কোনো উপসর্গ নেই, নিয়মিত শরীরচর্চা করেন, এমনকি উচ্চ রক্তচাপ বা কোলেস্টেরলের সমস্যাও নেই। তবু হৃদ্যন্ত্রের ধমনিতে নীরবে জমতে পারে বিপজ্জনক চর্বিজাতীয় পদার্থ, যা একসময় হার্ট অ্যাটাকের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এমন উপসর্গহীন হৃদ্রোগ আগেভাগে শনাক্ত করতে নতুন এক পরীক্ষাপদ্ধতি নিয়ে কাজ করছেন অস্ট্রেলিয়ার সিডনির গবেষকেরা।
সিডনির রয়্যাল নর্থ শোর হাসপাতাল ও সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা এমন একটি রক্ত পরীক্ষাভিত্তিক শনাক্তকরণ পদ্ধতি তৈরি করছেন, যার মাধ্যমে হৃদ্রোগের প্রচলিত ঝুঁকি না থাকা ব্যক্তিদের মধ্যেও করোনারি ধমনিতে রোগের প্রাথমিক লক্ষণ খুঁজে পাওয়া সম্ভব হতে পারে।
আজ মঙ্গলবার অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজ ও অস্ট্রেলিয়ান অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে এ গবেষণার অগ্রগতির তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণাটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জেমা ফিগট্রি। তার গবেষক দল পাঁচ হাজারের বেশি হৃদ্রোগীর রক্তের নমুনা ও সিটি স্ক্যানের তথ্য বিশ্লেষণ করে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক নির্দেশক বা ‘বায়োমার্কার’ শনাক্ত করেছে।
গবেষকদের আশা, ভবিষ্যতে সাধারণ রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে এসব নির্দেশকের উপস্থিতি শনাক্ত করা সম্ভব হবে। প্রয়োজন হলে পরবর্তী ধাপে সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে হৃদ্যন্ত্রের ধমনিতে চর্বিজাতীয় পদার্থ জমেছে কি না, তা পরীক্ষা করা যাবে।
সুস্থ মানুষেরও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি
সাধারণত উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান, অতিরিক্ত কোলেস্টেরল এবং স্থূলতাকে হৃদ্রোগের প্রধান ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু গবেষকদের মতে, এসব প্রচলিত ঝুঁকি না থাকলেও কোনো কোনো ব্যক্তির হৃদ্যন্ত্রের ধমনিতে বিপজ্জনক প্রতিবন্ধকতা তৈরি হতে পারে।
সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ববর্তী গবেষণায় দেখা গেছে, প্রথমবার হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রায় এক-চতুর্থাংশের মধ্যে পরিচিত প্রধান ঝুঁকিগুলো শনাক্ত করা যায়নি।
এই বাস্তবতায় গবেষকেরা রোগের উপসর্গ প্রকাশের আগেই ধমনির প্রকৃত অবস্থা শনাক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
অধ্যাপক ফিগট্রির মতে, শুধু প্রচলিত ঝুঁকির ওপর নির্ভর করলে কিছু রোগী শনাক্তকরণের বাইরে থেকে যেতে পারেন। নতুন পদ্ধতির মাধ্যমে হৃদ্রোগের প্রাথমিক পর্যায়েই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ এই গবেষণা
সিডনির এই গবেষণার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য, যেখানে হৃদ্রোগসহ অসংক্রামক রোগ জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশের জন্য দায়ী অসংক্রামক রোগ। এর মধ্যে হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস, ক্যানসার ও দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ উল্লেখযোগ্য।
এ ছাড়া, অস্ট্রেলিয়ার ২০২৩ সালের হৃদ্রোগের ঝুঁকি মূল্যায়নবিষয়ক চিকিৎসা নির্দেশিকায় বাংলাদেশিসহ দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তিদের বিষয়ে বিশেষ বিবেচনার কথা বলা হয়েছে।
