অস্ট্রেলিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশি জেনারেল প্র্যাকটিশনারদের অন্যতম বৃহৎ সংগঠন বাংলাদেশি জেনারেল প্র্যাকটিশনার্স অ্যাসোসিয়েশন অস্ট্রেলিয়ার (বিজিপিএএ) বার্ষিক সাধারণ সম্মেলন, ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড এডুকেশনাল কনফারেন্স, গালা ডিনার ও কালচারাল নাইট-২০২৬ জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
গত শনিবার অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড প্রদেশের গোল্ডকোস্টে দিনব্যাপী আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে দেশটির বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ১৫০ জন চিকিৎসকসহ প্রায় ৩০০ অতিথি অংশ নেন। বৈজ্ঞানিক আলোচনা, পেশাগত অভিজ্ঞতা বিনিময়, বার্ষিক সাধারণ সভা এবং বর্ণিল সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিনটি পরিণত হয় বাংলাদেশি চিকিৎসক ও তাদের পরিবারের এক মিলনমেলায়।
সকালে অনুষ্ঠিত হয় সংগঠনের বার্ষিক সায়েন্টিফিক সেমিনার। এতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
সেমিনারে প্রধান অতিথি ও কিনোট স্পিকার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রয়্যাল অস্ট্রেলিয়ান কলেজ অব জেনারেল প্র্যাকটিশনার্সের (আরএসিজিপি) কুইসল্যান্ড চেয়ার ডা. ক্যাথেরিন হেস্টার।
বক্তব্য দেন সংগঠনের সভাপতি ডা. পারভেজ খান ও অস্ট্রেলিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার এফ এম বুরহান উদ্দিন।
স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ডা. সাজিদুল ইসলাম। সঞ্চালনা করেন ডা. মাহবুবা খানম মুক্তা ও ডা. রেশমী সেহেলি।
বৈজ্ঞানিক সেমিনারে অস্ট্রেলিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশি চিকিৎসকদের পেশাগত অভিজ্ঞতা, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিভিন্ন দিক এবং জেনারেল প্র্যাকটিসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি চিকিৎসকেরা ক্লিনিক্যাল কন্টিনিউয়িং প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট (সিপিডি) সেশনে অংশ নেন।
সেমিনারে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত একাধিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তাদের বৈজ্ঞানিক উপস্থাপনা করেন। তাদের মধ্যে ছিলেন কার্ডিওলজিস্ট প্রফেসর ডা. আতিফুর রহমান, এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট ডা. ফাহিদ হাশেম, পাবলিক হেলথ ফিজিশিয়ান প্রফেসর ডা. গোলাম খন্দকার, নেফ্রোলজিস্ট ডা. শাহাদাত হোসেন, সাইকিয়াট্রিস্ট ডা. শামা পারভীন, প্যালিয়েটিভ কেয়ার স্পেশালিস্ট ডা. পীযুষ সরকার ও পেডিয়াট্রিশিয়ান ডা. মুমতাহিনা সেতু।
দিনব্যাপী কর্মসূচিতে অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন রাজ্য থেকে আগত বাংলাদেশি জেনারেল প্র্যাকটিশনারদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত বিজিপিএএ অস্ট্রেলিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশি জেনারেল প্র্যাকটিশনারদের পেশাগত বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ, দক্ষতা উন্নয়ন, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং চিকিৎসা-শিক্ষাসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে কাজ করে আসছে।
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে অস্ট্রেলিয়াজুড়ে প্রায় ১ হাজার ১০০ জন বাংলাদেশি জেনারেল প্র্যাকটিশনার কর্মরত রয়েছেন।
