বিবিসির বিশ্লেষণ
চরচা ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে চলমান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তেহরানের ওপর একটি প্রশ্নই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, আসলে নেতৃত্বে কে?
তাত্ত্বিকভাবে এর উত্তর অত্যন্ত স্পষ্ট। যুদ্ধের প্রথম দিন, অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন ছেলে মোজতবা খামেনি। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শাসনব্যবস্থায় এই পদটিই সর্বেসর্বা। যুদ্ধ, শান্তি কিংবা রাষ্ট্রের কৌশলগত যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সর্বোচ্চ নেতাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অধিকারী।
তবে বাস্তবে এই চিত্রটা বেশ ধোঁয়াশাপূর্ণ।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বর্তমান নেতৃত্বকে বিখণ্ডিত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, তেহরান কখন একটি একীভূত প্রস্তাব নিয়ে আসবে, যুক্তরাষ্ট্র সেই অপেক্ষায় রয়েছে।
নেতৃত্বের এই ঐক্যের বিষয়টি যে ইরানি কর্মকর্তাদের ভাবিয়ে তুলেছে, তা স্পষ্ট হয় গত বৃহস্পতিবার রাতে দেশটির নাগরিকদের মোবাইলে পাঠানো একটি বার্তার মাধ্যমে। সেখানে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, “ইরানে কট্টরপন্থী বা উদারপন্থী বলে আলাদা কিছু নেই–এখানে কেবল একটি জাতি এবং একটি অভিন্ন লক্ষ্য বিদ্যমান।”
অন্তরালে থাকা নেতা
ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে মোজতবা খামেনিকে একবারও জনসমক্ষে দেখা যায়নি। হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার নির্দেশনাসহ গুটিকয়েক লিখিত বিবৃতি ছাড়া রাষ্ট্রীয় কাজে তার সরাসরি অংশগ্রহণের তেমন কোনো শক্ত প্রমাণ নেই।
ইরানি কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, যুদ্ধের শুরুর দিকের হামলায় তিনি আহত হয়েছেন, তবে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেননি। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ইরানি সূত্রের বরাত দিয়ে এ সপ্তাহে জানিয়েছে যে, তিনি বেশ গুরুতরভাবে জখম হয়েছেন; এমনকি মুখে আঘাত পাওয়ার কারণে বর্তমানে তার কথা বলাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
নেতার এই অনুপস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কর্তৃত্ব কেবল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল নয়। এটি দৃশ্যমান উপস্থিতির ওপরও অনেকাংশে নির্ভরশীল। প্রয়াত আলি খামেনি তার বিভিন্ন ভাষণ, সুপরিকল্পিত জনসমক্ষে উপস্থিতি এবং বিবদমান উপদলগুলোর মধ্যে প্রকাশ্য মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ও লক্ষ্য জানান দিতেন। দিকনির্দেশনার সেই শৈলীটি এখন পুরোপুরি অনুপস্থিত।
এর ফলে তৈরি হয়েছে এক ধরণের ধোঁয়াশা। কেউ কেউ মনে করেন, যুদ্ধের উত্তাল সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করায় মোজতবা খামেনি নিজের মতো করে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ বা সময় পাননি। আবার অনেকের মতে, তার জখম হওয়ার খবরটিই বড় সত্য এবং তারা প্রশ্ন তুলছেন যে, বর্তমান ব্যবস্থাকে সক্রিয়ভাবে পরিচালনা করার মতো সক্ষমতা আদৌ তার আছে কি না।
পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটি এখন যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় অনেক বেশি বিকেন্দ্রীভূত বা অসংগঠিত বলে মনে হচ্ছে।
সীমিত কূটনৈতিক তৎপরতা
কাগজে-কলমে কূটনীতির চাবিকাঠি সরকারের হাতেই ন্যস্ত। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের প্রশাসনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনায় তেহরানের প্রতিনিধিত্ব করে যাচ্ছেন।
