Advertisement Banner

উত্তর কোরিয়ায় কী করতে যাচ্ছেন সি চিনপিং

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
উত্তর কোরিয়ায় কী করতে যাচ্ছেন সি চিনপিং
কিম জং উন এবং সি চিনপিং। ছবি: রয়টার্স

আজ সোমবার পিয়ংইয়ংয়ে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের বৈঠকটি একটি বিশেষ কারণে তাৎপর্যপূর্ণ।

তাদের এই বৈঠক হওয়াটাই কিন্তু বড় কথা নয়। ঠিক এক বছর আগেই বেইজিংয়ে এই দুই নেতা সাক্ষাৎ করেছিলেন, যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে মিত্রবাহিনীর কাছে জাপানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের ৮০ বছর পূর্তি উপলক্ষে চীন এক বিশাল সামরিক কুচকাওয়াজের আয়োজন করেছিল।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, সি চিনপিং যে এবার নিজেই সফরে যাচ্ছেন।

চীনা এই নেতা ২০১৯ সালের পর থেকে আর পিয়ংইয়ং সফরে যাননি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি নিজের বিদেশ সফর একেবারেই কমিয়ে এনেছেন। আজকাল সাধারণত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিংবা রাশিয়ার নেতা ভ্লাদিমির পুতিনের মতো বিশ্ব নেতারাই তার সাথে দেখা করতে বেইজিংয়ে আসেন।

‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’-এর উত্তর-পূর্ব এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র অ্যানালিস্ট উইলিয়াম ইয়াং আল জাজিরাকে বলেন, “আমাদের মনে রাখতে হবে যে, সি চিনপিং আসলে ইদানীং খুব একটা বিদেশ সফর যান না। বিদেশি নেতারাই তার সাথে দেখা করতে বেইজিংয়ে ছুটে আসেন। সে জায়গায় তিনি নিজেই যখন পিয়ংইয়ং সফরের সিদ্ধান্ত নেন, তখন বোঝা যায় চীন এই সফরটিকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে।”

এশিয়া সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে সি বছরে গড়ে প্রায় ১৪টি সফর করতেন। কিন্তু ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তা কমে বছরে মাত্র ছয়টির কাছাকাছি নেমে আসে। ২০২০ সালে তিনি মাত্র একটি বিদেশ সফর করেছিলেন এবং ২০২১ সালে কোনো সফরই করেননি, কারণ সে সময় চীন করোনা মহামারি মোকাবিলায় ব্যস্ত ছিল।

তবে ইয়াংয়ের মতে, রাশিয়ার সাথে উত্তর কোরিয়ার বর্তমান সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগের কারণেই হয়তো সি এখন এই সফরে যাচ্ছেন।

তিনি কি আর ‘প্রধান অংশীদার’ নন?

ঐতিহাসিকভাবে চীন-উত্তর কোরিয়া সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেইজিং সবসময়ই 'প্রধান অংশীদার' বা অভিভাবকের ভূমিকা পালন করে এসেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা ‘ন্যাশনাল কমিটি অন নর্থ কোরিয়া’-এর ২০২২ সালের একটি হিসাব অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়া তার বাণিজ্যের প্রায় ৯৫ শতাংশেরই জন্য চীনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

তবে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর থেকে এই সমীকরণে পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। উত্তর কোরিয়া রাশিয়াকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সৈন্য সরবরাহ করেছে এবং পর্যবেক্ষকদের মতে, মস্কোর যুদ্ধযন্ত্রকে সচল রাখতে এটি বড় ভূমিকা পালন করেছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার-অর্থায়িত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজি’-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকে সৈন্য মোতায়েন এবং গোলাবারুদ, শেল এবং গাইডেড ও ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রপ্তানির জন্য মস্কো উত্তর কোরিয়াকে প্রায় ১ হাজার ৪৪০ কোটি (১৪.৪ বিলিয়ন) ডলার পর্যন্ত পরিশোধ করেছে।

একটি প্রতিবেদন অনুসারে, উত্তর কোরিয়া এর মধ্যে মাত্র ৫৮ কোটি থেকে ১৫০ কোটি ডলার পণ্য হিসেবে পেয়ে থাকতে পারে। এর অর্থ হলো, মস্কোর কাছ থেকে পাওয়া অর্থপ্রদানের বড় অংশটিই স্পর্শকাতর সামরিক প্রযুক্তি বা সংশ্লিষ্ট সুনির্দিষ্ট যন্ত্রাংশ ও কাঁচামাল' আকারে পাওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে, যা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সহজে ধরা যায় না।

পিয়ংইয়ংয়ের ওপর পর্যবেক্ষণ করা সিউল-ভিত্তিক সাংবাদিক ও গবেষক লি সাং ইয়ং ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, উত্তর কোরিয়ার ওপর রাশিয়ার প্রভাব ঠিক কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে, তা নিয়ে চীন বেশ সতর্ক থাকবে।

সি এই সফর প্রসঙ্গে তিনি আল জাজিরাকে বলেন, “বেইজিং সম্ভবত উত্তর কোরিয়ার ওপর তার নিজস্ব প্রভাব পুনরুত্থাপন করতে চায় এবং পিয়ংইয়ং যেন মস্কোর দিকে খুব বেশি ঝুঁকে না পড়ে তা নিশ্চিত করতে চায়।”

অস্ত্র তৈরির কারখানায় কিম জং উন। ছবি: রয়টার্স
অস্ত্র তৈরির কারখানায় কিম জং উন। ছবি: রয়টার্স