ক্লিনিক্যাল ও এডুকেশনাল কর্মসূচি শেষে অনুষ্ঠিত হয় বার্ষিক সাধারণ সভা ২০২৬।
‘আবার এলো যে সন্ধ্যা’—গালা ডিনারে মিলনমেলা
সন্ধ্যায় নেরাং বাইসেন্টেনিয়াল হলে অনুষ্ঠিত হয় বহুল প্রতীক্ষিত গালা ডিনার ও কালচারাল নাইট। এবারের সাংস্কৃতিক আয়োজনের নাম দেওয়া হয়—‘আবার এলো যে সন্ধ্যা’।
গালা অনুষ্ঠানে সংগঠনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের হাইকমিশনার এফ এম বুরহান উদ্দিন, প্রবীণ জেনারেল প্র্যাকটিশনার ডা. আব্দুর রশীদ আলমগীর ও ডা. কামাল উদ্দিন আহমেদকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়।
ডা. নাহিদ সিনহা ও ডা. রুম্মন চৌধুরীর প্রাণবন্ত উপস্থাপনায় পুরো সন্ধ্যা হয়ে ওঠে আনন্দ ও বিনোদনে পরিপূর্ণ। অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি চিকিৎসক এবং তাদের পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের অংশগ্রহণে নাচ, গান, আবৃত্তি ও নাট্যনৃত্যের মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করে।
সাংস্কৃতিক আয়োজনের কোঅর্ডিনেটর ছিলেন ডা. নাকিবুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে ছিল ডা. জবার আবৃত্তি, ডা. রেশমী ও ডা. রত্নার ধ্রুপদি নৃত্য এবং ডা. রাপ্তি সারওয়াতের মনমাতানো আধুনিক গান। ডা. পীযুষ ও ডা. খান মজলিসের ব্যান্ড পরিবেশনাও দর্শকদের বাড়তি আনন্দ দেয়।
নতুন প্রজন্মের আনিরা, তাসনিয়া ও মীমের চমৎকার পরিবেশনা সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায় যোগ করে ভিন্ন মাত্রা।
সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার অন্যতম আকর্ষণ ছিল রকহেম্পটন থেকে আসা কয়েকজন চিকিৎসক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের দলগত পরিবেশনা। গান ও নাচের সমন্বয়ে তৈরি এই পরিবেশনায় অংশ নেন ডা. মৌসুমী, জেভিয়ার, ডা. আরিফ, ডা. নাসমি, অন্তরা ও তাহসিন আলী। তাদের পরিবেশনা উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ ও আনন্দের সৃষ্টি করে।
রাতের শেষ পর্বে সংগঠনের কালচারাল কমিটির প্রযোজনা ও পরিচালনায় মঞ্চস্থ হয় ব্যতিক্রমী কৌতুকধর্মী হাইব্রিড যাত্রাপালা।
বাংলার ইতিহাসের সিরাজউদ্দৌলা ও ঘষেটি বেগম থেকে শুরু করে জনপ্রিয় চরিত্র বাকের ভাই, মুনা ও বদি—বিভিন্ন সময়ের পরিচিত চরিত্রগুলোকে অভিনব কৌতুক ও নাট্যরীতিতে মঞ্চে জীবন্ত করে তোলা হয়। হাসি-আনন্দে দর্শকদের মাতিয়ে তোলে এই ব্যতিক্রমী পরিবেশনা।
দিনব্যাপী সম্মেলন ও সাংস্কৃতিক আয়োজন শুধু পেশাগত সম্পর্ক ও জ্ঞান বিনিময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি চিকিৎসক ও তাদের পরিবারের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ, বন্ধুত্ব এবং শেকড়ের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করার এক অনন্য উপলক্ষ হয়ে ওঠে।
স্মৃতিচারণ, আড্ডা, গান, নাচ এবং দেশীয় খাবারের আয়োজনে হাজার হাজার মাইল দূরে বসবাস করেও চিকিৎসক ও তাদের পরিবারের সদস্যরা ফিরে যান প্রিয় বাংলাদেশের আবহে।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে ঘোষণা করা হয় ২০২৭ সালের বার্ষিক সাধারণ সম্মেলন, ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড এডুকেশনাল কনফারেন্স, গালা ডিনার ও কালচারাল নাইট অনুষ্ঠিত হবে নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের রাজধানী সিডনিতে।
এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে আনন্দঘন ও স্মরণীয় আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে।