ট্রাম্পের ডনরো ডকট্রিন দুনিয়ার জন্য অশনি সংকেত হতে পারে। ছবি: এআই
আমেরিকার ৫ম প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো ১৮৮৩ সালে একটি পররাষ্ট্রনীতি ঘোষণা করেন। সেই নীতি অনুসারে, লাতিন আমেরিকার যেকোনো বিষয়ে ইউরোপের হস্তক্ষেপ বা উপনিবেশ স্থাপনের চেষ্টা বা প্রক্রিয়া আমেরিকার কাছে ‘অবৈধ’ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং এ ধরণের হস্তক্ষেপে আমেরিকা সক্রিয়ভাবে বাধা দেবে। এই পররাষ্ট্রনীতিই ‘মনরো ডকট্রিন’ নামে পরিচিত।
সম্প্রতি ভেনেজুয়েলায় আমেরিকার সামরিক অভিযানের পর আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে এই নীতি, তবে ভিন্ন নামে। অনেকটা ‘পুরোনো বোতলে নতুন মদ’ হয়ে।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করার পর, এক সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘ডনরো ডকট্রিন’–এর কথা বলেন। এটি মূলত মার্কিন পরাশক্তি সম্পর্কে তার এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে আমেরিকা পশ্চিম গোলার্ধ দখল করতে তার সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতে পারে। ট্রাম্পের এই পররাষ্ট্রনীতি ‘মনরো ডকট্রিন’-এর নতুন সংস্কার বললে ভুল হবে না।
ভেনেজুয়েলায় হামলার পর শনিবার মার-এ-লাগোতে ট্রাম্প বলেন, “সেই শুরু থেকেই এটি মনরো ডকট্রিনের সঙ্গে যুক্ত। মনরো ডকট্রিন একটি বড় বিষয় ছিল, কিন্তু আমরা এখন তাকে অনেকখানি ছাড়িয়ে গেছি। সবাই এখন একে ‘ডনরো ডকট্রিন’ বলে ডাকছে।”
কারও বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে, ‘ডনরো’ শব্দটি ডোনাল্ড আর মনরোর মিশ্রণ। এই নয়া পররাষ্ট্রনীতি বুঝতে হলে আগে মনরো ডকট্রিন সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকতে হবে।
ঐতিহাসিক ‘মনরো ডকট্রিন’ ছিল আমেরিকা মহাদেশে ইউরোপীয় দেশগুলোর উপনিবেশ স্থাপনের বিরুদ্ধে এক ধরণের সতর্কবার্তা। পরবর্তীতে বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট এতে বেশ কিছু বিষয় যুক্ত করেন। ব্রিটানিকার তথ্য অনুযায়ী, ‘রুজভেল্ট করোলারি’ অনুসারে লাতিন আমেরিকার কোনো দেশ যদি ‘ভুল পথে’ চালিত হয়, তবে সেই দেশকে শাসন করার অধিকার আমেরিকার থাকবে। এভাবে আমেরিকা লাতিন আমেরিকার ২০টি দেশের দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেয়। এই নীতির ‘দোহাই’ দিয়ে ১৮৯৮ থেকে ১৯৯৪ সালের মধ্যে মার্কিন প্রশাসন অন্তত ৪১ বার লাতিন আমেরিকায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অযাচিত হস্তক্ষেপ বা আগ্রাসন চালিয়েছিল।
ভেনেজুয়েলার সঙ্গে আমেরিকার বিরোধী শক্তির ঘনিষ্ঠতা ট্রাম্পের সহ্য হচ্ছিলো না। ছবি: রয়টার্স
এবিসি নিউজের একটি প্রতিবেদনে বলা হয় যে, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ‘অফিস অব দ্য হিস্টোরিয়ান’-এর তথ্যমতে, কিউবা, নিকারাগুয়া, হাইতি এবং ডোমিনিকান রিপাবলিকে মার্কিন হস্তক্ষেপের যৌক্তিকতা হিসেবে ‘মনরো ডকট্রিন’ ব্যবহৃত হয়েছিল।
মনরো ডকট্রিন প্রবর্তনের দুই শতাব্দীর মধ্যে বৈশ্বিক রাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। এখন ইউরোপ আর আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। সেখানে যুক্ত হয়েছে রাশিয়া, চীন, ইরান ও উত্তর কোরিয়া। লাতিন আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদবিরোধী দেশ ভেনেজুয়েলার সঙ্গে এই দেশগুলো ঘনিষ্ঠতা ছিল। পাশাপাশি দেশটির তেল শিল্পে রাশিয়া, চীন ও ইরানের প্রভাব বাড়ছিল। এটি কোনোভাবে মেনে নিতে পারেনি ট্রাম্প প্রশাসন। তার চোখে এগুলো মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির চরম লঙ্ঘন।
গত নভেম্বরে ট্রাম্প প্রশাসন তাদের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল প্রকাশ করেছে, যেখানে পশ্চিম গোলার্ধের প্রতি তাদের নীতিকে ‘মনরো ডকট্রিনের’ আদলে সাজানো হয়েছে। হোয়াইট হাউজের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে ৩৩ পৃষ্ঠার এই কৌশলপত্র প্রকাশ করা হয়।
সেই কৌশলপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে,“বছরের পর বছর অবহেলার পর পশ্চিম গোলার্ধে আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্ব পুনরুদ্ধার করতে এবং আমাদের মাতৃভূমি ও এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক এলাকাগুলোতে আমাদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে আমেরিকা পুনরায় মনরো ডকট্রিন কার্যকর ও প্রয়োগ করবে।”
কৌশলপত্র অনুযায়ী, “আমরা আমাদের অঞ্চলে পশ্চিম গোলার্ধ-বহির্ভূত প্রতিযোগীদের কোনো সামরিক বাহিনী বা অন্য কোনো হুমকিমূলক সক্ষমতা মোতায়েন করা অথবা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগ দেব না। মনরো ডকট্রিনের এই ‘ট্রাম্প করোলারি’ বা ট্রাম্প-সংযোজন হলো মার্কিন শক্তির এক বিচক্ষণ ও শক্তিশালী পুনরুদ্ধার এবং আমাদের অগ্রাধিকারগুলোর পুনঃস্থাপন, যা আমেরিকার নিরাপত্তা স্বার্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।”
ট্রাম্প পরবর্তিতে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “আমাদের নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের অধীনে, পশ্চিম গোলার্ধে আমেরিকার আধিপত্য নিয়ে আর কখনো প্রশ্ন উঠবে না। এমনটা আর ঘটবেই না। গত কয়েক দশক ধরে অন্যান্য প্রশাসনগুলো পশ্চিম গোলার্ধের এই ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা হুমকিগুলোকে অবহেলা করেছে, এমনকি বাড়িয়ে তুলতেও সাহায্য করেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে আমরা আমাদের নিজস্ব অঞ্চলে অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে মার্কিন শক্তি পুনরায় প্রতিষ্ঠা করছি।”
‘ডনরো ডকট্রিন’ মার্কিন অবস্থানের একটি শক্তিশালী ও হস্তক্ষেপমূলক পরিবর্তনের প্রতিনিধিত্ব করবে। এটি কূটনৈতিক সতর্কতা থেকে সরাসরি পদক্ষেপের দিকে মোড় নেবে; যার প্রতিফলন সম্প্রতি ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযানে দেখা গেছে। এই পদ্ধতিটিকে কেউ কেউ মূল মনরো ডকট্রিন এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের ‘রুজভেল্ট করোলারি’-র একটি ‘ট্রাম্প সংস্করণ’ হিসেবে দেখছেন, যা লাতিন আমেরিকার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘সামরিক’ অধিকারের দাবি নিশ্চিত করে।
ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযানের পর ট্রাম্প প্রকাশ্যেই কলম্বিয়াকে হুমকি দিয়ে বলেন যে, দেশটিকে ভেনেজুয়েলার মতো একই পরিণতির মুখোমুখি হতে হতে পারে। এ ছাড়া কিউবাও পতনের জন্য ‘পুরোপুরি প্রস্তুত’ বলে তিনি মন্তব্য করেন। মাদক কার্টেলগুলোর বিরুদ্ধে প্রশাসনের চলমান লড়াইয়ের অংশ হিসেবে মেক্সিকোও পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এর বাইরে ট্রাম্প আবারও গ্রিনল্যান্ড দখলের কথা তুলেছেন।
ট্রাম্পের ডনরো ডকট্রিন আসলে চীন ও রাশিয়ার জন্য একটি সতর্কবার্তা। ছবি: রয়টার্স
ডনরো ডকট্রিনের প্রভাবে ভূ-রাজনীতিতে আরও কিছু পরিবর্তন হতে পারে। যেমন-
চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত: ফিন্যান্সিয়াল রিভিউয়ের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন যে, এই ডকট্রিন চীন ও রাশিয়ার মতো গোলার্ধ-বহির্ভূত প্রতিযোগীদের সাথে উত্তেজনার ‘আগুনে ঘি ঢালবে’। এই দুইটি দেশ গত কয়েক দশকে লাতিন আমেরিকায় (যেমন ভেনেজুয়েলার তেল খাত) উল্লেখযোগ্য প্রভাব ও সম্পদ গড়ে তুলেছে। নয়া পররাষ্ট্রনীতি স্পষ্টভাবে এই প্রতিযোগীদের পশ্চিম গোলার্ধে ‘কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের’ মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যা সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি করবে।
স্বৈরাচারী শক্তিগুলোর জন্য নজির: ডেমোক্রেটিক সিনেটর মার্ক ওয়ার্নারসহ কিছু বিশ্লেষক মনে করেন যে, বিদেশি নেতাদের আক্রমণ ও বন্দি করার এই মার্কিন দাবি আন্তর্জাতিকভাবে একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে যে, চীন (তাইওয়ানের ক্ষেত্রে) বা রাশিয়ার (ইউক্রেনের ক্ষেত্রে) মতো স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থাগুলো তাদের নিজস্ব সামরিক পদক্ষেপ ও আঞ্চলিক দাবিকে বৈধতা দিতে এই নীতিকে ‘উদাহরণ’ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
কৌশলগত সম্পদের ওপর বিশেষ নজর (তেল এবং গ্রিনল্যান্ড): বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে যে, মার্কিন পদক্ষেপগুলো কৌশলগত সম্পদের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হবে। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে এর মধ্যে রয়েছে তেলের মজুতে মার্কিন নিয়ন্ত্রণ বিশ্ব তেলের বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। একই যুক্তি নিরাপত্তার খাতিরে গ্রিনল্যান্ডের ওপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও প্রসারিত হয়েছে, যা ইউরোপীয় কূটনৈতিক কর্মকর্তা এবং ন্যাটোর মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
তবে আক্রমণাত্মক বাগাড়ম্বর সত্ত্বেও, ভেনেজুয়েলার মতো দেশগুলোতে ‘ডনরো ডকট্রিন’-এর দীর্ঘমেয়াদী সাফল্য অনিশ্চিত। বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে, একটি অনুগত নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়তে পারে। এছাড়া কংগ্রেসের জোরালো সমর্থন বা আন্তর্জাতিক সংহতি ছাড়া এই আধিপত্য বিস্তারের পথটি অত্যন্ত কঠিন হবে। এই ‘ডকট্রিন’ প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত ইচ্ছা এবং তার পররাষ্ট্র নীতিবিষয়ক দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজনের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এর ধারাবাহিক বাস্তবায়ন নিয়ে ‘সঠিক’ পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন।
ট্রাম্পের ডনরো ডকট্রিন দুনিয়ার জন্য অশনি সংকেত হতে পারে। ছবি: এআই
আমেরিকার ৫ম প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো ১৮৮৩ সালে একটি পররাষ্ট্রনীতি ঘোষণা করেন। সেই নীতি অনুসারে, লাতিন আমেরিকার যেকোনো বিষয়ে ইউরোপের হস্তক্ষেপ বা উপনিবেশ স্থাপনের চেষ্টা বা প্রক্রিয়া আমেরিকার কাছে ‘অবৈধ’ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং এ ধরণের হস্তক্ষেপে আমেরিকা সক্রিয়ভাবে বাধা দেবে। এই পররাষ্ট্রনীতিই ‘মনরো ডকট্রিন’ নামে পরিচিত।
সম্প্রতি ভেনেজুয়েলায় আমেরিকার সামরিক অভিযানের পর আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে এই নীতি, তবে ভিন্ন নামে। অনেকটা ‘পুরোনো বোতলে নতুন মদ’ হয়ে।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করার পর, এক সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘ডনরো ডকট্রিন’–এর কথা বলেন। এটি মূলত মার্কিন পরাশক্তি সম্পর্কে তার এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে আমেরিকা পশ্চিম গোলার্ধ দখল করতে তার সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতে পারে। ট্রাম্পের এই পররাষ্ট্রনীতি ‘মনরো ডকট্রিন’-এর নতুন সংস্কার বললে ভুল হবে না।
ভেনেজুয়েলায় হামলার পর শনিবার মার-এ-লাগোতে ট্রাম্প বলেন, “সেই শুরু থেকেই এটি মনরো ডকট্রিনের সঙ্গে যুক্ত। মনরো ডকট্রিন একটি বড় বিষয় ছিল, কিন্তু আমরা এখন তাকে অনেকখানি ছাড়িয়ে গেছি। সবাই এখন একে ‘ডনরো ডকট্রিন’ বলে ডাকছে।”
কারও বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে, ‘ডনরো’ শব্দটি ডোনাল্ড আর মনরোর মিশ্রণ। এই নয়া পররাষ্ট্রনীতি বুঝতে হলে আগে মনরো ডকট্রিন সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকতে হবে।
ঐতিহাসিক ‘মনরো ডকট্রিন’ ছিল আমেরিকা মহাদেশে ইউরোপীয় দেশগুলোর উপনিবেশ স্থাপনের বিরুদ্ধে এক ধরণের সতর্কবার্তা। পরবর্তীতে বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট এতে বেশ কিছু বিষয় যুক্ত করেন। ব্রিটানিকার তথ্য অনুযায়ী, ‘রুজভেল্ট করোলারি’ অনুসারে লাতিন আমেরিকার কোনো দেশ যদি ‘ভুল পথে’ চালিত হয়, তবে সেই দেশকে শাসন করার অধিকার আমেরিকার থাকবে। এভাবে আমেরিকা লাতিন আমেরিকার ২০টি দেশের দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেয়। এই নীতির ‘দোহাই’ দিয়ে ১৮৯৮ থেকে ১৯৯৪ সালের মধ্যে মার্কিন প্রশাসন অন্তত ৪১ বার লাতিন আমেরিকায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অযাচিত হস্তক্ষেপ বা আগ্রাসন চালিয়েছিল।
ভেনেজুয়েলার সঙ্গে আমেরিকার বিরোধী শক্তির ঘনিষ্ঠতা ট্রাম্পের সহ্য হচ্ছিলো না। ছবি: রয়টার্স
এবিসি নিউজের একটি প্রতিবেদনে বলা হয় যে, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ‘অফিস অব দ্য হিস্টোরিয়ান’-এর তথ্যমতে, কিউবা, নিকারাগুয়া, হাইতি এবং ডোমিনিকান রিপাবলিকে মার্কিন হস্তক্ষেপের যৌক্তিকতা হিসেবে ‘মনরো ডকট্রিন’ ব্যবহৃত হয়েছিল।
