Advertisement Banner

পাকিস্তান বাইরে ফিটফাট, ভেতরে কি সদরঘাট?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
পাকিস্তান বাইরে ফিটফাট, ভেতরে কি সদরঘাট?
অর্থনীতিতে সংকটে পাকিস্তান। ফাইল ছবি: রয়টার্স

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পাকিস্তানের দাবার চাল বরাবরই প্রশংসিত। দেশটির কূটনীতিকরা দাবি করছেন, চলমান উপসাগরীয় যুদ্ধের সংকটময় মুহূর্তে পাকিস্তান অত্যন্ত সফলভাবে নিজের অবস্থান বজায় রেখেছে। একদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, অন্যদিকে ইরানের প্রভাবশালী ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর’-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা–সব মিলিয়ে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান এখন বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে।

তবে ‘মুদ্রার উল্টো পিঠ’ বলছে ভিন্ন কথা। কূটনীতিকদের এই সাফল্যে অর্থনীতিবিদরা ঠিক স্বস্তি পাচ্ছেন না। সংবাদমাধ্যম ইকনোমিস্ট বলছে, যুদ্ধের প্রভাবে যখন জ্বালানি ও খাদ্যের দাম আকাশছোঁয়া, তখন বৈশ্বিক মর্যাদার ‘বড়াই’ সাধারণ মানুষের পেটে অন্ন জোগাতে পারছে না।

ইতিহাস বলছে, পাকিস্তান বরাবরই তার কৌশলগত অবস্থানকে পুঁজি করে আর্থিক সুবিধা আদায় করে নিয়েছে। স্নায়ুযুদ্ধ বা ২০০-এর দশকের ‘সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধ’ চলাকালে মার্কিন সামরিক সহায়তা। কিংবা সাম্প্রতিক সময়ে চীনের অবকাঠামো ঋণ ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সস্তা ঋণ–পাকিস্তান কোনো না কোনোভাবে বৈশ্বিক সহায়তায় টিকে থেকেছে। বর্তমান সংকটেও হয়তো তাদের এই ‘কূটনৈতিক দক্ষতা’ কোনোভাবে পার করে দেবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বকে নগদে রূপান্তরের এই প্রবণতা দেশটিকে এক ‘দুষ্টচক্রে’ আটকে ফেলেছে। ফলে প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সংস্কার এবং প্রবৃদ্ধি থমকে গেছে। আর বারবার বাড়ছে ‘বেইল-আউটের’ ওপর নির্ভরশীলতা।

বর্তমানে পাকিস্তানের বৈদেশিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা চরম পর্যায়ে। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি ও সার আমদানিতে দেশটি তাদের জিডিপির প্রায় ৪ শতাংশ ব্যয় করে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরকার বাধ্য হয়ে জ্বালানি রেশনিং শুরু করেছে। এর প্রভাব পড়েছে জনজীবনেও। সরকারি চাকরিজীবীদের কর্মঘণ্টা কমানো হয়েছে। জনবহুল পাঞ্জাব প্রদেশে চলছে লোডশেডিং। এমনকি দর্শকশূন্য স্টেডিয়ামে আয়োজন করা হচ্ছে ক্রিকেট ম্যাচ। পেট্রোল ও ডিজেলের দাম লাফিয়ে বেড়েছে যথাক্রমে ৪৩ ও ৫৫ শতাংশ। অথচ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যে তলানিতে, তাতে এই ব্যয়বৃদ্ধি দিয়ে সংকট সামাল দেওয়া অসম্ভব মনে হচ্ছে। যুদ্ধের আগে পাকিস্তানের হাতে যে রিজার্ভ ছিল, তা দিয়ে মাত্র তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব ছিল।

বিদেশের মাটিতে কর্মরত পাকিস্তানিদের প্রায় অর্ধেকই থাকেন সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মতো উপসাগরীয় দেশগুলোতে। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণ বছরে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার, যা পাকিস্তানের জিডিপির ১০ শতাংশ। ‘পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিকস’-এর মতে, যুদ্ধের প্রভাবে রেমিট্যান্স প্রবাহে ৩ থেকে ৪ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কর্মসংস্থান বন্ধ হয়ে যাবে এবং দেশে বেকারত্ব চরম আকার ধারণ করবে।

পাকিস্তানে হয়েছে আমেরিকা ও ইরানের শান্তি আলোচনা। ছবি: রয়টার্স
পাকিস্তানে হয়েছে আমেরিকা ও ইরানের শান্তি আলোচনা। ছবি: রয়টার্স

সাবেক ডেপুটি গভর্নর মুর্তজা সৈয়দ ইকনোমিস্টকে বলেন, পাকিস্তান এর আগে কখনো এত কম বিকল্প নিয়ে এমন সংকটে পড়েনি। ১৯৫০ সালে আইএমএফের সদস্য হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত দেশটিকে ২৫ বার বেইল-আউট বা আর্থিক উদ্ধার প্যাকেজ নিতে হয়েছে। ২০২৪ সালের সর্বশেষ প্যাকেজটি নেওয়া হয়েছিল ইউক্রেন যুদ্ধ ও ভয়াবহ বন্যার পরবর্তী ধাক্কা সামলাতে। বর্তমানে পাকিস্তান তাদের মোট কর রাজস্বের অর্ধেকের বেশি ব্যয় করে ঋণের সুদ মেটাতে।

দেশটির মোট ১৩৮ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক ঋণের সিংহভাগই আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও চীনের কাছ থেকে নেওয়া। এ ছাড়া সৌদি আরব ও কাতারও বিভিন্ন সময় তেল কেনায় ছাড় বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নগদ আমদানির মাধ্যমে সহায়তা করেছে। বিশেষজ্ঞরা একে ‘কৌশলগত খাজনা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। সাবেক অর্থমন্ত্রী মিফতাহ ইসমাইলের মতে, আমেরিকার সঙ্গে সুসম্পর্কের কারণে আইএমএফ পাকিস্তানের প্রতি কিছুটা নমনীয় থাকে, যা আসলে হিতে বিপরীত হয়। কারণ, এই সুযোগে পাকিস্তান প্রয়োজনীয় কঠোর অর্থনৈতিক সংস্কারগুলো বারবার পিছিয়ে দেয়।

পাকিস্তানের বিশাল গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশগুলোকে তাদের প্রতি আগ্রহী করে রাখে। এছাড়া সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা চুক্তি থাকায় তারা দেশটির ঋণের বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। তবে এই কৌশল এখন ফুরিয়ে আসছে বলে মনে হচ্ছে। পাকিস্তান ঋণ শোধে গড়িমসি করায় চীন এখন অর্থ লগ্নি করতে ভয় পাচ্ছে। এমনকি সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাত ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ নবায়নে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, যা পাকিস্তানের জন্য বড় ধাক্কা। যদিও সৌদি আরব তাৎক্ষণিকভাবে ৩ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা দিয়ে সেই গর্ত ভরাটের চেষ্টা করেছে।

অর্থনীতিবিদ হানোশ কর্নাইয়ের ‘সফট বাজেট কনস্ট্রেইন্ট’ তত্ত্বের মতো পাকিস্তানের রাষ্ট্র কাঠামো এমন এক ধারণায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে, তাদের পতন হবে না। তারা জানে, সংস্কার না করলেও কৌশলগত গুরুত্বের কারণে কোনো না কোনো মিত্র দেশ ঠিকই অর্থ জোগাবে।

এই ‘সহজ অর্থের’ নেশায় দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ জনগণ। ১৯৯৫ সালেও পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় ভারতের চেয়ে ৪৫ শতাংশ বেশি এবং বাংলাদেশের প্রায় দ্বিগুণ ছিল। বর্তমানে চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টো। এখন পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় ভারতের চেয়ে ৪৫ শতাংশ এবং বাংলাদেশের চেয়ে ৩৫ শতাংশ কম। উদারপন্থী অর্থনীতিবিদরা আশা করেছিলেন, বর্তমান সংকট হয়তো পাকিস্তানকে কাঠামোগত সংস্কারের পথে হাঁটতে বাধ্য করবে। কিন্তু ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের কারণে আবারও সস্তা ‘লাইফলাইন’ পেয়ে যাওয়ায় সেই সংস্কারের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসছে।

সম্পর্কিত