Advertisement Banner

ট্রাম্প কি শেষ পর্যন্ত রক্ষা পাবেন?

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ‘মাগা’ সমর্থকরা ট্রাম্পের ভোটারদের একটি অংশ মাত্র। একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের ভোটারদের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ ছিল কোর ‘মাগা’ গোষ্ঠী।

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ট্রাম্প কি শেষ পর্যন্ত রক্ষা পাবেন?
ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ এখন শুধু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেই নয়, তার নিজের রাজনৈতিক ভিত্তিতেও গভীর ফাটল তৈরি করেছে। ফরেন পলিসি পত্রিকার কলামিস্ট এমা অ্যাশফোর্ডের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই যুদ্ধ ট্রাম্পের সেই বিস্তৃত রাজনৈতিক জোটকে ভেঙে দিচ্ছে, যা তাকে ২০২৪ সালের নির্বাচনে জয়ী করেছিল। যদিও তার ঘনিষ্ঠ ‘মাগা’ সমর্থকদের একটি বড় অংশ এখনো তার পাশে আছে, কিন্তু বৃহত্তর ভোটার গোষ্ঠীর মধ্যে অসন্তোষ দ্রুত বাড়ছে।

এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে পরিচালিত জরিপগুলো বলছে, এক-চতুর্থাংশেরও কম আমেরিকান মনে করে, ইরান যুদ্ধটি সার্থক হয়েছে। যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব–বিশেষ করে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি যত হচ্ছে, এই সমর্থন আরো কমার সম্ভাবনা রয়েছে। তবুও ট্রাম্প, একজন ‘লেম-ডাক’ প্রেসিডেন্ট হিসেবে, স্বাভাবিক রাজনৈতিক চাপের অনেকটাই এড়িয়ে যেতে পারছেন। কংগ্রেস থেকে তাৎক্ষণিক কোনো বিদ্রোহের মুখে তিনি পড়েননি। যদিও এই যুদ্ধের কারণে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের আসন হারানোর ঝুঁকি বেড়েছে।

তবে আসল প্রশ্নটি এখন অন্য জায়গায়। ট্রাম্প কি তার নিজস্ব সমর্থনভিত্তিও হারাচ্ছেন? কিছু উচ্চপ্রোফাইল ব্যক্তিত্ব, যেমন ডানপন্থী মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও রাজনীতিবিদরা, ইতিমধ্যেই তাকে সমালোচনা করতে শুরু করেছেন। কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, ট্রাম্প তার মূল প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গেছেন। অন্যদিকে যুদ্ধবাজ রিপাবলিকানরা বলছেন, ‘মাগা রিপাবলিকানদের’ মধ্যে এখনো যুদ্ধের শক্ত সমর্থন রয়েছে।

কিন্তু এই ‘মাগা বনাম নন-মাগা’ বিতর্ক আসল সমস্যাটিকে আড়াল করছে। ট্রাম্পের রাজনৈতিক জোট কেবল তার কোর সমর্থকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং বিভিন্ন মতাদর্শ ও সামাজিক গোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত ছিল এই জোট। এই বৃহত্তর জোটের একটি বড় অংশ এখন ইরান যুদ্ধকে একটি ভাঙা প্রতিশ্রুতি হিসেবে দেখছে। তাদের জন্য ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি মানে ছিল বিদেশি যুদ্ধে না জড়ানো, বরং দেশের ভেতরের সমস্যাগুলোর দিকে মনোযোগ দেওয়া।

গত ২৫ বছরের মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধগুলো আমেরিকান জনগণের ধৈর্য অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে। এমন কোনো সামরিক অভিযান, যার সফলতা স্পষ্ট নয়, তা এখন সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। অথচ ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধ শুরুর আগে জনগণকে বোঝানোর জন্য কার্যকর কোনো প্রচার চালায়নি। এমনকি যুদ্ধ শুরুর দুই মাস পরেও প্রশাসন স্পষ্ট করে বলতে পারেনি কেন এই সংঘাত প্রয়োজনীয় ছিল।

জরিপের পরিসংখ্যানগুলো এই অসন্তোষকে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরে। প্রায় ৬৬ শতাংশ আমেরিকান যুদ্ধের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। ৬৮ শতাংশ ইরানে স্থলবাহিনী পাঠানোর বিপক্ষে। ৬৯ শতাংশ মানুষ যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন, বিশেষ করে জ্বালানির দাম নিয়ে। আর ৬৪ শতাংশ মনে করেন, প্রেসিডেন্ট এই সংকট সমাধানে সক্ষম নন। সংক্ষেপে বলা যায়, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আমেরিকান এই যুদ্ধ চান না।

