ট্রাম্পের ভেঙে ফেলার রাজনীতি যেভাবে পুরো বিশ্বকে নিয়ে গেছে খাদের কিনারায়

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ট্রাম্পের ভেঙে ফেলার রাজনীতি যেভাবে পুরো বিশ্বকে নিয়ে গেছে খাদের কিনারায়

ইরানে যুদ্ধের আগে মিত্র দেশগুলোর প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাবে এক ধরনের উদাসীনতা ছিল। এই উদাসীনতা বোঝাতে প্রায়ই ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের পরা একটি জ্যাকেটের লেখার কথা উল্লেখ করা হয়। তাতে লেখা ছিল, “আমি সত্যিই পরোয়া করি না। তুমি করো?”

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন শুধু যে জোট গঠনকে উপেক্ষা করেছে বা ১৯৯০-৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ কিংবা ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণের মতো কূটনৈতিক সমর্থনও খোঁজেনি তা নয়, অনেক মিত্র দেশকে আগেভাগে না জানিয়েই ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানে হামলা শুরু করেছে।

ইউরোপের অনেক দেশের তুলনায় ট্রাম্পের রাজনৈতিক মতাদর্শের কাছাকাছি থাকা ইতালি সরকারের এক জ্যেষ্ঠ সদস্যের উদাহরণ টেনে সিএনএন বলছে, ওই কর্মকর্তা দুবাইতেই ছিলেন কিন্তু ইরানে হামলার বিষয়টি আগে থেকে জানতেন না।

সিএনএন বলছে, ৯ দিন পর এই যুদ্ধ পুরো বিশ্বকে আরও এমন এক অস্থিরতার দিকে গভীরভাবে টেনে নিয়েছে, যা ট্রাম্পের ভেঙে ফেলার রাজনীতির যুগে এরমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বাস্তবতা হয়ে উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের প্রথম দফা হামলাতেই নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র অস্থিরতা সৃষ্টি করে। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো হঠাৎ এমন এক যুদ্ধে পড়ে গেছে, যা তাদের নয় এবং যার অধিকাংশই তারা চায়নি।

বিভিন্ন দেশের কর্মকর্তারা দ্রুত যুদ্ধক্ষেত্রে আটকে পড়া নিজেদের নাগরিকদের উদ্ধার করতে উদ্যোগ নেন। জ্বালানি দামের মূল্যস্ফীতি নাজুক অর্থনীতিগুলোকে আরও চাপের মুখে ফেলেছে এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

ইরানে হামলা শুরুর পর উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে পড়ে। এসব হামলা মরুভূমির শান্ত পরিবেশকে নষ্ট করে দিয়েছে এবং বিশ্বব্যাপী বিমান চলাচলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রও কার্যত অচল হয়ে পড়ে।

সিএনএন বলছে, একদিকে যুদ্ধের অর্থনৈতিক ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে ইরান ভেঙে পড়লে সম্ভাব্য শরণার্থী সংকটের আশঙ্কা এবং নিজেদের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে কিছু মিত্র দেশ ক্রমেই হতাশ হয়ে পড়ছে। তারা একই সঙ্গে ভাবছে, সামনে আর কী ঘটতে পারে। তবে প্রশাসনের বিজয়োল্লাস এবং সমালোচকদের এই যুদ্ধকে ইরাকের দীর্ঘ অচলাবস্থার সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতা সত্ত্বেও, যুদ্ধটি শেষ পর্যন্ত কীভাবে শেষ হবে-তা নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা এখনই সম্ভব নয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অব্যাহত পরিকল্পিত হামলার তুলনায় তেহরানের প্রতিবেশী দেশগুলোকে হুমকি দেওয়ার ক্ষমতাকে বড় ধরনের আঘাত বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর এতে মধ্যপ্রাচ্য উপকৃত হতে পারে, ট্রাম্প আঞ্চলিক শক্তিমান নেতা হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে পারেন, ইসরায়েল একটি অস্তিত্বগত হুমকি থেকে মুক্তি পেতে পারে এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্রটির সঙ্গে প্রায় অর্ধশতক ধরে চলা বিরোধের পর যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তাও শক্তিশালী হতে পারে।

তবে পূর্ণাঙ্গ শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন না হলে ইরানের জনগণকে বড় মূল্য দিতে হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। কারণ যদি পাল্টা বিপ্লবের পরিবর্তে কঠোর দমন-পীড়ন শুরু হয় বা যদি ট্রাম্পের যুদ্ধ ইরানি রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ভেঙে দেয় এবং গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, তাহলে শরণার্থী সংকট বা গুরুতর অর্থনৈতিক ধাক্কা বিশ্বকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

‘শান্ত থাকো, তাদের অপমান করো না’

সিএনএন বলছে, ইরানে চলমান এই যুদ্ধ পশ্চিমা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্য নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে। তারা ট্রাম্পকে নিয়ে বাঁচতে পারে না, আবার তাকে ছাড়াও বাঁচতে পারে না।

ইউরোপ ও উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্ররা কেন আগে থেকে এটি বুঝতে পারেনি, তা বোঝা কঠিন। এই যুদ্ধ আসলে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির একটি শক্তিশালী উদাহরণ। কারণ যুক্তরাষ্ট্র নিজের স্বার্থ প্রতিষ্ঠার জন্য এখানে সরাসরি শক্তি প্রয়োগ করছে। ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টার মতো ঘটনাও একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন।

সিএনএন’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শক্তিশালী দেশগুলো বলপ্রয়োগের মাধ্যমে শাসন করতে পারে- ট্রাম্পের এই নীতি এমন ধারণাকেও প্রতিফলিত করে। একই সঙ্গে এটি ট্রাম্পের অস্থির স্বভাব, পরিকল্পনার প্রতি অনীহা এবং সীমাহীন ক্ষমতার প্রতি ঝোঁকের প্রকাশ। আধুনিক যুগের সবচেয়ে ‘আনপ্রেডিক্টেবল’ প্রেসিডেন্ট এখন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রকেও এক অস্থিরতার উৎসে পরিণত করেছেন।

এক ইউরোপীয় কূটনীতিক সিএনএনকে বলেন, এই সংঘাতে সামরিকভাবে যুক্ত হওয়ার প্রধান উদ্দেশ্য হলো ‘জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা’। অন্যদের মতে, ট্রাম্পকে সামলানোও এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্বার্থ।

আরেকজন ইউরোপীয় কূটনীতিক বলেন, “এই মুহূর্তে আমরা শান্ত থাকার চেষ্টা করছি এবং তাদের অপমান না করার চেষ্টা করছি,” কারণ প্রকাশ্য বিরোধিতা উল্টো ফল দিতে পারে।

ইউরোপীয় বৈদেশিক সম্পর্ক পরিষদের মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির পরিচালক জুলিয়েন বার্নস ডেসি বলেন, ইউরোপীয় দেশগুলো ‘সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়ে গেছে’।

তার ভাষ্য, “এখন বিশ্বজুড়ে তারা এমন এক মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রতিদিনের সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া দিচ্ছেন, যিনি ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি করছেন।” তিনি আরও বলেন, “তারা যেন দুটি কঠিন অবস্থার মাঝে আটকে গেছে। একদিকে তারা আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থাকে ধরে রাখতে চায়, অন্যদিকে তারা মরিয়া হয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে।”

বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে ট্রাম্পের অবজ্ঞায় ইউরোপীয় দেশগুলো বিস্মিত হলেও, তাদের নিজস্ব সামরিক দুর্বলতার কারণে এমন এক মার্কিন নেতার সঙ্গে খুব সতর্কভাবে চলতে হচ্ছে-যিনি তাদের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নেদারল্যান্ডের দ্য হেগে অবস্থিত কৌশলগত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কোগিতোপ্রাক্সিসের প্রধান নির্বাহী নিকোলাস ডানগান বলেন, “ইউরোপীয়রা আন্তর্জাতিক আইনের নিঃশর্ত রক্ষক-এভাবে বলা খুবই সরলীকরণ করা হবে। বেশিরভাগ ইউরোপীয় দেশের অবস্থান হলো, ‘আমরা তোমাদের পদ্ধতির নিন্দা করব, কিন্তু উদ্দেশ্যকে পুরোপুরি অস্বীকারও করব না’।”

