ads

তীব্র গরমে নতুন শব্দ আনল জাপান, কেন?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
তীব্র গরমে নতুন শব্দ আনল জাপান, কেন?
জাপানের তাপপ্রবাহ চরম আকার ধারণ করেছে। ছবি: রয়টার্স

গত বছর জাপানের স্বাস্থ্য ও আবহাওয়া দপ্তর দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। কারণ, বিশেষ একটি অবস্থা নিয়ে তাদের ভাণ্ডারে কোনো শব্দ ছিল না। এদিকে, সরকারি সতর্কবার্তা থাকা সত্ত্বেও রেকর্ডসংখ্যক মানুষ হিট স্ট্রোকের শিকার হন। কারণ সেসময় দেশটির বেশ কয়েকটি শহরে তাপমাত্রা ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল।

অবশেষে সমস্যাটির একটি সুনির্দিষ্ট নাম দিয়ে এর সমাধানের উদ্যোগ নেয় আবহাওয়া কর্তৃপক্ষ। চলতি বছরের শুরুর দিকে জাপান মেটিওরোলজিক্যাল এজেন্সি চরম তাপমাত্রার বিষয়ে পূর্ব সতর্কতা দিতে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট) বা তার বেশি তাপমাত্রার দিনের জন্য উপযুক্ত একটি নাম নির্বাচনে জনমত জরিপের আয়োজন করে। ৪০ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়ে সেই জরিপে বিজয়ী নামটি হলো, ‘কোকুশোবি’, যার অর্থ ‘চরম তাপদাহে দিন’।

Advertisement

শব্দটির প্রথম প্রয়োগ ঘটে গত মঙ্গলবার, যখন মধ্য জাপানের তিনটি শহরে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রিতে পৌঁছায়—যা চলতি বছরের জন্য সে দেশে প্রথম। কর্মকর্তারা জনগণকে ঘরের ভেতরে থাকা, এসি ব্যবহার করা এবং পর্যাপ্ত পানি পানের অনুরোধ জানান।

জনগণ যে এই সতর্কবার্তায় সাড়া দিয়েছিল, তার স্পষ্ট ইঙ্গিতও দেখা গেছে। মঙ্গলবার ওসাকা দুর্গ এবং কিয়োটোর কিয়োমিজু মন্দিরের মতো জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে অন্যান্য দিনের তুলনায় ভিড় ছিল লক্ষণীয়ভাবে কম।

জাপান মেটিওরোলজিক্যাল এজেন্সির জলবায়ু পূর্বাভাস বিভাগের সহকারী পরিচালক তারো কাওয়াসাতো দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, “সংখ্যার হিসাব বোঝা সাধারণ মানুষের জন্য কঠিন, কারণ প্রত্যেকে এটি ভিন্নভাবে পর্যবেক্ষণ করে। তবে দিনটিকে ‘কোকুশোবি’ নাম দেওয়ার ফলে মানুষ শুনেই এর তীব্রতা বুঝতে পারবে এবং আজকের দিনটি যে বিপজ্জনক—তা উপলব্ধি করতে পারবে।”

সংস্থাটির এক বিবৃতিতে জানানো হয়, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে আয়োজিত এই জনমত জরিপে ৪ লাখেরও বেশি ভোট পড়েছিল। ‘কোকুশোবি’ শব্দটি ‘বিপজ্জনক গরমের দিন’, ‘ঘাম ঝরানো দিন’ ও ‘সাওনা ডে’-র মতো এক ডজন শব্দকে পেছনে ফেলে শীর্ষস্থান দখল করে। কাওয়াসাতো জানান, সম্ভাব্য নামের তালিকা তৈরিতে আবহাওয়াবিদরা সংবাদমাধ্যম ও ভাষাবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়েছিলেন।

অবশ্য সামনের দিনগুলোতে তাপমাত্রা কিছুটা কমার পূর্বাভাস থাকলেও ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। জাপানের ফায়ার অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি জানায়, প্রথম 'কোকুশোবি' রেকর্ড করার আগেই গত সপ্তাহে দেশটিতে অতিরিক্ত গরমজনিত রোগে অন্তত ১৪ জন মারা গেছেন।

ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার ঝুঁকি সঠিকভাবে তুলে ধরতে নতুন পরিভাষা বা শব্দের আশ্রয় নেওয়া দেশগুলোর তালিকায় জাপানই সর্বশেষ সংযোজন।

যুক্তরাজ্যে উচ্চ তাপমাত্রা যেন স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও জনসেবায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে না পারে, সেজন্য সেখানকার আবহাওয়া দপ্তর ২০২১ সাল থেকেই চরম তাপদাহের সতর্কতা জারি করা শুরু করে। এমনকি গত মাসে ইউরোপীয় দেশগুলোতে তৈরি হওয়া তাপদাহের সময় সর্বোচ্চ মাত্রার ‘লাল সতর্কতা’ জারি করা হয়েছিল। এছাড়া যুক্তরাজ্যের হেলথ সিকিউরিটি এজেন্সি ইংল্যান্ডের জন্য ‘হিট হেলথ অ্যালার্ট’ বা স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বার্তা প্রকাশ করে থাকে, যাতে প্রবীণ ও শারীরিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর চরম গরমের প্রভাব সম্পর্কে স্বাস্থ্য খাতকে পূর্বেই সতর্ক করা যায়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনা ভাষার সংবাদমাধ্যমগুলোতেও গ্রীষ্মের দাবদাহ বোঝাতে নতুন নতুন শব্দবন্ধের ব্যবহার দেখা গেছে। তাইওয়ানের খবরের শিরোনামগুলোতে আবহাওয়াকে ‘সাওনা’-র মতো এবং মানুষকে ‘পোড়া মিষ্টি আলুর’ মতো পুড়তে থাকা পরিবেশের সাথে তুলনা করা হয়েছে।

চীনের দক্ষিণ উপকূলীয় শহর শেনঝেনের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এক পোস্টে জানায়, জুলাইয়ের শুরুর দিকে সেখানকার তাপমাত্রা একপ্রকার ‘বার্বিকিউ মোড’-এ পৌঁছে গিয়েছিল। কর্তৃপক্ষ আরও জানায়, ওই সময়ে প্রচণ্ড তাপদাহ বা হিট স্ট্রোকের শিকার হয়ে ৬২ জন জরুরি অ্যাম্বুলেন্সের সহায়তা চান, যাদের মধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়।

জাপান মেটিওরোলজিক্যাল এজেন্সির কর্মকর্তা কাওয়াসাতো নিউইয়র্ক টাইমসকে জানান, সারা দেশজুড়ে তীব্র গরমের দিন বাড়তে থাকায় ২০২১ সাল থেকেই জাপান সরকার ‘হিট স্ট্রোক অ্যালার্ট’ বা সতর্কবার্তা জারি করা শুরু করে।

আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দেশটির অন্তত ৩০টি স্থানে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়; যার মধ্যে টোকিওর উত্তরে অবস্থিত ইসেসাকি শহরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪১.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১০৭.২ ডিগ্রি ফারেনহাইট)।

হিট স্ট্রোক মূলত অতিরিক্ত গরমজনিত অসুস্থতারই একটি রূপ, যা শরীর নিজের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেললে তৈরি হয় এবং এর ফলে হৃদযন্ত্র চরম চাপের মুখে পড়ে। এর লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে বিভ্রান্তি, মাথা ঘোরা ও বমি বমি ভাব থেকে শুরু করে দ্রুত হৃদস্পন্দন ও ঘন ঘন শ্বাস নেওয়া।

ফায়ার অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি ২০০৮ সাল থেকে তথ্য সংগ্রহ শুরু করার পর থেকে জাপানে গত গ্রীষ্মেই (মে থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে) সবচেয়ে বেশি হিট স্ট্রোকের ঘটনা ঘটে; যখন জরুরি উদ্ধারকর্মীরা ১ লাখেরও বেশি আক্রান্ত মানুষকে সহায়তা প্রদান করেন।

সম্পর্কিত