব তুলে নাসিম মঞ্জুর বলেন, “ঝুঁকি মূল্যায়ন করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আগে কোনো ট্র্যাক রেকর্ড আছে কি না–দেখে সে অনুযায়ী তা অটোমেটেড করে ফেলেন।
পাশাপাশি লার্জ ট্যাক্স পেয়ারস ইউনিট (এলটিইউ): “এলটিইউ থেকে একটা বড় অঙ্কের কর পাই। আগেও বলেছি, আবার বলছি–বাংলাদেশে দুর্ভাগ্যবশত আমরা যারা কর দিই, আমরা নিজেদেরটাও দিই, যারা দেয় না, তাদেরটাও দিই। আর কতকাল এভাবে চলবে? সেটা যদি হতেই হয়–লার্জ টেক্সপেয়ারে যদি আপনারা আমাদের ফেলতেই চান, তাহলে সেই সেবাটা আমাদের দিন।”
করনীতি ও আদায়কারী সংস্থা পৃথকীকরণের দাবি
ব্যবসায়ী নেতা এবং সাবেক আমলারা কর কাঠামো সংস্কারে একটি মৌলিক পরিবর্তনের দাবি তুলেছেন। মোহাম্মদ হাতেম এবং সাবেক অর্থসচিব মুসলিম চৌধুরী উভয়েই একমত হয়ে বলেন, একই সংস্থার হাতে করনীতি প্রণয়ন এবং কর আদায়ের ক্ষমতা থাকা অনৈতিক।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “ট্যাক্স কালেক্টর আর পলিসি মেকার একই লোক হওয়া উচিত না; এই দুই বিভাগকে অবিলম্বে আলাদা করতে হবে। এ ছাড়া বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার সুবিধার জন্য কর নীতি অন্তত ৫ বছরের জন্য স্থিতিশীল রাখতে হবে।”
অটোমেশনের নামে হয়রানি ও আস্থার সংকট
কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে আলোচনা হলেও বক্তারা বর্তমান প্রক্রিয়ার সমালোচনা করেন। আইসিএমএবি-র সভাপতি কাওসার আলম বলেন, “যিনি ট্যাক্সপেয়ার তার আস্থার অভাব আছে। তিনি চিন্তা করেন তার টাকার বিনিময়ে সরকার কী সার্ভিস দিচ্ছে।”
কাওসার আলম মনে করেন, শুধু রাজস্ব বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা না দিয়ে আদায়ের পদ্ধতিতে গুণগত পরিবর্তন আনতে হবে।
এ বিষয়ে নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের ডিন ড. ওয়ারসুল করিম বলেন, “অটোমেশন মানে শুধু ওয়েবসাইটে গিয়ে রিটার্ন জমা দেওয়া নয়, বরং দেশের প্রতিটি বিক্রয়কেন্দ্রকে (POS) এনবিআর সার্ভারের সাথে যুক্ত করতে হবে।”
অন্যদিকে নাসিম মঞ্জুর পরামর্শ দেন, অডিটের নামে হয়রানি বন্ধ করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ভিত্তিক ‘রিস্ক-বেজড’ অডিট ব্যবস্থা চালু করার, যাতে সৎ ব্যবসায়ীরা অহেতুক হেনস্তার শিকার না হন।

ফেসলেস সার্ভিস ও স্বচ্ছতা
সাবেক অর্থসচিব মুসলিম চৌধুরী কর ব্যবস্থাকে হয়রানিমুক্ত করতে ‘ফেসলেস’ ও অনলাইন সার্ভিস চালুর ওপর জোর দেন। তিনি মনে করেন, করদাতার সাথে কর কর্মকর্তার সরাসরি যোগাযোগ যত কমবে, দুর্নীতি ও ‘ট্যাক্স টেররিজম’ ততটাই হ্রাস পাবে।
চরচা সম্পাদক সোহরাব হাসানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এ গোলটেবিল আলোচনায় ব্যবসায়ী নেতা ও অর্থনীতিবিদদের এসব প্রস্তাব ও দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, “বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমরা লক্ষ্য করেছি যে, পাঁচটি বিষয়ের কথা তারা (বিনিয়োগকারীরা) উল্লেখ করেন। প্রথমেই আছে নীতির ধারাবাহিকতা। একজন বিনিয়োগকারী বিনিয়োগ করতে পারেন, যদি তিনি ন্যূনতম পাঁচ বছরের ক্ষেত্রে পরিকর্পনা করতে পারেন। আপনারা ১১ জুন দেখতে পারবেন যে, কর কাঠামোর ক্ষেত্রে এর প্রতিফলন ঘটবে। দ্বিতীয় হচ্ছে–বিভিন্ন টেবিলে তাকে ঘুরে বেড়াতে হয়, সাংবাদিকতার ভাষায় যাকে বলে লাল ফিতার দৌরাত্ম, সে ক্ষেত্রেও আমরা বিনিয়ন্ত্রীকরণের বাস্তবায়নযোগ্য পদ্ধতিগুলো উল্লেখ করব।”