অস্ট্রেলিয়ার মতো এমন আর কেউ করেনি বাংলাদেশের সঙ্গে।
২০০০ সালে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর টেস্ট খেলা সব দেশেই কমবেশি সফর করেছে বাংলাদেশ। পারফরম্যান্স যা–ই হোক, অতিথ্যে কোনো কার্পণ্য ছিল না কারওরই। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া কেন যেন বাংলাদেশের ব্যাপারে আতিথেয়তার ধার ধারতে চায়নি কখনোই। ২০০৩ সালে একবার নিজেদের মাটিতে টেস্ট খেলতে ডাকার পর কেটে গেছে ২৩ বছর। সময়টা নেহই কম নয়। বাংলাদেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দল নয়, বাংলাদেশের সঙ্গে টেস্ট খেলে বাণিজ্যিক লাভ নেই—এমন কত অজুহাত! দুই দশক আগে যা–ও একবার বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ায় গিয়েছিল টেস্ট খেলতে, খেলা হয়েছিল অচেনা, অজানা ভ্যেনুতে। মেলবোর্ন, ব্রিসবেন, সিডনি, পার্থ, অ্যাডিলেডের মতো প্রচলিত ভ্যেনু বাদ দিয়ে বাংলাদেশকে খেলতে হয়েছিল ডারইউন ও কেয়ার্নসে।
২৩ বছর অপেক্ষার পর আরেকটি অস্ট্রেলিয়া সফরেও একই অবস্থা। টেস্টের ভ্যেনু সেই ডারউইন। কিন্তু এবার অস্ট্রেলিয়াকে বাংলাদেশ বুঝিয়ে দিল তুচ্ছ–তাচ্ছিল্য করার দিন শেষ। খুব সহজে আরও একটি টেস্ট জিতবে বলে যে স্বপ্ন দেখছিল অস্ট্রেলিয়া, তাতে বাংলাদেশ যে এভাবে কালি লেপে দেবে, সেটা বোধহয় ভাবতে পারেনি টেস্ট ক্রিকেটের এক নম্বর দলটি। ডারউইনে, অফ সিজনের টেস্টেই অস্ট্রেলিয়াকে এমন শিক্ষা দিল বাংলাদেশ, যেটা তারা মনে রাখবে আজীবন। কত সহজে বাংলাদেশকে হারানো যাবে, এই ভাবনা যখন অস্ট্রেলিয়ানদের, তখন বাংলাদেশ দাপট দেখিয়েই তুলে নিয়েছে ঐতিহাসিক এক জয়। ২০১৭ সালে ঘরের মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে টেস্টে হারানোর সুখস্মৃতি ছিল, এবার অস্ট্রেলিয়াকে তাদের মাটিতেই হারাল বাংলাদেশ। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে দুর্দান্ত সব মুহূর্ত আছে। কোনো দ্বিধা ছাড়াই বলে দেওয়া যায় ডারউইনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট জয় এদেশের ক্রিকেট ইতিহাসেরই সবচেয়ে সেরা মুহূর্ত। তাচ্ছিল্য আর অবহেলার মোক্ষম জবাব।
টেস্টের তৃতীয় দিন শেষে নিজেদের দ্বিতীয় ইনিংসে ১৬১ রান তুলতেই ৪ উইকেট হারিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। বাংলাদেশের ৪২৬ রানের জবাবে প্রথম ইনিংসে ১৯৮ রানে গুটিয়ে যাওয়া অস্ট্রেলিয়া তখনও পিছিয়ে ছিল ৬৭ রানে। জয়ের সুবাস পাচ্ছিল বাংলাদেশ। তবে প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া বলেই কিন্তু ছিল। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ানদের ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাসই ছিল চিন্তার বিষয়। কিন্তু চতুর্থ দিনটাও বাংলাদেশ শুরু করল ঠিক সেই জায়গা থেকে, যেখানে তৃতীয় দিন শেষ হয়েছিল। চতুর্থ দিনের রাজা মেহেদী হাসান মিরাজ। ব্যাট হাতে ৬৫ রান করা মিরাজ বল হাতে চতুর্থ দিন হয়ে উঠলেন অস্ট্রেলিয়ানদের যম। ৫ উইকেট নিয়ে তিনি অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহটা ২৮৪ রানের বেশি যেতে দেননি। তাকে যোগ্য সঙ্গ দিয়েছেন হাসান মাহমুদ, ৩ উইকেট তুলে নিয়ে। জয়ের জন্য বাংলাদেশের সামনে ৫৭ রানের বেশি দিতে পারেনি মহাপরাক্রমশালী অস্ট্রেলিয়া। হাতে দেড় দিন রেখে সেই লক্ষ্যমাত্রাটা যে কেবলই আনুষ্ঠানিকতা, ক্রিকেট বিশ্বকে সেটা জানান দিল বাংলাদেশ ৯ উইকেটের জয়ে। ৫৭ রানের লক্ষ্যে পৌঁছতে ৮৬ বলের বেশি লাগেনি সাদমান ইসলাম, মুমিনুল হকদের।