তবে রাজনৈতিক বিভাজন এখানে স্পষ্ট। যে এক-তৃতীয়াংশ আমেরিকান যুদ্ধকে সমর্থন করছেন, তাদের বেশির ভাগই রিপাবলিকান। জরিপে দেখা গেছে, রিপাবলিকানদের মধ্যে ৭৭ শতাংশ যুদ্ধের পক্ষে। আরও ছোট একটি গোষ্ঠী– যারা নিজেদের ‘মাগা রিপাবলিকান’ হিসেবে পরিচয় দেন– তাদের মধ্যে সমর্থন প্রায় ৯০ শতাংশ। যদিও অন্য জরিপ বলছে, ট্রাম্পের ভোটারদের মধ্যে মাত্র ১১ শতাংশ ইরানকে প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে দেখেন, আর ৬০ শতাংশ বেশি চিন্তিত মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে। তবুও সংকটময় মুহূর্তে তারা প্রেসিডেন্টের পাশে দাঁড়াচ্ছেন।

ডানপন্থী মিডিয়া ও সামাজিক মাধ্যমে এই নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে। কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব যুদ্ধবিরোধীদের ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বৃত্ত থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। ট্রাম্প নিজেও সমালোচকদের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ করেছেন, তাদের ‘মাগা’ নয় বলে আখ্যা দিয়েছেন।

কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে—‘মাগা’ এবং ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এক জিনিস নয়। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ একটি পররাষ্ট্রনীতি, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয় এবং অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ এড়ানোর কথা বলে। ট্রাম্পের অনেক সমালোচক এই নীতির অনুসারী। উদাহরণ হিসেবে, একজন সাবেক উচ্চপদস্থ নিরাপত্তা কর্মকর্তা যুদ্ধের প্রতিবাদে পদত্যাগ করে স্পষ্টভাবে বলেছেন, এই সংঘাত আমেরিকার জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ‘মাগা’ সমর্থকরা ট্রাম্পের ভোটারদের একটি অংশ মাত্র। একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের ভোটারদের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ ছিল কোর ‘মাগা’ গোষ্ঠী। বাকি অংশটি ছিল অপেক্ষাকৃত ঢিলেঢালা সমর্থনভিত্তি, যাদের মধ্যে এখন অসন্তোষ বেশি।

বিশেষ করে তরুণ ভোটার, কম শিক্ষিত শ্বেতাঙ্গ ভোটার এবং রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ বা হতাশ ভোটারদের মধ্যে যুদ্ধবিরোধিতা বেশি। এই গোষ্ঠীগুলোই ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে জয়ী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এখন তারা এই যুদ্ধকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখছে। জনপ্রিয় পডকাস্টার ও সাংস্কৃতিক প্রভাবশালীরাও এই সমালোচনায় যোগ দিয়েছেন।

সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন যে, ট্রাম্পের কোর সমর্থকরা তাকে ছেড়ে না গেলেও, তার বৃহত্তর রাজনৈতিক জোট ভেঙে পড়ছে। একজন লেম-ডাক প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক শাস্তি এড়াতে পারেন, কিন্তু এই অসন্তোষ ভবিষ্যতের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলবে।

রিপাবলিকান দলের ভবিষ্যৎ নেতাদের জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ভাইস প্রেসিডেন্ট বা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো নেতাদের এই অজনপ্রিয় যুদ্ধ থেকে নিজেদের দূরে রাখা কঠিন হতে পারে। একইভাবে ডেমোক্র্যাটদের জন্যও মাঝামাঝি অবস্থান নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

পররাষ্ট্রনীতি সাধারণত ভোটারদের প্রধান ইস্যু নয়। কিন্তু ২০২৪ সালে ট্রাম্পের সাফল্যের একটি বড় কারণ ছিল আগের প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতির প্রতি অসন্তোষ। এখন সেই একই ইস্যুতে তিনি নিজেই সমালোচনার মুখে পড়েছেন। ফলে প্রশ্ন উঠছে– এই হতাশ ভোটারদের আস্থা কে আবার অর্জন করতে পারবে?

এই বিশ্লেষণ স্পষ্ট করে যে, ইরান যুদ্ধ শুধু একটি সামরিক বা কূটনৈতিক ঘটনা নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। এবং সেই প্রভাব ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ছাড়িয়ে পুরো আমেরিকান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে বদলে দিতে পারে।

সম্পর্কিত