ইরানের প্রক্সি বাহিনী এখন কোথায়?

ইরানের প্রক্সি বাহিনী এখন কোথায়?
ছবি: রয়টার্স

ইরান বহু বছর ধরে বিপুল অর্থ ব্যয় করে বিদেশে তাদের ঘনিষ্ঠ প্রক্সি যোদ্ধাদের প্রস্তুত করেছে। তবে তেহরান যখন অস্তিত্ব সংকটের মুখে, তখন ইরানের লালিত-পালিত অনেক যোদ্ধা ও আধা সামরিক গোষ্ঠী এখন পর্যন্ত তাদের পক্ষে যুদ্ধে নামেনি।

এর মধ্যে একজন ইরাকের একটি ইরানপন্থী আধাসামরিক গোষ্ঠীর কমান্ডার এ. জে.। ব্যক্তিগত নিরাপত্তার স্বার্থে তিনি সঠিক নাম ব্যবহার করেননি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এক সপ্তাহ আগে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে তিনি তেহরানের নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছেন। কিন্তু এখনো সেই নির্দেশ আসেনি।

এমনকি ইরাকের ভেতরে ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর কোনো ব্যাপক সমাবেশও দেখা যায়নি। অথচ গাজা, লেবানন, সিরিয়া থেকে শুরু করে ইয়েমেন ও ইরাক পর্যন্ত বিস্তৃত ইরানের শক্তিশালী জোটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিগুলোর একটি হলো ইরাক।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরাকের কিছু ইরানপন্থী গোষ্ঠী হামলার দাবি করেছে। একটি গোষ্ঠী জানিয়েছে, তারা ‘ইরাক ও আশপাশের অঞ্চলে শত্রু ঘাঁটিগুলোতে’ ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এ ছাড়া কুর্দি অধ্যুষিত উত্তরাঞ্চলীয় শহর এরবিলের মার্কিন ঘাঁটিতে কয়েকটি বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটেছে।

তবে কুর্দি কর্মকর্তাদের মতে, অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলাই সরাসরি ইরান থেকেই চালানো হয়েছে। ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স অব ইরাকের’ নামে অনলাইনে দুই ডজনের বেশি হামলার দাবি করা হলেও সেগুলোতে তেমন উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে হামলার কোনো প্রমাণও পাওয়া যায়নি।

এ. জে. মনে করেন, তেহরান থেকে সরাসরি নির্দেশ এলেও তা ইরানের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা বহু ইরাকি শিয়া আধাসামরিক গোষ্ঠীর মধ্যে হয়তো মাত্র দুই বা তিনটিকে দেওয়া হবে। তিনি রয়টার্সকে বলেন, “আমার মনে হয় না তাদের বেশিরভাগই এখন আর নির্ভরযোগ্য।”

এ. জে আরও বলেন, “কেউ কেউ হয়তো সরাসরি পদক্ষেপ নেবে। আবার কেউ কেউ নিজেদের নাম গোপন রেখে ভিন্ন কোনো গোষ্ঠীর মাধ্যমে হামলা চালাতে পারে। কিন্তু এখন অনেকেই নিজেদের স্বার্থের দিকেই বেশি নজর দিচ্ছে।”

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং এর বিদেশি অভিযানের ইউনিট কুদস ফোর্সের নেতৃত্বে এই প্রক্সি নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছিল, যার লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লড়াই করা। তবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে এই প্রক্সি নেটওয়ার্ককে দুর্বল করে দিয়েছে। ফলে এখন ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান তাদের সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্তে অনেকটাই একা হয়ে পড়েছে।

ইরাকের ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলো কেন দুর্বল হয়ে পড়ছে?

এ. জে. রয়টার্সকে বলেন, ইরাকের ইরানপন্থী প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর সামরিক শক্তি কমে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক হামলায় ক্ষতি, সিরিয়াকে সরবরাহ পথ হিসেবে হারানো এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডারের ইরাকের রাজনীতি ও ব্যবসায়িক জীবনে যুক্ত হয়ে পড়া।

ইরাকের আরও প্রায় দুই ডজনের মতো আধা সামরিক শিয়া সদস্যরাও এ. জের সঙ্গে সহমত পোষণ করেন। তাদের মতে, বছরের পর বছর ধরে টার্গেট করে অভিজ্ঞ নেতাদের হত্যা, নিরাপদ প্রশিক্ষণ ঘাঁটি ও অস্ত্র সরবরাহপথ হারানো এবং অনেক ইরাকি কমান্ডারের ধনী রাজনীতিবিদ বা ব্যবসায়ী হয়ে ওঠার ফলে এই নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে পড়েছে।

