ফজলে রাব্বি

২৮ এপ্রিল, ২০২৬। পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এই দিন থেকে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের রিঅ্যাক্টরে একের পর এক ইউরেনিয়াম ফুয়েল রড প্রবেশ করতে শুরু করবে। বহু বছরের পরিকল্পনা, নির্মাণকাজ, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও নানাবিধ কারিগরি চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে বাংলাদেশ এখন প্রবেশ করছে পারমাণবিক বিদ্যুতের যুগে। আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি সংস্থা রোসাটমের কারিগরি সহায়তায় এই ‘ফুয়েল লোডিং’ কেবল একটি কারিগরি ধাপ নয়; বরং এটি বাংলাদেশের জ্বালানি ইতিহাসে এক সাহসী ও কাঠামোগত পরিবর্তনের সূচনা। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩২তম দেশ হিসেবে অভিজাত ‘নিউক্লিয়ার ক্লাব’-এ নিজের নাম লেখাতে যাচ্ছে। কিন্তু এই অর্জনের সমান্তরালে দাঁড়িয়ে আছে কিছু মৌলিক প্রশ্ন–রূপপুর কি বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের ক্ষুধার টেকসই সমাধান, নাকি এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ও আর্থিক দায়?
বিদ্যুতের ক্ষুধা ও নিরবচ্ছিন্ন শক্তির সন্ধান
বাংলাদেশের গত দুই দশকের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি ছিল বিদ্যুৎ। শিল্পায়ন, দ্রুত নগরায়ন ও ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ব্যাপক হারে বাড়ানো হয়েছে। তবে এই উৎপাদনের ভিত্তি ছিল প্রধানত দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাস। কিন্তু সময়ের সাথে গ্যাসের মজুত ফুরিয়ে আসায় বাংলাদেশ একটি গভীর জ্বালানি সংকটের মুখে পড়ে। দেশীয় গ্যাসের সীমাবদ্ধতার কারণে গত এক দশকে বাংলাদেশের জ্বালানি কাঠামোতে আমদানিকৃত এলএনজি, কয়লা ও তেলের ওপর নির্ভরতা নাটকীয়ভাবে বেড়েছে।
এই আমদানিনির্ভরতা বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় একটি বড় দুর্বলতা তৈরি করেছে। বিশেষ করে ২০২২-২৩ সালে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে সৃষ্ট অস্থিরতা প্রমাণ করেছে যে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনীতির ওপর। এমনকি বর্তমানে ইরান যুদ্ধের জেরে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাবও বাংলাদেশে এসে পড়েছে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে এলএনজি ও জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যায়, যা জাতীয় বাজেটে বড় ধরনের চাপ তৈরি করে। এই অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি পেতে এমন একটি জ্বালানি উৎসের প্রয়োজন দেখা দেয়, যা একই সাথে নিরবচ্ছিন্ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিদিনের অস্থিরতা থেকে মুক্ত। পারমাণবিক শক্তি ঠিক এই জায়গাতেই বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের ভাবনায় প্রধান্য পায়।

পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর ‘বেসলোড পাওয়ার’ (Baseload Power) সরবরাহ করার ক্ষমতা। একটি পারমাণবিক কেন্দ্র বছরের ৩৬৫ দিন, ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। সৌর বা বায়ুবিদ্যুতের মতো এটি প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল নয়, আবার কয়লা বা গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের মতো এতে জ্বালানি সরবরাহে ঘনঘন বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা কম। শিল্প-কারখানার চাকা সচল রাখতে এবং বড় বড় শহরের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে এই ‘বেসলোড’ সরবরাহ অত্যন্ত জরুরি।
রূপপুরের অর্থনীতি: বিশাল বিনিয়োগ বনাম দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় একক প্রকল্প। ১২.৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এই বিশাল ব্যয়ের প্রায় ৯০ শতাংশই আসছে রাশিয়ার ঋণের মাধ্যমে। এই প্রকল্পের অর্থনৈতিক উপযোগিতা বুঝতে হলে আমাদের ‘লেভেলাইজড কস্ট অব ইলেকট্রিসিটি’ (LCOE) ধারণাটি বুঝতে হবে। পারমাণবিক প্রকল্পের আর্থিক চরিত্র হলো–এর প্রাথমিক নির্মাণ ব্যয় বা ‘আপফ্রন্ট কস্ট’ অত্যন্ত বেশি, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর পরিচালন ব্যয় এবং জ্বালানি খরচ থাকে তুলনামূলক অনেক কম এবং স্থিতিশীল।
