চরচা ডেস্ক

সপ্তাহব্যাপী রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে যে সাময়িক যুদ্ধবিরতি চলছিল, তাকে এবার একটি স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে রূপ দিতে একমত হয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। উভয় দেশই এখন একটি সমঝোতা স্মারক বা মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং স্বাক্ষরের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, যা দুই দেশের মধ্যকার সব অমীমাংসিত সমস্যা সমাধানের একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করবে। তবে চূড়ান্ত এই চুক্তিটি আজই সই হচ্ছে না বলেই আভাস পাওয়া গেছে।
কূটনৈতিক মহলে এখন সবচেয়ে বড় কৌতূহল–কী আছে এই বহুল প্রতীক্ষিত সমঝোতা স্মারকে? পর্দার আড়ালের সেই শর্তগুলো এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
তবে এই উদ্যোগের মূল ভিত্তি হলো–স্মারকটি স্বাক্ষরিত হওয়ামাত্রই চলমান সব ধরনের যুদ্ধবিগ্রহের চিরতরে অবসান ঘটবে। আর এই শান্তির বার্তা দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের জন্যই এই মুহূর্তে সবচেয়ে স্বস্তির খবর। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চলতি বছরের শেষের দিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘মিডটার্ম’ বা মধ্যবর্তী নির্বাচনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত ইরানও চাইছে এই যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ।
চুক্তির অভ্যন্তরীণ খসড়া সম্পর্কে ধারণা আছে–এমন একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন যে সমঝোতা স্মারকটি চূড়ান্ত করার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে, তার সাম্প্রতিকতম সংস্করণে একটি বড় সুখবর রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ পর্যায়ক্রমে পুনরায় উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে এবং ইরানি বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের যে কঠোর অবরোধ বা ব্লকেড রয়েছে, তারও অবসান ঘটবে। আর এই প্রাথমিক শর্তগুলো বাস্তবায়নের পর থেকেই শুরু হবে একটি নির্দিষ্ট কাউন্টডাউন বা সময়সীমা, যার ভেতরে দুই পক্ষকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও জটিল বিষয়গুলো আলোচনার টেবিলে বসে চিরতরে মীমাংসা করতে হবে।
ওয়াশিংটনের এক উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক কর্মকর্তা রোববার সিএনএন-কে জানিয়েছেন, এই খসড়া সমঝোতা চুক্তিটি মূলত চূড়ান্ত চুক্তির শর্তে পৌঁছানোর জন্য উভয় পক্ষকে ৬০ দিনের একটি সময়সীমা বেঁধে দিচ্ছে।

ওই কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য এই চুক্তিটি নিশ্চিত করবে, যেন ইরান কখনই কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে। একই সাথে এটি ইরানকে তাদের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করতে বাধ্য করবে, যেটিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রায়ই নিউক্লিয়ার ডাস্ট বলে থাকেন। তবে ইরানের এই ইউরেনিয়ামের বিশাল মজুত কীভাবে এবং কোথায় ধ্বংস বা অপসারণ করা হবে, তা নির্ধারণ করা হবে আলোচনার পরবর্তী ধাপে।
পুরো প্রক্রিয়ার কৌশলগত কাঠামো ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ওই কর্মকর্তা অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেন, “এই কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো–ইরান যদি তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে, তবে তারা কিছুই পাবে না। সোজা কথা কোনো ডাস্ট নেই, তো কোনো ডলারও নেই! হরমুজ প্রণালী যেভাবে উন্মুক্ত করা হবে, ঠিক সেই অনুপাতে বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধও শিথিল করা হবে।” বিষয়টিকে তিনি বর্ণনা করেছেন আক্ষরিক অর্থেই এক কড়া হুঁশিয়ারি হিসেবে, যা যেন বিখ্যাত মার্কিন নীতি ‘বিশ্বাস করো কিন্তু যাচাই করে নাও’ (ট্রাস্ট বাট ভেরিফাই) এর এক চরম ও কঠোর সংস্করণ।
তবে মার্কিন প্রশাসন যতটা আশাবাদী, ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো এই সমঝোতা স্মারক আদৌ বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নিয়ে ঠিক ততটাই সংশয় প্রকাশ করেছে। ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম গত রোববার জানিয়েছে, সম্ভাব্য এই সমঝোতা স্মারকের এক বা দুটি ধারা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে এখনও তীব্র মতবিরোধ রয়ে গেছে।
