স্ক্রিনটাইম বা মোবাইল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার অভ্যাস মনের ওপর কী প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে অনেকেই কম-বেশি চিন্তিত। কিন্তু এটি শরীরের কী ক্ষতি করছে?
সম্প্রতি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি কয়েকজন বিশেষজ্ঞের বরাত দিয়ে এক নিবন্ধে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছে।
সর্বশেষ বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, হাতে থাকা ফোন ও এই ধরনের ডিজিটাল ডিভাইসগুলো ধীরে ধীরে ঘাড়ের স্বাভাবিক আকৃতি বদলে দিচ্ছে। এটি আপনার দৃষ্টিশক্তির ক্ষতি করছে, পেশি সঞ্চালনের ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে এবং পেশির শক্তি হ্রাস করছে।
এমনকি প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপনের কারণে ত্বকে দ্রুত বলিরেখা বা বয়সের ছাপ পড়ছে বলেও অনেকে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। আরও আশঙ্কার কথা হলো, এই শারীরিক সমস্যাগুলো পরবর্তীতে মানসিক কর্মক্ষমতা হ্রাস বা আরও বড় কোনো জটিলতার দিকে নিয়ে যেতে পারে।
আপনি যদি দীর্ঘক্ষণ বসে থাকেন, তাহলে এই সমস্যায় আপনিও পড়তে পারেন। তবে আশার কথা হলো, প্রযুক্তি যাতে আপনার শরীরের এই ক্ষতি করতে না পারে, সেজন্য এখনই কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব।
মেরুদণ্ডের ক্ষতি ও ‘টেক নেক’
আপনি যদি এখন ফোনে এই লেখাটি পড়েন, তবে খেয়াল করে দেখুন, আপনি হয়তো মাথা নিচের দিকে ঝুঁকিয়ে রেখেছেন।
এভাবে মাথা নিচু করে রাখলে আপনার ঘাড়ে প্রায় ২৭ কেজি পর্যন্ত বাড়তি চাপ পড়ে। দিন দিন এমন হতে থাকলে মেরুদণ্ডের হাড়ের ক্ষতি হতে পারে, ঘাড় ও পিঠের পেশি দুর্বল হয়ে যেতে পারে এবং ফুসফুসের বাতাস নেওয়ার ক্ষমতাও কমে যেতে পারে। এই সমস্যার একটি নামও আছে, ‘টেক নেক’। এটি আপনার শরীরের স্বাভাবিক গঠন চিরতরে নষ্ট করে দিতে পারে।
ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে কিছু ব্যায়ামের মাধ্যমে এই সমস্যা ঠিক করা যায়। তবে এর চেয়েও সহজ একটি উপায় আপনি এখনই শুরু করতে পারেন, আপনার ফোনটি একটু উঁচুতে তুলে ধরুন।
ফোনের স্ক্রিন সবসময় চোখের সোজাসুজি রাখুন, আর মুখ থেকে অন্তত এক হাত দূরে রাখুন। কম্পিউটারের মনিটরের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম মেনে চলুন। এছাড়া বিশেষজ্ঞরা কিছুক্ষণ পর পর ফোন থেকে চোখ সরানোর পরামর্শ দেন। প্রতি আধা ঘণ্টা ফোন ব্যবহারের পর অন্তত ২০ মিনিটের জন্য বিরতি নিন।
ত্বকের সমস্যা ও ঘাড়ের বলিরেখা?
ইদানীং একটি নতুন দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে, সারাক্ষণ ঘাড় বাঁকিয়ে রাখার কারণে কি ঘাড়ে দাগ হচ্ছে বা চামড়া কুঁচকে যাচ্ছে?