যুক্তরাজ্যের এক্সেটার ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং আটলান্টিক কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ ফেলো গ্যারেথ স্টান্সফিল্ড বলেন, “ইরাকি আধা সামরিক নেতারা ব্যক্তিগতভাবে নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে চান না। তারা পশ্চিমা দেশে চিকিৎসা নিতে চান, সন্তানদের বিদেশে পড়াতে চান।”

তিনি আরও বলেন, গত বছরের জুনে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনের সংঘাতের পর এই প্রবণতা আরও বেড়েছে।

ইরাকি নিরাপত্তা কর্মকর্তারা এবং আধাসামরিক গোষ্ঠীর ভেতরের সূত্রগুলো বলছে, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে অথবা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কোনো হামলাকে যদি তারা পুরো শিয়া সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে হামলা হিসেবে মনে করে, অথবা যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত কুর্দি বাহিনী যদি ইরানের ওপর হামলা চালায়, তাহলে ইরানের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো বড় আকারে যুদ্ধে নামতে পারে।

তবে গ্যারেথ সতর্ক করে বলেন, তারা চাইলে এখনই আগের মতো লড়াই করতে পারবে না। ইরাকি নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতে, যুদ্ধ শুরুর পর যেসব সীমিত হামলা হয়েছে, সেগুলোতে পুরনো ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে।

এ. জে. জানান, গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের পর থেকে তেহরান তার গোষ্ঠীর কাছে নতুন কোনো অস্ত্র পাঠায়নি। যদিও অন্য ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর ক্ষেত্রেও একই অবস্থা কিনা তা নিশ্চিত করতে পারেনি রয়টার্স। গত বছরের সংঘাতে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড এ.জের গোষ্ঠীকে পাল্টা হামলার নির্দেশ দিয়েছিল। তখন তারা ইসরায়েলের দিকে ড্রোন ছুড়ে প্রতিশোধ নেয়।

তবে এখন অস্ত্র স্থানান্তর করা ‘খুবই ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ তা নজরদারির মাধ্যমে ধরা পড়ে যেতে পারে বলে জানান এ.জে.।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী রয়টার্সকে জানিয়েছে, “ইরাকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো ইরানের প্রক্সি হিসেবে কাজ করে।”

এক বিবৃতিতে তারা আরও জানায়, তারা হামলা চালালে ইসরায়েলও বসে থাকবে না-এই বার্তা স্পষ্ট হওয়ার ফলে ইরাক থেকে ইসরায়েলের দিকে হামলার সংখ্যা কমে গেছে।

এ বিষয়ে ইরাক ও ইরান সরকার কিংবা হোয়াইট হাউস এবং পেন্টাগনও রয়টার্সের প্রশ্নের কোনো জবাব দেয়নি।

ইরানে আমেরিকার হামলা। ছবি: রয়টার্স
ইরানে আমেরিকার হামলা। ছবি: রয়টার্স

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত ইরাকের আরেকটি আধাসামরিক বাহিনীর কমান্ডার কায়েস আল খাজালি সামাজিকমাধ্যম এক্সে একটি সংক্ষিপ্ত বিবৃতি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিন্দা জানান এবং সমর্থকদের কালো পোশাক পরে ক্ষোভ প্রকাশ করার আহ্বান জানান।

অতীতে খাজালি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে হামলার হুমকি দিয়েছেন, আর তার নেতৃত্বাধীন যোদ্ধারা ২০০৭ সালে ইরাকে মার্কিন সেনাদের হত্যা করেছিল। কিন্তু এবার তিনি কোনো সশস্ত্র লড়াইয়ের আহ্বান জানাননি। খাজালির দপ্তর রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি।

বাগদাদের এক বিক্ষোভকারী ইরানপন্থী শীর্ষ আধাসামরিক নেতাদের সমর্থনের অভাব নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। অনলাইনে প্রকাশিত এক ভিডিওতে তিনি বলেন, “তোমরা কোথায়?” তিনি আরও বলেন, “তোমরা যদি আমাদের সঙ্গে এসে মার্কিন দূতাবাসে আগুন না দাও, তাহলে তোমরা কাপুরুষ।”

