Advertisement Banner

অস্তিত্বের হুমকি আসলে কার জন্য, ইসরায়েল না ফিলিস্তিন?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
অস্তিত্বের হুমকি আসলে কার জন্য, ইসরায়েল না ফিলিস্তিন?
পতাকা হাতে ফিলিস্তিনি জনগণের বিক্ষোভ। ছবি: রয়টার্স

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যে দখলকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা নতুন করে আন্তর্জাতিক মনোযোগ কাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষক রামোনা ওয়াদি মিডল ইস্ট মনিটরে তার সাম্প্রতিক এক লেখায় প্রশ্ন তুলেছেন– অস্তিত্বের প্রকৃত হুমকি আসলে কার জন্য? ইসরায়েল, নাকি ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য?

সম্প্রতি দখলকৃত পশ্চিম তীর সফর শেষে সাবেক মোসাদ প্রধান তামির পার্দো মন্তব্য করেন, তিনি যা দেখেছেন সেটিই ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্য ‘অস্তিত্বগত হুমকি’। তিনি মূলত ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংস আচরণের দিকে ইঙ্গিত করেন। তবে ওয়াদি তার বিশ্লেষণে বলেন, এই ধরনের মন্তব্য আংশিক বাস্তবতা তুলে ধরে এবং বৃহত্তর ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে আড়াল করে।

ওয়াদির মতে, বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন বা নতুন ঘটনা নয়। বরং এটি দীর্ঘদিন ধরে চলমান একটি প্রক্রিয়ার অংশ, যা ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের আগেই শুরু হয়েছিল। ১৯৪৮ সালের নাকাবা বা ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতির আগে থেকেই এই ধরনের সহিংসতা বিদ্যমান ছিল। সেই সময় থেকে বসতি স্থাপনকারীদের উপস্থিতি ও কার্যক্রমকে উৎসাহিত করা হয়েছে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য।

রামোনা ওয়াদির বিশ্লেষণে বলা হয়, ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠা ও তার পরবর্তী নীতিগুলোতে বসতি স্থাপন একটি কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে কাজ করেছে। এই প্রক্রিয়াকে অনেকেই ‘সেটলার-কলোনিয়ালিজম’ বা বসতি-উপনিবেশবাদ হিসেবে আখ্যা দেন। এই কাঠামোর মধ্যে বসতি স্থাপনকারীরা শুধু ভূমি দখলই করেন না, বরং স্থানীয় ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং তাদের স্থানচ্যুত করার প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

ওয়াদি উল্লেখ করেন, মেনাচেম উছাখিন নামের এক প্রভাবশালী জায়নিস্ট নেতা ১৯৩০ সালে প্রকাশ্যে বলেছিলেন, যদি অন্য বাসিন্দারা সেখানে থাকে, তবে তাদের অন্যত্র সরিয়ে নিতে হবে। এই বক্তব্য সেই সময়কার রাজনৈতিক চিন্তার প্রতিফলন, যা ভূমি দখল ও জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের ধারণাকে সমর্থন করত।

এই প্রেক্ষাপটে সাবেক মোসাদ প্রধান পার্দোর মন্তব্যকে ওয়াদি সীমিত ও আংশিক বলে মনে করেন। তার মতে, পার্দো বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও, এই সহিংসতার মূল কাঠামো বা রাষ্ট্রীয় সমর্থনের বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। অর্থাৎ, সহিংসতাকে সমস্যা হিসেবে দেখা হলেও, এর পেছনের নীতিগত ও ঐতিহাসিক ভিত্তিকে প্রশ্ন করা হয়নি।

ওয়াদি আরও বলেন, ইসরায়েলের ভেতরে এখন ‘চরমপন্থী বসতি স্থাপনকারী’ এবং সাধারণ বসতি স্থাপনকারীদের মধ্যে পার্থক্য করার একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এই বিভাজন বাস্তব সমস্যাকে আড়াল করে। কারণ, তার মতে, পুরো বসতি স্থাপন প্রক্রিয়াই একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ, যেখানে বিভিন্ন মাত্রায় অংশগ্রহণ থাকলেও লক্ষ্য একটাই– ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।

ইসরায়েলের পতাকা। ছবি: রয়টার্স
ইসরায়েলের পতাকা। ছবি: রয়টার্স

এই বিশ্লেষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে– যদি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ইসরায়েলের জন্য হুমকি হয়, তাহলে ফিলিস্তিনিদের জন্য এর অর্থ কী? ওয়াদির মতে, ফিলিস্তিনিরাই প্রকৃতপক্ষে অস্তিত্বগত হুমকির মুখে রয়েছে। কারণ তারা প্রতিনিয়ত সহিংসতা, ভূমি দখল এবং বাস্তুচ্যুতির শিকার হচ্ছে।

দখলকৃত পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের হামলার পাশাপাশি, ফিলিস্তিনিদের ওপর বিভিন্ন ধরনের চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান, চলাচলে বিধিনিষেধ ও অর্থনৈতিক অবরোধ। এসব মিলিয়ে ফিলিস্তিনিদের দৈনন্দিন জীবন ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।

একই সঙ্গে গাজা উপত্যকার পরিস্থিতিও এই আলোচনায় উঠে এসেছে। ওয়াদি দাবি করেন, সেখানে চলমান সংঘাত একটি মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে– এমন অভিযোগও তুলে ধরা হয়েছে।

বিশ্লেষণে আরও বলা হয়, ইসরায়েলের জন্য বসতি স্থাপনকারীদের উপস্থিতি একটি কৌশলগত উপাদান। কারণ, এই উপস্থিতি জনসংখ্যাগত ভারসাম্য পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। ফলে বসতি স্থাপনকারীদের সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন বা সমস্যা হিসেবে দেখা কঠিন। বরং তারা রাষ্ট্রীয় নীতির একটি অংশ হিসেবেই কাজ করে।

ওয়াদি যুক্তি দেন, যদি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতাকে সত্যিকার অর্থে সমালোচনা করতে হয়, তাহলে পুরো কাঠামো বা ব্যবস্থাকেই প্রশ্ন করতে হবে। শুধুমাত্র সহিংসতার একটি অংশকে আলাদা করে দেখলে সমস্যার মূল কারণ অদৃশ্য থেকে যায়।

এই প্রেক্ষাপটে তিনি বলেন, ইসরায়েল রাষ্ট্র নিজেই তার বর্তমান সংকটের ভিত্তি তৈরি করেছে। জায়নিস্ট আদর্শ এবং তার বাস্তব প্রয়োগের ফলে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা এখন বিভিন্নভাবে সামনে আসছে। বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা তারই একটি দৃশ্যমান রূপ।

সবশেষে ওয়াদি তার বিশ্লেষণে বলেন, অস্তিত্বগত হুমকির প্রশ্নটি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। তার মতে, এই হুমকি ইসরায়েলের কল্পনায় নয়, বরং ফিলিস্তিনিদের বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত হচ্ছে। দখল, সহিংসতা ও বাস্তুচ্যুতির ধারাবাহিকতার মধ্যে ফিলিস্তিনিরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

এই বিশ্লেষণ মধ্যপ্রাচ্যের জটিল বাস্তবতাকে নতুনভাবে ভাবার সুযোগ করে দেয়। বিশেষ করে ‘অস্তিত্বগত হুমকি’ শব্দটির ব্যবহার এবং তার রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করে। একই সঙ্গে এটি দেখায়, একটি সংঘাতকে বোঝার জন্য কেবল সাম্প্রতিক ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা কতটা জরুরি।

সম্পর্কিত