ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানে ধুঁকতে থাকা অর্থনীতি এবং আকাশচুম্বী জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখন সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।
গত রোববার থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ বর্তমানে দেশটির গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকাগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে। বিক্ষোভকারী এবং নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত অন্তত সাতজন নিহতের খবর পাওয়া গেছে।
এবারের বিক্ষোভ শুরু হয় রাজধানী তেহরানে। গত রোববার উচ্চমূল্য এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতার প্রতিবাদে দোকানদাররা ধর্মঘট শুরু করলে তা দ্রুত দাবানলের মতো সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। যদিও রাজধানী তেহরানে বিক্ষোভের গতি কিছুটা ধীর, কিন্তু অন্যান্য প্রদেশে তা ক্রমশ সহিংস হয়ে উঠছে। তেহরানের মালার্ড জেলা থেকে জনশৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে অন্তত ৩০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা।
বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা বাহিনীর সমন্বিত অভিযানে এই ‘দাঙ্গাকারীদের’ চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর ইরানে এটিই সবচেয়ে বড় গণবিক্ষোভ। যদিও আমিনি পরবর্তী আন্দোলনের মতো এটি এখনো দেশব্যাপী তীব্র হয়ে ওঠেনি, তবে নিহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি যেকোনো সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) তথ্যমতে, বুধ ও বৃহস্পতিবার মোট সাতজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের অধিকাংশই লুর জাতিগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকার বাসিন্দা। সবচেয়ে তীব্র সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে তেহরান থেকে ৩০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত লোরেস্তান প্রদেশের আজনা শহরে। সেখানে বিক্ষোভকারীদের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিবর্ষণের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। আধা-সরকারি ফারস নিউজ এজেন্সি সেখানে তিনজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে।
ইরানের ছড়িয়ে পড়ছে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ। ছবি: রয়টার্সএছাড়া লোর্ডেগান শহরে গভর্নর অফিস, মসজিদ এবং ব্যাংকে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ সেখানে টিয়ার গ্যাস ও গুলিবর্ষণ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে। লোরেস্তান প্রদেশের উপ-গভর্নর সাইদ পৌরালি জানিয়েছেন, কুহদাশত শহরে বিক্ষোভকারীদের হামলায় আধাসামরিক বাহিনী বাসিজের এক সদস্য নিহত হয়েছেন।
প্রাথমিকভাবে অর্থনৈতিক দাবিতে আন্দোলন শুরু হলেও ভিডিও ফুটেজে বিক্ষোভকারীদের রাজনৈতিক স্লোগান দিতে দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, বিক্ষোভকারীরা ‘মোল্লাদের বিদায় নিতে হবে’, ‘স্বৈরশাসকের মৃত্যু চাই’ এবং ‘যতক্ষণ মোল্লাদের দাফন না হবে, এ দেশ মুক্ত হবে না’-এমন উগ্র স্লোগান দিচ্ছে।
ইরানি-আমেরিকান সাংবাদিক মাসিহ আলিনেজাদ বেশ কিছু ভিডিও পোস্ট করেছেন যেখানে দেখা যাচ্ছে, বাবোল শহরে তরুণরা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতাকা পুড়িয়ে দিচ্ছে। এই বিক্ষোভ সরাসরি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
ইরানের এই অস্থিরতার মূলে রয়েছে ভয়াবহ অর্থনৈতিক ধস। বর্তমানে ইরানের রিয়াল মুদ্রার মান রেকর্ড পরিমাণ কমে গেছে। বর্তমানে ১ মার্কিন ডলারের বিনিময় মূল্য প্রায় ১৪ লাখ রিয়াল। দেশটির সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ডিসেম্বরে মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল ৫২ শতাংশ।
প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বিক্ষোভকারীদের শান্ত করার চেষ্টা করে বলেছেন, তাদের দাবি ‘যৌক্তিক’। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তিনি বলেন, “ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে জনগণের জীবনযাত্রার সমস্যার সমাধান করতে না পারলে আমাদের নরকে যেতে হবে।” তবে তিনি স্বীকার করেছেন যে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সাম্প্রতিক যুদ্ধের প্রভাবে তার সরকারের হাতে করার মতো খুব বেশি কিছু নেই।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্সইরানের এই অস্থিরতা এমন এক সময়ে এসেছে যখন দেশটি গত জুনে ইসরায়েলের সাথে ১২ দিনের যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। ওই সময়ে আমেরিকা ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতেও বোমা হামলা চালিয়েছিল। ইরান বর্তমানে তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখার ঘোষণা দিলেও, ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর হুঁশিয়ারির কারণে পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে আলোচনার পথ এখনো রুদ্ধ।
নিরাপত্তা বাহিনী বর্তমানে কঠোর অবস্থানে যাওয়ার হুমকি দিলেও তেহরান প্রশাসন বুধবার থেকে ‘শীতের’ অজুহাতে সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাজধানী থেকে মানুষকে সরিয়ে দিয়ে বিক্ষোভের ভিড় কমানোর জন্য এটি একটি কৌশল।
বর্তমানে ইরান এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। একদিকে আন্তর্জাতিক চাপ ও যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ জনগণের ক্ষোভ এই দ্বিমুখী সংকট আয়াতুল্লাহ খামেনির নেতৃত্বাধীন দীর্ঘস্থায়ী ধর্মতান্ত্রিক শাসনের অস্তিত্বকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।