মনরো ডকট্রিন প্রবর্তনের দুই শতাব্দীর মধ্যে বৈশ্বিক রাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। এখন ইউরোপ আর আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। সেখানে যুক্ত হয়েছে রাশিয়া, চীন, ইরান ও উত্তর কোরিয়া। লাতিন আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদবিরোধী দেশ ভেনেজুয়েলার সঙ্গে এই দেশগুলো ঘনিষ্ঠতা ছিল। পাশাপাশি দেশটির তেল শিল্পে রাশিয়া, চীন ও ইরানের প্রভাব বাড়ছিল। এটি কোনোভাবে মেনে নিতে পারেনি ট্রাম্প প্রশাসন। তার চোখে এগুলো মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির চরম লঙ্ঘন।
গত নভেম্বরে ট্রাম্প প্রশাসন তাদের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল প্রকাশ করেছে, যেখানে পশ্চিম গোলার্ধের প্রতি তাদের নীতিকে ‘মনরো ডকট্রিনের’ আদলে সাজানো হয়েছে। হোয়াইট হাউজের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে ৩৩ পৃষ্ঠার এই কৌশলপত্র প্রকাশ করা হয়।
সেই কৌশলপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে,“বছরের পর বছর অবহেলার পর পশ্চিম গোলার্ধে আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্ব পুনরুদ্ধার করতে এবং আমাদের মাতৃভূমি ও এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক এলাকাগুলোতে আমাদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে আমেরিকা পুনরায় মনরো ডকট্রিন কার্যকর ও প্রয়োগ করবে।”
কৌশলপত্র অনুযায়ী, “আমরা আমাদের অঞ্চলে পশ্চিম গোলার্ধ-বহির্ভূত প্রতিযোগীদের কোনো সামরিক বাহিনী বা অন্য কোনো হুমকিমূলক সক্ষমতা মোতায়েন করা অথবা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগ দেব না। মনরো ডকট্রিনের এই ‘ট্রাম্প করোলারি’ বা ট্রাম্প-সংযোজন হলো মার্কিন শক্তির এক বিচক্ষণ ও শক্তিশালী পুনরুদ্ধার এবং আমাদের অগ্রাধিকারগুলোর পুনঃস্থাপন, যা আমেরিকার নিরাপত্তা স্বার্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।”
ট্রাম্প পরবর্তিতে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “আমাদের নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের অধীনে, পশ্চিম গোলার্ধে আমেরিকার আধিপত্য নিয়ে আর কখনো প্রশ্ন উঠবে না। এমনটা আর ঘটবেই না। গত কয়েক দশক ধরে অন্যান্য প্রশাসনগুলো পশ্চিম গোলার্ধের এই ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা হুমকিগুলোকে অবহেলা করেছে, এমনকি বাড়িয়ে তুলতেও সাহায্য করেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে আমরা আমাদের নিজস্ব অঞ্চলে অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে মার্কিন শক্তি পুনরায় প্রতিষ্ঠা করছি।”
‘ডনরো ডকট্রিন’ মার্কিন অবস্থানের একটি শক্তিশালী ও হস্তক্ষেপমূলক পরিবর্তনের প্রতিনিধিত্ব করবে। এটি কূটনৈতিক সতর্কতা থেকে সরাসরি পদক্ষেপের দিকে মোড় নেবে; যার প্রতিফলন সম্প্রতি ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযানে দেখা গেছে। এই পদ্ধতিটিকে কেউ কেউ মূল মনরো ডকট্রিন এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের ‘রুজভেল্ট করোলারি’-র একটি ‘ট্রাম্প সংস্করণ’ হিসেবে দেখছেন, যা লাতিন আমেরিকার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘সামরিক’ অধিকারের দাবি নিশ্চিত করে।
ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযানের পর ট্রাম্প প্রকাশ্যেই কলম্বিয়াকে হুমকি দিয়ে বলেন যে, দেশটিকে ভেনেজুয়েলার মতো একই পরিণতির মুখোমুখি হতে হতে পারে। এ ছাড়া কিউবাও পতনের জন্য ‘পুরোপুরি প্রস্তুত’ বলে তিনি মন্তব্য করেন। মাদক কার্টেলগুলোর বিরুদ্ধে প্রশাসনের চলমান লড়াইয়ের অংশ হিসেবে মেক্সিকোও পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এর বাইরে ট্রাম্প আবারও গ্রিনল্যান্ড দখলের কথা তুলেছেন।
ট্রাম্পের ডনরো ডকট্রিন আসলে চীন ও রাশিয়ার জন্য একটি সতর্কবার্তা। ছবি: রয়টার্স
ডনরো ডকট্রিনের প্রভাবে ভূ-রাজনীতিতে আরও কিছু পরিবর্তন হতে পারে। যেমন-
চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত: ফিন্যান্সিয়াল রিভিউয়ের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন যে, এই ডকট্রিন চীন ও রাশিয়ার মতো গোলার্ধ-বহির্ভূত প্রতিযোগীদের সাথে উত্তেজনার ‘আগুনে ঘি ঢালবে’। এই দুইটি দেশ গত কয়েক দশকে লাতিন আমেরিকায় (যেমন ভেনেজুয়েলার তেল খাত) উল্লেখযোগ্য প্রভাব ও সম্পদ গড়ে তুলেছে। নয়া পররাষ্ট্রনীতি স্পষ্টভাবে এই প্রতিযোগীদের পশ্চিম গোলার্ধে ‘কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের’ মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যা সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি করবে।
স্বৈরাচারী শক্তিগুলোর জন্য নজির: ডেমোক্রেটিক সিনেটর মার্ক ওয়ার্নারসহ কিছু বিশ্লেষক মনে করেন যে, বিদেশি নেতাদের আক্রমণ ও বন্দি করার এই মার্কিন দাবি আন্তর্জাতিকভাবে একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে যে, চীন (তাইওয়ানের ক্ষেত্রে) বা রাশিয়ার (ইউক্রেনের ক্ষেত্রে) মতো স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থাগুলো তাদের নিজস্ব সামরিক পদক্ষেপ ও আঞ্চলিক দাবিকে বৈধতা দিতে এই নীতিকে ‘উদাহরণ’ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
কৌশলগত সম্পদের ওপর বিশেষ নজর (তেল এবং গ্রিনল্যান্ড): বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে যে, মার্কিন পদক্ষেপগুলো কৌশলগত সম্পদের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হবে। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে এর মধ্যে রয়েছে তেলের মজুতে মার্কিন নিয়ন্ত্রণ বিশ্ব তেলের বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। একই যুক্তি নিরাপত্তার খাতিরে গ্রিনল্যান্ডের ওপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও প্রসারিত হয়েছে, যা ইউরোপীয় কূটনৈতিক কর্মকর্তা এবং ন্যাটোর মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
তবে আক্রমণাত্মক বাগাড়ম্বর সত্ত্বেও, ভেনেজুয়েলার মতো দেশগুলোতে ‘ডনরো ডকট্রিন’-এর দীর্ঘমেয়াদী সাফল্য অনিশ্চিত। বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে, একটি অনুগত নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়তে পারে। এছাড়া কংগ্রেসের জোরালো সমর্থন বা আন্তর্জাতিক সংহতি ছাড়া এই আধিপত্য বিস্তারের পথটি অত্যন্ত কঠিন হবে। এই ‘ডকট্রিন’ প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত ইচ্ছা এবং তার পররাষ্ট্র নীতিবিষয়ক দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজনের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এর ধারাবাহিক বাস্তবায়ন নিয়ে ‘সঠিক’ পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন।