ফাহমিদা শিকদার

মানুষের মধ্যে আদি থেকেই আছে আধিপত্য বিস্তারের নেশা, যার চূড়ান্ত রূপ যুদ্ধ। কখনো জাতিতে-জাতিতে, আবার কখনো রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে বাধে যুদ্ধ। আর এখন এসে হাজির তথ্যযুদ্ধের এক নয়া সংস্করণ, যা আর কোনো সীমায় আটকে নেই।
নতুন বিশ্বব্যবস্থায় এসে পরিবর্তন ঘটেছে যুদ্ধপদ্ধতি ও যুদ্ধাস্ত্রের। মিলিটারি সায়েন্সে যুক্ত হয়েছে নতুন ধারণা ও কৌশলের। যুদ্ধ একযোগে চারটি ফ্রন্টে চালিয়ে যেতে হয়–সামরিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রোপাগান্ডা ফ্রন্ট। প্রোপাগান্ডারই নতুন রূপ হিসেবে এবার আমাদের সামনে হাজির হয়েছে ‘স্লপাগান্ডা’।
২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েল যৌথবাহিনী হামলা চালায় ইরানে। ইরানও চুপ করে বসে থাকেনি। পাল্টা হামলা চালায়। শুরু হয় যুদ্ধ। এক সপ্তাহ পর মার্চের শুরুর দিকে হোয়াইট হাউস একটি ভিডিও প্রকাশ করে। সেখানে আমেরিকার প্রকৃত হামলার দৃশ্যের সাথে জনপ্রিয় সিনেমা, টেলিভিশন সিরিজ, ভিডিও গেম ও অ্যানিমের ক্লিপ জুড়ে দেওয়া হয়েছিল।
ইরান ও তাদের সমর্থকরা এই হামলার প্রতিক্রিয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরনো যুদ্ধের ফুটেজ ছড়িয়ে দিয়ে বর্তমান সংঘাতের বলে দাবি করে। পাশাপাশি তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বিভিন্ন কনটেন্টও প্রচার করে, যেখানে তেল আবিব ও পারস্য উপসাগরের মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার কাল্পনিক দৃশ্য দেখানো হয়।
সম্প্রতি ইরানিদের একটি দলের তৈরি বলে প্রচারিত কিছু ভাইরাল ভিডিও ক্লিপে ডোনাল্ড ট্রাম্প, জেফরি এপস্টেইন, শয়তান, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, পিট হেগসেথ, আয়াতুল্লাহ খামেনিসহ আরও অনেককে লেগো খেলনা হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। প্রথমে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুকে এবং চলতি মাসের একদম শুরুতে হেগসেথকে অত্যন্ত তুচ্ছতাচ্ছিল্য তৈরি লেগো এনিমেশন ছড়িয়ে দেওয়া হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এ নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা। এমন ভিডিও তৈরির জন্য ইরান সমর্থক যুদ্ধবিরোধী ইনফ্লুয়েন্সার ও নেটিজেনদের প্রশংসায় ভাসছে ইরান। আর এভাবেই আমরা প্রবেশ করি প্রোপাগান্ডার নতুন ধারা স্লপাগান্ডায়।
যুদ্ধে প্রোপাগান্ডা
মেলবোর্ন-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য কনভারসেশন বলছে, প্রোপাগান্ডা হলো এমন এক ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা, যা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের লক্ষ্যে মানুষের বিশ্বাস, আবেগ, মনোযোগ, স্মৃতি ও অন্যান্য জ্ঞান ও অনুভূতিমূলক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত বা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যবহৃত হয়। অস্ট্রেলিয়ান ওয়ার মেমোরিয়াল-এর ওয়েবসাইটে প্রোপাগান্ডা নিয়ে লেখা একটি নিবন্ধে বলা হয়েছে, এটি মূলত কোনো তথ্য, ধারণা, মতামত বা চিত্র, একপক্ষীয় যুক্তি, যা সম্প্রচারিত হয়, প্রকাশিত হয় বা অন্য কোনোভাবে জনগণের মতামত প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
তথ্যকোষ ব্রিটানিকায় পাওয়া তথ্যানু্যায়ী, শত্রুর উদ্দেশ্য থাকে প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে ভীতি ও আতঙ্কের অবস্থা সৃষ্টি করে ব্যক্তি অথবা দলের আচরণে চাহিদা অনুযায়ী পরিবর্তন সাধন করা। এর উদ্দেশ্যই থাকে অপর পক্ষকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তার সাহস ভেঙে দেওয়া। প্রোপাগান্ডার মধ্য দিয়ে আদর্শিক, অর্থনৈতিক স্বার্থ-সুবিধা আদায় করে নেওয়া হয় এবং হীনম্মন্যতা সৃষ্টির নানা কার্যকারণকে সক্রিয় করে তোলা হয়। তাই একে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বললে ভুল হবে না।

যুদ্ধে প্রোপাগান্ডার ব্যবহার বিংশ বা একবিংশ শতাব্দী থেকে হচ্ছে–ব্যাপারটি এমন নয়। এর ইতিহাস আরও পুরনো।
মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধকে অনেক সময় আধুনিক উদ্ভাবন বলে মনে করা হলেও এর উৎস আসলে প্রাচীনকাল থেকেই। পারস্যের বিখ্যাত সম্রাট সাইরাস দ্য গ্রেট এটি ব্যাবিলনের বিরুদ্ধে; সম্রাট জেরক্সিস গ্রিকদের বিরুদ্ধে এবং মেসিডোনের দ্বিতীয় ফিলিপ ব্যবহার করেছিলেন অ্যাথেন্সের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে গ্রিক সম্রাট থেমিস্টোক্লিস প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে পারস্যের সম্রাট জেরক্সিসকে নৌযুদ্ধে জড়াতে প্রভাবিত করেন। ভয়ানক এই যুদ্ধে গ্রিকদের বিজয় হয়।
চেঙ্গিস খানের বিজয়গুলো সহজ হয়েছিল তার সেনাবাহিনীতে থাকা অগণিত হিংস্র মোঙ্গল অশ্বারোহী নিয়ে সুনিপুণভাবে ছড়িয়ে দেওয়া গুজবের মাধ্যমে। প্রাচীন যুগে এই প্রোপাগান্ডা ছড়াত মুখে মুখে বা চিঠির মাধ্যমে।
আরও কয়েক শতাব্দী পর মার্কিন বিপ্লবের সময় প্রোপাগান্ডার আরেক রূপ দেখা যায়। যেমন, প্যামফ্লেট বা পুস্তিকা। টমাস পেইনের ‘কমন সেন্স’ ছিল ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীদের বিরুদ্ধে আমেরিকানদের লড়াইয়ের মানসিক শক্তি জোগাতে ব্যবহৃত অসংখ্য পুস্তিকার মধ্যে অন্যতম। এ ছাড়া ওই সময় লিফলেট বিতরণ করেও প্রোপাগান্ডা চালানো হতো।
তবে যোগাযোগের ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তিগত উন্নতি; যেমন–দ্রুতগতিসম্পন্ন মুদ্রণ, রেডিও, টেলিভিশন; সেই সঙ্গে জনমত বিশ্লেষণ ও গণ-আচরণের পূর্বাভাস দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিকাশের ফলে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ একসময় রণকৌশল ও সমরবিদ্যায় আরও সুশৃঙ্খল ও বিস্তৃত একটি পদ্ধতিতে পরিণত হয়েছে এবং সামগ্রিক যুদ্ধের একটি বড় অনুষঙ্গে রূপান্তর হয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় শুরু আধুনিক প্রোপাগান্ডার যুগ। প্যামফ্লেট, লিফলেট তো ছিলই, এর সঙ্গে যুক্ত হয় পোস্টার, দৈনিক পত্রিকার নিবন্ধ, প্রামাণ্যচিত্র, আলোকচিত্র। তখন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় শত্রু রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যেমন প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হতো, তেমনি এর মাধ্যমে দেশের নাগরিকদের যুদ্ধে যোগদানের জন্য প্রভাবিতও করা হতো।
মার্কিন শিক্ষামূলক ওয়েবসাইট থটকো’তে বলা হয়েছে, কমিটি অন পাবলিক ইনফরমেশন ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় গঠিত একটি সরকারি সংস্থা, যার কাজ ছিল জনমতকে প্রভাবিত করার লক্ষ্যে তথ্য প্রচার এবং আমেরিকার যুদ্ধে অংশগ্রহণের পক্ষে জনসমর্থন তৈরি। সংস্থাটি মূলত ফেডারেল সরকারের একটি প্রোপাগান্ডা শাখা হিসেবে কাজ করত। তবে জনসাধারণের এবং কংগ্রেসের কাছে এটিকে যুদ্ধের খবরের ওপর সরকারি সেন্সরশিপ বা কঠোর নিয়ন্ত্রণের একটি যৌক্তিক বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল।
স্লপাগান্ডা-র উত্থান
গত বছরের শেষ দিকে, সুইডিশ জার্নাল ফিলোসোফিসকা নোটিসার-এ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র থেকে ‘স্লপাগান্ডা’ শব্দটি উদ্ভাবিত হয়। মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত এআই দিয়ে তৈরি নিম্নমানের স্লপ বা কনটেন্ট বোঝাতেই এই নতুন শব্দটি তৈরি হয়। সোজা ভাষায় প্রোপাগান্ডার সাথে যখন এআই যুক্ত হয়, তখনই তার নাম হয় স্লপাগান্ডা।
স্লপাগান্ডা পরিস্থিতি আমাদের প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি উদ্বেগজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। কী রকম? ২০২৫ সালের অক্টোবরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি এআই ভিডিও পোস্ট করেন। এতে দেখা যায়, তিনি মাথায় মুকুট পরে একটি যুদ্ধবিমান চালাচ্ছেন এবং বিক্ষোভকারীদের ওপর মলত্যাগ করছেন। অতি সম্প্রতি, তিনি আরেকটি এআই-নির্মিত ভিডিও পোস্ট করেছেন, যেখানে তার প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরিকে একটি বিশাল জাঁকজমকপূর্ণ আকাশচুম্বী অট্টালিকা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যার ভেতরে রয়েছে একটি সোনালি লিফট।
ইরান-নির্মিত লেগো-থিমযুক্ত স্লপাগান্ডা হলো এই ধারার সাম্প্রতিকতম উদাহরণ মাত্র। তবে এই উপাদানগুলো কেবল ভিডিওর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি ছবি, টেক্সট বা এআই দিয়ে তৈরি করা সম্ভব–এমন যেকোনো কিছু হতে পারে।
স্লপাগান্ডার মূল উদ্দেশ্য আসলে কী?
প্রথমত, মূলধারার সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম–উভয় ক্ষেত্রেই বারবার সামনে আসার মাধ্যমে স্লপাগান্ডা আমাদের সাধারণ মানসিক প্রতিরক্ষা ব্যুহ ভেদ করতে সক্ষম হয়। এটি তখনই কার্যকর হয়, যখন এটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়, আবেগগতভাবে বিচলিত করার মতো (সাধারণত নেতিবাচক উপায়ে) এবং এমন এক বিভ্রান্ত দর্শকদের কাছে পৌঁছায়, যারা হয়তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রল করছেন কিংবা ব্রাউজারের এক ট্যাব থেকে অন্য ট্যাবে দ্রুত যাতায়াত করছেন।
দ্বিতীয়ত, আমরা যা জানি বলে বিশ্বাস করি সেই জগতকে–মিথ্যা ও অর্ধ-সত্য দিয়ে কলুষিত করার একটি অত্যন্ত কার্যকর উপায় এই স্লপাগান্ডা। বিশেষজ্ঞরা যেমনটা যুক্তি দিয়েছেন, চ্যাটজিপিটি এবং অন্যান্য জেনারেটিভ এআই টুলগুলো মূলত ‘বুলশিট’ তৈরির যন্ত্র হতে পারে; এখানে ‘বুলশিট’ বলতে এমন কনটেন্টকে বোঝানো হয়েছে, যার সাথে সত্যের কোনো লেনদেন নেই।
স্লপাগান্ডাকে এক বিশেষ ধরনের ‘এআই বুলশিট’ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে, তবে ইরানি লেগো ভিডিওর মতো প্রচারণাগুলোর দিকে তাকালে এর অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এটি কেবল সাধারণ আজেবাজে কথা বা ‘বুলশিট’ নয়। ট্রাম্প এফ-১৫ যুদ্ধবিমান চালিয়ে মলত্যাগ করছেন–এই ভিডিও দেখে কেউ বিভ্রান্ত হয়ে এমনটা বিশ্বাস করে বসবে না। কেউ এমনটা বিশ্বাস করে না যে, প্লাস্টিকের ট্রাম্প লেগো আরেকটি খেলনা প্লাস্টিকের শয়তান মূর্তির সাথে হাত মিলিয়ে ষড়যন্ত্র করছে।

স্লপাগান্ডা আসলে সঠিক তথ্য প্রদানের লক্ষ্য নিয়ে তৈরি হয় না। বরং এটি অনুভূতি ও আবেগের প্রকাশভঙ্গি এবং প্রতীকী রূপ হিসেবে কাজ করে এবং মানুষের মনে একটি বিশেষ ধারণা বা অনুষঙ্গ তৈরি করতে চায়। এর মূল লক্ষ্য হলো–শয়তানের সাথে ট্রাম্পের যোগসূত্র, কিংবা যুক্তরাষ্ট্র মানেই খারাপ বা অশুভ শক্তি, ইত্যাদি ধাঁচের কিছু সংযোগ স্থাপন করা।
গতানুগতিক প্রোপাগান্ডার সঙ্গে স্লপাগান্ডার সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো–এর তৈরির ধরন, মান ও দৃষ্টিভঙ্গিতে। আগে প্রোপাগান্ডা ছিল সুশৃঙ্খল, তৈরি হতো উদ্দেশ্যপ্রোণদিতভাবে। মানুষকে একটি নির্দিষ্ট আদর্শে বিশ্বাসী করা বা কোনো মহৎ (বা অসৎ) উদ্দেশ্যে ঐক্যবদ্ধ করা। যেমন, নাৎসি বাহিনীর ইহুদি ও জাপানিদের আমেরিকা-বিরোধী কার্টুন ও সিনেমাগুলোর কথাই ধরুন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এগুলো শক্তিশালী সামরিক কৌশল হিসেবে কাজ করত।
অনেক বড় বড় প্রোডাকশন হাউজ এর সঙ্গে জড়িত ছিল। ইতিহাস, শিল্পকলা ও দর্শনভিত্তিক অনলাইন ম্যাগাজিন দ্য কালেক্টর থেকে জানা যায়, ওয়াল্ট ডিজনিও জড়িয়ে গিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে প্রোপাগান্ডা কার্টুন তৈরির কাজে। এগুলোর কাহিনি ছিল বেশ আকর্ষণীয় এবং কোয়ালিটি ছিল তৎকালীন সময় অনুযায়ী ‘টপনচ’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের প্রোপাগান্ডা কার্টুন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য ইউনাইটেড স্টেটস হলোকাস্ট মেমোরিয়াল মিউজিয়ামের ওয়েবসাইটে আছে। এ ছাড়া আইএমডিবিতেও পাওয়া যাবে।
অন্যদিকে স্লপাগান্ডা মূলত এআই দিয়ে তৈরি। এতে মানুষের সৃজনশীলতার চেয়ে যান্ত্রিক উৎপাদনের আধিক্য বেশি এবং সাধারণত সস্তা বা নিম্নমানের হয়। এর মূল লক্ষ্য মানুষকে শিক্ষিত করা বা বিশ্বাস করানো নয়; বরং ইন্টারনেটে তথ্যের জোয়ার তৈরি করা, অথবা শত্রুপক্ষকে ট্রল বা অপমান করা।
সত্যের ওপর স্লপাগান্ডার প্রভাব