বর্তমানে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ জ্বালানি ভেদে ভিন্ন। দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাস দিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট ৩ থেকে ৫ টাকার মধ্যে থাকলেও, আমদানিকৃত এলএনজি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ পড়ছে ১০ থেকে ১৪ টাকা। অন্যদিকে, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ৮ থেকে ১০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের অনুমান অনুযায়ী, রূপপুরের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম হতে পারে ৮ থেকে ১২ টাকার মধ্যে। যদিও এটি দেশীয় গ্যাসের চেয়ে বেশি, তবে এটি আমদানিকৃত জ্বালানির তুলনায় অনেক বেশি স্থিতিশীল। কারণ, পারমাণবিক জ্বালানির দাম বাড়লেও তা মোট উৎপাদন ব্যয়ের ওপর খুব সামান্যই প্রভাব ফেলে, যা এলএনজি বা তেলের ক্ষেত্রে পুরোপুরি বিপরীত।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠ হলো ঋণের বোঝা। রাশিয়ার ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ার পর প্রতি বছর বাংলাদেশকে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ কোটি মার্কিন ডলার কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। উদ্বেগের বিষয় হলো, একই সময়ে বাংলাদেশ মেট্রোরেল, পায়রা বন্দর এবং অন্যান্য মেগা প্রকল্পের ঋণ পরিশোধের চাপের মধ্যেও থাকবে। ফলে পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার সংস্থান রাখা এবং জাতীয় অর্থনীতির ওপর এই ঋণের প্রভাব ব্যবস্থাপনা করা আগামী দিনগুলোতে সরকারের জন্য একটি বড় পরীক্ষা হবে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: পারমাণবিক শক্তির ভিন্নমুখী পথ
পারমাণবিক শক্তি নিয়ে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে একটি ‘পলিসি ক্রস রোড’ বা দ্বিমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। একে বলা হচ্ছে ‘ডাইভারজেন্ট স্ট্র্যাটেজি’। একদল দেশ পারমাণবিক শক্তি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, অন্যদল একে জ্বালানি নিরাপত্তার মূল ভিত্তি বানাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, জার্মানি ২০২৩ সালে তাদের সর্বশেষ তিনটি পারমাণবিক চুল্লি বন্ধ করে দিয়ে সম্পূর্ণভাবে এই প্রযুক্তি থেকে বেরিয়ে এসেছে। জাপানের ফুকুশিমা দুর্ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে এক ধরনের ভীতি তৈরি হয়েছিল, যা জার্মানির এই সিদ্ধান্তকে ত্বরান্বিত করে।

অন্যদিকে, ফ্রান্স ও চীনের মতো দেশগুলো তাদের জ্বালানি সক্ষমতা ও জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যাপকভাবে পারমাণবিক প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করছে। এমনকি জাপানও ফুকুশিমা দুর্ঘটনার পর তাদের কেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দিলেও সাম্প্রতিক বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মুখে তারা আবার তাদের কিছু রিঅ্যাক্টর চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও পাকিস্তান অনেক আগে থেকেই পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। বাংলাদেশ এখন এই ‘হাই টেকনোলজি লিপ’-এর মাধ্যমে নিজেকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে, যা দেশটিকে বৈশ্বিক ‘নিউক্লিয়ার ক্লাবে’র সদস্য পদ এনে দিয়েছে।
ঝুঁকি ও অজানার চ্যালেঞ্জ
রূপপুর কেবল সাফল্যের গল্প নয়, এটি কিছু গভীর প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত ঝুঁকিও সামনে নিয়ে এসেছে। প্রথমত, প্রযুক্তিগত নির্ভরতা। ইউরেনিয়াম আমদানি থেকে শুরু করে রিফুয়েলিং এবং কারিগরি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বাংলাদেশ দীর্ঘকাল রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল থাকবে। এটি এক ধরনের নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করে।
দ্বিতীয়ত, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। ব্যবহৃত তেজস্ক্রিয় জ্বালানি বা স্পেন্ট ফুয়েল রড ব্যবস্থাপনা একটি অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ। যদিও রাশিয়ার সাথে ব্যবহৃত জ্বালানি ফেরত নেওয়ার চুক্তি রয়েছে, তবুও এই তেজস্ক্রিয় পদার্থ হ্যান্ডলিং এবং পরিবহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বিশাল দায়িত্ব।
তৃতীয়ত, নিরাপত্তা সক্ষমতা। প্রযুক্তির আধুনিকায়নের পাশাপাশি দেশীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং মানবসম্পদকে আন্তর্জাতিক মানের সমকক্ষ করে তোলা জরুরি। পারমাণবিক বিদ্যুতের ক্ষেত্রে ছোট কোনো কারিগরি ত্রুটিও একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই কারিগরি উৎকর্ষের পাশাপাশি কঠোর নিরাপত্তা সংস্কৃতি গড়ে তোলা এই প্রকল্পের সাফল্যের জন্য অপরিহার্য।
রূপান্তরের প্রতীক্ষায় বাংলাদেশ
সব বিতর্ক এবং চ্যালেঞ্জের ঊর্ধ্বে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বাংলাদেশের জন্য এক অনন্য মাইলফলক। এটি কেবল কয়েক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের কারখানা নয়; বরং এটি বাংলাদেশের বিজ্ঞানমনস্ক জাতি হিসেবে গড়ে ওঠার এবং উচ্চপ্রযুক্তিতে প্রবেশের এক সাহসী আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। এটি প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ এখন একটি জটিল এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়নের কারিগরি ও রাজনৈতিক সক্ষমতা রাখে।
রূপপুর সফলভাবে পরিচালিত হলে তা কেবল শিল্পের চাকাই সচল করবে না, বরং বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার মেরুদণ্ড হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে। এটি কি বাংলাদেশের জ্বালানি স্বাধীনতার পথ দেখাবে, নাকি নতুন ধরনের বৈশ্বিক নির্ভরতা তৈরি করবে, তার উত্তর হয়তো দেবে আগামী কয়েক দশক। তবে বর্তমানের তীব্র ‘বিদ্যুতের ক্ষুধা’ মেটাতে এবং আমদানিকৃত জ্বালানির অস্থির বাজার থেকে সুরক্ষা পেতে পারমাণবিক প্রযুক্তিতে এই প্রবেশ ছিল এক সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। অর্জন এবং অজানার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রূপপুর এখন আগামী দিনের উন্নত ও প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখাচ্ছে। এটি কেবল বিদ্যুতের আলো নয়, বরং এক নতুন দিনের আত্মবিশ্বাসের আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে।

২৮ এপ্রিল, ২০২৬। পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এই দিন থেকে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের রিঅ্যাক্টরে একের পর এক ইউরেনিয়াম ফুয়েল রড প্রবেশ করতে শুরু করবে। বহু বছরের পরিকল্পনা, নির্মাণকাজ, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও নানাবিধ কারিগরি চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে বাংলাদেশ এখন প্রবেশ করছে পারমাণবিক বিদ্যুতের যুগে। আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি সংস্থা রোসাটমের কারিগরি সহায়তায় এই ‘ফুয়েল লোডিং’ কেবল একটি কারিগরি ধাপ নয়; বরং এটি বাংলাদেশের জ্বালানি ইতিহাসে এক সাহসী ও কাঠামোগত পরিবর্তনের সূচনা। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩২তম দেশ হিসেবে অভিজাত ‘নিউক্লিয়ার ক্লাব’-এ নিজের নাম লেখাতে যাচ্ছে। কিন্তু এই অর্জনের সমান্তরালে দাঁড়িয়ে আছে কিছু মৌলিক প্রশ্ন–রূপপুর কি বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের ক্ষুধার টেকসই সমাধান, নাকি এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ও আর্থিক দায়?
বিদ্যুতের ক্ষুধা ও নিরবচ্ছিন্ন শক্তির সন্ধান
বাংলাদেশের গত দুই দশকের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি ছিল বিদ্যুৎ। শিল্পায়ন, দ্রুত নগরায়ন ও ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ব্যাপক হারে বাড়ানো হয়েছে। তবে এই উৎপাদনের ভিত্তি ছিল প্রধানত দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাস। কিন্তু সময়ের সাথে গ্যাসের মজুত ফুরিয়ে আসায় বাংলাদেশ একটি গভীর জ্বালানি সংকটের মুখে পড়ে। দেশীয় গ্যাসের সীমাবদ্ধতার কারণে গত এক দশকে বাংলাদেশের জ্বালানি কাঠামোতে আমদানিকৃত এলএনজি, কয়লা ও তেলের ওপর নির্ভরতা নাটকীয়ভাবে বেড়েছে।
এই আমদানিনির্ভরতা বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় একটি বড় দুর্বলতা তৈরি করেছে। বিশেষ করে ২০২২-২৩ সালে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে সৃষ্ট অস্থিরতা প্রমাণ করেছে যে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনীতির ওপর। এমনকি বর্তমানে ইরান যুদ্ধের জেরে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাবও বাংলাদেশে এসে পড়েছে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে এলএনজি ও জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যায়, যা জাতীয় বাজেটে বড় ধরনের চাপ তৈরি করে। এই অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি পেতে এমন একটি জ্বালানি উৎসের প্রয়োজন দেখা দেয়, যা একই সাথে নিরবচ্ছিন্ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিদিনের অস্থিরতা থেকে মুক্ত। পারমাণবিক শক্তি ঠিক এই জায়গাতেই বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের ভাবনায় প্রধান্য পায়।

পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর ‘বেসলোড পাওয়ার’ (Baseload Power) সরবরাহ করার ক্ষমতা। একটি পারমাণবিক কেন্দ্র বছরের ৩৬৫ দিন, ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। সৌর বা বায়ুবিদ্যুতের মতো এটি প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল নয়, আবার কয়লা বা গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের মতো এতে জ্বালানি সরবরাহে ঘনঘন বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা কম। শিল্প-কারখানার চাকা সচল রাখতে এবং বড় বড় শহরের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে এই ‘বেসলোড’ সরবরাহ অত্যন্ত জরুরি।
রূপপুরের অর্থনীতি: বিশাল বিনিয়োগ বনাম দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় একক প্রকল্প। ১২.৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এই বিশাল ব্যয়ের প্রায় ৯০ শতাংশই আসছে রাশিয়ার ঋণের মাধ্যমে। এই প্রকল্পের অর্থনৈতিক উপযোগিতা বুঝতে হলে আমাদের ‘লেভেলাইজড কস্ট অব ইলেকট্রিসিটি’ (LCOE) ধারণাটি বুঝতে হবে। পারমাণবিক প্রকল্পের আর্থিক চরিত্র হলো–এর প্রাথমিক নির্মাণ ব্যয় বা ‘আপফ্রন্ট কস্ট’ অত্যন্ত বেশি, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর পরিচালন ব্যয় এবং জ্বালানি খরচ থাকে তুলনামূলক অনেক কম এবং স্থিতিশীল।