এদিকে চুক্তিটির বেশির ভাগ অংশই চূড়ান্ত হয়ে গেছে–এমন গুঞ্জনের মধ্যেই গত রোববার সুর কিছুটা বদলেছেন খোদ ট্রাম্প। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র কোনো অবস্থাতেই তাড়াহুড়ো করে কোনো চুক্তিতে সই করবে না।
বারাক ওবামার আমলে হওয়া পূর্ববর্তী পরমাণু চুক্তির কড়া সমালোচনা করে ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে লিখেছেন, “আমি যদি ইরানের সাথে কোনো চুক্তি করি, তবে সেটি হবে অত্যন্ত নিখুঁত ও উপযুক্ত একটি চুক্তি; ওবামার করা চুক্তির মতো মোটেও নয়।”
ট্রাম্পের দাবি, ওবামার সেই চুক্তিটি ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির একটি সহজ ও উন্মুক্ত পথ তৈরি করে দিয়েছিল। তবে তার নিজের প্রস্তাবিত চুক্তিটি যে তার সম্পূর্ণ বিপরীত, তা উল্লেখ করলেও ট্রাম্প বলেন, “এটি সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী একটি চুক্তি, যা এখনও কেউ দেখেনি এবং এটি সম্পর্কে কেউ কিছু জানেও না।”
পরস্পরবিরোধী এমন নানামুখী বিবৃতির মাঝেই এখন আবর্তিত হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ শান্তি ও পরমাণু নিরাপত্তার মূল চাবিকাঠি।
ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার এই সম্ভাব্য চুক্তির সবচেয়ে বড় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন ‘হরমুজ প্রণালী’। বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম লাইফলাইন এই নৌপথটি নিয়ে ইতিমধ্যেই দুই পক্ষের মধ্যে শুরু হয়েছে চরম মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ।
গত শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, খসড়া সমঝোতা স্মারকের আওতায় কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই হরমুজ প্রণালী বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য পুনরায় খুলে দেওয়া হবে।
কিন্তু ট্রাম্পের এই দাবিকে পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো। বিশেষ করে দেশটির কট্টরপন্থী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যমগুলো রোববার স্পষ্ট জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণভাবে ইরানের নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। তবে তারা আগামী ৩০ দিনের মধ্যে এই রুটে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলকে যুদ্ধপূর্ব স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার অনুমতি দিতে পারে।
একই সাথে ইরান দাবি করছে, হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার সমান্তরালে তাদের বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন অবরোধও তুলে নিতে হবে। কিন্তু ইরানের এই অনড় অবস্থানের মুখে রোববার ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টা কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে লিখেছেন, “যতক্ষণ না একটি চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন ও স্বাক্ষরিত হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত মার্কিন ব্লকেড বা অবরোধ বহাল থাকবে।”
ট্রাম্পের এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, তিনি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক নয়, বরং চূড়ান্ত চুক্তি সইয়ের আগে অবরোধ তোলার মুডে নেই।
ইরানি গণমাধ্যমগুলো একটি বিষয়ে বেশ জোর দিচ্ছে–নৌপথটি উন্মুক্ত করার মানে এই নয় যে, তেহরান এই কৌশলগত জলসীমার ওপর তাদের যুদ্ধকালীন অধিকার বা দাবি ত্যাগ করছে। সহজ কথায়, ইরান এটিই বোঝাতে চাইছে যে, তারা বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পরিমাণ স্বাভাবিক করতে রাজি হলেও যুদ্ধ শুরুর আগে এই রুটে তাদের যতটা নিয়ন্ত্রণ ছিল, তার চেয়েও অনেক বেশি কড়া নিয়ন্ত্রণ তারা ভবিষ্যতেও বজায় রাখতে চায়।
রোববার সিএনএন-এর সাথে আলাপকালে এক ইরানি সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “প্রণালীটি তো ইতিমধ্যেই খোলা রয়েছে, তবে নিরাপদ ট্রানজিট নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ইরানি কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয় করা বাধ্যতামূলক।”
বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই শনিবার স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, “হরমুজ প্রণালীর সাথে আমেরিকার কোনো সম্পর্ক নেই। এটি সম্পূর্ণ আমাদের এবং এই উপকূলীয় দেশগুলোর, বিশেষ করে ওমানের মধ্যকার নিজস্ব অভ্যন্তরীণ বিষয়।”
উল্লেখ্য, চলমান এই সংঘাতের পুরোটা সময়জুড়েই ইরান দাবি করে আসছে যে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর শুল্ক বা ফি আরোপ করার পূর্ণ অধিকার তাদের রয়েছে।