নিকোলাস আরও বলেন, “তাই ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যখন যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে, তখন ইউরোপীয়রা এমনভাবে যুক্ত থাকার চেষ্টা করছে-যাতে পুরোপুরি জড়িয়েও না পড়ে, আবার সম্পূর্ণ দূরেও না থাকে। তারা প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছে, কিন্তু পুরোপুরি প্রতিশ্রুতিবদ্ধও হচ্ছে না।”

তবে ইউরোপের এই সতর্ক প্রচেষ্টার প্রতি যেন খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছেন না ট্রাম্প। শনিবার এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমি এতে একেবারেই পরোয়া করি না।” অতিরিক্ত সহায়তা চান কি না-জানতে চাইলে তিনি বলেন, “তারা যা খুশি করতে পারে।”

ইরান যুদ্ধের ধাক্কা আটলান্টিকের দুই পাশের জোটকেও নাড়া দিয়েছে। এর আগেই ট্রাম্প জানুয়ারিতে আবার দাবি তুলেছিলেন যে, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়া উচিত-যা সেই জোটকে অস্থির করে তুলেছিল।

ব্রিটেন প্রথমে তাদের ঘাঁটি থেকে মার্কিন যুদ্ধবিমান উড্ডয়নের অনুমতি দিতে না চাইলে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও সংকটে পড়ে। এরপর ব্রিটেনের প্রধারমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার যুদ্ধবিমান থেকে হামলা চালিয়ে ট্রাম্পের ‘শাসন পরিবর্তনের নীতি’র সমালোচনা করলে ক্ষুব্ধ হন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

অন্যদিকে কিছু ইউরোপীয় দেশ তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করেছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাঁখো বলেন, আন্তর্জাতিক আইনের বাইরে পরিচালিত হামলাকে তিনি সমর্থন করতে পারেন না। তবে একই সঙ্গে তিনি ফ্রান্সের স্বার্থ রক্ষায় দেশটির বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে ট্রাম্পের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্ৎসও ওয়াশিংটনের বৈঠকে কৌশলী অবস্থান নেন। তিনি ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের সঙ্গে একমত হন এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের হুমকির নিন্দা করেন।

কিন্তু স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ভিন্ন অবস্থান নেন। তিনি ইরানের ওপর হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে স্পেনের সামরিক স্থাপনা ব্যবহার করতে দেননি এবং যুক্তরাষ্ট্র ‘লক্ষ লক্ষ মানুষের ভাগ্য নিয়ে বিপজ্জনক জুয়া খেলছে’ বলেও মন্তব্য করেন।

উপসাগরীয় দেশগুলোর হামলায় বিস্মিত হোয়াইট হাউস

ইউরোপ যখন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া সামাল দিতে ব্যস্ত, তখন উপসাগরীয় অঞ্চলের পরিস্থিতি আরও সহিংস হয়ে ওঠে।

কুয়েত, সৌদি আরব, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও বাহরাইনে এসব হামলা চালানো হয়। এসব দেশের অনেকগুলোই ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রবাসীদের জন্য ধনী ও নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। কাতারে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালীর কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

তবে অবাক করার বিষয় হলো, এই পাল্টা হামলায় ট্রাম্প প্রশাসন যেন বিস্মিত হয়ে পড়ে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি যুদ্ধের আগে হোয়াইট হাউসের পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতারই প্রমাণ এবং ভবিষ্যতের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের ইঙ্গিত।