ডারউইন টেস্ট অস্ট্রেলিয়ানরা হারের জন্য ভুলে যেতে চাইলেও এই টেস্ট অস্ট্রেলিয়াকে ভুলতে দেবে না ব্যাটিং ব্যর্থতা। একেবারে শুরু থেকেই বাংলাদেশি বোলারদের সামনে রীতিমতো খাবি খেয়েছে অস্ট্রেলিয়া। প্রথম ইনিংসে ১৯৮ রানে গুটিয়ে যাওয়া টেস্টে গতিপ্রকৃতির একটা ইঙ্গিত দিয়েছিল। হাসান মাহমুদ ৬ উইকেট নিয়েছিলেন ৫৫ রানে। শুধু হাসান মাহমুদই নয়, ডারউইনের সবুজে ঢাকা উইকেট, যে উইকেট তৈরিই করা হয়েছিল প্যাট কামিন্স, জস হ্যাজলউড, মিচেল স্টার্কদের গতির কথা মাথায় রেখে, সেই উইকেটেই ঝড় তুলেছেন বাংলাদেশি পেসাররা। হাসান মাহমুদের পাশাপাশি ইবাদত হোসেন, তাসকিন আহমেদরা। স্টিভ স্মিথ ৭১ রানের ইনিংসটি না খেললে অস্ট্রেলিয়ার অবস্থা হতো আরও করুন। যদিও স্টিভ স্মিথ নিজেকে ভাগ্যবান মনে করতেই পারেন। ডিআরএসের এদিক–সেদিকে আউটের হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন।
জবাবে বাংলাদেশের হিরো তানজিদ হাসান তামিম। সঙ্গে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন ও মুমিনুল হক। শেষের দিকে মেহেদী হাসান মিরাজ। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্টে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪২৬ রান তুলে প্রতিপক্ষকে যেভাবে ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছে বাংলাদেশ, সেটা গত তিনদিন ক্রিকেট দুনিয়াতেই আলোচনার প্রধান বিষয়।
২২৮ রানে পিছিয়ে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করা অস্ট্রেলিয়া যেন আগেই হেরে বসেছিল। অস্ট্রেলিয়ার রেকর্ডই বলছিল এই টেস্ট তারা হারতে যাচ্ছে। নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসে ২০০ রান বা এর চেয়ে বেশি রানে প্রথম ইনিংসে ৮২ বার পিছিয়ে পড়া দলটি ওই অবস্থা থেকে টেস্ট জিতেছেই মাত্র ৩ বার।
ডারউইনে ইতিহাস হবে, নাকি ফিরবে ফতুল্লার স্মৃতি?
দ্বিতীয় ইনিংসে ইতিহাসের স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটার লক্ষ্য ছিল অস্ট্রেলিয়ার। সেটা কাটতে পেরেছেন একমাত্র ক্যামেরন গ্রিন। তিনি সেঞ্চুরি না করলে দ্বিতীয় ইনিংসেও অস্ট্রেলিয়ার অবস্থা প্রথম ইনিংসে মতোই হতো। গ্রিন খেলেছেন ১০৪ রানের ইনিংস। এ ছাড়া স্টিভ স্মিথের ৪৪, অ্যালেক্স ক্যারির ৩০ আর মারনাস লাবুশানের ৩১ রানে অস্ট্রেলিয়া স্কোরবোর্ড ২৮৪ রান তোলে। মেহেদী হাসান মিরাজ ৬৬ রানে ৫টি আর হাসান মাহমুদ ৫৬ রানে ৩ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের সহজ জয়ের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেন।
৫৭ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই জস হ্যাজলউডের বলে তানজিদ হাসান ফিরে গেলেও মামুলি লক্ষ্যে পৌঁছে সমস্যা হয়নি বাংলাদেশের। সাদমান ইসলাম আর মুমিনুল হকের আত্মবিশ্বাসী ব্যাটিংয়ে ইতিহাস গড়তে সময় লাগেনি বাংলাদেশের। সাদমান অপরাজিত ছিলেন ২৫ রানে, মুমিনুল ৩০ রানে।
২৩ বছর পর টেস্ট খেলতে অস্ট্রেলিয়ায় ফিরেই ইতিহাস। তুচ্ছ–তাচ্ছিল্যের এমন জবাবও হয়! অস্ট্রেলিয়ানরা বহুদিন মনে রাখবে ডারউইনের ইতিহাস।
অস্ট্রেলিয়ায় পরের সফরটি কবে হবে, সেটা এখনই বলার উপায় নেই। তবে সেই সফরে টেস্ট ম্যাচগুলো যে মেলবোর্ন, সিডনি, পার্থ, ব্রিসবেন কিংবা অ্যাডিলেডের মতো ভ্যেনুতেই হবে, সেটা বলাই যায়।