তবে তাদের কেউই মূল রণকৌশল নির্ধারণ করছেন বলে মনে হয় না। তদুপরি, ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে যখন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ-বাঘের গালিবাফকে দেখা যায়, তখন আরাগচি বা পেজেশকিয়ানের কর্তৃত্ব আরও বেশি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, আরাগচির ভূমিকা এখন নীতিনির্ধারণীর চেয়ে কেবল দাপ্তরিক বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। হরমুজ প্রণালি খোলা না কি বন্ধ—এই ইস্যুতে তার অবস্থান পরিবর্তনের ঘটনাটি একটি বিরল দৃষ্টান্ত। তিনি প্রথমে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে নৌ-চলাচল শুরু হয়েছে, কিন্তু দ্রুতই আবার সেই বক্তব্য থেকে সরে আসেন। এই ঘটনাটি স্পষ্ট করে দেয় যে, সামরিক সিদ্ধান্তের ওপর কূটনৈতিক মহলের নিয়ন্ত্রণ আসলে কতটা নগণ্য।
অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান শাসনব্যবস্থার সামগ্রিক কাঠামোর সাথে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সেখানে তার নিজস্ব কোনো বলিষ্ঠ ছাপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। তুলনামূলকভাবে একজন নমনীয় বা উদারপন্থী হিসেবে পরিচিত হওয়া সত্ত্বেও, তিনি এখন পর্যন্ত স্বাধীন কোনো অবস্থান বা ভিন্ন কোনো ধারা তৈরির চেষ্টা থেকে নিজেকে বিরত রেখেছেন।
ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দ্বিতীয় দফার আলোচনা থমকে যাওয়ার বিষয়টি এই পরিস্থিতিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। এর থেকে বোঝা যায় যে, কূটনৈতিক পথ খোলা থাকলেও বর্তমান ব্যবস্থাটি কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে কিংবা কার্যকর কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে হয় অক্ষম, না হয় পুরোপুরি অনিচ্ছুক।
সামরিক বাহিনীর ক্রমবর্ধমান আধিপত্য
হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণই বর্তমানে ইরানের দরকষাকষির সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। তবে এটি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত কোনো কূটনৈতিক দলের হাতে নেই, বরং তা ন্যস্ত আহমদ ওয়াহিদির নেতৃত্বাধীন ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) ওপর।
এর ফলে প্রকৃত ক্ষমতা এখন এমন কিছু গোষ্ঠীর হাতে চলে গেছে, যারা মূলত পর্দার আড়ালে থেকে কাজ করে। অতীতের সংকটগুলোর মতো এবার রণকৌশল পরিচালনায় একক কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে না। বরং একটি বিশেষ ধারা ফুটে উঠছে। আগে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, আর তার ব্যাখ্যা বা প্রচার আসছে পরে—যা অনেক সময় আবার অসংলগ্ন বা পরস্পরবিরোধী হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বাস্তবতা হলো, হরমুজ প্রণালি অবরোধ বা পারস্য উপসাগরে হামলা চালানোর মতো আইআরজিসির পদক্ষেপগুলোই এখন সংকটের গতিপথ নির্ধারণ করছে। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়াগুলো ঘটনার নেতৃত্বে থাকার বদলে কেবল সামরিক সিদ্ধান্তগুলোকে অনুসরণ করে যাচ্ছে।
এটি সরাসরি প্রশাসনের ভেঙে পড়ার ইঙ্গিত না-ও হতে পারে। তবে এটি নিশ্চিতভাবেই জানান দেয় যে, কোনো স্বচ্ছ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা বা মধ্যস্থতার অভাবে আইআরজিসির স্বায়ত্তশাসন অন্তত সাময়িকভাবে হলেও পূর্বের চেয়ে বহুগুণ বেড়েছে।
সম্মুখভাগে গালিবাফ
নেতৃত্বের এই অস্পষ্টতার সুযোগে পাদপ্রদীপে উঠে এসেছেন মোহাম্মদ-বাঘের গালিবাফ।
বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সাবেক এই কমান্ডার বর্তমানে পার্লামেন্টের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমান সংকটে তিনি অন্যতম এক সক্রিয় ও দৃশ্যমান ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তিনি নিজেকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন, জনগণের উদ্দেশে ভাষণ দিচ্ছেন এবং মাঝেমধ্যে এই যুদ্ধকে কেবল আদর্শিক সংঘাত হিসেবে না দেখে বাস্তবমুখী ও কৌশলী দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করছেন।

তবে পার্লামেন্টের অভ্যন্তরে এবং রক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে আলোচনার ব্যাপারে এখনো তীব্র বিরোধিতা বিদ্যমান। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এবং বিভিন্ন প্রচারণায় কট্টরপন্থী মনোভাব আরও কঠোর হয়েছে; সেখানে শত্রুর মোকাবিলায় আলোচনার প্রস্তাব দেওয়াকে দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে চিত্রায়িত করা হচ্ছে।
ফলে গালিবাফের অবস্থান এখন বেশ নড়বড়ে। তিনি সক্রিয় ঠিকই, কিন্তু তার এই তৎপরতা কতটা উচ্চপর্যায় থেকে অনুমোদিত, তা পরিষ্কার নয়। তিনি বারবার দাবি করছেন যে, তার প্রতিটি পদক্ষেপ মোজতবা খামেনির ইচ্ছার প্রতিফলন; অথচ তাদের মধ্যে সরাসরি কোনো সমন্বয় বা যোগাযোগের দৃশ্যমান প্রমাণ মেলা ভার।
ইরানের মতো একটি শাসনব্যবস্থা, যা মূলত শীর্ষ পর্যায় থেকে আসা সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার ওপর নির্ভরশীল, সেখানে এই অস্পষ্টতা একটি বড় ধরণের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সংহতির দাবি বনাম বাস্তবতা
সামগ্রিক এই পরিস্থিতি এটাই ইঙ্গিত দেয় যে, ইরানের শাসনব্যবস্থা সচল থাকলেও তা কোনো সুসংগঠিত নির্দেশনায় পরিচালিত হচ্ছে না।
দেশটিতে সর্বোচ্চ নেতার কর্তৃত্ব কাগজে-কলমে থাকলেও তার বাস্তব প্রয়োগ দৃশ্যমান নয়। প্রেসিডেন্টের অবস্থান বর্তমান ব্যবস্থার সাথে সংগতিপূর্ণ হলেও তিনি নেতৃত্বে নেই। কূটনীতি সক্রিয় থাকলেও তা চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখে না। সামরিক বাহিনীর হাতে ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি থাকলেও তাদের কোনো প্রকাশ্য পরিকল্পনাকারী বা রূপকার নেই। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা সম্মুখভাগে এগিয়ে আসছেন ঠিকই, কিন্তু তাদের গ্রহণযোগ্যতা এখনো প্রশ্নাতীত নয়।
একে অবশ্য শাসনব্যবস্থার ধস বলা যাবে না; ইসলামি প্রজাতন্ত্র এখনো অক্ষুণ্ণ রয়েছে। তবে এটি আরও সূক্ষ্ম একটি সংকটের দিকে ইঙ্গিত করে–তীব্র চাপের এই মুহূর্তে নিজেদের হাতে থাকা তুরুপের তাসগুলোকে (যেমন: হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার ক্ষমতা) একটি সুনির্দিষ্ট রণকৌশলে রূপান্তর করতে বর্তমান ব্যবস্থাটি হিমশিম খাচ্ছে। দেশটি এখনো একাধিক ফ্রন্টে লড়াই চালিয়ে যেতে সক্ষম, কিন্তু নিজের ক্ষমতা-কেন্দ্রগুলোর কাছে স্পষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা পাঠাতে পারছে না।
অথচ ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোতে এই দিকনির্দেশনা বা সংকেত প্রদানই হলো অভ্যন্তরীণ সংহতি বজায় রাখার প্রধান হাতিয়ার।
আপাতত প্রচণ্ড চাপ সত্ত্বেও এই ব্যবস্থাটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে এবং প্রকাশ্য কোনো ভাঙন এড়িয়ে চলছে। তবে দিনশেষে বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে এই প্রশ্নটিই–শাসনব্যবস্থার এই সংহতি কি সত্যিই কার্যকর আছে, নাকি এটি কেবল মৌখিক দাবি মাত্র?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে চলমান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তেহরানের ওপর একটি প্রশ্নই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, আসলে নেতৃত্বে কে?