স্লপাগান্ডা কেবল বিভ্রান্তিকরই নয়, বরং এটি তথ্যের উৎস নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করে। এর প্রভাবগুলো
সংকটকালে দ্রুত তৈরি করা ডিপফেক বা ভুলভাবে উপস্থাপিত কৌতুক (কনটেক্সট কলাপ্স) মানুষের মনে স্থায়ী নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে, যা দূর করা কঠিন।
স্লপাগান্ডার আধিক্যের কারণে মানুষ প্রকৃত সত্যকেও ‘স্লপ’ ভেবে ভুল করতে শুরু করে। ফলে নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা কমে গিয়ে এক ধরনের নৈরাশ্যবাদী সন্দেহের জন্ম হয়।
সত্যের অভিন্ন উৎসগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ায় মানুষ কেবল নিজের আবেগ বা স্বস্তির অনুকূলে থাকা তথ্য বিশ্বাস করতে শুরু করে, যা বর্তমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে জর্জরিত সমাজকে আরও বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়।

তবে প্রোপাগান্ডা ও স্লপাগান্ডার মধ্যে একটি মিল হচ্ছে–বিশাল জনমানুষের কাছে পৌঁছানোর ফলে এটি নির্বাচন, আন্দোলন বা যুদ্ধ নিয়ে জনমত ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। এবং তা নেতিবাচকভাবেই।
স্লপাগান্ডার তাণ্ডব রুখতে করণীয় কী?
স্লপাগান্ডার তাণ্ডব রুখতে দ্য কনভারসেশনে কয়েকটি পরামর্শ দেওয়া হয়েছে–
ব্যবহারকারীদের এআই কনটেন্টের লক্ষণ চেনা এবং তথ্যের উৎস যাচাইয়ে দক্ষ হতে হবে। কেবল কন্টেন্ট বিচার না করে, যারা নিয়মিত স্লপাগান্ডা ছড়ায়, তাদের সরাসরি ‘ব্লক’ করে তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা বজায় রাখতে হবে।
এআই কনটেন্টে বাধ্যতামূলক ‘ওয়াটারমার্ক’ বা জলছাপ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। প্রয়োজনে তথ্য সরবরাহকারী প্ল্যাটফর্মগুলো থেকে ক্ষতিকর কনটেন্ট সরিয়ে ফেলার ব্যবস্থা নিতে হবে।
ওপেনএআই, গুগল বা এক্স-এর মতো কোম্পানিগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। কর বা বিশেষ তহবিল সংগ্রহের মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ ডিজিটাল লিটারেসি ও নিয়ন্ত্রণমূলক কাজে ব্যয় করা যেতে পারে।
স্লপাগান্ডা সম্ভবত আমাদের মাঝে স্থায়ীভাবেই থেকে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে হয়তো এর চরম অবস্থাও আমাদের সামনে আসবে। তবে পর্যাপ্ত দূরদর্শিতা ও সাহসের সাথে আমরা এর সাথে মানিয়ে নিতে এবং এমনকি একে নিয়ন্ত্রণ করতেও সক্ষম হতে পারি।

মানুষের মধ্যে আদি থেকেই আছে আধিপত্য বিস্তারের নেশা, যার চূড়ান্ত রূপ যুদ্ধ। কখনো জাতিতে-জাতিতে, আবার কখনো রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে বাধে যুদ্ধ। আর এখন এসে হাজির তথ্যযুদ্ধের এক নয়া সংস্করণ, যা আর কোনো সীমায় আটকে নেই।
নতুন বিশ্বব্যবস্থায় এসে পরিবর্তন ঘটেছে যুদ্ধপদ্ধতি ও যুদ্ধাস্ত্রের। মিলিটারি সায়েন্সে যুক্ত হয়েছে নতুন ধারণা ও কৌশলের। যুদ্ধ একযোগে চারটি ফ্রন্টে চালিয়ে যেতে হয়–সামরিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রোপাগান্ডা ফ্রন্ট। প্রোপাগান্ডারই নতুন রূপ হিসেবে এবার আমাদের সামনে হাজির হয়েছে ‘স্লপাগান্ডা’।
২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েল যৌথবাহিনী হামলা চালায় ইরানে। ইরানও চুপ করে বসে থাকেনি। পাল্টা হামলা চালায়। শুরু হয় যুদ্ধ। এক সপ্তাহ পর মার্চের শুরুর দিকে হোয়াইট হাউস একটি ভিডিও প্রকাশ করে। সেখানে আমেরিকার প্রকৃত হামলার দৃশ্যের সাথে জনপ্রিয় সিনেমা, টেলিভিশন সিরিজ, ভিডিও গেম ও অ্যানিমের ক্লিপ জুড়ে দেওয়া হয়েছিল।