যুক্তরাজ্যের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ জাস্টিন হেক্সটল বলেন, সাধারণ নিয়মে বিষয়টি সত্যি হতেই পারে। কারণ চামড়ার ওপর বারবার চাপ পড়লে বলিরেখা তৈরি হয়, তাই সবসময় মাথা নিচু করে ঘাড় ভাঁজ করে রাখলে এমনটা হতেই পারে। তবে তিনি এও জানান যে, এই কথার পক্ষে এখনো ভালো কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই ইন্টারনেট বা অনলাইনে ‘টেক নেক’ দূর করার নাম করে যেসব ক্রিম বিক্রি হচ্ছে, তা না কেনার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
তবে ত্বকের অন্যান্য কিছু সমস্যা নিয়ে অবশ্যই ভাবনার কারণ আছে, বিশেষ করে যারা হাত থেকে কখনোই স্মার্টওয়াচ খোলেন না। ঘড়ির নিচের ঘামে ভেজা জায়গা ফাঙ্গাস বা ছত্রাক জন্মানোর জন্য একদম উপযুক্ত। এর ফলে ত্বকে চুলকানি বা একজিমা হতে পারে। আর এর কারণে ঘড়ি তৈরিতে ব্যবহৃত নিকেল, রাবার কিংবা বিভিন্ন কেমিক্যালে আপনার ত্বকে অ্যালার্জিও হয়ে যেতে পারে। এই সমস্যার সমাধান কিন্তু খুবই সহজ, মাঝে মাঝেই হাত থেকে ঘড়িটি খুলে রাখুন এবং চামড়া ভালো করে ধুয়ে নিন। আর যদি সারাদিন ঘড়ি পরে থাকতেই হয়, তবে ত্বকের সুরক্ষায় কোনো ভালো ময়েশ্চারাইজার বা ব্যারিয়ার ক্রিম ব্যবহার করতে পারেন।
চোখের ক্ষতি ও ক্ষীণদৃষ্টি?
গত কয়েক দশক ধরে মানুষের চোখের মায়োপিয়া বা কাছের জিনিস দেখতে পাওয়ার সমস্যা (দূরের জিনিস ঝাপসা দেখা) খুব দ্রুত বাড়ছে। আমাদের জীবনে ইদানীং কী কী বদল এসেছে তা ভাবলে, খুব সহজেই এর জন্য মোবাইল-কম্পিউটারকে দোষ দেওয়া যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির চোখের অধ্যাপক ডোনাল্ড মুত্তি জানান, কথাটি সত্যি হলেও ঠিক যেভাবে আমরা ভাবছি, সেভাবে নয়। তিনি বলেন, “শিশুদের চোখের বিকাশ এবং মায়োপিয়া হওয়ার কারণ নিয়ে আমরা ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে একটা বড় গবেষণা করেছি। সেখানে আমরা জানার চেষ্টা করেছিলাম, মুখের খুব কাছে ফোন রেখে কাজ করার সাথে চোখের এই সমস্যার কোনো সরাসরি যোগাযোগ আছে কি না। এর উত্তর- আসলে তেমন কোনো যোগাযোগ নেই।”
তবে এই গবেষণায় অন্য একটি দারুণ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। সেটি হলো, বাইরে খোলা জায়গায় সময় কাটালে চোখ ভালো থাকে। মুত্তি বলেন, “আসলে বাইরের উজ্জ্বল আলো আমাদের চোখের রেটিনা থেকে ডোপামিন নামের একটি হরমোন তৈরিতে সাহায্য করে।” আর এটিই চোখের সঠিক গঠনে সাহায্য করে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রযুক্তির কারণে এখন মানুষ ঘরের বাইরে যাওয়া কমিয়ে সারাক্ষণ ভেতরেই বেশি সময় কাটায়। এই দিক থেকে চিন্তা করলে মুত্তি বিশ্বাস করেন, ডিজিটাল ডিভাইসগুলো সরাসরি না হলেও পরোক্ষভাবে আমাদের চোখের ক্ষতি করছে।
মুত্তির মতে, এই সমস্যার সমাধান খুবই সহজ। আপনাকে কেবল ঘরের বাইরে খোলা জায়গায় বেশি সময় কাটাতে হবে। এটি যে শুধু আপনার চোখের জন্যই ভালো তা নয়, এটি আপনার ঘুম আরও ভালো করতেও সাহায্য করবে। তবে হ্যাঁ, রোদের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচতে বাইরে বের হওয়ার সময় সানস্ক্রিন এবং সানগ্লাস ব্যবহার করতে ভুলবেন না।
দুর্বল হাত ও হাতের মুঠোর জোর কমে যাওয়া