উত্তর কোরিয়ার ওপর রাশিয়ার ছায়া নিয়ন্ত্রণ করার একটি উপায় হতে পারে পিয়ংইয়ংয়ের প্রতি চীনের নিজস্ব অর্থনৈতিক সমর্থন বাড়িয়ে দেওয়া। স্টিমসন সেন্টারের কোরিয়া প্রোগ্রামের সিনিয়র ফেলো রেচেল মিনইয়ং লি আল জাজিরাকে বলেন, “উত্তর কোরিয়াকে অর্থনৈতিক প্রণোদনা দেওয়াটাই হয়তো বেইজিংয়ের পরিকল্পনা হতে পারে।”

তবে চীন কেবল উত্তর কোরিয়ার ওপর রাশিয়ার প্রভাবের দিকেই গভীর নজর রাখছে না।

ক্রাইসিস গ্রুপের গবেষক ইয়াং জানান, যদিও উত্তর কোরিয়ার সাথে চীনের একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে, তবুও উত্তর কোরিয়া নতুন কোনো সামরিক প্রযুক্তি অর্জন করুক—তা নিয়ে বেইজিং সতর্ক।

ইয়াং বলেন, “উত্তর কোরিয়াকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে বেইজিং সবসময়ই খুব হুঁশিয়ার। কারণ তারা মনে করে না যে, উত্তর কোরিয়া সামাজিকভাবে বা সামরিকভাবে শক্তিশালী হওয়াটা তাদের জন্য খুব একটা সুবিধাজনক। রাশিয়ার সাথে সম্পর্কের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়া যদি সামরিকভাবে বেশি সাহসী হয়ে ওঠে, তবে তা কোরীয় উপদ্বীপের ক্ষমতার ভারসাম্য এবং স্থিতিশীলতার জন্য সম্ভাব্য বিঘ্ন ঘটার কারণ হতে পারে।”

উত্তর কোরিয়ার গণমাধ্যম এবং ইউএস নেভাল ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়া বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ইতিমধ্যে আটটি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে এবং মে মাসে তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত একটি নতুন ট্যাকটিক্যাল ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের উন্মোচন করেছে।

চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে, উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম কিম জং উনের একটি নতুন অস্ত্র তৈরির পারমাণবিক সামগ্রী উৎপাদনের কারখানা পরিদর্শনের ছবিও প্রকাশ করেছে, যা পিয়ংইয়ংয়ের পারমাণবিক সক্ষমতাকে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বাড়িয়ে তুলতে ব্যবহার করা হবে।

‘উত্থান-পতনশীল’ উত্তেজনা

১৯৫০ সাল থেকে উত্তর কোরিয়া টেকনিক্যালি দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে, যা ১৯৫৩ সালের একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে স্থগিত আছে। দেশ দুটি ২৫০ কিলোমিটার (১৫৫ মাইল) দীর্ঘ একটি ডিমিলিটারাইজড জোন দ্বারা বিভক্ত, যা কোরীয় উপদ্বীপকে দুই ভাগে ভাগ করেছে।

বিগত বছরগুলোতে এই উত্তেজনা নাটকীয়ভাবে ওঠানামা করেছে। ২০২৪ সালে এটি এক সাম্প্রতিকতম তলানিতে পৌঁছায়, যখন কিম জং উন কোরীয় পুনরেকত্রীকরণের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যটি ত্যাগ করেন।

পর্যবেক্ষকদের মতে, এরপর থেকে তিনি সিউলের সাথে যোগাযোগ প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে রেখেছেন। গত শুক্রবার, দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে তারা আশা করছে সি’র এই সফর কোরীয় উপদ্বীপের সমস্যাগুলো সমাধানে একটি গঠনমূলক ভূমিকা পালন করবে —যা ইঙ্গিত দেয় যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টায় সিউল হয়তো চীনা নেতার ওপর কূটনৈতিক লবিং করে থাকতে পারে।

তাছাড়া, দক্ষিণ কোরিয়ার একত্রীকরণ বিষয়ক মন্ত্রী চুং ডং-ইয়ং গত মাসে সাংবাদিকদের আলাদাভাবে বলেছেন যে, বছরের শেষের দিকে কিম এবং ট্রাম্পের মধ্যে একটি সম্ভাব্য বৈঠকের বিষয়ে এই দুই নেতা আলোচনা করতে পারেন বলে তিনি আশা করছেন।

পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নয়ন নিয়েও সি চিনপিং উদ্বিগ্ন হতে পারেন। এর মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মধ্যে একটি সম্ভাব্য সামরিক-লজিস্টিক সহায়তা চুক্তির খবর, যা গত সপ্তাহে সিঙ্গাপুরে আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের ‘শাংরি-লা’ সংলাপে উত্থাপিত হয়েছিল।

চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যকার সম্পর্কে উত্থান-পতন থাকলেও, জাপানের সাথে চীনের সম্পর্ক বেশ তিক্ত। এর পেছনে রয়েছে ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকে তৎকালীন সাম্রাজ্যবাদী জাপানের চীন দখলের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ। পাশাপাশি, টোকিও কর্তৃক সম্প্রতি তাদের সামরিক বাহিনীকে কার্যত সম্প্রসারণ করার পদক্ষেপগুলোরও তীব্র বিরোধিতা করেছে বেইজিং।

সম্পর্কিত