শান্তি ম্যারিয়েট ডি’সুজা

বিগত বছরগুলোতে নয়াদিল্লি তার সবচেয়ে মেধাবী ও দক্ষ কূটনীতিকদেরই হাইকমিশনার হিসেবে ঢাকায় পাঠিয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর ক্ষেত্রে বিষয়টিকে একটি সাধারণ রীতি হিসেবেই গণ্য করা হয়, যা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুরুত্বকে নির্দেশ করে। রাষ্ট্রদূত পদে রাজনীতিবিদদের নিয়োগ দেওয়ার পুরনো অভ্যাসটি এখন অতীত। অনানুষ্ঠানিকভাবে সেই প্রথা ভেঙে পেশাদার কূটনীতিকদের পাঠানোর রীতিই এখন প্রতিষ্ঠিত।
আর এই প্রেক্ষাপটেই চলতি মাসে বাংলাদেশের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে একজন প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিবিদকে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি বেশ কিছু অলিখিত প্রোটোকল বা রীতিনীতি ভাঙার ইঙ্গিত দেয়।
একদিক থেকে এই পদক্ষেপটি সম্ভবত ঢাকার সাথে নয়াদিল্লির বর্তমান তিক্ত হতে শুরু করা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ। ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এবং বর্তমানে ভারতে নির্বাসিত থাকার কারণে দুই দেশের সম্পর্কে এক ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, এই সিদ্ধান্তটি একটি বড় ধরনের ঝুঁকিও হতে পারে।
ঢাকায় ভারতের নতুন প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পাচ্ছেন দীনেশ ত্রিবেদী। তিনি ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) একজন রাজনীতিবিদ এবং পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা। এর আগে কংগ্রেসে থাকাকালীন তিনি ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া ২০২১ সালে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার আগে তিনি পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) সাথেও দীর্ঘকাল যুক্ত ছিলেন।
বিজেপির সমর্থক গোষ্ঠী বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের সুরক্ষা এবং অধিকারের বিষয়ে বিশেষভাবে সোচ্চার। শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে এই বিষয়টিই দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রধান একটি ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ত্রিবেদীর জন্য এটি হবে মোকাবিলা করার মতো অসংখ্য জটিল চ্যালেঞ্জের মধ্যে অন্যতম একটি বিষয়।
ঔপনিবেশিক ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অংশ পশ্চিমবঙ্গ ছিল ১৯০৫ সালে ব্রিটিশ শাসকদের বঙ্গভঙ্গের ফসল। যদিও ১৯১১ সালে এই সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়েছিল, তবুও ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা উপমহাদেশ ত্যাগ করার সময় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশ হয়। ১৯৭১ সালে ভারতের সহায়তায় এটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং এর নাম হয় বাংলাদেশ—অর্থাৎ বাঙালিদের দেশ।

তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সরকারের পক্ষ থেকে আসা একরাশ প্রত্যাশা ও দাবির মুখে নয়াদিল্লির কাছে ত্রিবেদীর ‘বেঙ্গল কানেকশন’ বা পশ্চিমবঙ্গের সাথে সংশ্লিষ্টতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঢাকার তাৎক্ষণিক অনুরোধগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে–ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধের ফলে দেশটিতে সৃষ্ট তীব্র জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নয়াদিল্লির সহায়তা। বাংলাদেশ তার অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৬৩ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভর করে এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখা এবং দৈনিক জ্বালানি বিক্রিতে বিধিনিষেধসহ ধারাবাহিক বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে। এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের জিডিপি প্রায় ৩ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে।
বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর দুই দেশের সরকারের মধ্যে প্রথম উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ হিসেবে চলতি মাসে বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান নয়াদিল্লি সফর করেন। সেখানে তিনি ভারতের পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস বিষয়ক মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ডিজেল ও সার সরবরাহ বৃদ্ধির অনুরোধ জানান। জানা গেছে, পুরি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ভারতের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পর এই অনুরোধটি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হবে।