তাত্ত্বিকভাবে এর উত্তর অত্যন্ত স্পষ্ট। যুদ্ধের প্রথম দিন, অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন ছেলে মোজতবা খামেনি। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শাসনব্যবস্থায় এই পদটিই সর্বেসর্বা। যুদ্ধ, শান্তি কিংবা রাষ্ট্রের কৌশলগত যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সর্বোচ্চ নেতাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অধিকারী।
তবে বাস্তবে এই চিত্রটা বেশ ধোঁয়াশাপূর্ণ।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বর্তমান নেতৃত্বকে বিখণ্ডিত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, তেহরান কখন একটি একীভূত প্রস্তাব নিয়ে আসবে, যুক্তরাষ্ট্র সেই অপেক্ষায় রয়েছে।
নেতৃত্বের এই ঐক্যের বিষয়টি যে ইরানি কর্মকর্তাদের ভাবিয়ে তুলেছে, তা স্পষ্ট হয় গত বৃহস্পতিবার রাতে দেশটির নাগরিকদের মোবাইলে পাঠানো একটি বার্তার মাধ্যমে। সেখানে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, “ইরানে কট্টরপন্থী বা উদারপন্থী বলে আলাদা কিছু নেই–এখানে কেবল একটি জাতি এবং একটি অভিন্ন লক্ষ্য বিদ্যমান।”
অন্তরালে থাকা নেতা
ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে মোজতবা খামেনিকে একবারও জনসমক্ষে দেখা যায়নি। হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার নির্দেশনাসহ গুটিকয়েক লিখিত বিবৃতি ছাড়া রাষ্ট্রীয় কাজে তার সরাসরি অংশগ্রহণের তেমন কোনো শক্ত প্রমাণ নেই।
ইরানি কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, যুদ্ধের শুরুর দিকের হামলায় তিনি আহত হয়েছেন, তবে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেননি। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ইরানি সূত্রের বরাত দিয়ে এ সপ্তাহে জানিয়েছে যে, তিনি বেশ গুরুতরভাবে জখম হয়েছেন; এমনকি মুখে আঘাত পাওয়ার কারণে বর্তমানে তার কথা বলাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
নেতার এই অনুপস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কর্তৃত্ব কেবল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল নয়। এটি দৃশ্যমান উপস্থিতির ওপরও অনেকাংশে নির্ভরশীল। প্রয়াত আলি খামেনি তার বিভিন্ন ভাষণ, সুপরিকল্পিত জনসমক্ষে উপস্থিতি এবং বিবদমান উপদলগুলোর মধ্যে প্রকাশ্য মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ও লক্ষ্য জানান দিতেন। দিকনির্দেশনার সেই শৈলীটি এখন পুরোপুরি অনুপস্থিত।
এর ফলে তৈরি হয়েছে এক ধরণের ধোঁয়াশা। কেউ কেউ মনে করেন, যুদ্ধের উত্তাল সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করায় মোজতবা খামেনি নিজের মতো করে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ বা সময় পাননি। আবার অনেকের মতে, তার জখম হওয়ার খবরটিই বড় সত্য এবং তারা প্রশ্ন তুলছেন যে, বর্তমান ব্যবস্থাকে সক্রিয়ভাবে পরিচালনা করার মতো সক্ষমতা আদৌ তার আছে কি না।
পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটি এখন যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় অনেক বেশি বিকেন্দ্রীভূত বা অসংগঠিত বলে মনে হচ্ছে।
সীমিত কূটনৈতিক তৎপরতা
কাগজে-কলমে কূটনীতির চাবিকাঠি সরকারের হাতেই ন্যস্ত। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের প্রশাসনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনায় তেহরানের প্রতিনিধিত্ব করে যাচ্ছেন।
