ads

জ্বালানি রূপান্তরে কী পরিকল্পনা সরকারের

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
জ্বালানি রূপান্তরে কী পরিকল্পনা সরকারের
জ্বালানি সংকটে দেশে উৎপাদন হচ্ছে ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। ছবি: সংগৃহীত

ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ বাংলাদেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩৩ হাজার ৯২ মেগাওয়াট। তবে জ্বালানি সংকটে উৎপাদন হচ্ছে ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। চলতি বছরের ২০ মে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় ১৭ হাজার ২০১ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে লোডশেডিং করতে হচ্ছে মন্ত্রণালয়কে।

জ্বালানি সংকট, অতিরিক্ত ক্যাপাসিটি চার্জ ও বিপুল পরিমাণ ভর্তুকির কারণে তীব্র চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে বিদ্যুৎ খাত। একদিকে দেশীয় গ্যাসের মজুত কমে যাওয়া অপরদিকে আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধির ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ৪০ শতাংশেরও বেশি গ্যাসভিত্তিক হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের মূল্য ওঠানামার প্রভাব সরাসরি দেশের বিদ্যুৎ খাতে পড়ছে।

Advertisement

বার্তা সংস্থা ইউএনবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং দেশীয় জ্বালানি সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিতের পরিকল্পনা নিয়েছে। টেকসই বিদ্যুৎ খাত গড়ে তুলতে দেশের বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে এনার্জি অডিট (শক্তি ব্যবহারের নিরীক্ষা) জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

সরকারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো- আধুনিক, সাশ্রয়ী, নিরবচ্ছিন্ন এবং পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

জাতীয় বাজেট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, শিল্প কারখানায় বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়ানো এবং নির্ধারিত শিল্প গ্রাহকদের বিদ্যুৎ ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধিতে উৎসাহ দেওয়া হবে। ক্রমবর্ধমান জ্বালানির দাম ও বিদ্যুতের চাহিদার কারণে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর যে চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তা মোকাবিলায় এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাজেট নথি অনুযায়ী, সৌর প্যানেল, বায়ু টারবাইনের যন্ত্রাংশ এবং ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা (ব্যাটারি স্টোরেজ) দেশেই উৎপাদনের জন্য বিনিয়োগকারীদের বিভিন্ন প্রণোদনা দেওয়া হবে।

এদিকে, বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। ২০৫০ সালের মধ্যে এই হার ৩০ থেকে ৫০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

গত ১০ জুলাই নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যে জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০২৬-২০৩০)-এর খসড়া অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। নতুন কৌশলপত্র অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে সরবরাহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে কার্যকর চাহিদা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কমপক্ষে ১৫ শতাংশ বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যও রাখা হয়েছে।

এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ কর্মসূচির সম্প্রসারণ, উপকূলীয় এলাকায় বায়ুশক্তির সম্ভাব্যতা মূল্যায়ন, বৃহৎ পরিসরের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরীক্ষামূলক প্রকল্প চালু।

গত ১২ জুলাই বাংলাদেশ সচিবালয়ে আয়োজিত এক বিশেষ বৈঠকে ঢাকা শহরের ময়লা-আবর্জনা থেকে পরিবেশবান্ধব উপায়ে বিদ্যুৎ তৈরির দুটি বড় প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রকল্প দুটি হলো- ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতায় আমিনবাজার এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) আওতায় মাতুয়াইল এলাকায়।

বৈঠকে বিদ্যুৎ খাতের কর্মকর্তারা জানান, আমিনবাজারের প্রকল্প তৈরিতে অর্থায়ন করবে চীনের মেশিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন। এখানে প্রতিদিন ঢাকা শহরের প্রায় ৩ হাজার টন ময়লা পুড়িয়ে ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ তৈরি করা হবে। চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৮ সালের আগস্ট মাসের মধ্যে এই কেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ দেওয়া শুরু হবে। এই প্রকল্প থেকে আগামী ২৫ বছর টানা বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে।

গতকাল শুক্রবার সিরাজগঞ্জে এক অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, “বর্তমান সরকারের লক্ষ্য ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা। সৌরবিদ্যুতে জ্বালানির কোনো খরচ নেই। এতে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানি কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।”