ভারত এখনো রাশিয়া এবং অন্যান্য উৎস থেকে তেল আমদানি অব্যাহত রেখেছে, তাই বিদ্যমান পাইপলাইনের মাধ্যমে বাজারদরে ঢাকাকে ডিজেল সরবরাহ করা নয়াদিল্লির জন্য তুলনামূলক সহজ একটি বিকল্প। তবে অন্যান্য অনুরোধ রক্ষা করা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।
তারেক রহমান গত ৮ এপ্রিল ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গেও দেখা করেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে একটি সংক্ষিপ্ত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আলোচনার বিস্তারিত তেমন কিছু জানানো হয়নি। নয়াদিল্লিতে থাকাকালীন খলিলুর রহমান ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেননি। তবে তার পরবর্তী গন্তব্য মরিশাসের পোর্ট লুইসে একটি টেলিভিশন চ্যানেল তার সাক্ষাৎকার নেয়। সেখানে তিনি ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আয়োজিত নবম ভারত মহাসাগর সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়েছিলেন।
১০ এপ্রিলের সেই সাক্ষাৎকারে এবং অন্যান্য আলোচনায় খলিলুর রহমান তার দিল্লি সফরের সময় কী ঘটেছিল, সে সম্পর্কে কিছুটা মুখ খোলেন–যদিও তা ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। খলিলুর জানান, ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘটিত নৃশংসতার জন্য মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি শেখ হাসিনাকে হস্তান্তরের বিষয়টি উত্থাপন করেছেন তিনি।
১৭ এপ্রিল ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানান যে, দুই দেশের মধ্যকার বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় ঢাকার অনুরোধটি চলমান বিচারিক এবং অভ্যন্তরীণ আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পরীক্ষা করা হচ্ছে। গত বছর থেকেই নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে এই একই কথা বলা হচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে, ভবিষ্যতে পরিস্থিতির মোড় ঘুরে যাওয়ার সম্ভাবনা মাথায় রেখে ভারত হয়তো তার একজন প্রাক্তন মিত্রকে হস্তান্তরের পথে হাঁটবে না।
২০২৬ সালের ডিসেম্বরে গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে, যা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরেকটি অস্বস্তিকর বিষয়। এই চুক্তির নবায়নের জন্য আলোচনার প্রয়োজন, যা কঠিন দরকষাকষি ছাড়া সম্ভব নয়। ঢাকা যখন ‘ন্যায়সঙ্গত এবং জলবায়ু-সহনশীল’ পানিবণ্টনের আশা করছে, তখন নতুন কোনো চুক্তি ছাড়া বর্তমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
নয়াদিল্লি বিশ্বাস করে যে, বাংলাদেশের উচ্চাকাঙ্ক্ষী দাবিগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখার মতো যথেষ্ট সুযোগ তাদের হাতে রয়েছে। তারা আশা করছে যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দ্রুত ভারত সফর এ ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। মজার বিষয় হলো, ঢাকাও অনেকটা একই কৌশল ব্যবহার করছে বলে মনে হচ্ছে। তারা জানে যে, বাংলাদেশে পাকিস্তান ও চীনের প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় নয়াদিল্লির উদ্বেগ বাড়ছে। দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলজুড়ে চীনের অর্থায়ন, অবকাঠামো এবং প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বিস্তৃত হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, “ভারত বা চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কোনো ‘জিরো-সাম গেম’ (একজনের লাভে অন্যজনের ক্ষতি) নয়। যদি কোনো উদ্বেগ থাকে, তবে আমরা আশা করি আমাদের ভারতীয় বন্ধুরা সুনির্দিষ্টভাবে তা স্পষ্ট করবে।”
নয়াদিল্লির জন্য বিষয়টি সহজ হবে যদি ঢাকা আগে নমনীয় হয়। অন্যদিকে ঢাকা একটি অর্থবহ এবং পারস্পরিক আদান-প্রদানমূলক সম্পর্কের আশায় অনড় রয়েছে।
ঠিক এখানেই একজন বাঙালি রাজনীতিবিদ হিসেবে দীনেশ ত্রিবেদীর অভিজ্ঞতা কাজে লাগতে পারে। তিনি এমন এক ব্যক্তি, যিনি তার পূর্ব অভিজ্ঞতা এবং ঘনিষ্ঠতাকে কাজে লাগিয়ে দুই দেশের সম্পর্ককে সহজ করতে পারেন। তবে প্রত্যাশা পূরণ ও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া একটি অত্যন্ত কঠিন কাজ হতে পারে।
লেখক: মানত্রায়া ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট এবং গবেষক।
অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক দল নিরপেক্ষ, স্বাধীন থিংক ট্যাংক লোয়ি ইনস্টিটিউট পরিচালিত দ্য ইন্টারপ্রেটর-এর লেখাটি অনুবাদ করে প্রকাশিত।