ইরান ও তাদের সমর্থকরা এই হামলার প্রতিক্রিয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরনো যুদ্ধের ফুটেজ ছড়িয়ে দিয়ে বর্তমান সংঘাতের বলে দাবি করে। পাশাপাশি তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বিভিন্ন কনটেন্টও প্রচার করে, যেখানে তেল আবিব ও পারস্য উপসাগরের মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার কাল্পনিক দৃশ্য দেখানো হয়।
সম্প্রতি ইরানিদের একটি দলের তৈরি বলে প্রচারিত কিছু ভাইরাল ভিডিও ক্লিপে ডোনাল্ড ট্রাম্প, জেফরি এপস্টেইন, শয়তান, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, পিট হেগসেথ, আয়াতুল্লাহ খামেনিসহ আরও অনেককে লেগো খেলনা হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। প্রথমে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুকে এবং চলতি মাসের একদম শুরুতে হেগসেথকে অত্যন্ত তুচ্ছতাচ্ছিল্য তৈরি লেগো এনিমেশন ছড়িয়ে দেওয়া হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এ নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা। এমন ভিডিও তৈরির জন্য ইরান সমর্থক যুদ্ধবিরোধী ইনফ্লুয়েন্সার ও নেটিজেনদের প্রশংসায় ভাসছে ইরান। আর এভাবেই আমরা প্রবেশ করি প্রোপাগান্ডার নতুন ধারা স্লপাগান্ডায়।
যুদ্ধে প্রোপাগান্ডা
মেলবোর্ন-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য কনভারসেশন বলছে, প্রোপাগান্ডা হলো এমন এক ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা, যা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের লক্ষ্যে মানুষের বিশ্বাস, আবেগ, মনোযোগ, স্মৃতি ও অন্যান্য জ্ঞান ও অনুভূতিমূলক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত বা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যবহৃত হয়। অস্ট্রেলিয়ান ওয়ার মেমোরিয়াল-এর ওয়েবসাইটে প্রোপাগান্ডা নিয়ে লেখা একটি নিবন্ধে বলা হয়েছে, এটি মূলত কোনো তথ্য, ধারণা, মতামত বা চিত্র, একপক্ষীয় যুক্তি, যা সম্প্রচারিত হয়, প্রকাশিত হয় বা অন্য কোনোভাবে জনগণের মতামত প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
তথ্যকোষ ব্রিটানিকায় পাওয়া তথ্যানু্যায়ী, শত্রুর উদ্দেশ্য থাকে প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে ভীতি ও আতঙ্কের অবস্থা সৃষ্টি করে ব্যক্তি অথবা দলের আচরণে চাহিদা অনুযায়ী পরিবর্তন সাধন করা। এর উদ্দেশ্যই থাকে অপর পক্ষকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তার সাহস ভেঙে দেওয়া। প্রোপাগান্ডার মধ্য দিয়ে আদর্শিক, অর্থনৈতিক স্বার্থ-সুবিধা আদায় করে নেওয়া হয় এবং হীনম্মন্যতা সৃষ্টির নানা কার্যকারণকে সক্রিয় করে তোলা হয়। তাই একে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বললে ভুল হবে না।

যুদ্ধে প্রোপাগান্ডার ব্যবহার বিংশ বা একবিংশ শতাব্দী থেকে হচ্ছে–ব্যাপারটি এমন নয়। এর ইতিহাস আরও পুরনো।
মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধকে অনেক সময় আধুনিক উদ্ভাবন বলে মনে করা হলেও এর উৎস আসলে প্রাচীনকাল থেকেই। পারস্যের বিখ্যাত সম্রাট সাইরাস দ্য গ্রেট এটি ব্যাবিলনের বিরুদ্ধে; সম্রাট জেরক্সিস গ্রিকদের বিরুদ্ধে এবং মেসিডোনের দ্বিতীয় ফিলিপ ব্যবহার করেছিলেন অ্যাথেন্সের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে গ্রিক সম্রাট থেমিস্টোক্লিস প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে পারস্যের সম্রাট জেরক্সিসকে নৌযুদ্ধে জড়াতে প্রভাবিত করেন। ভয়ানক এই যুদ্ধে গ্রিকদের বিজয় হয়।
চেঙ্গিস খানের বিজয়গুলো সহজ হয়েছিল তার সেনাবাহিনীতে থাকা অগণিত হিংস্র মোঙ্গল অশ্বারোহী নিয়ে সুনিপুণভাবে ছড়িয়ে দেওয়া গুজবের মাধ্যমে। প্রাচীন যুগে এই প্রোপাগান্ডা ছড়াত মুখে মুখে বা চিঠির মাধ্যমে।