এর আগে, ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাকে হামলায় সুন্নি শাসক সাদ্দাম হোসেনের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ইরানি সমর্থনে শিয়া আধা সামরিক রা মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে। পরবর্তীতে এসব আধা সামরিক বাহিনী ইরাকের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতেও প্রভাব বিস্তার করে। ২০১৪ সালে উগ্রপন্থী সংগঠন আইএসের উত্থানের পর শিয়া আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যসংখ্যা আরও বেড়ে যায়, কারণ অনেক মানুষ দেশকে রক্ষার জন্য এতে যোগ দেয়।

রয়টার্স বলছে, ইরাকের ইরান-সমর্থিত আধাসামরিক বাহিনীগুলোর শক্তি বাড়ার সময়ই লেবাননে হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক প্রভাবও বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে, সিরিয়ায় ইরানের মিত্র প্রেসিডেন্ট বাসার আল আসাদ ইরানের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর সহায়তায় গৃহযুদ্ধে টিকে থাকতে সক্ষম হন।

তবে ২০১৯ সালে মার্কিন দূতাবাসে হামলার ঘটনাটি একটি বড় মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এর পরপরই ২০২০ সালের শুরুতে ড্রোন হামলায় ইরানের কমান্ডার কাশেম সোলাইমানিকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র। তিনি আইআরজিসির কুদস ফোর্সের প্রধান ছিলেন এবং বিদেশে ইরানের সামরিক কার্যক্রম ও প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো সমন্বয় করতেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে চালানো ওই হত্যাকাণ্ডের পর আধা সামরিক গোষ্ঠীগুলো সমন্বয়কারীর অভাবে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। সোলাইমানির স্থলাভিষিক্ত ইসমাইল ঘানির একই ধরনের প্রভাব বা কর্তৃত্ব নেই বলে মনে করেন অনেক আধা সামরিক সদস্য।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোলাইমানি নিহত হওয়ার পর ইরানের সবচেয়ে বিশ্বস্ত প্রক্সি হিজবুল্লাহ ওই অঞ্চলজুড়ে তেহরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর সমন্বয় করার দায়িত্ব নেয়। এ.জে. বলেন, হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ এক লেবানিজ রাজনৈতিক নেতা বৈরুতে বিভিন্ন গোষ্ঠীকে একত্র করে কৌশল নিয়ে আলোচনা করতেন। তখন তার গোষ্ঠীর সদস্যরাও বৈরুত ও তেহরানে সক্রিয় ছিল। কিন্তু পরে পরিস্থিতি বদলে যায়।

২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েল ও ইরানের মিত্র ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাসের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে হিজবুল্লাহও এতে জড়িয়ে পড়ে। এরপর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরায়েল হিজবুল্লাহর জনপ্রিয় নেতা হাসান নাসারুল্লাহকে হত্যা করে।

এ.জে. বলেন, নাসরাল্লাহ ও হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতৃত্ব নিহত হওয়ার পর বৈরুত আর নিরাপদ জায়গা থাকেনি। ফলে তার গোষ্ঠী তাদের সদস্যদের কার্যক্রম ইরাক ও তেহরানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে ফেলে। তিনি বলেন, “আগে আমরা ড্রোন ব্যবস্থার প্রশিক্ষণ নিতে লেবাননে যেতাম। এখন তা হচ্ছে তেহরানে।”

রয়টার্স যাদের সঙ্গে কথা বলেছে, তাদের প্রায় সবাই মনে করেন নাসরাল্লাহর হত্যাকাণ্ড পুরো প্রতিরোধ জোটের ওপর বড় ধাক্কা দিয়েছে এবং ইরাকি গোষ্ঠীগুলোর বৈরুত যাতায়াতও কঠিন হয়ে পড়েছে।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হিজবুল্লাহ লেবানন থেকে ইসরায়েলের দিকে সীমিত আকারে রকেট ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তবে এ বিষয়ে হিজবুল্লাহ ও লেবানন সরকার কোনো মন্তব্য করেনি।

হুতিরা কেন নীরব?