নির্দেশিকা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির হিসাব করা হৃদ্রোগের ঝুঁকি উচ্চতর ঝুঁকির সীমার কাছাকাছি থাকলে তার দক্ষিণ এশীয় বংশপরিচয় বিবেচনায় ঝুঁকির শ্রেণি পুনর্মূল্যায়ন করা যেতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে সিডনির নতুন গবেষণা ভবিষ্যতে বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে যাদের প্রচলিত পরীক্ষায় বড় ধরনের ঝুঁকি ধরা পড়ে না, তাদের মধ্যে উপসর্গহীন করোনারি ধমনির রোগ শনাক্তের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে।
তবে গবেষণাটির পরীক্ষাপদ্ধতি বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে কতটা নির্ভরযোগ্য হবে, তা জানতে আরও গবেষণা ও যাচাই প্রয়োজন।
গবেষণা এগিয়ে নিতে প্রয়োজন আরও অর্থায়ন
গবেষক দলটি নতুন পরীক্ষাপদ্ধতির ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল দ্রুত এগিয়ে নিতে এবং ভবিষ্যতে সাধারণ চিকিৎসকদের মাধ্যমে পরীক্ষা পরিচালনার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রায় ৮০ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলারের অতিরিক্ত অর্থায়ন চাইছে।
এর আগে চলতি বছর নিউ সাউথ ওয়েলস সরকার অধ্যাপক ফিগট্রির গবেষণার জন্য সাড়ে সাত লাখ অস্ট্রেলীয় ডলারের বেশি অনুদানের ঘোষণা দেয়।
গবেষকেরা বিশেষভাবে চান, উন্নত পরীক্ষার সুবিধা যেন শুধু বড় শহরের হাসপাতাল বা আর্থিকভাবে সচ্ছল মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রত্যন্ত ও চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত অঞ্চলের মানুষও যেন ভবিষ্যতে এ ধরনের পরীক্ষা ব্যবহারের সুযোগ পান।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এমন প্রযুক্তির সম্ভাব্য গুরুত্ব রয়েছে। বিশেষ করে বড় শহরের বাইরে হৃদ্রোগের উন্নত পরীক্ষার সুযোগ সীমিত থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য অপেক্ষাকৃত সহজ শনাক্তকরণ পদ্ধতি ভবিষ্যতে উপকারী হতে পারে।
কবে নাগাদ সাধারণ মানুষ এই পরীক্ষার সুযোগ পাবেন?
গবেষণাটি এখনো উন্নয়ন ও ক্লিনিক্যাল যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। নতুন পরীক্ষাপদ্ধতিটি নিয়মিত চিকিৎসাসেবায় ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত হয়েছে, এমন কোনো ঘোষণা আসেনি।
ফলে বর্তমানে প্রচলিত হৃদ্রোগের পরীক্ষা ও চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে এটি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। গবেষণার পরবর্তী ধাপগুলো সফলভাবে সম্পন্ন হলে ভবিষ্যতে সাধারণ চিকিৎসকদের মাধ্যমে পরীক্ষাটি সহজলভ্য করার লক্ষ্য রয়েছে গবেষকদের।
এদিকে চিকিৎসাবিষয়ক বিদ্যমান নির্দেশনা অনুযায়ী, হৃদ্রোগের ঝুঁকি মূল্যায়নে রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস, ধূমপান, পারিবারিক ইতিহাস এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত বিষয় বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
উপসর্গ না থাকলেও ব্যক্তিগত ঝুঁকি অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। আর বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কাজনক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসাসেবা নেওয়া উচিত।
সিডনির গবেষণাটি এখনই হৃদ্রোগ প্রতিরোধের নিশ্চয়তা না দিলেও উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগেই রোগ শনাক্ত করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ভবিষ্যতে পরীক্ষাপদ্ধতিটি কার্যকর ও নিরাপদ প্রমাণিত হলে অস্ট্রেলিয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের মতো হৃদ্রোগের উচ্চ বোঝা বহনকারী দেশগুলোর জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হতে পারে।