আরও কয়েক শতাব্দী পর মার্কিন বিপ্লবের সময় প্রোপাগান্ডার আরেক রূপ দেখা যায়। যেমন, প্যামফ্লেট বা পুস্তিকা। টমাস পেইনের ‘কমন সেন্স’ ছিল ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীদের বিরুদ্ধে আমেরিকানদের লড়াইয়ের মানসিক শক্তি জোগাতে ব্যবহৃত অসংখ্য পুস্তিকার মধ্যে অন্যতম। এ ছাড়া ওই সময় লিফলেট বিতরণ করেও প্রোপাগান্ডা চালানো হতো।
তবে যোগাযোগের ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তিগত উন্নতি; যেমন–দ্রুতগতিসম্পন্ন মুদ্রণ, রেডিও, টেলিভিশন; সেই সঙ্গে জনমত বিশ্লেষণ ও গণ-আচরণের পূর্বাভাস দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিকাশের ফলে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ একসময় রণকৌশল ও সমরবিদ্যায় আরও সুশৃঙ্খল ও বিস্তৃত একটি পদ্ধতিতে পরিণত হয়েছে এবং সামগ্রিক যুদ্ধের একটি বড় অনুষঙ্গে রূপান্তর হয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় শুরু আধুনিক প্রোপাগান্ডার যুগ। প্যামফ্লেট, লিফলেট তো ছিলই, এর সঙ্গে যুক্ত হয় পোস্টার, দৈনিক পত্রিকার নিবন্ধ, প্রামাণ্যচিত্র, আলোকচিত্র। তখন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় শত্রু রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যেমন প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হতো, তেমনি এর মাধ্যমে দেশের নাগরিকদের যুদ্ধে যোগদানের জন্য প্রভাবিতও করা হতো।
মার্কিন শিক্ষামূলক ওয়েবসাইট থটকো’তে বলা হয়েছে, কমিটি অন পাবলিক ইনফরমেশন ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় গঠিত একটি সরকারি সংস্থা, যার কাজ ছিল জনমতকে প্রভাবিত করার লক্ষ্যে তথ্য প্রচার এবং আমেরিকার যুদ্ধে অংশগ্রহণের পক্ষে জনসমর্থন তৈরি। সংস্থাটি মূলত ফেডারেল সরকারের একটি প্রোপাগান্ডা শাখা হিসেবে কাজ করত। তবে জনসাধারণের এবং কংগ্রেসের কাছে এটিকে যুদ্ধের খবরের ওপর সরকারি সেন্সরশিপ বা কঠোর নিয়ন্ত্রণের একটি যৌক্তিক বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল।
স্লপাগান্ডা-র উত্থান
গত বছরের শেষ দিকে, সুইডিশ জার্নাল ফিলোসোফিসকা নোটিসার-এ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র থেকে ‘স্লপাগান্ডা’ শব্দটি উদ্ভাবিত হয়। মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত এআই দিয়ে তৈরি নিম্নমানের স্লপ বা কনটেন্ট বোঝাতেই এই নতুন শব্দটি তৈরি হয়। সোজা ভাষায় প্রোপাগান্ডার সাথে যখন এআই যুক্ত হয়, তখনই তার নাম হয় স্লপাগান্ডা।
স্লপাগান্ডা পরিস্থিতি আমাদের প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি উদ্বেগজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। কী রকম? ২০২৫ সালের অক্টোবরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি এআই ভিডিও পোস্ট করেন। এতে দেখা যায়, তিনি মাথায় মুকুট পরে একটি যুদ্ধবিমান চালাচ্ছেন এবং বিক্ষোভকারীদের ওপর মলত্যাগ করছেন। অতি সম্প্রতি, তিনি আরেকটি এআই-নির্মিত ভিডিও পোস্ট করেছেন, যেখানে তার প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরিকে একটি বিশাল জাঁকজমকপূর্ণ আকাশচুম্বী অট্টালিকা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যার ভেতরে রয়েছে একটি সোনালি লিফট।
ইরান-নির্মিত লেগো-থিমযুক্ত স্লপাগান্ডা হলো এই ধারার সাম্প্রতিকতম উদাহরণ মাত্র। তবে এই উপাদানগুলো কেবল ভিডিওর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি ছবি, টেক্সট বা এআই দিয়ে তৈরি করা সম্ভব–এমন যেকোনো কিছু হতে পারে।
স্লপাগান্ডার মূল উদ্দেশ্য আসলে কী?
প্রথমত, মূলধারার সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম–উভয় ক্ষেত্রেই বারবার সামনে আসার মাধ্যমে স্লপাগান্ডা আমাদের সাধারণ মানসিক প্রতিরক্ষা ব্যুহ ভেদ করতে সক্ষম হয়। এটি তখনই কার্যকর হয়, যখন এটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়, আবেগগতভাবে বিচলিত করার মতো (সাধারণত নেতিবাচক উপায়ে) এবং এমন এক বিভ্রান্ত দর্শকদের কাছে পৌঁছায়, যারা হয়তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রল করছেন কিংবা ব্রাউজারের এক ট্যাব থেকে অন্য ট্যাবে দ্রুত যাতায়াত করছেন।
দ্বিতীয়ত, আমরা যা জানি বলে বিশ্বাস করি সেই জগতকে–মিথ্যা ও অর্ধ-সত্য দিয়ে কলুষিত করার একটি অত্যন্ত কার্যকর উপায় এই স্লপাগান্ডা। বিশেষজ্ঞরা যেমনটা যুক্তি দিয়েছেন, চ্যাটজিপিটি এবং অন্যান্য জেনারেটিভ এআই টুলগুলো মূলত ‘বুলশিট’ তৈরির যন্ত্র হতে পারে; এখানে ‘বুলশিট’ বলতে এমন কনটেন্টকে বোঝানো হয়েছে, যার সাথে সত্যের কোনো লেনদেন নেই।
স্লপাগান্ডাকে এক বিশেষ ধরনের ‘এআই বুলশিট’ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে, তবে ইরানি লেগো ভিডিওর মতো প্রচারণাগুলোর দিকে তাকালে এর অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এটি কেবল সাধারণ আজেবাজে কথা বা ‘বুলশিট’ নয়। ট্রাম্প এফ-১৫ যুদ্ধবিমান চালিয়ে মলত্যাগ করছেন–এই ভিডিও দেখে কেউ বিভ্রান্ত হয়ে এমনটা বিশ্বাস করে বসবে না। কেউ এমনটা বিশ্বাস করে না যে, প্লাস্টিকের ট্রাম্প লেগো আরেকটি খেলনা প্লাস্টিকের শয়তান মূর্তির সাথে হাত মিলিয়ে ষড়যন্ত্র করছে।

স্লপাগান্ডা আসলে সঠিক তথ্য প্রদানের লক্ষ্য নিয়ে তৈরি হয় না। বরং এটি অনুভূতি ও আবেগের প্রকাশভঙ্গি এবং প্রতীকী রূপ হিসেবে কাজ করে এবং মানুষের মনে একটি বিশেষ ধারণা বা অনুষঙ্গ তৈরি করতে চায়। এর মূল লক্ষ্য হলো–শয়তানের সাথে ট্রাম্পের যোগসূত্র, কিংবা যুক্তরাষ্ট্র মানেই খারাপ বা অশুভ শক্তি, ইত্যাদি ধাঁচের কিছু সংযোগ স্থাপন করা।
গতানুগতিক প্রোপাগান্ডার সঙ্গে স্লপাগান্ডার সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো–এর তৈরির ধরন, মান ও দৃষ্টিভঙ্গিতে। আগে প্রোপাগান্ডা ছিল সুশৃঙ্খল, তৈরি হতো উদ্দেশ্যপ্রোণদিতভাবে। মানুষকে একটি নির্দিষ্ট আদর্শে বিশ্বাসী করা বা কোনো মহৎ (বা অসৎ) উদ্দেশ্যে ঐক্যবদ্ধ করা। যেমন, নাৎসি বাহিনীর ইহুদি ও জাপানিদের আমেরিকা-বিরোধী কার্টুন ও সিনেমাগুলোর কথাই ধরুন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এগুলো শক্তিশালী সামরিক কৌশল হিসেবে কাজ করত।
অনেক বড় বড় প্রোডাকশন হাউজ এর সঙ্গে জড়িত ছিল। ইতিহাস, শিল্পকলা ও দর্শনভিত্তিক অনলাইন ম্যাগাজিন দ্য কালেক্টর থেকে জানা যায়, ওয়াল্ট ডিজনিও জড়িয়ে গিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে প্রোপাগান্ডা কার্টুন তৈরির কাজে। এগুলোর কাহিনি ছিল বেশ আকর্ষণীয় এবং কোয়ালিটি ছিল তৎকালীন সময় অনুযায়ী ‘টপনচ’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের প্রোপাগান্ডা কার্টুন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য ইউনাইটেড স্টেটস হলোকাস্ট মেমোরিয়াল মিউজিয়ামের ওয়েবসাইটে আছে। এ ছাড়া আইএমডিবিতেও পাওয়া যাবে।
অন্যদিকে স্লপাগান্ডা মূলত এআই দিয়ে তৈরি। এতে মানুষের সৃজনশীলতার চেয়ে যান্ত্রিক উৎপাদনের আধিক্য বেশি এবং সাধারণত সস্তা বা নিম্নমানের হয়। এর মূল লক্ষ্য মানুষকে শিক্ষিত করা বা বিশ্বাস করানো নয়; বরং ইন্টারনেটে তথ্যের জোয়ার তৈরি করা, অথবা শত্রুপক্ষকে ট্রল বা অপমান করা।
সত্যের ওপর স্লপাগান্ডার প্রভাব
স্লপাগান্ডা কেবল বিভ্রান্তিকরই নয়, বরং এটি তথ্যের উৎস নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করে। এর প্রভাবগুলো
সংকটকালে দ্রুত তৈরি করা ডিপফেক বা ভুলভাবে উপস্থাপিত কৌতুক (কনটেক্সট কলাপ্স) মানুষের মনে স্থায়ী নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে, যা দূর করা কঠিন।
স্লপাগান্ডার আধিক্যের কারণে মানুষ প্রকৃত সত্যকেও ‘স্লপ’ ভেবে ভুল করতে শুরু করে। ফলে নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা কমে গিয়ে এক ধরনের নৈরাশ্যবাদী সন্দেহের জন্ম হয়।
সত্যের অভিন্ন উৎসগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ায় মানুষ কেবল নিজের আবেগ বা স্বস্তির অনুকূলে থাকা তথ্য বিশ্বাস করতে শুরু করে, যা বর্তমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে জর্জরিত সমাজকে আরও বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়।

তবে প্রোপাগান্ডা ও স্লপাগান্ডার মধ্যে একটি মিল হচ্ছে–বিশাল জনমানুষের কাছে পৌঁছানোর ফলে এটি নির্বাচন, আন্দোলন বা যুদ্ধ নিয়ে জনমত ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। এবং তা নেতিবাচকভাবেই।
স্লপাগান্ডার তাণ্ডব রুখতে করণীয় কী?
স্লপাগান্ডার তাণ্ডব রুখতে দ্য কনভারসেশনে কয়েকটি পরামর্শ দেওয়া হয়েছে–
ব্যবহারকারীদের এআই কনটেন্টের লক্ষণ চেনা এবং তথ্যের উৎস যাচাইয়ে দক্ষ হতে হবে। কেবল কন্টেন্ট বিচার না করে, যারা নিয়মিত স্লপাগান্ডা ছড়ায়, তাদের সরাসরি ‘ব্লক’ করে তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা বজায় রাখতে হবে।
এআই কনটেন্টে বাধ্যতামূলক ‘ওয়াটারমার্ক’ বা জলছাপ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। প্রয়োজনে তথ্য সরবরাহকারী প্ল্যাটফর্মগুলো থেকে ক্ষতিকর কনটেন্ট সরিয়ে ফেলার ব্যবস্থা নিতে হবে।
ওপেনএআই, গুগল বা এক্স-এর মতো কোম্পানিগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। কর বা বিশেষ তহবিল সংগ্রহের মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ ডিজিটাল লিটারেসি ও নিয়ন্ত্রণমূলক কাজে ব্যয় করা যেতে পারে।
স্লপাগান্ডা সম্ভবত আমাদের মাঝে স্থায়ীভাবেই থেকে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে হয়তো এর চরম অবস্থাও আমাদের সামনে আসবে। তবে পর্যাপ্ত দূরদর্শিতা ও সাহসের সাথে আমরা এর সাথে মানিয়ে নিতে এবং এমনকি একে নিয়ন্ত্রণ করতেও সক্ষম হতে পারি।