এছাড়া, নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের অধিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে জাতীয় জ্বালানি সংরক্ষণ (এনার্জি স্টোরেজ) রোডম্যাপ প্রণয়ন এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার (গ্রিড) সক্ষমতা ও নমনীয়তা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করতে চায়। একই সঙ্গে সঞ্চালন নেটওয়ার্ক ২৫ হাজার সার্কিট কিলোমিটারে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

বাজেট নথিতে বলা হয়েছে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন প্রকল্পের নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। একটি রিঅ্যাক্টরে ইতোমধ্যে জ্বালানি রড স্থাপন করা হয়েছে এবং ২০২৬ সালের আগস্টের মধ্যে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার আশা করা হচ্ছে। ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে প্রথম ইউনিট থেকে এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

ক্যাপাসিটি চার্জ ব্যবস্থার মাধ্যমে আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ পাচারের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। পাশাপাশি, বিগত সরকারের সময় বিতর্কিত কিছু শর্তে বেশ কয়েকটি বড় বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করা হয়। এর ফলে ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ ক্রয় ও আমদানির সুযোগ সৃষ্টি হয়। যা রাষ্ট্রের ওপর বড় আর্থিক বোঝা সৃষ্টি করে।

উৎপাদন ব্যয় ও ভোক্তা পর্যায়ের বিদ্যুৎ মূল্যের মধ্যে ব্যবধান বেড়ে যাওয়ায় চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে সরকারি ভর্তুকি ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি হতে পারে।

ভর্তুকির চাপ কমাতে গত ৩ জুন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বা প্রতি ইউনিট ১ টাকা ৫২ পয়সা বাড়ায়। একই সঙ্গে পাইকারি পর্যায়েও বিদ্যুতের দাম ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বা প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ৩৯ পয়সা বৃদ্ধি করে। মূল্যবৃদ্ধিতে প্রতি ইউনিট খুচরা বিদ্যুতের দাম এখন থেকে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা এবং পাইকারি বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের দাম ৮ টাকা ৩৯ পয়সা হয়েছে।

সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায় সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। প্রধান উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে- বিদ্যুৎ খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধি, দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করা, পুরো খাতে নজরদারি জোরদার করা।

এছাড়া, যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারে না সেগুলো পর্যায়ক্রমে বন্ধ, প্রয়োজন অনুযায়ী আধুনিকায়ন এবং সর্বনিম্ন ব্যয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের (লিস্ট-কস্ট জেনারেশন) কৌশল গ্রহণ করা হবে।

বাজেটে আর্থিক জবাবদিহি বাড়াতে ক্যাপাসিটি চার্জ ও বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পাওয়ার পারচেজ অ্যাগ্রিমেন্ট) পর্যালোচনার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তির মাধ্যমে সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করে সিস্টেম লস কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। দুর্গম ও দ্বীপাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংযোগ সম্প্রসারণেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিদ্যুতের দাম সহনীয় রাখতে ভবিষ্যতের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের (কম্পিটিটিভ বিডিং) মাধ্যমে নির্মাণ করা হবে। মহানগর এলাকায় ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ বিতরণ লাইন ও সাবস্টেশন স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে, যা বিদ্যুৎ গ্রিড আধুনিকায়নের অংশ।

এছাড়া, সরকার ২০২৬-৫০ সময়কালের জন্য বিদ্যুৎ খাতের কৌশলপত্র প্রস্তুত করেছে। এতে সর্বনিম্ন ব্যয়ের বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনা, ভারসাম্যপূর্ণ জ্বালানি মিশ্রণ এবং এসসিএডিএ, জিআইএস ও এডভান্স মিটারিং ইনফ্রাস্টাকচার (এএমআই)-এর মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

গ্রাহকসেবা উন্নত করতে নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ গ্রহণ থেকে শুরু করে বিল পরিশোধ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে স্বয়ংক্রিয় করা হয়েছে।

ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন চাহিদা পূরণে শিল্প খাতে এনার্জি অডিট, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ এবং সুশাসনভিত্তিক সংস্কার কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতকে আরও স্থিতিশীল, সহনশীল এবং আর্থিকভাবে টেকসই করে তুলতে চায় সরকার।

সম্পর্কিত