বর্তমানে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ জ্বালানি ভেদে ভিন্ন। দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাস দিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট ৩ থেকে ৫ টাকার মধ্যে থাকলেও, আমদানিকৃত এলএনজি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ পড়ছে ১০ থেকে ১৪ টাকা। অন্যদিকে, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ৮ থেকে ১০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের অনুমান অনুযায়ী, রূপপুরের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম হতে পারে ৮ থেকে ১২ টাকার মধ্যে। যদিও এটি দেশীয় গ্যাসের চেয়ে বেশি, তবে এটি আমদানিকৃত জ্বালানির তুলনায় অনেক বেশি স্থিতিশীল। কারণ, পারমাণবিক জ্বালানির দাম বাড়লেও তা মোট উৎপাদন ব্যয়ের ওপর খুব সামান্যই প্রভাব ফেলে, যা এলএনজি বা তেলের ক্ষেত্রে পুরোপুরি বিপরীত।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠ হলো ঋণের বোঝা। রাশিয়ার ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ার পর প্রতি বছর বাংলাদেশকে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ কোটি মার্কিন ডলার কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। উদ্বেগের বিষয় হলো, একই সময়ে বাংলাদেশ মেট্রোরেল, পায়রা বন্দর এবং অন্যান্য মেগা প্রকল্পের ঋণ পরিশোধের চাপের মধ্যেও থাকবে। ফলে পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার সংস্থান রাখা এবং জাতীয় অর্থনীতির ওপর এই ঋণের প্রভাব ব্যবস্থাপনা করা আগামী দিনগুলোতে সরকারের জন্য একটি বড় পরীক্ষা হবে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: পারমাণবিক শক্তির ভিন্নমুখী পথ
পারমাণবিক শক্তি নিয়ে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে একটি ‘পলিসি ক্রস রোড’ বা দ্বিমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। একে বলা হচ্ছে ‘ডাইভারজেন্ট স্ট্র্যাটেজি’। একদল দেশ পারমাণবিক শক্তি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, অন্যদল একে জ্বালানি নিরাপত্তার মূল ভিত্তি বানাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, জার্মানি ২০২৩ সালে তাদের সর্বশেষ তিনটি পারমাণবিক চুল্লি বন্ধ করে দিয়ে সম্পূর্ণভাবে এই প্রযুক্তি থেকে বেরিয়ে এসেছে। জাপানের ফুকুশিমা দুর্ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে এক ধরনের ভীতি তৈরি হয়েছিল, যা জার্মানির এই সিদ্ধান্তকে ত্বরান্বিত করে।

অন্যদিকে, ফ্রান্স ও চীনের মতো দেশগুলো তাদের জ্বালানি সক্ষমতা ও জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যাপকভাবে পারমাণবিক প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করছে। এমনকি জাপানও ফুকুশিমা দুর্ঘটনার পর তাদের কেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দিলেও সাম্প্রতিক বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মুখে তারা আবার তাদের কিছু রিঅ্যাক্টর চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও পাকিস্তান অনেক আগে থেকেই পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। বাংলাদেশ এখন এই ‘হাই টেকনোলজি লিপ’-এর মাধ্যমে নিজেকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে, যা দেশটিকে বৈশ্বিক ‘নিউক্লিয়ার ক্লাবে’র সদস্য পদ এনে দিয়েছে।
ঝুঁকি ও অজানার চ্যালেঞ্জ
রূপপুর কেবল সাফল্যের গল্প নয়, এটি কিছু গভীর প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত ঝুঁকিও সামনে নিয়ে এসেছে। প্রথমত, প্রযুক্তিগত নির্ভরতা। ইউরেনিয়াম আমদানি থেকে শুরু করে রিফুয়েলিং এবং কারিগরি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বাংলাদেশ দীর্ঘকাল রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল থাকবে। এটি এক ধরনের নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করে।