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে হুতিরা কেন এখনও ‘ট্রিগারে আঙুল’ রেখেও গুলি ছুড়ছে না, তা নিয়ে শুরু হয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিদের এই নীরবতা মূলত তাদের কৌশলগত ধৈর্য এবং গত বছরের তিক্ত অভিজ্ঞতার ফসল।

বিশ্লেষকরা বলছেন, গত আগস্টে সানায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় হুথি প্রধানমন্ত্রী আহমেদ আল-রাহাওয়ি ও চিফ অব স্টাফ মোহাম্মদ আল-ঘুমারিসহ ১২ জন উচ্চপদস্থ নেতা নিহত হন। এই বিশাল ক্ষতি হুতি নেতৃত্বকে অনেক বেশি সতর্ক করে তুলেছে।

ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর একের পর এক হামলা হুথিদের মনোবলে বড় ধাক্কা দিয়েছে। বিশ্লেষক আল-হুরাইবি বলেন, ইরান হুথিদের জন্য একটি ধর্মীয় আদর্শ। সেই আদর্শ যদি পরাজিত হয়, তবে তাদের মনোবল অটুট থাকা কঠিন। এছাড়া ইরান থেকে আসা অস্ত্রের চোরাচালান বন্ধ হয়ে গেলে হুথিরা সামরিকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়বে।

ইউএন সিকিউরিটি কাউন্সিলের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মতে, রাশিয়া, চীন ও ইরানে তৈরি অস্ত্র বিভিন্ন পথে ইয়েমেনে পাচার করা হয়। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এই সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়তে পারে।

ইরান ও আমেরিকার মধ্যে দ্বন্দ্ব বহুদিনের। ছবি: এআই দিয়ে বানানো
ইরান ও আমেরিকার মধ্যে দ্বন্দ্ব বহুদিনের। ছবি: এআই দিয়ে বানানো

ইয়েমেনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাদাম আল-হুরাইবি মনে করেন, হুথিরা যুদ্ধে নামবে কি না তা নির্ভর করছে ইরানের সবুজ সংকেতের ওপর। তিনি বলেন, তেহরান তার সব কার্ড একসাথে ব্যবহার করতে চায় না। তারা হুথিদের যুদ্ধের পরবর্তী পর্যায়ের জন্য জমিয়ে রাখছে। ইসরায়েলি-মার্কিন হামলা না থামলে হুথিরা অনির্দিষ্টকাল হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না।

সিরিয়ায় ভরাডুবি

এ.জে.-র গোষ্ঠীসহ ইরানের অন্যান্য প্রক্সি বাহিনী ২০১১ সালে সিরিয়ায় মোতায়েন হয়েছিল প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের সরকারকে পতনের হাত থেকে রক্ষা করতে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে দামেস্কে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর এক বৈঠকে এ.জে. ও অন্যান্য ইরাকি কমান্ডার সিরিয়ার সামরিক কর্মকর্তাদের সতর্ক করেছিলেন যে, তাদের বাহিনীতে ইসরায়েলি গুপ্তচর ঢুকে পড়েছে। এ.জে. বলেন, “সিরিয়ায় সর্বত্র শত্রুর গুপ্তচর ছিল, যারা আমাদের অবস্থান জানিয়ে দেওয়ার অপেক্ষায় ছিল।”

এর কিছুদিন পর নাসরাল্লাহ নিহত হওয়ার ঠিক আগে ইসরায়েল সিরিয়ায় ইরানি কমান্ডারদের টার্গেট করে হত্যাকাণ্ড শুরু করে।

নিউইয়র্কভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান হরিজন এনগেজের বিশেষজ্ঞ মাইকেল নাইটস বলেন, এসব হামলার লক্ষ্য নির্ধারণে ইসরায়েলের স্থানীয় সহযোগীরা তথ্য দিচ্ছিল।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়া তেহরান ও তার প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসে। এই আকস্মিক পতনের ফলে ইরানপন্থী বাকি গোষ্ঠীগুলো ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং ইরাকি আধা সামরিক রা সীমান্ত পেরিয়ে ইরাকে ফিরে যায়।

এ.জে. জানান, দামেস্ক ছিল ইরানের প্রক্সি গোষ্ঠীর সমন্বয়ের মূল কেন্দ্র। এটা তাদের জন্য বড় একটি মোড় ঘোরানো ঘটনা ছিল।

অর্থই এখন সবচেয়ে বড় শক্তি

ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগের দিন ইরাকের সাবেক এক গোয়েন্দা প্রধান রয়টার্সকে বলেন, “এই নেতাদের ইরান তৈরি করেছে এবং শেষ পর্যন্ত তারা ইরানের প্রতিই অনুগত থাকতে পারে। কিন্তু তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি জিনিস হলো—অস্ত্র ও অর্থ।”

কয়েক মাস আগে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত কমান্ডার কায়েস আল খাজালি এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বিস্ময়কর মন্তব্য করেন। যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরাকের তেল খাতে পুনরায় বিনিয়োগের উদ্যোগ নেয়, তখন তিনি বলেন, মার্কিন কোম্পানিগুলো ইরাকে বিনিয়োগ করতে চাইলে স্বাগত জানানো হবে।

অথচ তার আগের বছর তিনি হুমকি দিয়েছিলেন- যুক্তরাষ্ট্র যদি লেবাননের হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলকে সমর্থন দেয়, তাহলে মার্কিন স্বার্থের ওপর হামলা চালানো হবে। এই হঠাৎ অবস্থান পরিবর্তন অনেক ইরানপন্থী কমান্ডার ভালোভাবে গ্রহণ করেননি।

ইরান-সমর্থিত কাতাব হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুক্ত সাবেক কমান্ডার আবু তুরাব আল তামিমি বলেন, “ইরাকে এখনকার পরিস্থিতি দেখিয়েছে, কে সত্যিকারের প্রতিরোধ শক্তি।” তিনি বলেন, এখন সত্যিকারের প্রতিরোধে আছে কেবল কাতাইব হিজবুল্লাহ, নুজাবা এবং হয়তো আরও কয়েকটি গোষ্ঠী। খাজালির গোষ্ঠীকে তিনি এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেননি।

ইরানপন্থী অনেক কমান্ডার এখন ইরাকের রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছেন। তারা সংসদ সদস্য হয়েছেন, রাজনৈতিক দল পরিচালনা করছেন এবং তাদের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে রাষ্ট্রীয় আধাসামরিক জোট পপুলার মোবিলাইজেশন ফের্সের অধীনে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

এই বাহিনী ইরাক সরকারের কাছ থেকে বছরে তিন বিলিয়ন ডলারের বেশি বাজেট পায়। একই সঙ্গে এসব নেতার বড় ব্যবসায়িক স্বার্থও তৈরি হয়েছে। এর ফলে তারা ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী কঠোর বক্তব্য কমিয়ে দিয়েছেন এবং সামরিক পদক্ষেপ থেকেও দূরে থাকছেন।

রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা সূত্রগুলো বলেছে, ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই কমান্ডারদের অধিকাংশই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নতুন কোনো হুমকি দেননি এবং তাদের গোষ্ঠীগুলোও নতুন হামলার দাবি করেনি। এমনকি ইরাকের নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন নিয়েও তারা নীরবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একই অবস্থান নিয়েছেন।

শিয়াদের বিরুদ্ধে হুমকি হলে পরিস্থিতি বদলাতে পারে

ইরাকের রাজনীতিবিদ ও আলেমদের মতে, ইরানের প্রতি আনুগত্যের কারণে নয় বরং যদি মনে হয় শিয়ারা হুমকির মুখে-তাহলেই ইরাকের আরও শিয়া গোষ্ঠী যুদ্ধে নামতে পারে। এটি ঘটতে পারে যদি ইরাকে শিয়াদের পবিত্র স্থানে হামলা হয় অথবা শিয়াদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা শুরু হয়।

বাগদাদে ইরানপন্থী বিক্ষোভে অংশ নেওয়া আলেম করিম আর সাইদি বলেন, “ইরাকের শিয়ারা ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে একটি আদর্শ ভাগ করে, তা হলো আমাদের ধর্মকে রক্ষা করা।” তিনি বলেন, “আমরা শান্তি চাই। কিন্তু যদি সংঘর্ষ শুরু হয়, আমরা প্রস্তুত।”

ইরাকের অনেক শিয়া আধাসামরিক যোদ্ধা শেষ বড় যুদ্ধ দেখেছিল যখন তারা ইরাক ও সিরিয়ায় আইএসের বিরুদ্ধে লড়েছিল। তারা মনে করে, সিরিয়ায় আবার সেই গোষ্ঠীর উত্থানের আশঙ্কা রয়েছে। ইরানের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর অনেক সদস্য বিশ্বাস করে, যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল শারাকে সমর্থন দিয়ে আবারও সুন্নি জিহাদি গোষ্ঠীগুলোকে শক্তিশালী করছে।

খাজালির সশস্ত্র গোষ্ঠীর এক সদস্য সাইফ (ছদ্মনাম) বলেন, “আমাদের নেতারা হয়তো রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু আমরা শুধু একটাই জিনিস জানি-জিহাদ।”

সম্পর্কিত