বিগত বছরগুলোতে নয়াদিল্লি তার সবচেয়ে মেধাবী ও দক্ষ কূটনীতিকদেরই হাইকমিশনার হিসেবে ঢাকায় পাঠিয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর ক্ষেত্রে বিষয়টিকে একটি সাধারণ রীতি হিসেবেই গণ্য করা হয়, যা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুরুত্বকে নির্দেশ করে। রাষ্ট্রদূত পদে রাজনীতিবিদদের নিয়োগ দেওয়ার পুরনো অভ্যাসটি এখন অতীত। অনানুষ্ঠানিকভাবে সেই প্রথা ভেঙে পেশাদার কূটনীতিকদের পাঠানোর রীতিই এখন প্রতিষ্ঠিত।
আর এই প্রেক্ষাপটেই চলতি মাসে বাংলাদেশের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে একজন প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিবিদকে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি বেশ কিছু অলিখিত প্রোটোকল বা রীতিনীতি ভাঙার ইঙ্গিত দেয়।
একদিক থেকে এই পদক্ষেপটি সম্ভবত ঢাকার সাথে নয়াদিল্লির বর্তমান তিক্ত হতে শুরু করা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ। ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এবং বর্তমানে ভারতে নির্বাসিত থাকার কারণে দুই দেশের সম্পর্কে এক ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, এই সিদ্ধান্তটি একটি বড় ধরনের ঝুঁকিও হতে পারে।
ঢাকায় ভারতের নতুন প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পাচ্ছেন দীনেশ ত্রিবেদী। তিনি ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) একজন রাজনীতিবিদ এবং পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা। এর আগে কংগ্রেসে থাকাকালীন তিনি ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া ২০২১ সালে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার আগে তিনি পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) সাথেও দীর্ঘকাল যুক্ত ছিলেন।
বিজেপির সমর্থক গোষ্ঠী বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের সুরক্ষা এবং অধিকারের বিষয়ে বিশেষভাবে সোচ্চার। শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে এই বিষয়টিই দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রধান একটি ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ত্রিবেদীর জন্য এটি হবে মোকাবিলা করার মতো অসংখ্য জটিল চ্যালেঞ্জের মধ্যে অন্যতম একটি বিষয়।
ঔপনিবেশিক ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অংশ পশ্চিমবঙ্গ ছিল ১৯০৫ সালে ব্রিটিশ শাসকদের বঙ্গভঙ্গের ফসল। যদিও ১৯১১ সালে এই সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়েছিল, তবুও ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা উপমহাদেশ ত্যাগ করার সময় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশ হয়। ১৯৭১ সালে ভারতের সহায়তায় এটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং এর নাম হয় বাংলাদেশ—অর্থাৎ বাঙালিদের দেশ।

তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সরকারের পক্ষ থেকে আসা একরাশ প্রত্যাশা ও দাবির মুখে নয়াদিল্লির কাছে ত্রিবেদীর ‘বেঙ্গল কানেকশন’ বা পশ্চিমবঙ্গের সাথে সংশ্লিষ্টতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঢাকার তাৎক্ষণিক অনুরোধগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে–ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধের ফলে দেশটিতে সৃষ্ট তীব্র জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নয়াদিল্লির সহায়তা। বাংলাদেশ তার অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৬৩ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভর করে এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখা এবং দৈনিক জ্বালানি বিক্রিতে বিধিনিষেধসহ ধারাবাহিক বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে। এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের জিডিপি প্রায় ৩ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে।
বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর দুই দেশের সরকারের মধ্যে প্রথম উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ হিসেবে চলতি মাসে বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান নয়াদিল্লি সফর করেন। সেখানে তিনি ভারতের পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস বিষয়ক মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ডিজেল ও সার সরবরাহ বৃদ্ধির অনুরোধ জানান। জানা গেছে, পুরি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ভারতের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পর এই অনুরোধটি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হবে।