তবে তাদের কেউই মূল রণকৌশল নির্ধারণ করছেন বলে মনে হয় না। তদুপরি, ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে যখন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ-বাঘের গালিবাফকে দেখা যায়, তখন আরাগচি বা পেজেশকিয়ানের কর্তৃত্ব আরও বেশি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, আরাগচির ভূমিকা এখন নীতিনির্ধারণীর চেয়ে কেবল দাপ্তরিক বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। হরমুজ প্রণালি খোলা না কি বন্ধ—এই ইস্যুতে তার অবস্থান পরিবর্তনের ঘটনাটি একটি বিরল দৃষ্টান্ত। তিনি প্রথমে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে নৌ-চলাচল শুরু হয়েছে, কিন্তু দ্রুতই আবার সেই বক্তব্য থেকে সরে আসেন। এই ঘটনাটি স্পষ্ট করে দেয় যে, সামরিক সিদ্ধান্তের ওপর কূটনৈতিক মহলের নিয়ন্ত্রণ আসলে কতটা নগণ্য।
অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান শাসনব্যবস্থার সামগ্রিক কাঠামোর সাথে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সেখানে তার নিজস্ব কোনো বলিষ্ঠ ছাপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। তুলনামূলকভাবে একজন নমনীয় বা উদারপন্থী হিসেবে পরিচিত হওয়া সত্ত্বেও, তিনি এখন পর্যন্ত স্বাধীন কোনো অবস্থান বা ভিন্ন কোনো ধারা তৈরির চেষ্টা থেকে নিজেকে বিরত রেখেছেন।
ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দ্বিতীয় দফার আলোচনা থমকে যাওয়ার বিষয়টি এই পরিস্থিতিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। এর থেকে বোঝা যায় যে, কূটনৈতিক পথ খোলা থাকলেও বর্তমান ব্যবস্থাটি কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে কিংবা কার্যকর কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে হয় অক্ষম, না হয় পুরোপুরি অনিচ্ছুক।
সামরিক বাহিনীর ক্রমবর্ধমান আধিপত্য
হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণই বর্তমানে ইরানের দরকষাকষির সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। তবে এটি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত কোনো কূটনৈতিক দলের হাতে নেই, বরং তা ন্যস্ত আহমদ ওয়াহিদির নেতৃত্বাধীন ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) ওপর।
এর ফলে প্রকৃত ক্ষমতা এখন এমন কিছু গোষ্ঠীর হাতে চলে গেছে, যারা মূলত পর্দার আড়ালে থেকে কাজ করে। অতীতের সংকটগুলোর মতো এবার রণকৌশল পরিচালনায় একক কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে না। বরং একটি বিশেষ ধারা ফুটে উঠছে। আগে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, আর তার ব্যাখ্যা বা প্রচার আসছে পরে—যা অনেক সময় আবার অসংলগ্ন বা পরস্পরবিরোধী হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বাস্তবতা হলো, হরমুজ প্রণালি অবরোধ বা পারস্য উপসাগরে হামলা চালানোর মতো আইআরজিসির পদক্ষেপগুলোই এখন সংকটের গতিপথ নির্ধারণ করছে। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়াগুলো ঘটনার নেতৃত্বে থাকার বদলে কেবল সামরিক সিদ্ধান্তগুলোকে অনুসরণ করে যাচ্ছে।
এটি সরাসরি প্রশাসনের ভেঙে পড়ার ইঙ্গিত না-ও হতে পারে। তবে এটি নিশ্চিতভাবেই জানান দেয় যে, কোনো স্বচ্ছ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা বা মধ্যস্থতার অভাবে আইআরজিসির স্বায়ত্তশাসন অন্তত সাময়িকভাবে হলেও পূর্বের চেয়ে বহুগুণ বেড়েছে।
সম্মুখভাগে গালিবাফ
নেতৃত্বের এই অস্পষ্টতার সুযোগে পাদপ্রদীপে উঠে এসেছেন মোহাম্মদ-বাঘের গালিবাফ।
বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সাবেক এই কমান্ডার বর্তমানে পার্লামেন্টের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমান সংকটে তিনি অন্যতম এক সক্রিয় ও দৃশ্যমান ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তিনি নিজেকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন, জনগণের উদ্দেশে ভাষণ দিচ্ছেন এবং মাঝেমধ্যে এই যুদ্ধকে কেবল আদর্শিক সংঘাত হিসেবে না দেখে বাস্তবমুখী ও কৌশলী দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করছেন।

তবে পার্লামেন্টের অভ্যন্তরে এবং রক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে আলোচনার ব্যাপারে এখনো তীব্র বিরোধিতা বিদ্যমান। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এবং বিভিন্ন প্রচারণায় কট্টরপন্থী মনোভাব আরও কঠোর হয়েছে; সেখানে শত্রুর মোকাবিলায় আলোচনার প্রস্তাব দেওয়াকে দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে চিত্রায়িত করা হচ্ছে।
ফলে গালিবাফের অবস্থান এখন বেশ নড়বড়ে। তিনি সক্রিয় ঠিকই, কিন্তু তার এই তৎপরতা কতটা উচ্চপর্যায় থেকে অনুমোদিত, তা পরিষ্কার নয়। তিনি বারবার দাবি করছেন যে, তার প্রতিটি পদক্ষেপ মোজতবা খামেনির ইচ্ছার প্রতিফলন; অথচ তাদের মধ্যে সরাসরি কোনো সমন্বয় বা যোগাযোগের দৃশ্যমান প্রমাণ মেলা ভার।
ইরানের মতো একটি শাসনব্যবস্থা, যা মূলত শীর্ষ পর্যায় থেকে আসা সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার ওপর নির্ভরশীল, সেখানে এই অস্পষ্টতা একটি বড় ধরণের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সংহতির দাবি বনাম বাস্তবতা
সামগ্রিক এই পরিস্থিতি এটাই ইঙ্গিত দেয় যে, ইরানের শাসনব্যবস্থা সচল থাকলেও তা কোনো সুসংগঠিত নির্দেশনায় পরিচালিত হচ্ছে না।
দেশটিতে সর্বোচ্চ নেতার কর্তৃত্ব কাগজে-কলমে থাকলেও তার বাস্তব প্রয়োগ দৃশ্যমান নয়। প্রেসিডেন্টের অবস্থান বর্তমান ব্যবস্থার সাথে সংগতিপূর্ণ হলেও তিনি নেতৃত্বে নেই। কূটনীতি সক্রিয় থাকলেও তা চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখে না। সামরিক বাহিনীর হাতে ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি থাকলেও তাদের কোনো প্রকাশ্য পরিকল্পনাকারী বা রূপকার নেই। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা সম্মুখভাগে এগিয়ে আসছেন ঠিকই, কিন্তু তাদের গ্রহণযোগ্যতা এখনো প্রশ্নাতীত নয়।
একে অবশ্য শাসনব্যবস্থার ধস বলা যাবে না; ইসলামি প্রজাতন্ত্র এখনো অক্ষুণ্ণ রয়েছে। তবে এটি আরও সূক্ষ্ম একটি সংকটের দিকে ইঙ্গিত করে–তীব্র চাপের এই মুহূর্তে নিজেদের হাতে থাকা তুরুপের তাসগুলোকে (যেমন: হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার ক্ষমতা) একটি সুনির্দিষ্ট রণকৌশলে রূপান্তর করতে বর্তমান ব্যবস্থাটি হিমশিম খাচ্ছে। দেশটি এখনো একাধিক ফ্রন্টে লড়াই চালিয়ে যেতে সক্ষম, কিন্তু নিজের ক্ষমতা-কেন্দ্রগুলোর কাছে স্পষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা পাঠাতে পারছে না।
অথচ ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোতে এই দিকনির্দেশনা বা সংকেত প্রদানই হলো অভ্যন্তরীণ সংহতি বজায় রাখার প্রধান হাতিয়ার।
আপাতত প্রচণ্ড চাপ সত্ত্বেও এই ব্যবস্থাটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে এবং প্রকাশ্য কোনো ভাঙন এড়িয়ে চলছে। তবে দিনশেষে বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে এই প্রশ্নটিই–শাসনব্যবস্থার এই সংহতি কি সত্যিই কার্যকর আছে, নাকি এটি কেবল মৌখিক দাবি মাত্র?