এবারের সমঝোতা প্রক্রিয়ার সবচেয়ে জটিল ও বিতর্কিত অধ্যায়টি হলো ইরানের ইউরেনিয়ামের মজুত এবং তা সমৃদ্ধকরণ প্রক্রিয়া। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার সম্ভাব্য চুক্তিতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে ইরানের একটি অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে রোববার সিএনএন রিপোর্ট করেছে। এই খসড়া পরিকল্পনার সাথে সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, চুক্তির আওতায় ইরান তাদের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ত্যাগ করার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় বসতে এবং নতুন করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হবে।
তবে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সুর সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে এই প্রাথমিক সমঝোতা স্মারকটি পুরোপুরি চূড়ান্ত হওয়ার পরই কেবল ইউরেনিয়াম নিয়ে কোনো আলোচনা শুরু হতে পারে। উল্লেখ্য, ইউরেনিয়াম হলো পারমাণবিক চুল্লির মূল জ্বালানি, যা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ করা হলে তা দিয়ে অতি সহজেই পারমাণবিক বোমা তৈরি করা সম্ভব।
বিষয়টি নিয়ে গত শনিবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সরাসরি বলেন, “এই পর্যায়ে পারমাণবিক কোনো বিষয় নিয়ে মোটেও আলোচনা করা হচ্ছে না।”
একই সুর শোনা গেছে ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ‘ফার্স’-এর রোববারের প্রতিবেদনেও। তারা বেশ জোর দিয়ে বলেছে, “এই চুক্তিতে পারমাণবিক মজুত হস্তান্তর করা, কোনো বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়া, পারমাণবিক স্থাপনা বন্ধ করা, এমনকি পারমাণবিক বোমা তৈরি না করার বিষয়েও ইরান কোনো ধরনের প্রতিশ্রুতি দেয়নি।”
অথচ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরু থেকেই জেদ ধরে আছেন যে, যেকোনো উপায়ে হোক ইরানকে তাদের কাছে থাকা ৪০০ কেজিরও বেশি (প্রায় ৯০০ পাউন্ড) উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সম্পূর্ণ ত্যাগ করতেই হবে। ধারণা করা হয়, গত বছর মার্কিন বিমান হামলার পর ইরান এই ইউরেনিয়ামের একটি বড় অংশ মাটির নিচে অত্যন্ত গোপন স্থানে সরিয়ে নিয়েছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রাথমিক এই সমঝোতা স্মারকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের বিষয়টি বিস্তারিতভাবে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। ফলে চূড়ান্ত ও সামগ্রিক একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে দুই পক্ষের এই বিপরীতমুখী অবস্থানকে এক টেবিলে আনাটাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ট্রাম্প অবশ্য এর আগে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকেই তার সামরিক অভিযানের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন এবং জানিয়েছিলেন যে, ইরান যদি আগামী ২০ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি স্থগিত রাখে, তবেই তা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।
ইরানের আটকে থাকা অর্থ
এবারের কূটনীতির টেবিলে ইরানের জন্য সবচেয়ে জরুরি এবং সংবেদনশীল বিষয়টি হলো তাদের আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ অর্থ। বর্তমানে গভীর অর্থনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত ইরান বিদেশি ব্যাংকগুলোতে ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ হয়ে থাকা তাদের শত কোটি ডলারের সম্পদ অবিলম্বে সচল করার জোরালো দাবি জানিয়েছে।
শনিবার এক বিবৃতিতে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই স্পষ্ট করে বলেন, “এই পুরো প্রক্রিয়ার একেবারে শুরুতেই অবরুদ্ধ সম্পদগুলো ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি পরিষ্কার করতে হবে।”
একই সুরে সুর মিলিয়ে রোববার একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা তাসনিম বেশ কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, “এই প্রথম পদক্ষেপেই যদি ইরানের ব্লকেড বা আটকে থাকা সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ অবমুক্ত না করা হয়–এবং বাকি সমস্ত সম্পদ নিশ্চিত ও ধারাবাহিকভাবে ফেরত দেওয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট মেকানিজম বা রূপরেখা তৈরি না হয়, তবে কোনো চুক্তিই আলোর মুখ দেখবে না।”