ভারত এখনো রাশিয়া এবং অন্যান্য উৎস থেকে তেল আমদানি অব্যাহত রেখেছে, তাই বিদ্যমান পাইপলাইনের মাধ্যমে বাজারদরে ঢাকাকে ডিজেল সরবরাহ করা নয়াদিল্লির জন্য তুলনামূলক সহজ একটি বিকল্প। তবে অন্যান্য অনুরোধ রক্ষা করা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।
তারেক রহমান গত ৮ এপ্রিল ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গেও দেখা করেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে একটি সংক্ষিপ্ত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আলোচনার বিস্তারিত তেমন কিছু জানানো হয়নি। নয়াদিল্লিতে থাকাকালীন খলিলুর রহমান ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেননি। তবে তার পরবর্তী গন্তব্য মরিশাসের পোর্ট লুইসে একটি টেলিভিশন চ্যানেল তার সাক্ষাৎকার নেয়। সেখানে তিনি ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আয়োজিত নবম ভারত মহাসাগর সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়েছিলেন।
১০ এপ্রিলের সেই সাক্ষাৎকারে এবং অন্যান্য আলোচনায় খলিলুর রহমান তার দিল্লি সফরের সময় কী ঘটেছিল, সে সম্পর্কে কিছুটা মুখ খোলেন–যদিও তা ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। খলিলুর জানান, ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘটিত নৃশংসতার জন্য মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি শেখ হাসিনাকে হস্তান্তরের বিষয়টি উত্থাপন করেছেন তিনি।
১৭ এপ্রিল ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানান যে, দুই দেশের মধ্যকার বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় ঢাকার অনুরোধটি চলমান বিচারিক এবং অভ্যন্তরীণ আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পরীক্ষা করা হচ্ছে। গত বছর থেকেই নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে এই একই কথা বলা হচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে, ভবিষ্যতে পরিস্থিতির মোড় ঘুরে যাওয়ার সম্ভাবনা মাথায় রেখে ভারত হয়তো তার একজন প্রাক্তন মিত্রকে হস্তান্তরের পথে হাঁটবে না।
২০২৬ সালের ডিসেম্বরে গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে, যা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরেকটি অস্বস্তিকর বিষয়। এই চুক্তির নবায়নের জন্য আলোচনার প্রয়োজন, যা কঠিন দরকষাকষি ছাড়া সম্ভব নয়। ঢাকা যখন ‘ন্যায়সঙ্গত এবং জলবায়ু-সহনশীল’ পানিবণ্টনের আশা করছে, তখন নতুন কোনো চুক্তি ছাড়া বর্তমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
নয়াদিল্লি বিশ্বাস করে যে, বাংলাদেশের উচ্চাকাঙ্ক্ষী দাবিগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখার মতো যথেষ্ট সুযোগ তাদের হাতে রয়েছে। তারা আশা করছে যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দ্রুত ভারত সফর এ ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। মজার বিষয় হলো, ঢাকাও অনেকটা একই কৌশল ব্যবহার করছে বলে মনে হচ্ছে। তারা জানে যে, বাংলাদেশে পাকিস্তান ও চীনের প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় নয়াদিল্লির উদ্বেগ বাড়ছে। দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলজুড়ে চীনের অর্থায়ন, অবকাঠামো এবং প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বিস্তৃত হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, “ভারত বা চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কোনো ‘জিরো-সাম গেম’ (একজনের লাভে অন্যজনের ক্ষতি) নয়। যদি কোনো উদ্বেগ থাকে, তবে আমরা আশা করি আমাদের ভারতীয় বন্ধুরা সুনির্দিষ্টভাবে তা স্পষ্ট করবে।”
নয়াদিল্লির জন্য বিষয়টি সহজ হবে যদি ঢাকা আগে নমনীয় হয়। অন্যদিকে ঢাকা একটি অর্থবহ এবং পারস্পরিক আদান-প্রদানমূলক সম্পর্কের আশায় অনড় রয়েছে।
ঠিক এখানেই একজন বাঙালি রাজনীতিবিদ হিসেবে দীনেশ ত্রিবেদীর অভিজ্ঞতা কাজে লাগতে পারে। তিনি এমন এক ব্যক্তি, যিনি তার পূর্ব অভিজ্ঞতা এবং ঘনিষ্ঠতাকে কাজে লাগিয়ে দুই দেশের সম্পর্ককে সহজ করতে পারেন। তবে প্রত্যাশা পূরণ ও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া একটি অত্যন্ত কঠিন কাজ হতে পারে।
লেখক: মানত্রায়া ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট এবং গবেষক।
অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক দল নিরপেক্ষ, স্বাধীন থিংক ট্যাংক লোয়ি ইনস্টিটিউট পরিচালিত দ্য ইন্টারপ্রেটর-এর লেখাটি অনুবাদ করে প্রকাশিত।