আজকাল আপনার শরীর ভেতর থেকে কতটা সুস্থ, তা বোঝার একটি বড় উপায় হলো হাতের মুঠোর শক্তি বা গ্রিপ স্ট্রেন্থ।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ব্লাড প্রেসার বা রক্তচাপের চেয়েও হাতের মুঠোর জোর দেখে মানুষের আগেভাগে মারা যাওয়ার ঝুঁকি বেশি ভালোভাবে বোঝা যায়। আর অনেক দেশেই এখন মানুষের, বিশেষ করে তরুণদের হাতের জোর দিন দিন কমে যাচ্ছে। জার্মানির লাউসিটজ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জোহানেস বেলার বলেন, “নতুন প্রজন্মের হাতের শক্তি কমে যাওয়া মানে শুধু হাত দুর্বল হওয়া নয়, এটি তরুণদের ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য খারাপ হওয়ার একটি আগাম লক্ষণ।”
কম্পিউটারের সামনে বসে সারাক্ষণ কাজ করা এবং অলস জীবন কাটানোর কারণে মানুষের শরীরের ফিটনেস কমে যাচ্ছে, আর এর প্রভাব যে হাতের শক্তির ওপরও পড়ছে, তা সহজেই বোঝা যায়।
আপনার হাতের জোর ঠিক আছে কি না তা পরীক্ষার একটি সহজ উপায় আছে। একটি টেনিস বল হাত দিয়ে যত জোরে পারেন চেপে ধরুন এবং সেটি ১৫ থেকে ৩০ সেকেন্ড ধরে রাখার চেষ্টা করুন। যদি আপনি এটি করতে না পারেন, তবে হাতের কবজি ও আঙুল শক্ত করার জন্য কিছু সহজ ব্যায়াম করতে পারেন। তবে এটি কেবল হাতের শক্তির বিষয় নয়, এটি আপনার পুরো শরীরের ফিটনেস বাড়ানোর সাথে জড়িত। সহজ কথায় বলতে গেলে, শরীরকে ফিট রাখতে নিয়মিত একটু শারীরিক পরিশ্রম বা কসরত করুন।
হাতের ও চোখের সমন্বয়
আমাদের মস্তিষ্ক এবং শরীরকে একসাথে কাজে লাগিয়ে নিখুঁত কোনো কাজ করার যে ক্ষমতা, তাকে বলা হয় মোটর স্কিল বা পেশি সঞ্চালনের দক্ষতা। প্রযুক্তি এই ক্ষমতার ওপর বড় প্রভাব ফেলছে।
জার্মানির রেগেনসবার্গ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সেবাস্টিয়ান সুগেট জানান, ফোনের স্ক্রিনে ক্লিক করা বা সোয়াইপ করার মতো কাজে প্রযুক্তি হয়তো আপনাকে আরও দক্ষ করে তুলছে। কিন্তু সামগ্রিক পেশির ক্ষমতা, বিশেষ করে হাতের আঙুলের সূক্ষ্ম ও নিখুঁত কাজের দক্ষতার ক্ষেত্রে প্রযুক্তির একটা নেতিবাচক বা খারাপ প্রভাব দেখা যাচ্ছে।
বড়দের চেয়ে শিশুদের ওপর এর প্রভাব কেমন পড়ে, তা আমরা জানি। সুগেটের নিজস্ব গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুরা যত বেশি স্ক্রিনের সামনে সময় কাটায়, তাদের পেশির ক্ষমতা ততটাই কমতে থাকে। এটি বেশ চিন্তার বিষয়, কারণ শিশুদের পেশির ক্ষমতার সাথে তাদের মানসিক বিকাশের একটা সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
তবে তার পরামর্শ হলো, এটা নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার বা স্ক্রিন একদম বন্ধ করে দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। এর বদলে দৈনন্দিন জীবনে ইচ্ছে করে এমন কিছু কাজ রাখুন যা হাত দিয়ে করতে হয়। যেমন- নিজের হাতে খাবার তৈরি করা কিংবা কোনো ধরনের হাতের কাজ করা। সুগেট নিজে যেমন কাঠের কাজ করেন, তেমনি আপনিও কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজানো শিখতে পারেন বা টাইপ না করে স্রেফ হাত দিয়ে লিখতে পারেন।
সুগেট বলেন, “এটি কোনো কেয়ামত বা পৃথিবী শেষ হওয়ার লক্ষণ নয়, এর প্রভাবগুলো খুবই সূক্ষ্ম। তবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে এই প্রভাব ছোট মনে হলেও, পুরো একটি প্রজন্মের দিক থেকে চিন্তা করলে এটি সমাজকে বুদ্ধিহীন করে তুলতে পারে। মানুষ বাস্তব পৃথিবীতে চিন্তা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারে, কারণ এই হাতই হলো বাইরের দুনিয়ার সাথে যোগাযোগ করার আমাদের প্রধান মাধ্যম।”