মূল্যস্ফীতির চাপ এবং অর্থনীতির ধীরগতি সামলাতে নীতি সুদহার বা পলিসি রেট ৯ দশমিক ৫০ শতাংশেই অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে জরুরি প্রয়োজনে ব্যাংকগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার হার বা এসএলএফ ১১ শতাংশ এবং টাকা জমা রাখার হার বা এসডিএফ ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটরি পলিসি কমিটির বৈঠকে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে আজ বুধবার এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর মেয়াদের জন্য এই মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছে। এবারই প্রথম তিন মাস মেয়াদে বা ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে মুদ্রানীতি প্রকাশ করল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
মুদ্রানীতির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমেছে। জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ থাকলেও আগস্টে তা কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে। তবে মূল্যস্ফীতির এই স্বস্তি মূলত খাদ্যপণ্যের দাম কমার কারণে এসেছে। খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ দশমিক ৩২ শতাংশের ওপরে রয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও দৈনন্দিন কেনাকাটায় চাপ এখনো রয়ে গেছে।
অন্যদিকে অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তিগুলোর গতি এখনো ধীর। শিল্প উৎপাদনে সংকোচনের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য বেসরকারি খাতে ঋণ নেওয়ার প্রবণতাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। উচ্চ সুদহার, দুর্বল বিনিয়োগ পরিস্থিতি এবং ব্যাংক খাতের নানা সংকটের কারণে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তার প্রভাব পড়ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে বাধার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম উঠানামা করছে। এর প্রভাব আমদানি ব্যয় এবং দেশের মূল্যস্ফীতির ওপর পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
দেশের বাজারে সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো এবং নতুন সরকারি বেতন স্কেল নিয়ে আলোচনা চলায় সামনে মূল্যস্ফীতির চাপ আবার বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রেখে একই সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
ব্যাংক খাতের পরিস্থিতিও এখনো স্বস্তিদায়ক নয়। আমানত বাড়লেও ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ মোট ঋণের প্রায় ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে পৌঁছেছে। উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং মূলধন সংকটে থাকা ব্যাংকগুলো নতুন করে ঋণ বিতরণে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এতে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ আরও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক মিলে ইতোমধ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানা পুনরায় চালু করতে ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার কথা বলা হয়েছে।
তবে বৈদেশিক খাতে কিছুটা স্বস্তি রয়েছে। প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের প্রবাহ ভালো থাকায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং ডলারের বাজারে আপাতত বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়নি। বৈদেশিক লেনদেনে স্থিতিশীলতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল করার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। অর্থনীতির পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হবে।