ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রির পূর্বনির্ধারিত কাঠমান্ডু সফর স্থগিত করা হয়েছে। আজ সোমবার দুইদিনের সফরে তার নেপালে পৌঁছানোর কথা ছিল। দুই দেশের কূটনৈতিক মহলে এই সফর নিয়ে ব্যাপক প্রস্তুতি থাকলেও শেষ মুহূর্তে দিল্লির পক্ষ থেকে সফর স্থগিতের কথা জানানো হয়।
বিক্রম মিশ্রির নির্ধারিত কাঠমান্ডু সফর শেষ মুহূর্তে স্থগিত হওয়ায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে নেপাালের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহের কূটনৈতিক অবস্থান।
আফ্রিকা-ইউরেশিয়াভিত্তিক থিংকট্যাঙ্ক ইউরেশিয়া রিভিউয়ের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভারত-নেপাল সম্পর্ক বরাবরই ওঠানামার মধ্যে থেকেছে। সাম্প্রতিক সময়ে তা আবারও নতুন করে টানাপোড়েনের মুখে পড়েছে। কূটনৈতিক প্রটোকল এবং ‘লিপুলেখ পাসকে’ ঘিরে সার্বভৌমত্বের বিরোধ–এই দুই ইস্যু এখন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে অস্বস্তি তৈরি করেছে।
নেপালের সংবাদমাধ্যম দ্য কাঠমান্ডু পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১১ ও ১২ মে অন্য ব্যস্ততা থাকায় বিক্রম মিশ্রির কাঠমান্ডু সফর স্থগিত করা হয়েছে বলে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। তবে সূত্র অনুযায়ী, বালেন্দ্র শাহ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি শুধুমাত্র পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা সমমানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গেই বৈঠক করবেন।
ইউরেশিয়া রিভিউয়ের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, সফররত কোনো দেশের পররাষ্ট্রসচিব কেবল তার সমমর্যাদার নেপালি কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করতে পারেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নয়। তবে পাকিস্তান ও চীন ব্যতীত প্রতিবেশী দেশগুলোর ক্ষেত্রে ভারত সবসময় এই ধরনের প্রটোকল কঠোরভাবে অনুসরণে অভ্যস্ত নয়।
নয়াদিল্লি নিজেকে প্রতিবেশীদের প্রতি এক ধরনের অভিভাবকসুলভ অবস্থানে দেখে, যেখানে তারা সহায়তাদাতা ও নিরাপত্তা প্রদানকারী হিসেবে ভূমিকা রাখে। ফলে তারা অতিরিক্ত কিছু কূটনৈতিক ছাড় প্রত্যাশা করে, কেবল আনুষ্ঠানিক প্রটোকলের কঠোর অনুসরণ নয়।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নির্বাচন-পরবর্তী নেপালে ভারতের প্রতি প্রচলিত ‘আনুগত্যের প্রত্যাশা’ এখন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। জেন–জি নেতৃত্বাধীন অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ক্ষমতায় আসা তরুণ ও প্রচলিত ধারা থেকে ভিন্ন রাজনীতির নেতা বালেন শাহ এ পরিবর্তনের প্রতিফলন ঘটাচ্ছেন।
ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বালেন শাহ বেশ কিছু কঠোর ও ‘বিতর্কিত’ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে, ছাত্র সংসদে রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা। ভারতীয় পররাষ্ট্রসচিবকে সাক্ষাৎ না দেওয়ার অভিযোগও তার দৃঢ় ও ব্যতিক্রমধর্মী রাজনৈতিক অবস্থানেরই অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নিচের পদমর্যাদার কোনো বিদেশি কর্মকর্তা বা নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করা থেকে বিরত থাকছেন নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী। এর আগে এই নীতির কারণেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের দুই উচ্চপদস্থ প্রতিনিধির সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেননি। একই নীতি অনুসরণ করে বিক্রম মিশ্রির সফরের ক্ষেত্রেও তিনি অবস্থান বজায় রাখেন।
সীমান্ত ইস্যুতে দীর্ঘদিনের বিরোধ
ভারত-নেপাল সম্পর্কের অন্যতম জটিল বিষয় সীমান্ত বিরোধ। বিশেষ করে ভারত-চীন সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত লিপুলেখ পাস নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য রয়েছে। নেপাল দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, লিপুলেখ তাদের ভূখণ্ডের অংশ। অন্যদিকে ভারত এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
অনেকদিন ধরেই লিপুলেখ পাস ভারতের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে নেপাল বলছে, ১৮১৬ সালের সুগৌলি চুক্তি অনুযায়ী এটি তাদের অংশ। ভারতের দাবি, পরবর্তীতে ব্রিটিশরা অবস্থান পরিবর্তন করে এলাকাটি ভারতের অন্তর্ভুক্ত করে।
বর্তমানে লিপুলেখ পাস ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এর একদিকে ভারত-চীন (তিব্বত) সীমান্ত অবস্থিত, অন্যদিকে তিব্বতের হিন্দু তীর্থস্থান মানস সরোবর যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ পথ। ভারত ও চীনের মধ্যে চুক্তির আওতায় এই পথ ব্যবহার করে তীর্থযাত্রা পরিচালিত হয়ে আসছে। তবে লিপুলেখ হয়ে মানস সরোবর যাত্রা পুনরায় চালুর চীন-ভারত সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়েছে বালেন শাহ প্রশাসন।
এদিকে ভারত সংঘাত এড়িয়ে সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের কথা বলেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, নেপাল ও ভারতের মধ্যে বকেয়া সব ইস্যু নিয়ে আলোচনা করতে তারা প্রস্তুত। সীমান্ত বিরোধ থাকলে তা সংলাপের মাধ্যমেই সমাধান সম্ভব। তবে একতরফাভাবে কোনো ভূখণ্ডের দাবি তোলা গ্রহণযোগ্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নেপাল সরকার এ বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে তাদের অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরে আসছে। লিপুলেখ প্রশ্নে তারা সম্পূর্ণ স্পষ্ট ও অনড় বলে উল্লেখ করেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র। তিনি জানান, বিষয়টি ইতিমধ্যে বন্ধুপ্রতীম দুই দেশ ভারত ও চীনকে অবহিত করা হয়েছে।
বিক্রম মিশ্রির সফর স্থগিত হওয়া সাময়িক কূটনৈতিক শীতলতা তৈরি করলেও দুই দেশের সম্পর্ক বড় কোনো সংকটে পড়বে না বলে মত বিশ্লেষকদের। কারণ আগামী মাসে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দিল্লি সফরের কর্মসূচি এখনো বহাল রয়েছে।