Advertisement Banner

সূর্যবংশীর ভারতীয় দলে ডাক পাওয়া সময়ের ব্যাপার?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
সূর্যবংশীর ভারতীয় দলে ডাক পাওয়া সময়ের ব্যাপার?
বৈভব সূর্যবংশী। ছবি: সংগৃহীত

“উপমহাদেশের ক্রিকেট আকাশে হঠাৎ জ্বলে ওঠা কোনো ধূমকেতু নয় সে, বরং দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার মতো এক নতুন নক্ষত্রের নাম বৈভব সূর্যবংশী।” যা ভাবছেন সেটাই ঠিক। জীবনানন্দ দাসের ভাষায় এভাবে ছন্দ মিলিয়ে দিয়েছে এআই প্রযুক্তি। খুব কি ভুল? অন্তত এবারের আইপিএলে যারা চোখ রাখছেন, তাদের পক্ষে এর বিপক্ষে মতামত দেওয়ার সুযোগ তো রাখেননি বৈভব সূর্যবংশী!

এই কদিন আগে এক সাক্ষাৎকারে কুমার সাঙ্গাকারা বলেছিলেন, ১৫ বছর বয়সেই সূর্যবংশী যা করে ফেলেছেন, তিনি গোটা ক্যারিয়ারেই হয়তো তা করতে পারতেন না। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রায় ২৮ হাজার রান করা একজন কিংবদন্তি ব্যাটসম্যানের এমন প্রশংসাকে একটু বাড়াবাড়ি মনে হতেই পারে। তার ওপর এটাও মনে রাখতে হবে, রাজস্থান রয়্যালসে সূর্যবংশীর কোচও সাঙ্গাকারা। তাই ভারতীয় এই বিস্ময়বালককে অনুপ্রেরণা জোগাতে এমনটা তিনি বলতেই পারেন। তাছাড়া টাকাও তো কথা বলে!

তবে আইপিএলের প্লে-অফে সূর্যবংশী যেভাবে ব্যাট করেছেন, যেভাবে ক্রিকেটকে ‘ভিডিও গেম’ বানিয়ে ফেলেছেন, যেভাবে ব্যাটকে দিয়ে কথা বলিয়েছেন - তাতে সাঙ্গাকারার প্রশংসাকে অবাস্তব মনে হওয়ার সুযোগ কমই। ফলে ভারতের জাতীয় দলে এখনই ডাক পাওয়ার দাবি ক্রমশ জোরাল হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, সময়টা কি আদর্শ সূর্যবংশীর জন্য?

প্লে-অফে টানা দুটি বিস্ফোরক ইনিংস খেলার পর এই ব্যাপারে সাঙ্গাকারা অবস্থান স্পষ্ট। সাবেক শ্রীলঙ্কান অধিনায়ক মনে করেন, “আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য কোনো খেলোয়াড় প্রস্তুত কি না, সেটা কিন্তু মাঠে নামার আগ পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তবে বিশ্বের সেরা কিছু বোলারদের বিপক্ষে বৈভব যা করে দেখিয়েছে, তাতে আমার মনে হয় তাকে যে কোনো চ্যালেঞ্জের সামনে ফেলে দিলেও সে প্রস্তুত। আমি নিশ্চিত, খুব শিগগিরই সে (ভারত) দলে ডাক পাবে।”

এই দলে আছেন অনেক সাবেক ক্রিকেটারের মতো ভারতের কিংবদন্তি ব্যাটসম্যান সুনীল গাভাস্কারও। তিনি অবশ্য আরও আগেই বলে দিয়েছিলেন, এখন না হলে আর কবে সূর্যবংশীকে ভারত দলে ডাকা হবে। তবে প্লে-অফে ৯৭ ও ৯৬ রানের যে দুটি দানবীয় ইনিংস উপহার দিয়েছেন তিনি, সেটা তাকে যেন নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়ে প্রমাণ করেছেন, তিনি ‘ওয়ান সিজন ওয়ান্ডার’ নন। তিনি এসেছেন ইতিহাস গড়তে। তিনি এসেছেন লম্বা সময় বিশ্ব ক্রিকেটে রাজত্ব করতে।

কিছু পরিসংখ্যানে চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক। আইপিএলের এক আসরে সর্বোচ্চ ছক্কার রেকর্ড এতদিন ছিল রিদ্ধিমান সাহার দখলে। সেই ২০১৪ সালে হাঁকিয়েছিলেন ১১টি ছক্কা। আর এবারের আসরে সূর্যবংশী মেরেছেন ১৯টি ছক্কা। বাঁহাতি এই ব্যাটসম্যান করেছেন ৭৭৫ রান, যা এক আসরে সর্বোচ্চ রানের তালিকায় পঞ্চম। তবে তিনি এই রান করেছেন ২৩৭ স্ট্রাইক রেটে, যার ধারেকাছেও নেই তালিকায় তার আগের চারজনের কেউই।

