কাঠমান্ডুর একটি হাসপাতালের দেয়ালে সাঁটানো শত শত ছবির মধ্যে প্রতিদিন নিজের নিখোঁজ আত্মীয়ের ছবি খুঁজে বেড়ান সতী সিগদেল। ছবিগুলোর কিছু নিখোঁজদের, আবার কিছু উদ্ধার হওয়া মরদেহের, যেগুলোর পরিচয় এখনো শনাক্ত করা যায়নি। মরিয়া হয়ে তিনি তার আত্মীয়ের কোনো খবর পাওয়ার আশায় এখানে আসেন।
“তিন দিন আগে আমরা তার ছবি এখানে লাগিয়েছি, কিন্তু এখনো কোনো খবর পাইনি”, নিজের আত্মীয় সুইটি পাইথানের কথা বলতে গিয়ে বলেন সিগদেল। হিমবাহ ধসে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় ১ হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর পর এখনো ৪ হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, দুর্যোগের এক সপ্তাহেরও বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ায় জীবিতদের উদ্ধারের আশা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। তবে নেপালের কর্তৃপক্ষ নিরলসভাবে তল্লাশি অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। প্রায় ৯০০ মানুষ জলবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ভেতরে আটকা পড়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গতকাল বুধবার গভীর রাতে নেপালের পাহাড়ি বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা কয়েকজন মানুষ রাজধানীর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় টিচিং হাসপাতালের ওই দেয়ালে সাঁটানো ছবিগুলো সতর্কতার সঙ্গে দেখছিলেন। আশপাশের নিরাপত্তারক্ষীদের কাছে তারা জানতে চাইছিলেন, তাদের নিখোঁজ স্বজনদের নাম তারা শুনেছেন কি না।
“আমরা একটি অলৌকিক ঘটনার আশায় আছি”, বলেন স্বপ্না নিউপানে। তার মামার পরিবারের চার সদস্যই নিখোঁজ। তাদের সঙ্গে যোগাযোগের আশায় তিনি হাসপাতালে এসেছেন। তিনি বলেন, “হাজার হাজার ছবির দিকে তাকিয়ে এই দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে থাকাটাই খুব কঠিন।”
কিছু ছবি নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিস্তারিত তথ্য ও যোগাযোগের নম্বরসহ যত্ন করে তৈরি করা পোস্টারে সাঁটানো হয়েছে। আবার কিছু ছবির নিচে হাতে লেখা নোট বা তথ্য রয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, একটি ছবির ওপরে বড় করে লেখা রয়েছে ‘নিখোঁজ’। ছবিতে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা এক দম্পতিকে দেখা যাচ্ছে। আরেকটি ছবিতে পেশিবহুল এক তরুণের ছবি রয়েছে। তাকে শনাক্ত করতে সাহায্য করার জন্য তার বাঁ হাতের ট্যাটুর কাছ থেকে তোলা ছবিও রয়েছে।
বাগমতী নদীর তীরে কাছেই অবস্থিত পশুপতিনাথ মন্দিরে কিছু পরিবার তাদের স্বজনদের খোঁজে ব্যর্থ হওয়ার পর আশা ছেড়ে দিয়ে খড় দিয়ে তৈরি প্রতিকৃতি দাহ করছিল।
“এটা আমার হৃদয়ে গভীর ক্ষত হয়ে আছে”, বলেন তাপিন্দ্র প্রসাদ তিমালসিনা। একজন হিন্দু পুরোহিত প্রার্থনা পাঠ করার সময় অন্যরা তার ২১ বছর বয়সী স্বজন সাবিনের প্রতিকৃতিতে পানি ঢালছিলেন। এরপর তারা চিতায় আগুন দেন–যে ধরনের ধর্মীয় আচার সাধারণত মৃত ব্যক্তির জন্যই করা হয়।
তবে হাসপাতালের সেই দেয়ালের কাছে সতীর আশা এখনো অটুট। সোমবার থেকে তিনি নিয়ম করে সেখানে অপেক্ষা করছেন। রয়টার্সকে তিনি বলেন, “আমি প্রতিদিন আমার আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের নিয়ে এখানে আসি, কোনো খবর পাওয়ার আশায়।”