ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, “বর্তমান খসড়ামতে কোনো অবস্থায় স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ মানবাধিকার কমিশন পাব না।” বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) উদ্যোগে মতবিনিময় সভায় এ কথা বলেন তিনি।
সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে বিকেল ৩টায় এ মতবিনিময় সভা হয়।
সভায় ড. ইফতেখারুজ্জামান কমিশন গঠনে সদস্যদের বাছাই কমিটি এবং এর নিয়োগ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার দাবি জানান। তিনি বলেন, “বর্তমান খসড়ামতে কোনো অবস্থায় স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ কমিশন পাব না। ঘোষণায় মানবাধিকার কমিশন কোনো মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকবে না–এটা নেই, যা ২০২৫-এর (খসড়ায়) উল্লেখ ছিল। সদস্যদের নিয়োগ যেহেতু রাষ্ট্রপ্রতি দ্বারা হবে, আমরা জানি রাষ্ট্রপ্রতি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা ছাড়া কিছু করতে পারবেন না–এমনটি সংবিধানে আছে। সরকারি কর্মকর্তারা ছুটি নিয়ে কমিশনের সদস্য হতে পারবেন–এমনটিও উল্লেখ আছে। তার মানে কমিশন সম্পূর্ণ সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। অর্থনৈতিক স্বাধীনতাটাও থাকবে সরকারের নিয়ন্ত্রণে।”
নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন বলেন, “অর্থনৈতিক কিছু করতে হলে সরকারে কাছে পূর্বানুমোদন কোনো স্বাধীন কমিশনের প্রতিচ্ছবি হতে পারে না।”
এ ছাড়া আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক গুম, খুন, নির্যাতনের শিকার হলে এই কমিশন নিজে থেকে কোনো তদন্ত করতে পারবে কি না, সে বিষয়ে খসড়ায় কোনো কিছু উল্লেখ নেই বলে মন্তব্য করেন গুম-সংক্রান্ত কমিশনের সাবেক সদস্য নূর খান লিটন। তিনি বলেন, “এটা এক ধরনের ২৪-এর আগের অবস্থার মতো মনে হচ্ছে।”
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রসঙ্গ তুলে ভাষ্কর ভট্টাচার্য বলেন, “আমি একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। আমি কীভাবে আবেদন করব মানবাধিকার কমিশনে, অথবা একজন বাকপ্রতিবন্ধী অনলাইনে কীভাবে আবেদন করবে–এসব কিছুই উল্লেখ নেই খসড়ায়।”
প্রস্তাবিত খসড়ায় কমিশনে সংখ্যালঘুদের সদস্য সংখ্যা নিয়েও প্রশ্ন তুলেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অনুপম দেবাশীষ রায়। তিনি বলেন, “কমিশনে একজন প্রতিনিধি রাখা হয়েছে সংখ্যালঘুদের পক্ষ থেকে। কিন্তু আমরা জানি হিন্দু, আদিবাসী, নারী–এরা প্রতিটা ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যালঘু গোষ্ঠী। তাহলে এই একজনটা কাদের কাছ থেকে নেবে?”
এ ছাড়া বাছাই কমিটিতে আন্তর্জাতিক এক্সপার্ট না রাখা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন আইনজীবী খান খালিদ আদনান। আর ক্ষতিপূরণের ধরন ও এ সম্পর্কিত অস্পষ্টতার বিষয়টি তুলে ধরেন মানবাধিকার কর্মী নওশীন নূর। তিনি বলেন, “ক্ষতিপূরণটা শুধু টাকার নয়; এর সাথে মানসিক সাপোর্ট, পূনর্বাসন, আর্থিক সহযোগিতা–এসব থাকতে হবে। ক্ষতিপূরণ কে দেবে, কারা কত দেবে, কীভাবে দেবে, কীসের ভিত্তিতে দেবে–খসড়ায় তা স্পষ্ট করা হয়নি। এমনকি কত সময়ের মধ্যে দেবে, তারও উল্লেখ নেই খসড়াতে।”
অনলাইন মিডিয়া চরচা সম্পাদক সোহরাব হাসান বলেন, “যে রাষ্ট্রে প্রতিটি মানুষের অধিকার সমানভাবে থাকবে না, সেটা মানবাধিকারের রাষ্ট্র হতে পারে না। অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর ৩৬৩ জন সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এই মামলাগুলোর ন্যায্য কি না, তার ব্যাখ্যা আমরা কি মানবাধিকার কমিশনের কাছে চাইতে পারব?”
বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন বলেন, “আজকের আলোচনা থেকে অনেকে মনে করতে পারেন আমরা মানবাধিকার কমিশন আইন চাই না। কিন্তু এটা স্পষ্ট করা উচিত যে, আমরা এমন একটা আইন দ্রুত চাই, যেটা সুচিন্তিতভাবে খসড়া করা হবে।”