আপনার সামনে রয়েছে ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ, স্বাগতিক দেশের সবাই অপেক্ষায় আপনার দলের একজন পেসারকে দেখার জন্য। কি করবেন, বা কি করা উচিত? বিশ্বের অন্য ক্রিকেট বোর্ড যাই করুক, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ঠিক এর উল্টোটা করে দেশের ক্রিকেটের ইমেজকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া সফরে যিনি হতে পারেন বাংলাদেশের তুরুপের তাস, সেই নাহিদ রানাকে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টানা খেলিয়ে অনিশ্চয়তায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, সোনার ডিম পাড়া হাসকে কেন এভাবে চোটের মুখে ঠেলে দেওয়া হল?
এই প্রসঙ্গে যিনি সবচেয়ে ভালো বলতে পারেন, সেই শন টেইট এক মাস আগে পেস বোলিং কোচের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন। নিজে গতিময় পেসার ছিলেন এবং চোটের কারণে ক্যারিয়ার বাঁধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে নাহিদের ব্যাপারে নিজে এবং টিম ম্যানেজম্যান্টকে সবসময় সচেতন রাখতেন। তিনি যতদিন কোচ ছিলেন, জাতীয় দলে নাহিদকে টানা চারটা ম্যাচ খেলানো হয়নি। তবে তিনি চাকরি ছাড়ার দ্বিতীয় সিরিজেই সেই ঘটনাই ঘটেছে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজে চোট পেয়ে নাহিদ অনিশ্চয়তায় পড়ে গেছেন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজেই।
চরচার পক্ষ থেকে টেইটের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল এই ব্যাপারে তার মতামত নিয়ে। সাবেক অজি পেসার বলেছেন, “আমি তো সেখানে আর নেই। তাই জানি না এই সিদ্ধান্ত কার বা ঠিক কেন অস্ট্রেলিয়া সিরিজের ঠিক আগে নাহিদকে টানা খেলানো হয়েছে। তবে হয়ত এটা এড়ানো যেত। অস্ট্রেলিয়ার অনেকেই নাহিদের বোলিং দেখার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। সে যদি সিরিজটা মিস করে, বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য বড় ক্ষতি হতে পারে। ব্যক্তিগতভাবে নাহিদের চোটে আমিও হতাশ।”
টেইট যা বলেছেন, বাস্তবতাও ঠিক তাই। পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ এবং আগে-পরে নাহিদের গতির ঝড় দেখে অস্ট্রেলিয়ার মিডিয়া থেকে শুরু করে ক্রিকেটার, দর্শক সবাই তার অপেক্ষায় আছে। ফাস্ট বোলিংয়ের জন্য আদর্শ কন্ডিশনে নাহিদ কেমন করেন, সেটা নিয়ে ভীষণ রোমাঞ্চিত দেশটির ক্রিকেটপ্রেমীরা।
তাই নাহিদের চোট শুধু বাংলাদেশ দলের জন্যই নয়, অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট বোর্ডের বাণিজ্যিক দিক থেকেও বড় ধাক্কা। কারণ, অস্ট্রেলিয়া ঘরের মাটিতে একটা টেস্ট সিরিজের আগে দুই দলের দুজন তারকা খেলোয়াড় নিয়ে একটা ব্র্যান্ডিং করে। ভারতের বিপক্ষের সিরিজের আগে যেমন ভিরাট কোহলিকে নিয়ে প্রচারণা চালায় দেশটির ক্রিকেট বোর্ড। বাংলাদেশের এই দলে এমন আছেন একজনই, নাহিদ। অথচ বিসিবি কিনা সেই নাহিদকে গুরুত্বহীন ম্যাচে খেলিয়ে গেছে!
অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট বোর্ডও তাই বিসিবির ওপর কিছুটা অসন্তুষ্ট। এমনিতেই পূর্ণ শক্তির এই অস্ট্রেলিয়া দলের বিপক্ষের বাংলাদেশ কেমন করবে, তা নিয়ে রয়েছে সংশয়। প্রথমত, এই দলের কারোরই নেই অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলার অভিজ্ঞতা। দ্বিতীয়ত, দুর্বল জিম্বাবুয়ের কাছে সদ্যই আড়াই দিনে ইনিংস ব্যবধানে টেস্ট হেরে এসেছে নাজমুল হোসেনের দল। এমন প্রেক্ষাপটে নাহিদও যদি না খেলতে পারেন, এই সিরিজ নিয়ে কেন স্বাগতিক দর্শকরা আগ্রহী হবেন?
অস্ট্রেলিয়ার জনপ্রিয় ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক এডাম কলিন্স এই প্রসঙ্গে চরচাকে বলেন, “(নাহিদ) রানা এই সিরিজ মিস করলে সেটা বাংলাদেশের জন্য অনেক বড় ক্ষতি হবে। তার গতিময় বোলিং দেখাটা এই সিরিজের অন্যতম আকর্ষণ। আমি জানি না জিম্বাবুয়ের মত একটা দলের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজে রানাকে খেলাতে গেল বাংলাদেশ। চোট পেসাররা পাবেই, কিন্তু এমন একটা সম্পদ নিয়ে আপনাকে সাবধানী হতে হিবে। আশা করি সে ফিট হয়ে যাবে সিরিজের আগেই।”
বিসিবির মেডিকেল টিম অবশ্য এখনো খুব আশাবাদী হওয়ার মত কিছু অবশ্য বলতে পারেনি। সাইড স্ট্রেইনের যে চোট পেয়েছেন নাহিদ, সেটা থেকে সেরে ওঠার জন্য কমপক্ষে দুই থেকে তিন সপ্তাহ লাগে। তাছাড়া, টেনেটুনে ১৭ আগস্টের প্রথম টেস্টের আগে নাহিদ ফিট হলেও ম্যাচ ফিটনেস পাবেন কিনা, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে যথেষ্টই।
একজন পেসারের রিকভারিতে এমনিতেই সময় লাগে একটু বেশি। তাছাড়া দলটা অস্ট্রেলিয়া বলেই টেস্ট লম্বা স্পেল বল করতে হতে পারে নাহিদকে। মাত্র চোট থেকে ফিরেই এই চাপ তার শরীর নিতে পারবে কি না, সেটাও বড় প্রশ্ন। আর একশ ভাগ ফিট না হয়ে খেলতে নেমে যদি আবার চোটে পড়েন, তাহলে সেটা নাহিদের ক্যারিয়ারে ফেলতে পারে বড় প্রভাব।
সব কিছুর শুরু যে জিম্বাবুয়ে সফরে নাহিদের টি-টোয়েন্টিতে খেলা নিয়ে, যিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তিনি নাকি এখন পুরো দোষ দলের সবার ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। চরচাকে দলের একটি সূত্র জানিয়েছেন, টেস্ট ও ওয়ানডে সিরিজে হেরে যাওয়ার পর কোচিং প্যানেলের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য নাহিদকে টি-টোয়েন্টিতে খেলার পক্ষে মত দেন।
অস্ট্রেলিয়ার সিরিজের গুরুত্ব বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য কত বড়, তা হয়ত টিম ম্যানেজম্যান্ট অবুধাবন করতে চায়নি অথবা পারেনি। নাহলে একটা গুরুত্বহীন সিরিজে টেস্টে দলের সেরা পেসারকে এভাবে খেলিয়ে দেওয়া আর বিপদ ডেকে আনা সমান কথা।
আর তাই যে সিরিজে নাহিদকে নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল সবচেয়ে বেশি, সেই সিরিজে তার অংশগ্রহণ নিয়েই জেগেছে শঙ্কা। বোর্ডের পক্ষ থেকে পেশাদারিত্বের কথা বারবার বলা হলেও নাহিদের ব্যাপারে চূড়ান্ত অপেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছে বিসিবি।
নাহিদের এই চোটের দায় কার, সেই প্রশ্নের উত্তর তাই যেন সবারই অজানা।