কিন্তু তেহরানের এই চরম অনড় অবস্থানের বিপরীতে ওয়াশিংটনও তাদের অবস্থানে অটল। মার্কিন প্রশাসনের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা রোববার সিএনএন-কে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানের এই আটকে থাকা অর্থ কেবল তখনই ছাড় করা হবে, যখন বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য কৌশলগত হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি উন্মুক্ত করা হবে।
বিশ্বের বেশ কয়েকটি বিদেশি ব্যাংকে জমা থাকা এই বিশাল পরিমাণ অর্থ ঠিক কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় ইরানের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হবে, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট বা চূড়ান্ত প্রতিশ্রুতি দেয়নি। ফলে দুই দেশের এই অর্থ বনাম নৌপথের দরকষাকষি চুক্তিটিকে এক সুতোয় বাঁধার ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নিষেধাজ্ঞা
আমেরিকা ও ইউরোপের চাপানো অসংখ্য আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। শনিবার বাঘাই বলেন, “এত সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে না,” যদিও “সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ইরানের দাবিটি খসড়া নথিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।” তিনি আরও যোগ করেন, “স্মারকটি চূড়ান্ত হওয়ার পর বিস্তারিত শর্তাবলি নিয়ে আলোচনা করতে হবে।” তার এই মন্তব্য থেকে ইঙ্গিত মেলে যে, নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের বিষয়টি পারমাণবিক ইস্যুর সাথে যুক্ত থাকবে। ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, দেশটির হিসাব অনুযায়ী কেবল তেল বিক্রির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলেই আগামী ৬০ দিনের মধ্যে সরকারের প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব আয় হতে পারে। ইরানের আটকে থাকা সম্পদের মতোই, তাদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলো কেবল তখনই প্রত্যাহার করা হবে, যখন হরমুজ প্রণালী আবার খুলে দেওয়া হবে এবং সেখানে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে বলে সিএনএন-কে জানিয়েছেন এক মার্কিন কর্মকর্তা।
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র
চলমান সংঘাতের সময় মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছিলেন যে, ইরানের দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো অবশ্যই ধ্বংস করতে হবে। ট্রাম্প বলেছিলেন যে, ইরানের “প্রচলিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি অত্যন্ত দ্রুত ও নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।” তবে ইসরায়েল এবং পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলো এই ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারকে একটি জরুরি ঝুঁকি হিসেবে দেখলেও সাম্প্রতিক সময়ে এই ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে বৃহত্তর আলোচনার অংশ করার বিষয়ে আলোচনা বেশ কমে গেছে।
লেবানন
ইসরায়েল এবং লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যকার সংঘাতের বিষয়টি কীভাবে বা আদৌ সমাধান করা হবে কি না, তা এখনও অস্পষ্ট। আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম রোববার জানিয়েছে, সমঝোতা স্মারকের শব্দ চয়নে “লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধের অবসান ঘোষণার” কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে ইসরায়েলের এক কর্মকর্তা সিএনএন-কে জানিয়েছেন, ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে বলেছেন যে, তিনি লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যেকোনো হুমকির বিরুদ্ধে ইসরায়েলের ‘সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার স্বাধীনতা বজায় রাখার’ ইচ্ছাকে সমর্থন করেন। ওই কর্মকর্তা রোববার জানান, শনিবার সন্ধ্যায় ট্রাম্পের সাথে এক ফোনালাপে নেতানিয়াহু জোর দিয়ে বলেন যে, “ইসরায়েল লেবাননসহ সব ফ্রন্টের হুমকির বিরুদ্ধে তাদের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার স্বাধীনতা বজায় রাখবে এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই নীতির প্রতি তার সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন।”
অবশেষে, সিএনএন-কে এক ইরানি সূত্র রোববার জানিয়েছেন, ইরান একটি “ন্যায়সঙ্গত এবং ভারসাম্যপূর্ণ চুক্তির” জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। “আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে এই যুদ্ধ যেন চিরতরে শেষ হয়।”
*সিএনএনে প্রকাশিত নিবন্ধ থেকে অনূদিত *

সপ্তাহব্যাপী রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে যে সাময়িক যুদ্ধবিরতি চলছিল, তাকে এবার একটি স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে রূপ দিতে একমত হয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। উভয় দেশই এখন একটি সমঝোতা স্মারক বা মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং স্বাক্ষরের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, যা দুই দেশের মধ্যকার সব অমীমাংসিত সমস্যা সমাধানের একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করবে। তবে চূড়ান্ত এই চুক্তিটি আজই সই হচ্ছে না বলেই আভাস পাওয়া গেছে।
কূটনৈতিক মহলে এখন সবচেয়ে বড় কৌতূহল–কী আছে এই বহুল প্রতীক্ষিত সমঝোতা স্মারকে? পর্দার আড়ালের সেই শর্তগুলো এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
তবে এই উদ্যোগের মূল ভিত্তি হলো–স্মারকটি স্বাক্ষরিত হওয়ামাত্রই চলমান সব ধরনের যুদ্ধবিগ্রহের চিরতরে অবসান ঘটবে। আর এই শান্তির বার্তা দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের জন্যই এই মুহূর্তে সবচেয়ে স্বস্তির খবর। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চলতি বছরের শেষের দিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘মিডটার্ম’ বা মধ্যবর্তী নির্বাচনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত ইরানও চাইছে এই যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ।
চুক্তির অভ্যন্তরীণ খসড়া সম্পর্কে ধারণা আছে–এমন একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন যে সমঝোতা স্মারকটি চূড়ান্ত করার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে, তার সাম্প্রতিকতম সংস্করণে একটি বড় সুখবর রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ পর্যায়ক্রমে পুনরায় উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে এবং ইরানি বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের যে কঠোর অবরোধ বা ব্লকেড রয়েছে, তারও অবসান ঘটবে। আর এই প্রাথমিক শর্তগুলো বাস্তবায়নের পর থেকেই শুরু হবে একটি নির্দিষ্ট কাউন্টডাউন বা সময়সীমা, যার ভেতরে দুই পক্ষকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও জটিল বিষয়গুলো আলোচনার টেবিলে বসে চিরতরে মীমাংসা করতে হবে।
ওয়াশিংটনের এক উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক কর্মকর্তা রোববার সিএনএন-কে জানিয়েছেন, এই খসড়া সমঝোতা চুক্তিটি মূলত চূড়ান্ত চুক্তির শর্তে পৌঁছানোর জন্য উভয় পক্ষকে ৬০ দিনের একটি সময়সীমা বেঁধে দিচ্ছে।

ওই কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য এই চুক্তিটি নিশ্চিত করবে, যেন ইরান কখনই কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে। একই সাথে এটি ইরানকে তাদের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করতে বাধ্য করবে, যেটিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রায়ই নিউক্লিয়ার ডাস্ট বলে থাকেন। তবে ইরানের এই ইউরেনিয়ামের বিশাল মজুত কীভাবে এবং কোথায় ধ্বংস বা অপসারণ করা হবে, তা নির্ধারণ করা হবে আলোচনার পরবর্তী ধাপে।
পুরো প্রক্রিয়ার কৌশলগত কাঠামো ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ওই কর্মকর্তা অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেন, “এই কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো–ইরান যদি তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে, তবে তারা কিছুই পাবে না। সোজা কথা কোনো ডাস্ট নেই, তো কোনো ডলারও নেই! হরমুজ প্রণালী যেভাবে উন্মুক্ত করা হবে, ঠিক সেই অনুপাতে বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধও শিথিল করা হবে।” বিষয়টিকে তিনি বর্ণনা করেছেন আক্ষরিক অর্থেই এক কড়া হুঁশিয়ারি হিসেবে, যা যেন বিখ্যাত মার্কিন নীতি ‘বিশ্বাস করো কিন্তু যাচাই করে নাও’ (ট্রাস্ট বাট ভেরিফাই) এর এক চরম ও কঠোর সংস্করণ।
তবে মার্কিন প্রশাসন যতটা আশাবাদী, ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো এই সমঝোতা স্মারক আদৌ বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নিয়ে ঠিক ততটাই সংশয় প্রকাশ করেছে। ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম গত রোববার জানিয়েছে, সম্ভাব্য এই সমঝোতা স্মারকের এক বা দুটি ধারা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে এখনও তীব্র মতবিরোধ রয়ে গেছে।
এদিকে চুক্তিটির বেশির ভাগ অংশই চূড়ান্ত হয়ে গেছে–এমন গুঞ্জনের মধ্যেই গত রোববার সুর কিছুটা বদলেছেন খোদ ট্রাম্প। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র কোনো অবস্থাতেই তাড়াহুড়ো করে কোনো চুক্তিতে সই করবে না।
বারাক ওবামার আমলে হওয়া পূর্ববর্তী পরমাণু চুক্তির কড়া সমালোচনা করে ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে লিখেছেন, “আমি যদি ইরানের সাথে কোনো চুক্তি করি, তবে সেটি হবে অত্যন্ত নিখুঁত ও উপযুক্ত একটি চুক্তি; ওবামার করা চুক্তির মতো মোটেও নয়।”
ট্রাম্পের দাবি, ওবামার সেই চুক্তিটি ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির একটি সহজ ও উন্মুক্ত পথ তৈরি করে দিয়েছিল। তবে তার নিজের প্রস্তাবিত চুক্তিটি যে তার সম্পূর্ণ বিপরীত, তা উল্লেখ করলেও ট্রাম্প বলেন, “এটি সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী একটি চুক্তি, যা এখনও কেউ দেখেনি এবং এটি সম্পর্কে কেউ কিছু জানেও না।”
পরস্পরবিরোধী এমন নানামুখী বিবৃতির মাঝেই এখন আবর্তিত হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ শান্তি ও পরমাণু নিরাপত্তার মূল চাবিকাঠি।
ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার এই সম্ভাব্য চুক্তির সবচেয়ে বড় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন ‘হরমুজ প্রণালী’। বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম লাইফলাইন এই নৌপথটি নিয়ে ইতিমধ্যেই দুই পক্ষের মধ্যে শুরু হয়েছে চরম মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ।
গত শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, খসড়া সমঝোতা স্মারকের আওতায় কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই হরমুজ প্রণালী বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য পুনরায় খুলে দেওয়া হবে।
কিন্তু ট্রাম্পের এই দাবিকে পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো। বিশেষ করে দেশটির কট্টরপন্থী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যমগুলো রোববার স্পষ্ট জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণভাবে ইরানের নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। তবে তারা আগামী ৩০ দিনের মধ্যে এই রুটে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলকে যুদ্ধপূর্ব স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার অনুমতি দিতে পারে।
একই সাথে ইরান দাবি করছে, হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার সমান্তরালে তাদের বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন অবরোধও তুলে নিতে হবে। কিন্তু ইরানের এই অনড় অবস্থানের মুখে রোববার ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টা কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে লিখেছেন, “যতক্ষণ না একটি চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন ও স্বাক্ষরিত হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত মার্কিন ব্লকেড বা অবরোধ বহাল থাকবে।”
ট্রাম্পের এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, তিনি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক নয়, বরং চূড়ান্ত চুক্তি সইয়ের আগে অবরোধ তোলার মুডে নেই।
ইরানি গণমাধ্যমগুলো একটি বিষয়ে বেশ জোর দিচ্ছে–নৌপথটি উন্মুক্ত করার মানে এই নয় যে, তেহরান এই কৌশলগত জলসীমার ওপর তাদের যুদ্ধকালীন অধিকার বা দাবি ত্যাগ করছে। সহজ কথায়, ইরান এটিই বোঝাতে চাইছে যে, তারা বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পরিমাণ স্বাভাবিক করতে রাজি হলেও যুদ্ধ শুরুর আগে এই রুটে তাদের যতটা নিয়ন্ত্রণ ছিল, তার চেয়েও অনেক বেশি কড়া নিয়ন্ত্রণ তারা ভবিষ্যতেও বজায় রাখতে চায়।
রোববার সিএনএন-এর সাথে আলাপকালে এক ইরানি সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “প্রণালীটি তো ইতিমধ্যেই খোলা রয়েছে, তবে নিরাপদ ট্রানজিট নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ইরানি কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয় করা বাধ্যতামূলক।”
বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই শনিবার স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, “হরমুজ প্রণালীর সাথে আমেরিকার কোনো সম্পর্ক নেই। এটি সম্পূর্ণ আমাদের এবং এই উপকূলীয় দেশগুলোর, বিশেষ করে ওমানের মধ্যকার নিজস্ব অভ্যন্তরীণ বিষয়।”
উল্লেখ্য, চলমান এই সংঘাতের পুরোটা সময়জুড়েই ইরান দাবি করে আসছে যে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর শুল্ক বা ফি আরোপ করার পূর্ণ অধিকার তাদের রয়েছে।

এবারের সমঝোতা প্রক্রিয়ার সবচেয়ে জটিল ও বিতর্কিত অধ্যায়টি হলো ইরানের ইউরেনিয়ামের মজুত এবং তা সমৃদ্ধকরণ প্রক্রিয়া। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার সম্ভাব্য চুক্তিতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে ইরানের একটি অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে রোববার সিএনএন রিপোর্ট করেছে। এই খসড়া পরিকল্পনার সাথে সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, চুক্তির আওতায় ইরান তাদের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ত্যাগ করার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় বসতে এবং নতুন করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হবে।
তবে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সুর সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে এই প্রাথমিক সমঝোতা স্মারকটি পুরোপুরি চূড়ান্ত হওয়ার পরই কেবল ইউরেনিয়াম নিয়ে কোনো আলোচনা শুরু হতে পারে। উল্লেখ্য, ইউরেনিয়াম হলো পারমাণবিক চুল্লির মূল জ্বালানি, যা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ করা হলে তা দিয়ে অতি সহজেই পারমাণবিক বোমা তৈরি করা সম্ভব।
বিষয়টি নিয়ে গত শনিবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সরাসরি বলেন, “এই পর্যায়ে পারমাণবিক কোনো বিষয় নিয়ে মোটেও আলোচনা করা হচ্ছে না।”
একই সুর শোনা গেছে ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ‘ফার্স’-এর রোববারের প্রতিবেদনেও। তারা বেশ জোর দিয়ে বলেছে, “এই চুক্তিতে পারমাণবিক মজুত হস্তান্তর করা, কোনো বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়া, পারমাণবিক স্থাপনা বন্ধ করা, এমনকি পারমাণবিক বোমা তৈরি না করার বিষয়েও ইরান কোনো ধরনের প্রতিশ্রুতি দেয়নি।”
অথচ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরু থেকেই জেদ ধরে আছেন যে, যেকোনো উপায়ে হোক ইরানকে তাদের কাছে থাকা ৪০০ কেজিরও বেশি (প্রায় ৯০০ পাউন্ড) উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সম্পূর্ণ ত্যাগ করতেই হবে। ধারণা করা হয়, গত বছর মার্কিন বিমান হামলার পর ইরান এই ইউরেনিয়ামের একটি বড় অংশ মাটির নিচে অত্যন্ত গোপন স্থানে সরিয়ে নিয়েছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রাথমিক এই সমঝোতা স্মারকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের বিষয়টি বিস্তারিতভাবে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। ফলে চূড়ান্ত ও সামগ্রিক একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে দুই পক্ষের এই বিপরীতমুখী অবস্থানকে এক টেবিলে আনাটাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ট্রাম্প অবশ্য এর আগে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকেই তার সামরিক অভিযানের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন এবং জানিয়েছিলেন যে, ইরান যদি আগামী ২০ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি স্থগিত রাখে, তবেই তা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।
ইরানের আটকে থাকা অর্থ
এবারের কূটনীতির টেবিলে ইরানের জন্য সবচেয়ে জরুরি এবং সংবেদনশীল বিষয়টি হলো তাদের আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ অর্থ। বর্তমানে গভীর অর্থনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত ইরান বিদেশি ব্যাংকগুলোতে ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ হয়ে থাকা তাদের শত কোটি ডলারের সম্পদ অবিলম্বে সচল করার জোরালো দাবি জানিয়েছে।
শনিবার এক বিবৃতিতে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই স্পষ্ট করে বলেন, “এই পুরো প্রক্রিয়ার একেবারে শুরুতেই অবরুদ্ধ সম্পদগুলো ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি পরিষ্কার করতে হবে।”
একই সুরে সুর মিলিয়ে রোববার একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা তাসনিম বেশ কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, “এই প্রথম পদক্ষেপেই যদি ইরানের ব্লকেড বা আটকে থাকা সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ অবমুক্ত না করা হয়–এবং বাকি সমস্ত সম্পদ নিশ্চিত ও ধারাবাহিকভাবে ফেরত দেওয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট মেকানিজম বা রূপরেখা তৈরি না হয়, তবে কোনো চুক্তিই আলোর মুখ দেখবে না।”
কিন্তু তেহরানের এই চরম অনড় অবস্থানের বিপরীতে ওয়াশিংটনও তাদের অবস্থানে অটল। মার্কিন প্রশাসনের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা রোববার সিএনএন-কে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানের এই আটকে থাকা অর্থ কেবল তখনই ছাড় করা হবে, যখন বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য কৌশলগত হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি উন্মুক্ত করা হবে।
বিশ্বের বেশ কয়েকটি বিদেশি ব্যাংকে জমা থাকা এই বিশাল পরিমাণ অর্থ ঠিক কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় ইরানের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হবে, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট বা চূড়ান্ত প্রতিশ্রুতি দেয়নি। ফলে দুই দেশের এই অর্থ বনাম নৌপথের দরকষাকষি চুক্তিটিকে এক সুতোয় বাঁধার ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নিষেধাজ্ঞা
আমেরিকা ও ইউরোপের চাপানো অসংখ্য আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। শনিবার বাঘাই বলেন, “এত সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে না,” যদিও “সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ইরানের দাবিটি খসড়া নথিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।” তিনি আরও যোগ করেন, “স্মারকটি চূড়ান্ত হওয়ার পর বিস্তারিত শর্তাবলি নিয়ে আলোচনা করতে হবে।” তার এই মন্তব্য থেকে ইঙ্গিত মেলে যে, নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের বিষয়টি পারমাণবিক ইস্যুর সাথে যুক্ত থাকবে। ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, দেশটির হিসাব অনুযায়ী কেবল তেল বিক্রির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলেই আগামী ৬০ দিনের মধ্যে সরকারের প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব আয় হতে পারে। ইরানের আটকে থাকা সম্পদের মতোই, তাদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলো কেবল তখনই প্রত্যাহার করা হবে, যখন হরমুজ প্রণালী আবার খুলে দেওয়া হবে এবং সেখানে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে বলে সিএনএন-কে জানিয়েছেন এক মার্কিন কর্মকর্তা।
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র
চলমান সংঘাতের সময় মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছিলেন যে, ইরানের দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো অবশ্যই ধ্বংস করতে হবে। ট্রাম্প বলেছিলেন যে, ইরানের “প্রচলিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি অত্যন্ত দ্রুত ও নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।” তবে ইসরায়েল এবং পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলো এই ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারকে একটি জরুরি ঝুঁকি হিসেবে দেখলেও সাম্প্রতিক সময়ে এই ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে বৃহত্তর আলোচনার অংশ করার বিষয়ে আলোচনা বেশ কমে গেছে।
লেবানন
ইসরায়েল এবং লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যকার সংঘাতের বিষয়টি কীভাবে বা আদৌ সমাধান করা হবে কি না, তা এখনও অস্পষ্ট। আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম রোববার জানিয়েছে, সমঝোতা স্মারকের শব্দ চয়নে “লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধের অবসান ঘোষণার” কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে ইসরায়েলের এক কর্মকর্তা সিএনএন-কে জানিয়েছেন, ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে বলেছেন যে, তিনি লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যেকোনো হুমকির বিরুদ্ধে ইসরায়েলের ‘সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার স্বাধীনতা বজায় রাখার’ ইচ্ছাকে সমর্থন করেন। ওই কর্মকর্তা রোববার জানান, শনিবার সন্ধ্যায় ট্রাম্পের সাথে এক ফোনালাপে নেতানিয়াহু জোর দিয়ে বলেন যে, “ইসরায়েল লেবাননসহ সব ফ্রন্টের হুমকির বিরুদ্ধে তাদের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার স্বাধীনতা বজায় রাখবে এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই নীতির প্রতি তার সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন।”
অবশেষে, সিএনএন-কে এক ইরানি সূত্র রোববার জানিয়েছেন, ইরান একটি “ন্যায়সঙ্গত এবং ভারসাম্যপূর্ণ চুক্তির” জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। “আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে এই যুদ্ধ যেন চিরতরে শেষ হয়।”
*সিএনএনে প্রকাশিত নিবন্ধ থেকে অনূদিত *