Advertisement Banner

দুই আগুনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সৌদি যুবরাজ

লিওন হাদার
লিওন হাদার
দুই আগুনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সৌদি যুবরাজ
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যখন পারস্য উপসাগরজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্রের গর্জন শুরু হলো, রিয়াদের পূর্বাঞ্চল থেকে শুরু করে বাহরাইন, কাতার ও আমিরাতের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে যখন আঘাত আসতে শুরু করল, তখন ওয়াশিংটনের সংবাদমাধ্যমগুলো তাদের পুরনো সুরেই গান গাইতে থাকে। তারা বলতে চেয়েছিল, এবার সৌদি আরবকে নিশ্চিতভাবেই কোনো এক পক্ষ বেছে নিতে হবে।

মার্কিন বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল, বেইজিং বা মস্কোর দিকে সৌদি আরবের সাম্প্রতিক যে ঝোঁক, তা যুদ্ধের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। তাদের দাবি ছিল, মোহাম্মদ বিন সালমানের (এমবিএস) এই ‘মাল্টিপোলারিটি’ বা বহুমুখী নীতি ছিল কেবল ‘শান্তিকালীন বিলাসিতা’। যুদ্ধের বাস্তবতায় সৌদি আরবকে আবারও সেই পুরনো আমেরিকান নিরাপত্তার ছায়াতলে ফিরে আসতেই হবে।

ধারণাটি বেশ স্বচ্ছ মনে হলেও, এটি আদতে ভুল।

সামরিক জোট ন্যাটোর বাইরে অন্যতম মিত্রের তকমাটা বড়জোর একটি সান্ত্বনা পুরস্কার হতে পারে। কিন্তু এই বন্ধুত্ব কোনো পাকাপোক্ত নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নয়। সৌদিরা এই পার্থক্য খুব ভালো করেই বোঝে।

আমরা রিয়াদে এখন যা দেখছি, তা দেখে মোটেই মনে হচ্ছে না যে, তারা কোনো অনুগত দাসের মতো পুরনো মালিকের কাছে ফিরে যাচ্ছে। বরং সৌদি আরব একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার চেষ্টা করছে। সৌদিরা চারপাশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। তারা ২০২৫ সালের জুনের সেই ‘১২ দিনের যুদ্ধ’ দেখেছে। ওই সময় ইসরায়েল ও আমেরিকা ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছিল।

সেই যুদ্ধ থেকে রিয়াদ এই শিক্ষা পেয়েছে যে, আমেরিকা অজেয় নয়। তারা বুঝেছে, ওয়াশিংটন বা জেরুজালেমের ইচ্ছেমতো এই অঞ্চল যেকোনো সময় যুদ্ধের মুখে পড়তে পারে, যার চরম মূল্য দিতে হবে প্রতিবেশী দেশগুলোকেই।

২০১৯ সালে আরামকো স্থাপনায় হামলার সময় সৌদিরা দেখেছে, তাদের বিপদে কোনো মার্কিন ‘অশ্বারোহী বাহিনী’ উদ্ধারে আসেনি। তারা দেখেছে, ২০২২ সালের হুতি যুদ্ধবিরতি টিকে ছিল রিয়াদের নিজস্ব প্রচেষ্টায়, ওয়াশিংটনের কারণে নয়। ফলে আমেরিকা ‘নির্ভরযোগ্য বন্ধু নয়’–সেই সিদ্ধান্তে তারা অনেক আগেই পৌঁছেছে। তারা বুঝতে পেরেছে, আমেরিকার ওপর অতি-নির্ভরশীলতার ঝুঁকি এখন অনেক বেশি।

এ কারণেই ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় তেহরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক স্বাভাবিক করা হয়। এ কারণেই ২০২৫ সালের নভেম্বরে যখন মোহাম্মদ বিন সালমান আমেরিকা সফর করেন, তখন তিনি কোনো পূর্ণাঙ্গ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেননি। সামরিক জোট ন্যাটোর বাইরে অন্যতম মিত্রের তকমাটা বড়জোর একটি সান্ত্বনা পুরস্কার হতে পারে। কিন্তু এই বন্ধুত্ব কোনো পাকাপোক্ত নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নয়। সৌদিরা এই পার্থক্য খুব ভালো করেই বোঝে।

কেবল পূর্ব বা পশ্চিমের মধ্যে কোনো একটি পক্ষকে বেছে নিতে হবে–লড়াইটা আসলে এমন নয়। এই অবস্থানকে বলা যেতে পারে অটোমান আমলের বিসমার্কীয় রাজনীতির আধুনিক রূপ, যাকে বলা হয় ‘শাউকেলপলিটিক’ বা দোলনা নীতি। এর মানে, একদিকে বেশি না ঝুঁকে ভারসাম্য বজায় রাখা।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি চিংপিং। ছবি: রয়টার্স
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি চিংপিং। ছবি: রয়টার্স

সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’ কোনো বিলাসিতা নয়; এটি হলো আমেরিকার ওপর থেকে অস্ত্র ও অর্থনৈতিক নির্ভরতা কমিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার একটি বাজি। এই লক্ষ্য অর্জনে এমবিএসের প্রয়োজন চীনা পুঁজি, তুর্কি ড্রোন, পাকিস্তানি জনশক্তি এবং ইউরোপীয় প্রযুক্তি। তিনি আমেরিকার নিরাপত্তা বলয়ও চান, তবে তা ওয়াশিংটনের শর্তে নয়, বরং নিজস্ব শর্তে।

ওয়াশিংটনের থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো এখন বেশ উদ্বেগের সঙ্গেই স্বীকার করতে শুরু করেছে, সৌদি আরবের এই বহুমুখী অবস্থান সাময়িক কোনো বিষয় নয়। ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের দিকে ঝোঁকা, চীনের সঙ্গে নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেনের পরিধি বাড়ানো কিংবা আঙ্কারা ও ইসলামাবাদের সঙ্গে কূটনৈতিক ঘনিষ্ঠতা–এগুলো নিছক কোনো দরকষাকষির কৌশল নয়। এগুলো হলো আমেরিকার প্রভাব-পরবর্তী এক নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর ভিত্তি, যা সবার চোখের সামনেই গড়ে উঠছে।

ওয়াশিংটন এখনও একটি বিভ্রান্তিতে ভুগছে। তারা মনে করে, আব্রাহাম অ্যাকর্ডস বা সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিক করার মূল লক্ষ্যই হলো দেশগুলোকে মার্কিন তাঁবুর ভেতরে রাখা। আমেরিকা মনে করে, তারা অপরিহার্য। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সৌদিরা যখন বলে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন ছাড়া তারা ইসরায়েলকে মেনে নেবে না, তখন ওয়াশিংটন এটাকে স্রেফ দরকষাকষি মনে করে ভুল করে। আমিরাত যখন মার্কিন প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কঠোর হয় বা কাতার যখন ইরানের সঙ্গে লাইন খোলা রাখে–ওয়াশিংটন সেগুলোকে গুরুত্ব দিতে চায় না। অথচ এই সবগুলো ঘটনা একই দিকে ইশারা করছে। আর সেই দিকটি হলো, এই অঞ্চলের দেশগুলো এখন আর কোনো একক দেশ বা শক্তির ওপর ভরসা করতে রাজি নয়।

বাস্তবতা মেনে নিতে পারলে আমেরিকার জন্য চিন্তার কিছু নেই। সৌদি আরব এখন নিজের প্রতিরক্ষার বোঝা নিজেই বইছে। দেশটি এমন সব কূটনৈতিক পথে হাঁটছে, যা আমেরিকার পক্ষে বাধাগ্রস্ত করা সম্ভব নয়। ভারত, ইন্দোনেশিয়া বা ব্রাজিলের মতো সৌদি আরবও এখন একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করেছে।

সৌদি আরব কার পক্ষ নেবে–ওয়াশিংটনের জন্য এখন বড় প্রশ্ন এটা নয়। কারণ, তারা কারোর পক্ষ নেবে না। আসল প্রশ্ন হলো, আমেরিকা কি সৌদি আরবের এই স্বায়ত্তশাসনকে সম্মান দিয়ে নতুন কোনো নীতি তৈরি করতে পারবে? নাকি এটাকে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে দেখবে?

ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন যদি এই বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে, তবে তারা ইতিবাচক কিছুই পাবে। তারা উপলব্ধি করতে পারবে যে, স্বাধীনচেতা সৌদি আরব আমেরিকার জন্য বেশি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হতে পারে। আর যদি আমেরিকা ব্যর্থ হয়, তবে রিয়াদ তার নিজের পথেই হাঁটবে।

দিনশেষে সৌদি আরব হলো একটি রাজতন্ত্র। আর রাজতন্ত্রগুলো ভালো করেই বোঝে, টিকে থাকাই আসল লক্ষ্য। আর তাদের কাছে চিরায়ত সত্যটা হলো, কোনো পৃষ্ঠপোষকই চিরস্থায়ী নয়।

(লেখাটি এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া)

সম্পর্কিত