একজন ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তা বলেন, যুদ্ধ শুরুর আগে ধারণা করা হয়েছিল যে, সংঘাত শুরু হলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। তবে বেসামরিক স্থাপনায় ইরান এত বড় পরিসরে হামলা চালাবে-তা পুরোপুরি অনুমান করা হয়নি। তিনি বলেন, “দুর্ভাগ্যজনকভাবে এটি এখন তাদের কৌশলের অংশ হয়ে গেছে।”

কাতারভিত্তিক জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক পল মাসগ্রেভও বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের এই ‘বিস্ময়’ ইঙ্গিত দেয় যে তারা ভেবেছিল ইরান শুধু হুমকি দিচ্ছে, বাস্তবে তেমন কিছু করবে না। তিনি বলেন, “ইরান দোহা বা দুবাই ধ্বংস করেনি, কিন্তু যুদ্ধ শুরুর আগে যে হুমকিগুলো বারবার দিয়েছিল-সেগুলোর অনেকটাই বাস্তবায়ন করেছে।”

ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার তীব্রতা কিছুটা কমলেও দেশটির অস্ত্রভাণ্ডার এখনো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইরানের হামলার কারণে মধ্যপ্রাচ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। শনিবার ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি সংকট নিয়ন্ত্রণ এবং যুদ্ধ শেষ করতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বাড়ানোর গুরুত্ব তুলে ধরেন।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনায় মধ্যস্থতা করা ওমানও উদ্বিগ্ন। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, অঞ্চলটি এখন ‘বিপজ্জনক’ পরিস্থিতিতে রয়েছে।

এদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলের কিছু সরকারি ও সামরিক কর্মকর্তা ট্রাম্প প্রশাসনের আক্রমণাত্মক ভাষা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করতে শুরু করেছেন বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে সিএনএন।

ওই অঞ্চলে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের এক সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “ওয়াশিংটন থেকে যে বার্তা আসছে তা প্রায় বিকৃত ধরনের মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে নেতারা যেন রক্তপাত উপভোগ করছেন, অথচ যুদ্ধ শেষ করার স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেই। এদিকে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের দেশগুলোর অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”

মিত্রদের থেকে কী চায় যুক্তরাষ্ট্র

এই যুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে-তা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকির বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে। ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতাবা খামেনি যদি ক্ষমতায় টিকে যান, তাহলে হয়তো বাইরের বিশ্বের জন্য তুলনামূলক কম হুমকি তৈরি করতে পারে। তবে সেটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত সামরিক হামলার প্রয়োজন হতে পারে।

আবার ভবিষ্যতে যদি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর অবশিষ্ট অংশের নেতৃত্বাধীন কোনো সরকার ক্ষমতায় আসে, তাহলে তারা হয়তো দেশের ভেতরে কঠোর দমন-পীড়ন চালাবে এবং একই সঙ্গে অঞ্চলটির জন্যও হুমকি তৈরি করতে পারে।

সামাজিক বা রাষ্ট্রীয়ভাবে ভেঙে পড়ার কারণে ইরান থেকে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা কেউই চায় না। কিন্তু অনেকেরই আশঙ্কা, ট্রাম্প হয়তো বিজয় ঘোষণা করে সরে দাঁড়াবেন এবং পরিণতি সামাল দেওয়ার দায় অন্যদের ওপর ছেড়ে দেবেন।

আবার ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপের সামরিক দুর্বলতা নিয়ে বেশ বিরক্ত বলে মনে হচ্ছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ মিত্র দেশগুলোর সমালোচনা করে বলেছেন, “তারা শক্তি প্রয়োগের বিষয়ে দ্বিধায় পড়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকে এবং অকারণে উদ্বেগ প্রকাশ করে।”

বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপ তাদের নীতিগত অবস্থান অক্ষুণ্ন রেখে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের দূরত্ব কমানোর একটি উপায় হলো নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো।

লন্ডনের কিংস কলেজের যুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা বিভাগের রাষ্ট্রক্ষমতা ও জাতীয় নিরাপত্তা কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ গবেষক সোফিয়া গ্যাস্টন বলেন, যুক্তরাজ্যের সঙ্গে জোটে যুক্তরাষ্ট্র তিনটি বিষয় আশা করে-কৌশলগত সামঞ্জস্য, সাংস্কৃতিক সামঞ্জস্য এবং বিশেষ সামরিক সক্ষমতা। তিনি বলেন, যদি কোনো দেশ কার্যকর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দেখাতে পারে, তাহলে কৌশলগত বা সাংস্কৃতিক পার্থক্য নিয়ে অনেক সময় ওয়াশিংটন ছাড় দেয়।

তার ভাষ্য, “যুক্তরাজ্যের মতো কোনো দেশ যত বেশি নিজের শক্তি, সমৃদ্ধি ও সক্ষমতায় বিনিয়োগ করবে, ততই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সে একটি আকর্ষণীয় অংশীদার হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে এমন জোটের অস্থিরতার মাঝেও সে নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে।”

বিশ্লেষকরা বলছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে মানুষের মনোভাব অনেকটাই নির্ভর করবে যুদ্ধের পরিণতি এবং ইরানের আচরণের ওপর।

কাতারভিত্তিক গবেষক পল মাসগ্রেভ বলেন, “উপসাগরীয় অঞ্চলের সাধারণ মানুষের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি যতটা বিরক্তি বা ক্ষোভ রয়েছে, ইসরায়েলের প্রতি সেই ক্ষোভ আরও বেশি। কিন্তু বাস্তবতা হলো-আমাদের দিকে গুলি ছুড়ছে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল নয়, ইরান। ইরান হয়তো এমন কৌশল নিয়েছে যাতে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়ে এবং তাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দূরত্ব তৈরি হয়।”

কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, ইরানের ওপর ক্ষোভের কারণে উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ব্যাপারে আরও আগ্রহী হতে পারে। এটি ট্রাম্পের একটি বড় অগ্রাধিকার। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত সপ্তাহে বলেন, তিনি মনে করেন এই যুদ্ধ সৌদি আরবের সঙ্গে শান্তির ‘দরজা খুলে দিতে পারে’।

তবে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে ইসরায়েলের এমন এক কর্মকর্তা বলেন, “গত আড়াই বছরে ইসরায়েল যুদ্ধ করে সিরিয়া, লেবানন ও গাজার কিছু অংশ দখল করেছে এবং কাতারেও হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলি সরকারের কিছু কট্টরপন্থী মন্ত্রী প্রকাশ্যে বলেছেন যে তারা ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিস নদী পর্যন্ত অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করতে চান। তাই অনেক দেশ এখন প্রশ্ন করছে-ইরানকে দুর্বল করা হচ্ছে কি শুধু এই জন্য, যাতে ইসরায়েল নতুন আঞ্চলিক আধিপত্যে পরিণত হতে পারে?”

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধের পরিণতি গুরুতর এবং ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। এই যুদ্ধ বিশ্বের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে বদলে দিতে পারে। ট্রাম্পের রাজনীতির একটি বৈশিষ্ট্য হলো প্রতিষ্ঠিত কাঠামো ভেঙে দেওয়া, তারপর পরিস্থিতি যেদিকে যায় তা দেখে কোনো না কোনোভাবে বিজয় ঘোষণা করা। মধ্যপ্রাচ্যের মতো জটিল অঞ্চলে এই কৌশল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং মিত্রদের জন্যও তা অনুমান করা কঠিন।

গত এপ্রিল এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছিলেন, তার প্রথম মেয়াদে তাকে দুটি কাজ করতে হয়েছে। এক-দেশ পরিচালনা করা, দুই-টিকে থাকা। আর দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি দেশও চালাবেন, বিশ্বও চালাবেন। তবে ইরানের এই যুদ্ধ দেখিয়ে দিচ্ছে, এমন অবস্থান বিশ্বের জন্য কতটা অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।

সম্পর্কিত