দ্বিতীয়ত, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। ব্যবহৃত তেজস্ক্রিয় জ্বালানি বা স্পেন্ট ফুয়েল রড ব্যবস্থাপনা একটি অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ। যদিও রাশিয়ার সাথে ব্যবহৃত জ্বালানি ফেরত নেওয়ার চুক্তি রয়েছে, তবুও এই তেজস্ক্রিয় পদার্থ হ্যান্ডলিং এবং পরিবহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বিশাল দায়িত্ব।
তৃতীয়ত, নিরাপত্তা সক্ষমতা। প্রযুক্তির আধুনিকায়নের পাশাপাশি দেশীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং মানবসম্পদকে আন্তর্জাতিক মানের সমকক্ষ করে তোলা জরুরি। পারমাণবিক বিদ্যুতের ক্ষেত্রে ছোট কোনো কারিগরি ত্রুটিও একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই কারিগরি উৎকর্ষের পাশাপাশি কঠোর নিরাপত্তা সংস্কৃতি গড়ে তোলা এই প্রকল্পের সাফল্যের জন্য অপরিহার্য।
রূপান্তরের প্রতীক্ষায় বাংলাদেশ
সব বিতর্ক এবং চ্যালেঞ্জের ঊর্ধ্বে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বাংলাদেশের জন্য এক অনন্য মাইলফলক। এটি কেবল কয়েক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের কারখানা নয়; বরং এটি বাংলাদেশের বিজ্ঞানমনস্ক জাতি হিসেবে গড়ে ওঠার এবং উচ্চপ্রযুক্তিতে প্রবেশের এক সাহসী আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। এটি প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ এখন একটি জটিল এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়নের কারিগরি ও রাজনৈতিক সক্ষমতা রাখে।
রূপপুর সফলভাবে পরিচালিত হলে তা কেবল শিল্পের চাকাই সচল করবে না, বরং বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার মেরুদণ্ড হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে। এটি কি বাংলাদেশের জ্বালানি স্বাধীনতার পথ দেখাবে, নাকি নতুন ধরনের বৈশ্বিক নির্ভরতা তৈরি করবে, তার উত্তর হয়তো দেবে আগামী কয়েক দশক। তবে বর্তমানের তীব্র ‘বিদ্যুতের ক্ষুধা’ মেটাতে এবং আমদানিকৃত জ্বালানির অস্থির বাজার থেকে সুরক্ষা পেতে পারমাণবিক প্রযুক্তিতে এই প্রবেশ ছিল এক সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। অর্জন এবং অজানার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রূপপুর এখন আগামী দিনের উন্নত ও প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখাচ্ছে। এটি কেবল বিদ্যুতের আলো নয়, বরং এক নতুন দিনের আত্মবিশ্বাসের আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে।

সরকার প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক বাজারে সভরেন বা সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর চিন্তা করছে। অবশ্য এটি প্রথমবার নয়। এর আগেও একবার এমন চিন্তা হয়েছিল। কিন্তু তা বাস্তবে রূপ নেয়নি। কিন্তু এবার বেশ জোরেশোরেই এ চিন্তা করা হচ্ছে। মূলত অভ্যন্তরীণ ঋণ কমানোর লক্ষ্যেই এ চিন্তা করছে সরকার। কিন্তু অর্থনীতিকে সঠিক

এই অদ্ভুত চুপচাপ, নির্বিকার স্বভাবের কারণে ওলিস একটা নাম পেয়েছেন। তা হল - ‘মিস্টার ননশ্যালান্ট’ বা শান্ত, নির্বিকার স্বভাবের একজন মানুষ। তবে ফুটবল পায়ে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন একজন মানুষ। লন্ডনে জন্ম নেওয়া এই ফরাসি প্লেমেকারকে দূর থেকে যতোটা নির্লিপ্ত মনে হয়, বাস্তবে তিনি এর ঠিক উল্টোটাই।