আইপিএলে মাত্র ২৩ ম্যাচেই এক হাজার রান পূর্ণ করেছেন সূর্যবংশী। এজন্য বল খেলেছেন মাত্র ৪৪০টি। এই তালিকায় দুইয়ে থাকা আন্দ্রে রাসেল খেলেছিলেন ১০৫টি বল বেশি।

তবে পরিসংখ্যানের বাইরেও তো অনেক কিছুই থাকে। যেমন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাঘা বাঘা সব বোলারদের যেভাবে স্রেফ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন সূর্যবংশী, তা বিস্ময়কর বললেও কমই বলা হবে। অবস্থাটা এমন দাঁড়িয়েছে যে, ইনিংসের প্রথম বলেই তিনি ছক্কা না মারলে সেটাই বরং এখন খবরের শিরোনাম হওয়ার জোগাড়। প্যাট কামিন্স, জাসপ্রিত বুমরাহ, লুঙ্গি এনগিডির মতো বোলারদের চোখে চোখ রেখে তিনি এই তিক্ত অভিজ্ঞতা উপহার দিয়েছেন।

আসরজুড়ে বোলারদের এমন বেদম প্রহার করেছেন সূর্যবংশী, চার-ছক্কা হজমের পর তাদের চেহারায় অসহায়ত্ব ছিল দৃশ্যমান। আর সেটা হবেই বা না কেন! বালক বয়সী একজন ব্যাটসম্যান যখন এভাবে তাদের নিয়ে ছেলেখেলা করেন, সেটার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকাটা প্রায় অসম্ভবই।

আর এখানেই বয়সকে হার মানিয়ে সূর্যবংশী নিজেকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করতে সক্ষম হয়েছেন। গত বছর তার ব্যাটিং দেখে অনেকেই ভেবেছিলেন ‘ফ্লুক’। তবে এবার আরও বিধ্বংসী রূপে হাজির হয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, আরও শাণিত হয়েছেন। ১৬ ম্যাচে ৫ ফিফটি ও এক সেঞ্চুরিতে ৭৭৬ রান অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতারই সাক্ষ্য দেয়।

শুধু তাই নয়, বয়সটা কম হলেও সূর্যবংশী এখনই দলের জন্য খেলার অর্থ খুব ভালো বোঝেন। আর তাই টানা দুই ম্যাচে শতক বঞ্চিত হয়েছেন নব্বইয়ের ঘরে গিয়ে। নিজের খেলার প্রতি আত্মবিশ্বাসটাও তার কম নয়। সম্প্রতি বলেছেন, ২০ ওভার ব্যাটিং করতে পারলে তিনি ২০০ রান করে ফেলবেন।

সেটা তিনি অনায়াসেই করে ফেলতে পারতেন এই আইপিএলেই। এলিমিনেটর ম্যাচে সানরাইজার্স হায়দরাবাদের বিপক্ষে সপ্তম ওভারে যখন আউট হন, নামের পাশে মাত্র ২৯ বলে ৯৭ রান। সেদিন সেঞ্চুরি মিস করলেও একদিন না একদিন তিনি অবশ্যই ২০ ওভার টিকে যাবেনই। আর সেদিন প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে হয়তো টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ২০০, এমনকি ২৫০ রানও করে ফেলবেন সূর্যবংশী।

এমনই যার প্রতিভা আর সম্ভাবনা, তাকে বয়স দিয়ে মাপা স্রেফ বোকামি। টানা দুইবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জেতা ভারত দলে প্রচণ্ড প্রতিযোগিতা থাকলেও তাই সূর্যবংশীকে এখন ভারত দলের বাইরে রাখাটা অন্যায় হবে তার সঙ্গে। দেখার বিষয় হবে তাই ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড তাকে নিয়ে কোন পথে হাঁটে।

তবে একটা বিষয় নিশ্চিত, সূর্যবংশীর ভারত দলে ডাক পাওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। আর তার আগে তিনি নিজেকে যেভাবে প্রস্তুত করে চলেছেন, তাতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে লম্বা সময় রাজত্ব করার ভিত রচনা হয়েই গেছে। অপেক্ষা কেবল তার আবির্ভাবের। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কি প্রস্তুত সূর্যবংশীর ব্যাটিংয়ের জন্য?

সম্পর্কিত